তাহের হত্যা, ৭ই নভেম্বর :: অসমাপ্ত বিপ্লব

Posted: নভেম্বর 6, 2012 in দেশ, মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

কর্নেল আবু তাহের

কর্নেল আবু তাহের

৭ই নভেম্বর, বাংলার ইতিহাসের এক অনন্য দিন। কারো মতে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের সূচনা, আবার কারো মতে তা বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বিএনপি’র পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, এই দিনে সিপাহিজনতার উত্থানের মধ্য দিয়ে একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, ফলে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে এবং সার্বভৌমত্বস্বাধীনতা রক্ষা পায়। ৭ নভেম্বর বিএনপি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করলেও এই বিপ্লব সংঘটনের অপরাধেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম ও তাঁর রাজনৈতিক দল জাসদের নেতৃবৃন্দকে এক প্রহসনের বিচারের মুখোমুখি করা হয়, কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, ঐ দিনের ঘটনাক্রম ছিল পাকিস্তান আমল বা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া বুর্জোয়া রাজনৈতিক টানাপোড়েন থেকে একদমই ভিন্ন। সেদিন সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত সেনা সদস্যরা একটি ভিন্ন লক্ষ্যে এগিয়ে আসে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ, চাটুকার ঘেরা তৎকালীন সরকার, রাষ্ট্রদ্রোহীতার দায়ে জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) নিষিদ্ধকরণ ও দমন নিপীড়ণের স্বার্থে দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীসমর্থকদের হত্যা এবং মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে কতগুলো অভ্যুত্থান আর রক্তপাতের বিরুদ্ধে ছিল তাদের তীব্র ঘৃণা; আর এরই ফলশ্রুতিতে জাতীয় জীবনে পরিপূর্ণ মুক্তির লক্ষ্যে তাদের এই প্রচেষ্টা। এখানে বলে রাখা ভাল যে, এখনকার শোষকের ভাগীদার জাসদ আর তৎকালীন জাসদ’কে এক করাটা পুরোদস্তুর বোকামী হবে। তবে কর্নেল তাহেরের কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা করার ক্ষেত্রে দলটির মূল্যায়ণ অতীব জরুরী, যা আমরা আলোচনার পরের অংশে করব।

মূলত ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মূলে ছিল জাসদের সশস্ত্র শাখা। এই বিদ্রোহের মাধ্যমেই প্রথম “বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা” এবং “বিপ্লবী গণবাহিনী” প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে। দুটি সংগঠনই মুক্তিযুদ্ধে দোর্দণ্ড প্রতাপে নেতৃত্বদানকারীঅংশগ্রহণকারীদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। তৎকালীন সিনিয়র সামরিক অফিসারদের অনেকেই বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত ছিলেন, এবং বিদেশী গোয়েন্দাদের সঙ্গেও যোগসাজশ ছিল তাদের। যারা ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অনেক সাধারণ সিপাহী ছিলেন। তাদের সাহস, বীরত্ব আর আত্মত্যাগের যে গুণাবলী লক্ষ্য করা গেছে, তা ঐ বিদ্রোহের এক বিশিষ্ট উত্তরাধিকার হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

এই বিষয়ে আলোচনার জন্য তৎকালীন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির মূল্যায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, নীতি নির্ধারণী মহলে অচলাবস্থা, শিক্ষার অভা, বেকারত্ব ছিল তখন চরম পর্যায়ে। দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী জনগগোষ্ঠীর সংখ্যা ৭৮ শতাংশ। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচার করলে এরকম হতাশাব্যঞ্জক অর্থনৈতিক দৃষ্টান্তকে চ্যালেঞ্জ করা ছিল খুবই যৌক্তিক। উপরন্তু, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো সেনা ক্যু সংঘটিত হয়। শেখ মুজিবকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা দখলকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি তাহের। সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে এ রকম একটি ষড়যন্ত্রের আভাসও দিয়েছিলেন তাহের। কিন্তু কোনো সতর্কতা কাজে আসেনি, হত্যাকারীরা সফল হয়েছিল। সে সময় সেনাবাহিনীর মধ্যে একের পর এক সেনা ক্যু সংঘটিত হতে থাকে। এমতাবস্থায় দেশকে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন কর্নেল তাহের ও তার সহযোদ্ধারা।

৪ নভেম্বর থেকে আবু ইউসুফ এবং এবিএম মাহমুদের বাসায় শুরু হয় জাসদের নেতৃবৃন্দের লাগাতার মিটিং। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল আলম খান, . আখলাকুর রহমান, হাসানুল হক ইনু, আফম মাহবুবুল হক, খায়ের এজাজ মাসুদ, কাজী আরেফ প্রমুখ। আরো ছিলেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতা হাবিলদার হাই, কর্পোরাল আলতাফ, নায়েব সুবেদার মাহবুব, জালাল, সিদ্দিক প্রমুখ। তৎকালীন অন্যতম প্রধান দল জাসদ, যারা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রত ছিল, তাদের যাত্রা প্রথমে বাধাগ্রস্ত হয়েছে শেখ মুজিব সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষতঃ রক্ষীবাহিনী কর্তৃক দলের প্রায় ২৬ হাজার নেতাকর্মীসমর্থকদের হত্যা, নির্যাতনের কারণে এবং দ্বিতীয়বারের মতো রাজনীতির গতিপথ বদলে দেবার জন্য আবির্ভূত হন খালেদ মোশারফ। সে সময়ে সিপাহীরা স্পষ্টতই বুঝতে পারেন যে, তাদের কেবলই ব্যবহার করা হচ্ছে, কিছু গোষ্ঠির হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তেফলশ্রুতিতে সৈনিকরা ক্রমেই হতাশাগ্রস্থ হয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠছিল।

