সাম্রাজ্যবাদী বাসনার অদৃশ্য কালিতে অঙ্কিত নাফিসের মুখাবয়ব :: একটি পর্যালোচনা

Posted: অক্টোবর 26, 2012 in অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, দেশ, মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

 

মার্কিন গোয়েন্দাবৃত্তির শিকার নাফিস

নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে হামলা পরিকল্পনার জন্য এফবিআই দ্বারা প্ররোচিত হওয়ার পর গত ১৭ অক্টোবর গ্রেপ্তারকৃত বাংলাদেশী নাগরিক রেজওয়ানুল আহসান নাফিসকে নিয়ে এদেশে আলোচনাজল্পনাকল্পনার অভাব নেই। বিভিন্ন মহল নিজস্ব অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে অবলোকন ও পর্যালোচনা করার প্রচেষ্টায় তৎপর রয়েছেন। যারা নিজেদেরকে সেকুলার মুক্তমনা বলে প্রকাশ করতে সর্বদা আগ্রহশীল থাকেন তারা এই মুহূর্তে মেতে উঠেছেন ইসলামী মৌলবাদ কতোটা খারাপ জিনিস, ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ সমাজসভ্যতাসংস্কৃতির জন্য কতোটা ভয়াবহ ও বিনাশী ব্যাপারএটা প্রমাণের জন্য। তাদের ভাষ্যমতে এই ধরনের মৌলবাদী কর্মকাণ্ড ও তৎপরতা হচ্ছে নিতান্তই স্বাধীন অভিব্যক্তি। অথবা সমাজের অভ্যন্তরে পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ইত্যাদি বিরাজমান থাকলে তার অনিবার্য প্রতিফল হিসেবে মৌলবাদী সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের ভিত্তি সেখানে গড়ে ওঠে। কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়; বরং এটা মোটামুটি সর্বাংশে সত্য ও স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু মুক্তমনাদের বিশ্লেষণে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ভিত্তি হিসেবে ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং সাংস্কৃতিক অন্ধত্বের উল্লেখ থাকলেও এর থেকে আরেকটু পেছনে গিয়ে বিষয়টিকে আরো বিস্তৃতভাবে দেখার সুযোগ কিংবা আগ্রহ কোনোটাই তাদের নেই।

পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ এবং কার্যকারণ সম্পর্কের সূত্রায়নের কোনো প্রয়োজনও নেই। ঘটনার মূল হিসেবে যেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামিকে চিহ্নিত করা গেছে তখন তাদের আর কিছু পাওয়ার চাহিদা থাকে না। তাদের মতে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং বৈশ্বিক পরিসরে ধর্মীয় হানাহানি, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা হিসেবে যা কিছু পরিলক্ষিত হয় তার মূলগত এবং একমাত্র কারণ হচ্ছে ধর্ম। এর পেছনে পর্দার অন্তরালে যে আরো নিগূঢ় অভিসন্ধি কার্যকর থাকতে পারে এটা তারা মনে করেন না।

আবার যারা সমাজে মডারেট মুসলিম বলে পরিচিত তারা সাম্প্রতিক এই ঘটনার সাথে প্রকৃত ইসলামের যে কোনো সম্পর্ক নেই এটা প্রমাণের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। অর্থাৎ সেকুলার মুক্তমনা কর্তৃক ধর্মীয় বিষয়াদির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশের পাল্টা হিসেবে তারা উপস্থিত হয়েছেন ধর্ম বিশেষত ইসলামের পক্ষের অ্যাডভোকেট হিসেবে। ধর্মগ্রন্থের পাতা উল্টে কোথায় শান্তির কোন বাণী বিধৃত রয়েছে তার রেফারেন্স দিতে গিয়ে তাদের গলদঘর্ম অবস্থা। এই দুপক্ষের তর্কবিতর্ক, ঝগড়াঝাঁটি আর প্রচারণার ডামাডোলে মূল বিষয় এবং এর শেকড়স্থিত কারণসমূহ থেকে দৃষ্টি সরে যায় আমজনতার। বিষয়ের প্রকৃত গুরুত্ব এবং তার তাৎপর্য উপলব্ধির প্রয়াস অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়।

