লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের কয়েকটি অঞ্চলে যে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় স্যান্ডি আঘাত হেনেছে তাতে সেদেশের একটা বিপুল অংশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। তারা বাস্তুচ্যুত হয়ে, জীবিকার সংস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্তমানে অসহায় জীবন যাপন করছেন, ইতোমধ্যে সেখানে মৃতের সংখ্যা প্রায় অর্ধশতে পৌঁছেছে। স্যাটেলাইটের কল্যাণে পাওয়া ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে যে, এই মুহূর্তে বহু অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে আছে। বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন, নিউ ইয়র্কের স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকসমূহ ধসে পড়া অবস্থায় উপনীত, জনজীবন বিপর্যস্ত।

 

এই ঘূর্ণিঝড়সৃষ্ট বিপর্যয়ের বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া বিবিধ। ব্যাপক একটা অংশের মানুষ মনে করছেন, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে খোদায়ী গজব হিসেবে পতিত। “ইহুদিনাসারা” যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে “ধর্মযুদ্ধে” অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ এটা হলো ঐশী প্রতিবিধান। বলাই বাহুল্য এই চিন্তার মধ্যে যুক্তি ও সুচিন্তার লেশমাত্র নেই। প্রথমত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হওয়ার কিছু বস্তুগত শর্ত রয়েছে। এই শর্তগুলো প্রকৃতিতে উপস্থিত হলেই এ ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেখা পাওয়া যায়। তাছাড়া, এই তথাকথিত গজবে “ধর্মযুদ্ধে”র পরিচালকগণ কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি, যে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তু ও জীবিকা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন এবং যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তারা এইসব যুদ্ধের ধারেকাছে নেই, অথবা ছিলেন না। আমাদের দেশেও নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ হিসেবে মানুষের পাপবৃদ্ধির কথা শোনা যায়, কিন্তু সেখানেও এই কথিত “পাপে”র হর্তাকর্তাদের কাউকে কখনো বিপর্যস্ত হতে দেখা যায় না। তাদের দিনানুদৈনিক জীবন যাপনে কোনো রকম ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় না। কিন্তু উপকূল অঞ্চলের মৎসজীবী সম্প্রদায়ের একটা বিশাল অংশের মানুষ এবং তাদের পরিবার জলোচ্ছ্বাসে নিশ্চিহ্ন হন, মৃত্যুবরণ করেন অথবা জীবিকার সংস্থান হতে বিযুক্ত হয়ে মৃতবৎ জীবনমুখে পতিত হন। পাহাড় ধসের ফলে এর কোলে আশ্রয় নেয়া অসংখ্য বাস্তুচ্যুত মানুষ নিহত হন, অন্যান্যরাও বিবিধ দুরবস্থার সম্মুখীন হয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকেন।

আবার এক ধরনের তথাকথিত প্রগতিশীল আছেন, যারা মুখে কিছু উচ্চারণ না করলেও মনে মনে ভাবছেন, এর মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের একটা শিক্ষা হয়েছে। এতে তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হবে, এবং তারা আর্থিকভাবে বিপর্যয়ের শিকার হয়ে বিশ্বব্যাপী তাদের আগ্রাসনকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে সীমিত করে আনতে বাধ্য হবে। এটিও একটা ভ্রান্ত ধারণা। কেননা, এ জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেদেশের অর্থনীতি সাময়িকভাবে সঙ্কটের মুখে পতিত হলেও এখন পর্যন্ত তার সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র খর্ব হওয়ার মতো কোনো অবস্থার সৃষ্টি তাতে হয়নি। দুর্যোগ কেটে গেলে খুব সামান্য সময়ের মধ্যেই তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে এবং নিজেদের যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে আধিপত্য জারি রাখার ক্ষেত্রে সক্ষমতার পর্যায়ে উপনীত হবে। কেননা বিশেষভাবে সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত বিপর্যয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে নিহিত নেই, তার অর্থনীতির অভ্যন্তরে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রকার দ্বন্দ্ব ও সঙ্কটের ফলেই তা এক সময় ধ্বংস হতে বাধ্য।

 

বিপর্যস্ত নগর-জীবনওপরে উল্লিখিত দুই শ্রেণীর চিন্তার মধ্যে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয় তাহলো, এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টির প্রকৃত কারণ এবং এর ফলে সংঘটিত ক্ষয়ক্ষতির স্বরূপ। লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় সহ যেকোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় এখন অত্যন্ত ঘন ঘন আমাদের জীবনে উপস্থিত হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের অপরাপর অংশেও তা বিভিন্নরূপে আঘাত হানছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং প্রকৃতির অন্যান্য যে উপাদান সমূহ প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখে তার ভেতর গুণগত পরিবর্তনই এর মূল কারণ। কলকারখানা থেকে অবিরাম নির্গত দূষিত ধোঁয়াযা কার্বনডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড সহ আরো ক্ষতিকর উপাদান ধারণ করে সেগুলোর মাত্রা কমিয়ে আনার উপায় থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিকশিত পুঁজিবাদী দেশ সহ ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, ব্রাজিলের ন্যায় বিকাশমান বৃহৎ অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো এ কাজে উৎসাহী নয়। তার কারণ এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে মুনাফার অপ্রতিহত গতি কিছুটা হলেও ব্যাহত হবে, পুঁজির অদম্য অশ্বের মুখে লাগাম পরাতে হবে তাদের। এ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিয়োটো প্রটোকল স্বাক্ষরে সম্মত হয়নি। কেভিন রাড ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মতো শিল্পোন্নত রাষ্ট্রও স্বাক্ষরের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