আবু ইউসুফের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় কমরেডদের সাথে মিটিং চলাকালে তাহের জানান, ২ তারিখ রাতে জেনারেল জিয়া তার জীবন রক্ষা করে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য ফোনে ও পরে এক সুবেদারের মাধ্যমে এসওএস ম্যাসেজের মাধ্যমে অনুরোধ করেন। ন্যাশনালিস্ট, সৎ অফিসার হিসেবে আর্মিতে তার একটা ইমেজ থাকায় তাহের জিয়াকেই সর্বাপেক্ষা উপযোগী বলে মনে করেন। তাহের জানান যে, জাসদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেনারেল জিয়ার নীরব সমর্থন রয়েছে। তৎকালীন সময়ে জিয়ার পক্ষে জাসদের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু চিন্তা করাও সম্ভব ছিল না। গৃহবন্দি জিয়াকে যে কোন সময়ে হত্যা করা হতে পারে, আর তাকে সে অবস্থা থেকে মুক্ত করতে পারে কেবল কর্নেল তাহের। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, অভ্যুত্থান সফল হলে বিজয়ী সিপাহি জনতা কার নামে স্লোগান দেবে, জিয়ার নামে। কারণ, তাহের অনেক আগেই আর্মি থেকে রিটায়ার্ড, ক্যান্টনমেন্টে তার নামে স্লোগান হলে একটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। অপরদিকে, জাসদের বড় নেতাদের মধ্যে জলিল, রব, শাজাহান সিরাজ তখন কারাগারে। জিয়া আর্মির লোক, তাকে জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিকেরা মুক্ত করেছে, তাছাড়া সাধারণ মানুষের কাছেও তার একটা পরিচিতি ছিল। ঠান্ডা মাথায় পুরো অভ্যুত্থানের ছক তৈরি করেন তাহের। আসলো সেই ৭ই নভেম্বরের রাত। মধ্য রাতের পর জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করা হয় আর এর দায়িত্বে ছিলেন হাবিলদার হাই। তিনি ২০/৩০ জন সিপাই নিয়ে জিয়ার বাসভবনে যান। তারা স্লোগান দিতে দিতে আসেন ‘কর্নেল তাহের লাল সালাম, জেনারেল জিয়া লাল সালাম’।

গভীর রাতে টেলিফোনের মাধ্যমে নিজের জীবন রক্ষার অনুরোধের প্রেক্ষিতে তাহের যে বাস্তবিকই তাকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন তা দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠেন জেনারেল জিয়া। হাই জিয়াকে বলেন, কর্নেল তাহের এলিফ্যান্ট রোডে তার ভাইয়ের বাড়ীতে জেনারেল জিয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়েও উঠে পড়েন সৈনিকদের আনা গাড়িতে। মাঝপথে ফারুক, রশীদের এক সহযোগী মেজর মহিউদ্দীন এসে জিয়াকে বহনকারী গাড়িটিকে থামান। জিয়াকে টু ফিল্ড আর্টিলারীতে নিয়ে যাবার ব্যাপারে মেজর মহিউদ্দীন খুব তৎপর হয়ে উঠেন। সিপাহিরা খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। জিয়া টু ফিল্ড আর্টিলারীতে গিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। জিয়া আর ক্যান্টনমেন্টের বাইরের কোন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ে যেতে চাইলেন না। জিয়া বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের বলেন কর্নেল তাহেরকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসতে। তাহের এই খবর পেয়ে ইনুকে বলেন, এরা একটা রিয়েল ব্লান্ডার করে ফেলল। আমি চেয়েছিলাম আমাদের বিপ্লবের কেন্দ্রটাকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে নিয়ে আসতে।” টু ফিল্ড আর্টিলারীতে পৌঁছালে জিয়া এগিয়ে এসে তাহেরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। জিয়া তাহেরকে বলেন, তাহের, ইউ সেভড মাই লাইফ, থ্যাঙ্ক ইউ। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।” তাহের বলেন, আমি কিছুই করিনি, করেছে এই সিপাহিরা। অল ক্রেডিট গোজ টু দেম।” এরপর তাহের বসেন জিয়ার সঙ্গে আলাপে। কিভাবে তারা এই বিপ্লবটি সংগঠিত করেছেন তা জিয়াকে বিস্তারিত জানান। তাহের জিয়াকে পরেরদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটা সমাবেশ করা এবং তাতে বক্তৃতা দেবার কথা বলেন। বক্তৃতার কথা শুনতেই জিয়া বেঁকে বসে। রেডিওতেও যেতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে ক্যান্টনমেন্টেই রেকর্ড করা জিয়ার একটি বক্তৃতা প্রচার করা হয়েছে রেডিওতে। সেখানে জিয়া নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সিপাহীদের অভ্যুত্থানের কথা বললেও বক্তৃতায় জিয়া কোথাও অভ্যুত্থানের পেছনে জাসদ কিংবা কর্নেল তাহেরের কথা উল্লেখ করেননি। উপমহাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় এই সিপাহী অভ্যুত্থান ঘটবার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেটিকে বাঞ্চাল করে দেবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে দুটি শক্তি, একদিকে জেনারেল জিয়া, আরেক দিকে খন্দকার মোশতাক। তাহেরকে না জানিয়ে গোপনে ক্যান্টনমেন্টে মিটিং করেন মেজর জেনারেল জিয়া, মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান, এয়ার ভাইস মার্শাল তোয়াব, রিয়ার এডমিরাল একেএইচ খান, জেনারেল ওসমানী, মাহবুবুল আলম চাষী। হঠাৎ মিটিয়ে তাহের উপস্থিত হলে মাহবুবুল আলম চাষী বলেন, উই হ্যাব ডিসাইডেড টু কন্টিনিউ দি গভার্নমেন্ট উইথ মোশতাক এজ দি প্রেসিডেন্ট।” তাহের বলেন, উই ক্যান নট এলাউ দিস নুইসেন্স টু গো অন ফর এভার।” জেনারেল ওসমানী তাহেরের চিন্তাভাবনা জানতে চাইলে তাহের বলেন, প্রথমত আমাদের একটা বিপ্লবী পরিষদ করতে হবে, গঠন করতে হবে সর্বদলীয় জাতীয় সরকার। সে সরকারের কাজ হবে যত দ্রুত সম্ভব একটা ফ্রি এন্ড ফেয়ার ইলেকশান দেওয়া। জাস্টিজ সায়েম আপাতত হেড অফ দি স্টেট থাকতে পারেন। জেনারেল জিয়া আর্মি চিফ থাকবেন।”

ঘটনাক্রমে ক্ষমতা হাতে পাওয়া জিয়া নানান টাল বাহানায় বিপ্লবী সৈনিকদের দাবী দাওয়া মানতে অস্বীকৃতি জানায়। এ ঘটনায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠে ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানকারী বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য, বিপ্লবী গণবাহিনীর সদস্যরা আওয়াজ তোলেন যে, জেনারেল জিয়া ১২ দফা মানবার কথা দিয়ে কথা রাখেননি, ওয়াদা খেলাপ করেছেন, প্রতারণা করেছেন তাদের সঙ্গে। অবশেষে তাহের সব বুঝতে পেরে বলেন, এটা স্পষ্ট যে মূলত দু’টো কারণে হাতের মুঠোয় সাফল্য পেয়েও আমরা তা ধরে রাখতে পারিনি। প্রথমত জিয়াউর রহমানের বিশ্বাসঘাতকতা, দ্বিতীয়ত আমাদের গণজমায়েত করার ব্যর্থতা। আমাদের বিপ্লবের মিলিটারি ডাইমেনশনটা সাক্সেসফুল হলেও সিভিল ডাইমেনশনে আমরা ফেইল করে গেছি।”