এইসব হৈহল্লা এবং বক্তব্যমতপ্রকাশের হট্টগোলপাল্টা হট্টগোলে যে পরিমাণ ধূলিকণা বাতাসে উড়ে বেড়ায় তা আমাদের মতো সাধারণ জনগণের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখার জন্য যথেষ্ট। এর মধ্য থেকে নিজেদেরকে আধুনিক এবং সভ্য মানুষ হিসেবে দাবিদার মধ্যবিত্ত নাগরিকের মনে প্রশ্ন উদিত হয়: নাফিস কেন এরকম করল? সে তো মাদ্রাসায় শিক্ষিত তালেবানপন্থী মানসিকতার কোনো তরুণ নয়। সে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় অধ্যয়ন করত। সেখানে কয়েক সেমিস্টার পড়ার পর এই বছরের গোড়ার দিকে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরিতে যায়। ওখানে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর আবার স্থানান্তরিত হয়ে ভর্তি হয় নিউ ইয়র্কের আরেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপালনকারী হলেও সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রতিহিংসামূলক মনোভাব পোষণ করত এমন কথা ঐ দেশে যারা তার পরিচিত ছিলেন তেমন কেউই বলেন নি। তারা বরং এমন একটা অভিযোগে নাফিসকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিস্মিত হয়েছেন।

তাহলে নাফিস এমন করল কেন? এ বিষয়ে নাগরিক ভদ্রলোকদের মনে প্রশ্ন ও আশ্চর্যবোধের অন্ত নেই। মানুষের মনস্তত্ত্ব কোন ক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করে সে বিষয়ে দৃষ্টি না রেখে ঘটনার উপরিকাঠামোয় বিচ্ছিন্নভাবে বিশ্লেষণ করে কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে গেলে তা থেকে বিস্ময়ের বোধ সৃষ্টি হতে পারে বৈকি! সুতরাং আধুনিকশিক্ষিতহয়েও নাফিস কেন এই কাজ করতে গেল সে প্রশ্ন এখন বিস্ময়াভিভূত প্রশ্নাকারে নাগরিক মধ্যবিত্ত মানসপটে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এ বিষয়ে আলোচনার আগে প্রথমে নাফিসকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে ভূমিকা পালনকারী এফবিআই কী বলে সেটা জেনে নেয়া যেতে পারে। জানা যায় যে, নাফিস নিউ ইয়র্কের গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনায় হামলা চালানোর ‘ইচ্ছে’ নিয়ে নাকি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এফবিআই নাফিসের মনের এই ইচ্ছের খবর কীভাবে পেল সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা না গেলেও তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মানসিক অবস্থার বিষয়ে অবগত হয়ে তারা নিজেদের একজন আন্ডারকভার এজেন্টকে নাফিসের কাছে পাঠায় গত জুন মাসে। সে বন্ধুবেশে নাফিসের কাছ থেকে তার সুপ্ত ইচ্ছেটির বিষয়ে নিশ্চিত হয়। তখন সে আলকায়েদা জঙ্গি বলে আরেকজন ব্যক্তির সাথে নাফিসকে পরিচয় করিয়ে দেয় তার ইচ্ছেপূরণের সক্রিয় অভিযাত্রী হিসেবে। এই দ্বিতীয় ব্যক্তিটিও এফবিআইয়ের গুপ্তচর। এভাবে কয়েকজনের সাথে পরিচিত হবার পর নাফিস এ জাতীয় অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা সম্পন্নের সক্ষমতা অর্জনের বিষয়ে অবহিত হয় এবং নিজের পরিকল্পনাকে সে অনুযায়ী এগিয়ে নিতে থাকে। এদিকে এই ছদ্মজঙ্গিরাই নাফিসকে শিখিয়েপড়িয়ে পরিকল্পনা কার্যকরের বিষয়ে সাহায্য করতে থাকে এবং তাকে যানবাহন, বিস্ফোরক সহ প্রয়োজনীয় সব রসদের যোগান দেয়। কিন্তু যে বিস্ফোরক তাকে সরবরাহ করা হয় তা ছিল ভূয়া, অকার্যকর। সুতরাং নাফিস তার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় এবং এমন একটি অবস্থায় পূর্বপরিকল্পনামতো তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মোটামুটি এটাই হচ্ছে এফবিআইয়ের ভাষ্য।