বলাবাহুল্য, নিজস্ব অর্থনীতির বিকাশের তাগিদে এবং উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের নাগরিকের চাহিদার প্রেক্ষিতে বর্তমানে বহু উন্নয়নশীল দেশে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। এর থেকে নির্গত পরিবেশ দূষণকারী বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাস প্রতিনিয়ত প্রকৃতিতে মিশে যাচ্ছে। আবার কলকারখানার যন্ত্রপাতি শীতল রাখার ব্যবস্থা, বাড়িঘরে এসি, ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর থেকে নিসৃত ক্লোরোফ্লুরোকার্বন প্রভৃতিও উপর্যুক্ত উপাদানসমূহের সাথে সম্মিলিত হয়ে যে “সবুজঘর প্রতিক্রিয়া”র (গ্রীন হাউক এফেক্ট) সৃষ্টি করে, তার ফলে বিশ্বের সামগ্রিক জলবায়ু ক্রমশ উত্তপ্ত হয়। উভয় মেরুতে সঞ্চিত বিশাল বরফাধার গলতে থাকে, সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে। এছাড়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের বিপুল পরিমাণ শিল্পবর্জ্য ডাম্প করার ফলে সমুদ্রগর্ভের তলদেশের উচ্চতাও বৃদ্ধি পায়। এই বর্ধিত পানির প্রবাহকে ধারণ করার মতো জলাধার না থাকায় জলোচ্ছ্বাসের পরিমাণ বাড়ে, ভূপৃষ্ঠ প্লাবিত হয়। এছাড়া সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বহুজাতিক বীজ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণনকৃত উচ্চফলনশীল বীজ ও তৎসম্পর্কিত কীটনাশক, রাসায়নিক সার প্রভৃতির অত্যধিক ব্যবহারের ফলে জমির রাসায়নিক মিশ্রণে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়; জমিতে কার্সিনোজেন, আর্সেনিক প্রভৃতির বিস্তৃতি ঘটে। মানবদেহে সরাসরি ক্যান্সার, আর্সেনিকোসিস প্রভৃতি রোগের বিস্তার ছাড়াও তা প্রকৃতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। মানববসতি স্থাপন, কলকারখানা প্রতিষ্ঠা, প্রাকৃতিক জ্বালানি সম্পদ উত্তোলন প্রভৃতি কারণে যে নির্বৃক্ষকরণের প্রক্রিয়া চলছে সমগ্র বিশ্বজুড়ে তা এই প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করে।

সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ অর্থনীতির বিস্তারে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য কায়েম ও তা বজায় রাখার জন্য যেসব অস্ত্র, বিস্ফোরক, বোমা প্রভৃতির ব্যবহার হয়ে থাকে, তার কোনো প্রভাব প্রকৃতির ওপর পড়ে না এটা চিন্তা করা একরকম অর্বাচীন মূর্খতা। বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি তার বায়ুমণ্ডলকে শব্দ দ্বারাই কেবল দূষিত করে না, মানববিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহারের ফলে যে সমস্ত ক্ষতিকর যৌগ এর মাধ্যমে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে তার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুতর। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বোমা ও বিস্ফোরকের যুদ্ধকালীন ও পরীক্ষামূলক ব্যবহার ভূপৃষ্ঠের গঠনপ্রকৃতি ও মাটির স্তরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। ভূঅভ্যন্তরে অবস্থিত টেকটোনিক প্লেটের স্থানচ্যুতি ঘটে। এসব কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্প এখন প্রায় নিয়মিত ঘটতে থাকা বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

স্যান্ডির আগ্রাসনবস্তুত, ওপরে উল্লিখিত বিষয়সমূহের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়াই মানুষ ও জীবজগতের জীবনধারণের প্রতিকূলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে এবং তার ফলস্বরূপ এ সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয় আমাদের জীবনে। এসব দুর্যোগে অনুন্নতউন্নত নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্বেই ক্ষতিগ্রস্থ হয় প্রধানত দরিদ্র শ্রেণীর ও শ্রমজীবী মানুষ। সুতরাং এই বিপর্যয়কে ঐশী গজব অথবা সাম্রাজ্যবাদের শিক্ষালাভের উপায় মনে করাটা সুচিন্তিত ভাবনাপ্রসূত মতবাদ নয় অবশ্যই।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্ব মানচিত্রের মধ্যে সীমারেখায়িত কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে চিহ্নিত করতে পারে না। সুতরাং সমগ্র বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে তা এক পর্যায়ে ধনীনির্ধন, উন্নতঅনুন্নত নির্বিশেষে সকল অঞ্চলের রাষ্ট্র এবং সব মানুষকেই আক্রান্ত করবে। কিন্তু মুনাফা ও পুঁজির অবিচ্ছিন্ন স্বার্থের সূত্রে জড়িত উচ্চমার্গীয় ব্যক্তিবর্গের মানসকাঠামোয় এই চিন্তা যেমন বিলম্বে প্রবেশাধিকার লাভ করবে, তেমনি এর দ্বারা তারা আঘাতপ্রাপ্তও হবে অন্য সবার পরে। সে সময় যদি তারা এর প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা গ্রহণ করতে সচেষ্টও হয়, ততোদিনে বহু বিলম্ব হয়ে যাবে। অপরিবর্তনীয় সে ক্ষয়ক্ষতির অগ্রযাত্রাকে রোধ করা তখন হয়তো আর কারো পক্ষে সম্ভব হবে না। এ কারণেই বর্তমানে ঘন ঘন সৃষ্ট এইসব দুর্যোগ ও তার পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে এই বিশ্বের সাধারণ মানুষকেই, যারা সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯৯%। এ বিষয়ে এখনই সক্রিয়ভাবে তৎপর না হলে ফলস্বরূপ তা মানুষ, তাবৎ প্রাণীকুল, জীবজগৎ সহ সমগ্র বিশ্বের জন্যই অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে নিয়ে আসবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s