৭ নভেম্বরে ফুঁসে ওঠা ঐ বিদ্রোহ জাগিয়ে দেওয়ার পেছনে জাসদের কিছু মূল লক্ষ্য ছিল। আর তা হলো জাসদ বুঝতে পেরেছিল সাংগঠনিক দিক থেকে তারা ক্ষমতা দখলের উপযোগী অবস্থায় নেই। তাদের অনেক কর্মীই তখন কারাগারে। ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল কারাগার থেকে তাদের নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকদের মুক্ত করা, তারপর এস্টাবলিশমেণ্টের শরীক হওয়া এবং রাজনৈতিক এবং সামরিক ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্র তৈরী করা। জাসদ মনে করছিল যে, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান না করেও ঘটনাপ্রবাহের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট ওজন তাদের আছে।

এ অবস্থায় জাসদ তাদের গণসংগঠনগুলোকে সক্রিয় করা এবং সেনানিবাসে অনুগত সামরিক কমিটি গঠন করার মাধ্যমে নিচ থেকে এক ধরনের ‘আধিপত্য’ তৈরী করতে চেয়েছিল। এ সময় জাসদ আন্দাজ করেছিল সমর্থনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ভিত্তি তারা প্রসারিত করতে পারবে। জাসদের পক্ষ হতে মনে করা হয়েছিল অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে মৈত্রীর কৌশল অনুসরণের ব্যাপারে তারা প্রস্তুতই ছিল, যা সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য পূরণের উপযোগী একটি রাষ্ট্র তৈরীর ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন হতে পারতো ঐ বিদ্রোহের দ্বিতীয় পর্যায়, যার জন্য হয়তো কয়েক মাস সময় লাগতো, আর এ সময়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন অস্থায়ী সরকার ক্ষমতায় থাকতো।

জাসদের এই মূল্যায়ণ আদতে কতোটুকু সঠিক ছিল, সে বিশ্লেষণে আমরা পরে আসছি। তার আগে সে সময়কার ঘটনা প্রবাহ উল্লেখ করা প্রয়োজন।

তাহের বুঝতে পারেন এ মুহূর্তে জাসদ এরকম একটা পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেবার মতো অবস্থা নেই। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের সময় জাসদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি বিদ্রোহের ন্যূনতম লক্ষ্য পূরণের উপযোগী ছিল না। লিফশুলৎসের সঙ্গে আলোচনায় তাহের জোর দিয়ে বললেন, ঘটনার গতিধারাই তাদেরকে আগেভাগে এ্যাকশনে যেতে বাধ্য করেছে। তিনি বললেন, তাদের নিজেদের হিসাবনিকাশ অনুযায়ী একেবারে আঁটঘাট বেঁধে প্রস্তুত হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছতে, প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে ১৯৭৬ সালের মার্চ বা এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগে যেত। অর্থ্যাৎ, আরো ছয় মাস অপেক্ষা করলে ততোদিনে শহরে এবং গ্রাম এলাকায় তারা তাদের জনসমর্থন নতুন করে সাজাতে পারতেন।

তাহের যুক্তি দেখালেন, একটার পর একটা অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থান সশস্ত্রবাহিনীকে গভীরভাবে অস্থির করে তুলেছিল। এর কারণ, সামরিক বাহিনীর সবাই বুঝে গেছে যে, সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে একপক্ষের উপর আরেক পক্ষের বাড়তি সুযোগসুবিধাই কেবল প্রতিষ্ঠিত হয়, দেশের যে হতদরিদ্র সিংহভাগ মানুষ, তাদের ক্ষেত্রে তা কোন মৌলিক পরিবর্তন আনে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা ব্রিগেডের মাধ্যমে কর্নেল তাহের বারবার যে বাণীটি প্রচার করতেন তা হলো একজন সৈন্যের পক্ষে দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ হলো, সবকিছুর উর্দ্ধে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণীটিকে তুলে ধরা। বাংলাদেশের মতো বিশ্বের এক দরিদ্রতম দেশে এই বাণী সামরিক বাহিনীর রাজনীতি সচেতন অংশটির মধ্যে বিপুলভাবে জায়গা করে নিয়েছিল। এই রাজনীতি সচেতন শক্তিটিই তাহের এবং জাসদকে বিদ্রোহে নেমে পড়তে চাপ দিয়েছিল। নিঃসন্দেহে, এমনকি তুখোড় পর্যালোচনা সত্ত্বেও, তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মনে করা হচ্ছিলো, তারা অংশগ্রহণ করুন আর নাই করুন, একটি বিদ্রোহ অত্যাসন্ন। জাসদের সামনে তখন এ বিদ্রোহে ভ্যানগার্ড হিসেবে অবতীর্ণ হওয়ার অথবা না হওয়ার প্রশ্ন। তারা তখন ভ্যানগার্ড হওয়ার মতো উপযোগী অবস্থানে ছিল। ফলে তারা বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থেকে পথনির্দেশ দিয়েছে। সম্ভবত তারা এমন এক সমাজে বসবাস করতে করতে অধৈর্য হয়ে পড়ছিল যেখানে সমাজতন্ত্রের বুলি আওড়ানো লোকেরা শেষ পর্যন্ত আরাম কেদারায় দোল খায়, না হলে বাজারে চায়ের ষ্টলে বসে আলোচনার ঝড় তোলে। (লরেন্স লিফশুলৎজএর “অসমাপ্ত বিপ্লব” অনুসারে)

এগার তারিখ পর্যন্ত জিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ থাকলেও বার তারিখের পর সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেই জিয়া তাহেরকে এড়িয়ে যেতেন। একটা সফল বিদ্রোহের জন্য সকল দুরুহ এবং জটিল দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার মতো যথেষ্ট পরিমাণে প্রস্তুতি ছিল কি না, এপ্রসঙ্গে ১৫ নভেম্বর ১৯৭৫ লিফশুলৎসের সাথে কথোপকথনে তাহের জানান, অভ্যুত্থানের সময় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুবই জটিল ছিল। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা ছিল এবং তারা অভ্যুত্থানের সমর্থকদের খতম করার অভিযানে নামতে পারতো। প্রতিশোধ স্পৃহার অভিপ্রকাশ হিসেবে পরবর্তী তিন বছরে সেটাই ঘটেছে। অপরিণত ও অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি এরকম পরিণতিই বয়ে আনে।