এখানে গ্রেপ্তার অভিযান যেটি পরিচালনা করা হয় সেটা মূলত সম্পন্ন হয় স্টিং অপারেশন হিসেবে। অর্থাৎ প্রকৃত কোনো সন্ত্রাসীর সম্ভাব্য অভিযান পরিচালনার সংবাদ পেয়ে তাকে গ্রেপ্তারের পরিবর্তে এখানে একজন ‘সন্দেহভাজন’কে সন্ত্রাসী হিসেবে গড়ে তুলে নিয়ে তাকে দিয়ে একটি অভিযান পরিচালনার নাটক মঞ্চস্থ করিয়ে তারপর আটক করা হয়। এই পদ্ধতি নিয়ে ইতোমধ্যেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলে। বলা হচ্ছে নাফিসের অভিপ্রায়ের কথা জানতে পেরে সেখানেই কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাকে এ কাজ থেকে বিরত রেখে যখন সম্মানজনকভাবে বিষয়টির সমাধান করা যেতো তখন সে কাজ না করে কেন এভাবে তাকে সন্ত্রাসী বানিয়ে তারপর গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই সন্ত্রাসবিরোধী নাটকের হৈচৈ তোলা হচ্ছে। বস্তুত এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন ব্যবস্থা অথবা এফবিআইকে দোষারোপের কিছু আছে বলে মনে হয় না। যারা এভাবে পুরো বিষয়টির সমালোচনা করছেন হয় তারা মনে করেন নতুবা সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে চাইছেন যে, মার্কিন এই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্তদের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। এখানে মানুষকে ‘হেদায়েত’ করে ‘সৎপথে’ পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়!

এবার আসা যেতে পারে নাফিস একাজ কেন করতে গেল সেই প্রশ্নে। প্রথম কথা, নাফিসের সাথে প্রকৃত কোনো আলকায়েদা সদস্যের কখনোই যোগাযোগ ছিল না। গ্রেপ্তারকারী এফবিআই সদস্যরাও সেকথাই বলছে। দেশে থাকতেও সে কোনো জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। সে যে মাদ্রাসা ছাত্র ছিল না এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেছে সেটাও আগেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু কথা হলো কোনো সক্রিয় সদস্যের সাথে তার কার্যকর যোগাযোগ না থাকলেও সে মনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার অভিপ্রায় ধারণ করত। চাইলেই এফবিআইয়ের লোকজন অথবা অন্য কেউ একজন যুবককে এই পথে পরিচালিত করতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন হয় একটি বিশেষ মানসকাঠামোর এবং তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিন্তা ও অভিব্যক্তির। সেটা কীভাবে একজন অল্পবয়সী ছেলের ভেতর সৃষ্টি হতে পারে সে বিষয়ে কিছু আলোচনা করা দরকার।