এর সপ্তাহখানেক পর এক বৈঠকে তাহের ইঙ্গিত করলেন, ব্যাপক গণসমাবেশ, যেটা তিনি আশা করেছিলেন, তাতে জাসদ সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক মানুষ রাস্তায় নেমে এসে সিপাহীদের স্বতস্ফুর্তভাবে অভিনন্দিত করলেও, অতীতে যেমন ছাত্রজনতারাজনৈতিক কর্মীদের ব্যাপক আলোড়ন দেখা গেছে, এক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। ৪ ও ৫ নভেম্বর জাসদের আন্ডারগ্রাউন্ড নেতৃত্বের এক বৈঠকে ঐসব শক্তিগুলোকে সক্রিয় করে তোলার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব প্রাপ্তরা পরে যথেষ্ট আন্তরিকতা ও তৎপরতা নিয়ে মাঠে নামেননি। অভ্যুত্থানের বেশ কয়েকটি দিক ছিল। কেবল যে সামরিক শক্তিকেই সংগঠিত করা হয়েছিল তা নয়, ছাত্রকর্মীদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছিল এবং তাদের সংগঠিত ঐক্যের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছিল। লক্ষ্যনির্ভর বিদ্রোহের হাতকে মুষ্টিবদ্ধ করতে হলে সকল আঙ্গুলকে তো একসঙ্গেই গুটাতে হয়।

পূর্বধারণা অনুযায়ী কেন সংগঠিত সমর্থন পাওয়া যায়নি, সে ব্যাপারেও যথেষ্ট বির্তক রয়েছে। ১৯৭৩ ও ৭৪ সালে যে সংগঠনটি লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়েছে, তাদের পক্ষে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড সামর্থ্যের বাইরে থাকার কথা ছিল না। ৭ নভেম্বরের সকালে জাসদ পরিস্কারভাবে তাদের কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেনি, যা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার এবং বিদ্রোহকে অন্যখাতে প্রবাহিত করার সুযোগ করে দেয়। জনগণের একটি বড়ো অংশ তখন পর্যন্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, অভ্যুত্থানের নায়ক আসলে কারা এবং তাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, নীতিই বা কি, যদি তা আদৌ থেকে থাকে। কয়েকটি স্লোগানই যথেষ্ট ছিল না। এতে কোনো সন্দেহ নেই, সমাজতান্ত্রিক ধারার কোনো সংগঠনের পক্ষে এগুলো খুবই মারাত্মক ব্যর্থতা। আর এ কারণে জাসদের তৎকালীন নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ।

২৩ নভেম্বর পুলিশের একটা বড় দল কর্নেল তাহেরের বড় ভাই ফ্লাইট সার্জেণ্ট আবু ইউসুফ খানের বাড়ী ঘেরাও করে ও তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় মেজর জেনারেল জিয়াকে টেলিফোন করলে অন্য প্রান্ত থেকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল এরশাদ আমার কথা শুনে বলেন যে, আবু ইউসুফ গ্রেফতারের ব্যাপারে সেনাবাহিনী কিছুই জানে না। ওটা হচ্ছে একটা সাধারণ পুলিশী তৎপরতা। তখন একই সময়ে মেজর জলিল ও আসম আব্দুর রব সহ অন্যান্য অনেক জাসদ নেতা ও কর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল।

২৪ নভেম্বর এক বিরাট পুলিশ বাহিনী কর্নেল আবু তাহেরকে ঘিরে ফেলে। তাকে জিয়ার সঙ্গে কথা বলার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে একটা জিপে তুলে সোজা জেলে নিয়ে আসা হয়।

জিয়া শুধু তাহেরের সাথেই নয়, বিপ্লবী সেনাদের সাথে, সাত নভেম্বরের চেতনার সঙ্গে, এক কথায় গোটা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পেছন থেকে ছুরি মেরেছে। আর তার এহেন চরিত্র কেবল মাত্র মীর জাফরের সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ। এরপর ১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই একটি গোপন সামরিক আদালতে প্রহসনের বিচার করা হলো। বিচারে কর্নেল তাহেরসহ ১৭ জনকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাহেরকে দেওয়া হলো মৃত্যুদণ্ড। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তথাকথিত রায়টি ঘোষিত হওয়ার মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ২১ জুলাই দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এই বিপ্লবী বিন্দুমাত্র শঙ্কাবোধ করেননি ফাঁসির মঞ্চে উঠতে।

নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর বড় কোনো সম্পদ নেই” কর্নেল তাহের

তাহেরের বিপ্লবী চিন্তা সার্বজনীন, এই মুক্তচিন্তার কোন কপিরাইট কোন দলের নাই। কারণ জাসদ তাহেরের নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করে এখন শোষক শ্রেণীর ক্ষমতার শরিক হলেও তাহেরকে কুক্ষিগত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি, তাহলে যে তারা সেই কাঙ্ক্ষিত বিপ্লবকে আর অগ্রাহ্য করতে পারতো না! সম্প্রতি কর্নেল আবু তাহেরের হত্যার রায় ঘোষণা করেছে উচ্চ আদালত। এই আদালতের বিচার যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত তা সহজেই অনুমেয়। এর মূল কারণ হলো, এখানে বিচার বিভাগ নামে মাত্র স্বাধীনতা ভোগ করে, মূলত এখানে সরকারী দলেরই রাজত্ব কায়েম ছিল ও আছে, এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আর এই রায়ে জিয়াকে আদালত কর্তৃক ভর্তসনা করা হয়েছে। আর লুটেরা শাসক গোষ্ঠির ক্ষমতার পালা বদলের পরিক্রমায় আওয়ামী লীগের এক সময়কার পরম শত্রু জাসদ এখন আওয়ামী লীগের কোলগত সুবোধ বালক; এক প্রহসনের বিচারে তাহের’কে হত্যা করা হয়েছিল, আরেক প্রহসনের বিচারে তাহেরকে দেশপ্রেমিক আখ্যা দেওয়া হয়, মূলতঃ জিয়া’কে ভর্তসনা করার জন্যেই। এর সাথে সুশাসনের কোনো সম্পর্ক খুঁজতে যাওয়াটা পুরোদস্তুর বোকামী। হয়তো আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে কমরেড সিরাজ সিকদার হত্যার বিচারও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মূল কথা হলো, যে সিস্টেমের বিরুদ্ধে তাহের লড়াই করেছিলেন, সেই সিস্টেমই (খুনী জিয়ার রূপে) তাকে হত্যা করল, আবার এতো বছর পর ঐ একই সিস্টেম সেই হত্যাকে অবৈধ ঘোষণা করল। এতে স্পষ্টতঃ প্রমাণিত হয় যে, এই সিস্টেম কতটা অমানবিক, কতটা রক্তচোষা, কতটা অগণতান্ত্রিক। অথচ যে বিপ্লবী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি প্রকৃত মুক্তির লড়াই চালিয়েছিলেন এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে, তা এখনো অধরা রয়ে গেছে। এখনো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে বিপ্লব আকাঙ্ক্ষী কমিউনিস্ট ও মুক্তিকামী জনগণ।

তাহের হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন হাইকোর্টে উপস্থিত ছিলাম আমি, নিঃসন্দেহে এই মূহুর্তটি ছিল অসীম ধৈর্য্যের অধিকারী মাতৃসম লুৎফা তাহের (কর্নেল তাহেরের স্ত্রী) ও তার পরিবারের জন্য খুবই আবেগতাড়িত। কিন্তু একটু ভিন্ন কোণ থেকে দেখলে ব্যাপারটা সবারই বোধগম্য হবে, যে কথাগুলো উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতে আরো উপস্থিত ছিলেন তাহেরের পুরনো বন্ধু লরেন্স লিফশুলৎজ। অনেক চেষ্টা করেও ইন্টারভিউ নিতে না পেরে (যেহেতু তাহেরের বিষয়ে বলার জন্য তাকে নিয়ে মিটিং সেমিনার করাটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে প্রায়, আর এত ভ্রমণের পর প্রতিদিন দিনভর সেমিনারমিটিং করে তিনি সেসময়ে খুবই ক্লান্ত ছিলেন) অনেক অপেক্ষার পর তার সাথে ক্ষাণিক কথা বলার সুযোগ মিলে হাইকোর্টের পাশেই। এই স্বল্প সময়ে খোস গল্পে না গিয়ে মূলত তাকে প্রশ্ন করেছিলাম দুইটা।

প্রশ্ন এক. এই রায় কী তাহেরের বিপ্লব চিন্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ?

উত্তর: “না, আমি তা মনে করি না, একজন বিপ্লবী ও তার বিপ্লবী চিন্তা কোন আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে সকল অন্যায়ের বিচার আদালতে করারই পক্ষপাতি। তার (তাহের) চিন্তায় ছিল সেনাবাহিনী হবে সাধারণ মানুষের সাথে সম্পর্কিত, আর তাই সেনাবাহিনীকেই তিনি বিপ্লবের ভিত্তি ধরে নেন, তবে সম্ভবত সমস্যা হয়েছিল তার রাজনৈতিক দল সাধারণ মানুষের কাছে সেভাবে না পৌছাতে পারায়।”

প্রশ্ন দুই. বর্তমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় সেই কাঙ্খিত বিপ্লব কী সম্ভব বলে মনে করেন, আর তা কিভাবে?

উত্তর: “অসম্ভব কিছুই নয়, এই সমাজে এখনো তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি, ১৯৭৫ থেকে ২০১১তে এসে এখনো এই সমাজে নীতি নির্ধারণের জায়গাতে সাধারণ মানুষের তেমন কোন মূল্যায়ন নেই। আর বিপ্লবের অনেকগুলো স্তর/ধারা আছে, এটা আপনাদেরই নির্ধারণ করে নিতে হবে এই বিপ্লব আপনারা চান কিনা, আর তা কোন উপায়ে।”

অতঃপর তিনি তাহেরের পরিবারবর্গের সাথে হাইকোর্ট থেকে বেরিয়ে যান। অনেক কথা বলার ইচ্ছা থাকলেও এর বেশী কিছু বলা সম্ভব হয়নি। যাওয়ার পথে লরেন্সকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম।

তাহেরকে সম্মান জানাতে চাইলে, তার আদর্শকে ধারণ করলে সেই বিপ্লব আকাঙ্ক্ষাকেও ধারণ করতে হবে। আর সেই অসমাপ্ত বিপ্লবকে সফল করার মাধ্যমেই কেবল তাহের ও অন্যান্য মুক্তিকামীদের আত্মাহুতির প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব। এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, দেশের মুক্তির জন্য কর্নেল তাহেরের মতো আরো যারা যুদ্ধ করেছেন, তাদের একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। বাংলাদেশের জনগণকে যেন আর কখনো নিজ দেশে ক্রীতদাসে পরিণত হতে না হয়, সেজন্য ঐ দৃষ্টিভঙ্গিটা ফিরিয়ে আনতে হবে। এই জনপদে রক্তই যেন সকল অর্জনের পূর্বশর্ত, রক্ত ছাড়া কোন আন্দোলন সংগ্রামই এখানে সফল হয়নি। যদিও মানুষ এখনো মুক্তির স্বাদ পায়নি, তথাপি এই নষ্ট, ঘূণে ধরা রাষ্ট্রে মুক্তিকামীদের রক্ত কিন্তু এখনো ঝরেই চলেছে। তবু এখানে সিরাজতাহেরদের জন্ম হয়, হয়ত আবারো কোন বিপ্লবী জন্ম নেবে এই ভূখন্ডে, আবারো আমাদের প্রকৃত মুক্তির স্বপ্ন পাবে বাস্তবতার ছোঁয়া। তাই দেশ গড়ার ক্ষেত্রে ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের শিক্ষা ও দিক নির্দেশনা, সেই সাথে ভুলগুলোও বিশ্লেষণ করে পৌছে দিতে হবে আপামর জনসাধারণের মাঝে। কর্নেল তাহেররা হয়ত আমাদের মাঝে স্বশরীরে অনুপস্থিত, কিন্তু তারা আছেন তাদের দেখানো মুক্তির চেতনায়, প্রতিটা বিদ্রোহের মাঝে, এজাতির প্রাণে মিশে আছেন তারা। যতদিন রবে মুক্তিকামী মানুষ, ততদিন রবে তাদের চেতনা সমান উজ্জ্বল।