বর্তমানে সারা বিশ্বজুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একাধিপত্য, ধ্বংসলীলা, সম্পদ লুণ্ঠন, নির্যাতন ও প্রতারণার অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ারূপে এ জাতীয় মানসিকতার উন্মেষ ঘটতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী অর্থব্যবস্থাকে রক্ষা এবং তার মুনাফাকে সংহত রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের জন্য যুদ্ধ অর্থনীতির অস্তিত্ব একটি অবশ্য প্রয়োজনীয় বিষয়। পুঁজিবাদ তার বিকাশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী রূপ পরিগ্রহ করে। আর সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের অবশ্যম্ভাবী আচরণ হিসেবে সে অন্যান্য রাষ্ট্র, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত নির্ভরশীল (এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য যে নির্ভরশীলতার এই ধারণা একটি ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সযা সৃষ্টি হয় সেই রাষ্ট্রসমূহের পরিচালনপদ্ধতি, শিক্ষা ও শাসনব্যবস্থা এবং তাদের অর্থনীতি যে সমস্ত ক্ষমতাসম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে তার ভিত্তিতে। এই ধরনের তথাকথিত নির্ভরশীল রাষ্ট্রও তার এই নির্ভরশীলতা ভেঙে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে যদি সে ঔপনিবেশিকতার সমগ্র কাঠামোটিকে ভেতরবাহির থেকে কার্যকরভাবে ধ্বংস করে ফেলতে পারে) রাষ্ট্রসমূহের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং দেশীয়আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের ওপর কার্যকর আধিপত্য বিস্তার করে। এই অর্থনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে তার পরিপক্বতার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে শিল্প পুঁজির পরিবর্তে বণিক পুঁজির স্বার্থের অধীন হয়। অর্থাৎ উৎপাদনশীল পুঁজির চাইতে অনুৎপাদনশীল পুঁজি সেই রাষ্ট্রের অর্থনীতির কাঠামো ও নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন বিষয়ে প্রাধান্য বিস্তার করে। পুঁজিবাদ তার বিকাশের একেকটি স্তর যতো অতিক্রম করতে থাকে, ততোই সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তার ক্ষমতার বিন্যাস, কাঠামো, উপাদানসমূহ গড়ে উঠতে থাকে এবং সেগুলোর অস্তিত্ব নিশ্চিত করার প্রয়োজনে তার মুনাফার তাগিদ ক্রমশ বেড়েই চলে। সে অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য অন্বেষণ করতে থাকে নতুন নতুন ক্ষেত্র। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো সস্তা শ্রমের বাজার। তৃতীয় বিশ্বের জনসংখ্যাবহুল ও তুলনামূলক সস্তা শ্রমের যোগান দেয়া রাষ্ট্রগুলোতে সে তার উৎপাদনশীল খাতগুলোকে স্থানান্তরিত করে। এভাবে অর্থনীতির কাঠামো পরিবর্তিত হয়, এক পর্যায়ে কেবল আর্থিক খাতগুলোর প্রাধান্যই সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতিতে বিরাজ করে। সামগ্রিকভাবে উৎপাদনশীল খাত তার স্থান করে নেয় প্রধানত ভার্চুয়াল জগতে। এর অনিবার্য প্রতিফল হিসেবে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দেখা দেয় বেকারত্ব, ধূমায়িত অসন্তোষ। ফলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মাথা চাড়া দেয় সামাজিক অস্থিতিশীলতা। এই অস্থিতিশীলতাকে মোকাবেলা এবং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সর্বভূক মুনাফার চাহিদাকে পূরণের জন্য তাকে আশ্রয় নিতে হয় একটি বিশেষায়িত খাতের: যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক খাত। এই খাতের পেছনে উৎপাদিত পুঁজিকে সমবেত করার উদ্দেশ্যে তাকে সৃষ্টি করতে হয় যুদ্ধ পরিস্থিতির।