তবে একথা ভুলে যাওয়ার অবকাশ নাই যে, কর্নেল তাহেরের কর্মপন্থায় সমগ্র বিপ্লবীত্ব সহকারেও কিছু মোটা দাগের ভুল প্রতীয়মান হয়। তিনি অনেকাংশে চে গুয়েভারা, বা ফোকোবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ফোকো (FOCO) একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার ইংরেজী প্রতিশব্দ ফোকাস (FOCUS), আর ফোকোবাদ হলো ফরাসি লেখক রেগিস দেব্রে ও চে গুয়েভারা দ্বারা গঠিত মতবাদ, যা পরবর্তীতে চেবাদ নামেও পরিচিতি লাভ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল তাহের লাইনের প্রশ্নে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণকে সশস্ত্র করার বদলে, অর্থাৎ গণযুদ্ধের বদলে, একটা এলিট সশস্ত্র ফোর্স গঠনকেই যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন। যার ফলে তিনি সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী অংশ, অর্থাৎ “বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা” এবং “বিপ্লবী গণবাহিনী”কে বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি নিরূপণ করেছিলেন। আর এক্ষেত্রে ৭ নভেম্বরের ভূমিকায় তার রাজনৈতিক দল জাসদ ছিল একেবারেই নিষ্প্রভ, আর এই দলের তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান, ওরফে দাদা’র ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। যে দলটি কয়েক মাস আগেও লাখো মানুষের জমায়েত করতে পারে, সে দলটি কেন নভেম্বরে চুপসে গেল? এমনকি কর্নেল তাহেরের গ্রেফতার ও প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে এক দেশপ্রেমিকের রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের সময়কালেও দেশজুড়ে জাসদের কোন উল্লেখযোগ্য সাড়াশব্দ লক্ষ্য করা যায়নি। আর সিরাজুল আলম খান চেয়েছিলেন মার্কিন এম্বেসীর পাণে, মার্কিন কৃপায় উড়াল দিয়েছিলেন মার্কিন মুল্লুকে। পরবর্তীতে সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষকতাও করেন দীর্ঘদিন যাবৎ। বিভিন্ন সময়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অন্যতম হোতা হিসেবে অভিযুক্ত এই ব্যক্তিটি ছিলেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের মাঝে অন্যতম, “জয় বাংলা” স্লোগান সহ শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া বিখ্যাত ৭ই মার্চের ভাষণ তৈরীর ক্ষেত্রেও তার বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে কথিত আছে। আবার শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী ঘটনা প্রবাহেও আঙ্গুল তাক করা হয় তার দিকে। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি, তথাপি মার্কিন এম্বেসীর সাথে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ও তাদের কৃপা লাভ এবং ১৯৭৫ এর নভেম্বর পরবর্তী ঘটনাক্রমে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান তার সাম্রাজ্যবাদী যোগাযোগের দিকেই ইশারা করে।

এখানে দুটি বিষয় ভীষণভাবে লক্ষ্যণীয়। এক. দল গঠনের প্রশ্ন, আর দুই. লাইনের প্রশ্নআর এক্ষেত্রে প্রথমেই মূল্যায়ণ প্রয়োজন জাসদ দলটির গঠন ও তার রণনীতিরণকৌশল সম্পর্কে।

১৯৭২ সালের ২৩ জুলাই আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ আসম রব ও শাজাহান সিরাজ এবং নূরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন গ্রুপে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ হয়ে যায়। প্রথম গ্রুপ পল্টন ময়দান এবং দ্বিতীয় গ্রুপ রমনা রেসকোর্সে সম্মেলন আহ্বান করে এবং দুটি গ্রুপই শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু শেখ মুজিব সিদ্দিকীমাখন গ্রুপের সম্মেলনে যোগ দিলেন, আর সেই থেকে ছাত্রলীগ ‘মুজিববাদী’ ও ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী’ নামে দুটি আলাদা সংগঠন হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে ‘আমাদের লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ স্লোগান নিয়ে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ গঠিত হয়। জাসদের ছাত্র সংগঠনের নামও তারা রাখেন “ছাত্রলীগ”, যা জাসদছাত্রলীগ নামে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই আওয়ামী দুঃশাসনে জনগণ অতীষ্ট হয়ে পড়েছিল, ছাত্র রাজনীতির অঙ্গন বা ক্যাম্পাস রাজনীতিতেও এর কোন ব্যতিক্রম ছিল না, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের কর্মীসদস্য, এমনকি শিক্ষকরা পর্যন্ত ছিল মুজিববাদী ছাত্রলীগারদের কাছে জিম্মি। এমতাবস্থায় জাসদ’র গঠন তরুণ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এর আরেকটা বড় কারণ ছিল প্রগতিশীল নামধারী বাম দল সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের আওয়ামী লেজুরবৃত্তিমূলক কর্মকাণ্ড। ফলে কলেজবিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রগতিশীল চিন্তার শিক্ষার্থীরা বিকল্প হিসেবে বেছে নেয় জাসদের ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’।

তৎকালীন অন্য বাম দলগুলো মনে করতো বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো আধা পুঁজিবাদী, আধা সামন্ততান্ত্রিক। আর এ কারণে বিপ্লবের স্তর জাতীয় গণতান্ত্রিক, বা নয়াগণতান্ত্রিক, যা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পূর্ববর্তী কাজ। অথচ জাসদ বাংলাদেশের খণ্ডিত বা ভ্রান্ত আর্থসামাজিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করে যে, এদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো নাকি ধনতান্ত্রিক (!) আর তাই বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক। আর এই ভ্রান্তিবিলাসে বিপুলসংখ্যক তরুণও তাতে আকৃষ্ট হয়েছিল।

জাসদ চেয়েছিল যেকোনো মূল্যে শেখ মুজিব সরকারের পতন, যেন এতেই ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের মুক্তি নিহিত! আর সেই কাজটি সপরিবার শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে অন্য কেউ করে ফেলায় জাসদ কর্মহীন হয়ে পড়ে অনেকাংশেই, যেহেতু তাদের কর্মপদ্ধতি সর্বোতভাবে আওয়ামী রাজনীতিকে টেক্কা দেওয়াতেই নিয়োজিত ছিল। জনগণের প্রকৃত মুক্তির পথে তারা কাজ করেনি, তাই জনভিত্তিও মজবুত করা সম্ভব হয়নি। আর রাজনৈতিক লক্ষ্যউদ্দেশ্য সম্পর্কে নিজেরাই বিভ্রান্তিতে থাকায় এই বিপ্লবী (!) নেতাদের কেউ বিএনপিতে সমর্পিত হয়েছেন, কেউ বা ওয়ামী লীগের কোলে চড়েছেনআবার কেউ স্বৈরসামরিক শাসকের পদলেহী হয়েছেন

শেখ মুজিব জীবিত থাকতে জাসদের আন্দোলনের কৌশল ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ এবং তার পরিবর্তে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন। (১৯৭৪ সালে গৃহীত থিসিস)। ‘কিন্তু দুই বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে আন্দোলনের চেহারাটা বদলে যায়। এবার রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ না, কী করে বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে একটা সরকার গঠন করা যায়, সেটাই জনাব খানের (সিরাজুল আলম খান) আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে পড়ে। তাঁর মনোযোগ নিয়োজিত হয় একটা গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রতি (জাসদের রাজনীতি, নজরুল ইসলাম )

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সময় জিয়াউর রহমানকে সামনে রাখার বিষয়টিও জাসদ প্রদেয়, তা কর্নেল তাহেরের একার সিদ্ধান্ত ছিল না। আর ‘গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার’ গঠন করার লক্ষ্যেই তা করা হয়েছিল। কিন্তু তাহের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, শ্রেণী চরিত্রের উর্ধ্বে কিছু নাই, আর এই শ্রেণী চরিত্রের কারণেই ‘গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার’ গঠনের চিন্তা সর্বোতভাবে ভণ্ডামী ভিন্ন কিছু নয়। ১৯৮০ সালে জাসদ ঘোষিত ১৮ দফা কর্মসূচিতে আরও গণতন্ত্র, ২০০ আসনের পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্বসহ ৫০০ আসনের পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ দোসর নয়, এমন বুর্জোয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠনের ওকালতি করা হয়েছে এই কর্মসূচিতে। আর যে স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান, কর্নেল তাহেরকে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে হত্যা করেছেন, তার সঙ্গে ঐক্যের আহ্বানও জানিয়েছেন ওই বিপ্লবী (!) নেতারা। অবশ্য তৎকালীন সময়ে আরেক নামধারী বাম দল সিপিবিও জিয়াউর রহমানের চাটুকারী কম করেনি। সিপিবি নেতারা তখন জিয়াউর রহমানকে মহান রাষ্ট্রনায়ক আর তার খাল কাটা কর্মসূচীকে মহান কর্মকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। আবার ওই বাম দলগুলোই মুখে মুখে বলতো, সংগ্রাম করতে হবে সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের এদেশীয় দালালদের বিরুদ্ধে।” ১৯৮০ সালে ১৮ দফা কর্মসূচি প্রশ্নে জাসদ বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং দলের একাংশ দল থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ নামে নতুন দল করে। পরে বাসদও দুই ভাগ হয়ে যায়। জাসদ বর্তমান সরকারের কোলে চড়ে আছে, তাই আপাততঃ তাদের বিপ্লবের বুলি কপচানো স্থগিত রয়েছে। আর বাসদ যেন নতুন বোতলে সেই পুরনো মদের উপমা, এখনো তারা বিপ্লবী বুলি কপচে মেধাবী তরুণদের কাছে ডেকে নিচ্ছে, আর শ্রেণী বিভক্ত সমাজে শ্রেণী সংগ্রামহীন শহুরে মিটিংমিছিল আর পল্টন টু প্রেসক্লাবের রাজনীতিতে বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজনীতি থেকে যায় শুধু অধরা; কারণ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ প্রেসক্লাব টু পল্টন আর ওই বামপন্থীদের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিস কক্ষে বসবাস করেন না!

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে সক্ষম যে, জাসদ মূলত কোন বিপ্লবী দল নয়, বরং বিভ্রান্তি আর সুবিধাবাদীতা এই দলটির মূল উপজীব্য। আর এমন একটি দল মুখে বিপ্লবের কথা বললেও বিপ্লবের পথে কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না। আর একারণেই জাসদ কখনো কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী চেতনার সমকক্ষ হতে পারেনি। আর জাসদ’কে দিয়ে তাহেরের বিপ্লবীত্ব তুলনা করতে যাওয়াটাও হবে কপটতা। তবে পূর্বে কখনো কর্নেল তাহেরের গণসংগঠন বা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততা না থাকার কারণে এবং মতাদর্শিক ক্ষেত্রে বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজনীতির স্বরূপ ধরতে না পারার কারণে তিনিও জাসদ দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন। আর এই বিভ্রান্তি তিনি ধরতেও পারেননি। জাসদ সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষের বুলি কপচালেও মূলতঃ এটি ছিল পেটিবুর্জোয়া, সুবিধাবাদী শ্রেণী প্রসূত অস্পষ্ট মতাদর্শের দল বিশেষ। আর সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শ সঠিকভাবে আত্মস্থ করতে না পারায়, কর্নেল তাহেরের মাঝেও বিদ্যমান ছিল সমন্বয়বাদী চিন্তা, আর একারণেই তিনি সর্বহারার একনায়কত্বের পথে না গিয়ে “জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার” গঠন করতে চেয়েছিলেন। তিনি ব্যর্থ হয়েছেন মার্কসবাদলেনিনবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়াগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে হাঁটতে।

তবে বর্তমানকালের জাসদ নামক দলটির সাথে তৎকালীন জাসদ’কে গুলিয়ে ফেলাটা সঠিক হবে না, আর এর মূল কারণ হলো সে সময়ে দলটির নিদেন পক্ষে একটা জাতীয় চরিত্র বিদ্যমান ছিল, এর সাথে সম্পৃক্ত ছিল হাজারো ত্যাগী কর্মীসমর্থক, যা বর্তমানে একেবারেই অনুপস্থিত, বর্তমানে এই দলটি বিশেষভাবে শাসকশ্রেণীর দালালীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত!

এবার আসা যাক লাইনের প্রশ্নে। কর্নেল তাহের মার্কসবাদ দ্বারা প্রভাবিত হলেও লাইনগতভাবে তিনি তা সঠিকতার সাথে আঁকড়ে ধরতে পারেননি। যার ফলে তিনি যে লাইন নির্ধারণ করেছিলেন, তা ছিল ফোকোবাদ দ্বারা প্রভাবিত, যা পূর্বেও বলা হয়েছে। আর এর ফলে তিনি তৎকালীন আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত বিপ্লবী মতাদর্শ মার্কসবাদলেনিনবাদমাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে (যা বর্তমানে যা মাওবাদ) আঁকড়ে ধরেননি, বরং চে দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি গ্রহণ করেন ফোকোবাদ। ব্যাপক নিপীড়িত জনগণকে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে, অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে, কৃষকদের সাথে নিয়ে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণকে সংগঠিত করে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের (Protracted People’s War) মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পথ গ্রহণ না করে, তিনি গ্রহণ করলেন একটি সশস্ত্র এলিট ফোর্সের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পথ। আবার ফোকোবাদ অনুসারে, এই আর্মড এলিট ফোর্স দ্বারাই রাজনৈতিক ধারা নির্ধারিত হবার কথা, যা আবার জাসদের সাথে সাংঘর্ষিক; বিধায় যা হয়েছে, তা মূলতঃ এক জগাখিচুড়ী, মতাদর্শগত বিচ্যুতি। আর এর সাথে মার্কসবাদী রাজনীতির কোনো সংযোগ খুঁজে পাওয়াটা দুষ্কর। এখানে উল্লেখ্য যে, বিপ্লবী চেতনা আর সর্বহারা রাজনীতি এক জিনিষ নয়। সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বের পথে সংগঠিত বিপ্লবকেই আমরা সর্বহারা বিপ্লব বলতে পারি, অপরদিকে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবীত্ব বা তার দেশপ্রেম নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও শ্রেণী রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সমন্বয়বাদী। যা সুস্পষ্টভাবেই মার্কসবাদের বিচ্যুতি।

উপরন্তু, জাসদ তৎকালীন সময়ে বলতো বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা পুঁজিবাদী, তাই বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক! অথচ তৎকালীন সময়ে এখানে গণতন্ত্র ছিল সুদূরপরাহত, যা বর্তমান সময়েও প্রায় একইরূপে বিরাজমান। তাহের নিজে অনেকবার এই ব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক উল্লেখ করলেও এই তাত্ত্বিক বিচ্যুতি তিনি ঘুচাতে পারেননি। আর স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার উচ্ছেদ করে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিস্থাপনের তত্ত্বও তিনি গ্রহণ করেননি। বরং তিনি চেয়েছিলেন অনেকটা ওয়েলফেয়ার স্ট্যাট, বা কল্যাণ রাষ্ট্র ধাঁচের একটা ব্যবস্থা নির্মাণ করতে। যা মার্কসবাদ সরাসরি খারিজ করে।

অন্যান্য বিপ্লবী কমিউনিস্ট দলগুলো যখন দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘাঁটি গড়ে তুলছিল, তখন জাসদ, আওয়ামী লীগকে টেক্কা দিতেই গলদঘর্ম। তারা ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ আন্ডারগ্রাউন্ডে গেলেও মতাদর্শিততাত্ত্বিক অস্বচ্ছতার জন্য তারা জনভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি। বিশাল কর্মী বাহিনী থাকার পরেও ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের মাঝে কাজের প্রতিফলন ঘটাতে তারা ব্যর্থ হয়েছিলেন। মূলতঃ দলের প্রকাশ্য নেতারা আত্মগোপনে গিয়ে সশস্ত্র বাহিনী গঠন করেন। আর এই বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের মাওবাদী (তৎকালীন সময়ে মাও সেতুঙ চিন্তাধারা) পন্থা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে বাহিনী নামে “গণবাহিনী” হলেও তা গণমানুষের দ্বারা গঠিত গণমানুষের বাহিনী হয়ে উঠতে পারেনি। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চের পর জাসদের প্রকাশ্য তৎপরতাও অনেকাংশে কমে যায়। শাজাহান সিরাজের ভাষ্য মতে, বস্তুত ১৭ মার্চ ১৯৭৪এ আমরা কী করতে চেয়েছিলাম? তখনকার সাহিত্যগুলো খুঁজে দেখলে মূলত একটি জবাব বেরিয়ে আসবে। চেয়েছিলাম গণআন্দোলনের ছেদ ঘটিয়ে তাকে বিপ্লবী আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে।” (জাসদের আত্মসমালোচনামূলক দলিল, ১৯৭৯) তিনি আরো বলেন,১৭ মার্চের ঘটনার পর জনগণ ও আমাদের মাঝে সৃষ্টি হয় যোগসূত্রহীনতা। বস্তুত ১৭ মার্চের পর আমরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।” (রাজনৈতিক রিপোর্ট, ১৯৮০ শাজাহান সিরাজ)

তবে এই জনভিত্তি না গড়তে পারার কথা কেবল ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চের বিষয় নয়, তা কেবল জাসদেরও বিষয় নয়। অস্বচ্ছ উপায়ে পার্টি গঠন এবং পার্টি লাইন নির্ধারণে মতাদর্শিক অস্বচ্ছতাই জনবিচ্ছিন্নতা তৈরী করে। যার ফলে আসে মতাদর্শিক বিচ্যুতি ও সুবিধাবাদ। আর ভ্রান্ত লাইনের চর্চা এবং মতাদর্শিক বিচ্যুতি সত্ত্বেও কর্নেল তাহেরের দেশপ্রেম, তার বিপ্লবীত্ব প্রশ্নাতীত। আর তাকে অসম্মান করার মানে হলো সকল বিপ্লবীদেরই অসম্মান করা। আবার কর্নেল তাহেরকে সকল ত্রুটিবিচ্যুতির উর্ধ্বে তুলে পূজা করার মানে হলো যান্ত্রিকতা; বরং তাকে আমাদের দেখতে হবে দ্বান্দ্বিক উপায়ে। তার ভুলত্রুটিগুলো নিয়ে আলোচনার মানে এই নয় যে, তাকে খাটো করে দেখা হবে। বরং পরবর্তীতে কোনো বিপ্লবী চিন্তার মানুষ যেন সেই ভুলগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে, সে লক্ষ্যেই এই আলোচনা।

বিভ্রান্তি আর ভণ্ডামীর রাজনীতিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে, পড়ছে। আর কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় নেতৃত্ব ও মতাদর্শকে আঁকড়ে ধরে শ্রেণী সংগ্রাম পরিচালিত করা, আর এ ক্ষেত্রে সংশোধনবাদ, নয়াসংশোধনবাদ, মধ্যপন্থা ও সুবিধাবাদকে নির্মূল করার লড়াই ব্যতিত বিপ্লবী রাজনীতি সমুন্নত রাখা, তথা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করাও সম্ভব নয়।

এখনো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একদিন সেই কাঙ্খিত বিপ্লব হবে, আসবে প্রকৃত মুক্তি।

রাত্রি যেথা গভীর, সেথায় আলোর হাতছানি”

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হউক!

দীর্ঘজীবী হউক স্বদেশ!

জয় হউক সর্বহারার!

সহায়ক গ্রন্থ: অসমাপ্ত বিপ্লব’, লরেন্স লিফশুলৎজ, রাজনৈতিক রিপোর্ট, ১৯৮০ শাজাহান সিরাজ, জাসদের আত্মসমালোচনামূলক দলিল, ১৯৭৯

(কর্নেল তাহেরের উপর পূর্ববর্তী একটি লেখার পরিমার্জন ও বর্ধিতকরণের ফলে লেখাটি বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। লেখক)

Advertisements
মন্তব্য
  1. Tanjimhabib Habib বলেছেন:

    তাহের চাক রি মুজিব হত্তা র আগেই ছারেন

  2. Kabir Sir বলেছেন:

    Reblogged this on Collecting the Gems of Knowledge and commented:
    শেখ মুজিব জীবিত থাকতে জাসদের আন্দোলনের কৌশল ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ এবং তার পরিবর্তে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন। (১৯৭৪ সালে গৃহীত থিসিস)। ‘কিন্তু দুই বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে আন্দোলনের চেহারাটা বদলে যায়। এবার রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ না, কী করে বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে একটা সরকার গঠন করা যায়, সেটাই জনাব খানের (সিরাজুল আলম খান) আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে পড়ে। তাঁর মনোযোগ নিয়োজিত হয় একটা গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রতি। (জাসদের রাজনীতি, নজরুল ইসলাম ) ========>>

  3. ATIQ বলেছেন:

    খুব ভালো লেখা অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ।

  4. Nafis বলেছেন:

    জাসদ মানে বিপ্লব।ক্ষমতার লোভ নয়।ইনু সাহেব ক্ষমতার লোভে জাসদের আদর্শ বিক্রি করে দিয়েছেন।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s