এই যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য তার প্রয়োজন হয় একজন দৃশ্যমান প্রতিপক্ষকে বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর। কেননা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো যোগ্য প্রতিপক্ষ খুঁজে না পাওয়া গেলে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিতে এভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনার আমদানি ঘটানো সম্ভব নয়। শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এ ধরনের প্রতিপক্ষের অভাব যুক্তরাষ্ট্রের হয় নি। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার মিত্ররা সে সময় শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় মার্কিন শাসকগোষ্ঠী জনগণকে কমিউনিজমের জুজু দেখিয়ে বিশ্বের দেশেদেশে তার অনেক চক্রান্তমূলক তৎপরতাকেই জায়েজ করেছে। নব্বই দশকের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় তেমন কোনো প্রতিপক্ষ আর যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না যাকে কেন্দ্র করে সামরিক মহড়া চালানো যায়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দেশের সাথে সামরিক জোট গঠন করে তাদের কাছে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক প্রজেক্ট ও যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি করা যায়। কিন্তু ক্রমাগত বর্ধমান পুঁজির অন্তর্গত চাহিদাকে পূরণের জন্য তার এ ধরনের শত্রু সৃষ্টি করা খুবই প্রয়োজন, তা নাহলে মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক এবং দৃশ্যমানঅদৃশ্য কনসোর্টিয়ামগুলোর কর্ণধারদের নাখোশ হওয়া ঠেকানো যাবে না। সামাল দেয়া যাবে না সর্বগ্রাসী মুনাফার অপ্রতিরোধ্য চাহিদা। সুতরাং গত শতাব্দের শেষ দশকের পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে এ ধরনের সঙ্কটের মুখোমুখি হয়ে তাকে খুঁজে নিতে হয়েছে নতুন প্রতিপক্ষ: ইসলামী সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী তার পরিচয়।

যেহেতু বর্তমান বিশ্বে মধ্যপ্রাচ্য সহ মুসলিমপ্রধান একটি বিশাল এলাকা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ সুতরাং এতদঞ্চলে তার স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানকে নিশ্চিত করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাংশকে দাঁড় করানো তাদের পক্ষে এক ঢিলে একাধিক বিহঙ্গ শিকারের মতো ব্যাপার। প্রথমত, প্রতিপক্ষ তৈরির মাধ্যমে যু্দ্ধাবস্থা বজায় রাখা, যুদ্ধ অর্থনীতির চাহিদাকে অক্ষুণ্ন রাখা; দ্বিতীয়ত, ইসলামী সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের অজুহাতে এই দেশগুলোতে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে কিংবা অন্যপ্রকারে মাথার ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে তাদের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ অধিকার করা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিনির্ধারণে তাদেরকে প্রভাবিত করা। তৃতীয়ত, নিজের দেশের জনগণকে বিভ্রান্তিতে রেখে তাদের করের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিশাল সব অবকাঠামো নির্মাতা ও জ্বালানি উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান, অস্ত্র নির্মাণকারী কোম্পানির স্বার্থের পেছনে সমবেত করা। এই কাজগুলো করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরিচালনা করতে হয় বিভিন্ন নির্যাতননিপীড়নমূলক তৎপরতা। বিদ্যমান রাজতন্ত্রীসামরিক স্বৈরশাসকদের গোপন ও প্রকাশ্যে নৈতিক সমর্থন প্রদান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামরিকবেসামরিক চুক্তির শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ রেখে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ হরণ করাএসবই করতে হয়। এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়া হিসেবেই মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ক্ষোভ সৃষ্টি হতে থাকে তা সঠিক পথ খুঁজে না পেয়ে বিকারগ্রস্থ পন্থায় তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এইসব অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশেই প্রগতিশীল আন্দোলন জোরদার নয়, গণসংগঠনসমূহের তেমন কোনো জনভিত্তি নেই। ধর্মীয় পশ্চাৎপদতা, কূপমণ্ডুকতা, গোঁড়ামি এবং অস্বচ্ছ চিন্তার পরিস্থিতিও সেখানে চক্রান্তমূলকভাবে বজায় রাখা হয়। জনগণের বিক্ষুব্ধ মানসিকতাকে তাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথে পরিচালনা করা এবং তাদের ক্ষোভকে যথার্থ পাত্রে ধারণ করার মতো যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে তা এই ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল পথে তার বিস্ফোরণ ঘটায়।

এক্ষেত্রে মুসলিমঅধ্যুষিত অঞ্চলসমূহের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বিগত কয়েক দশকে সেখানে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও রাজনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং ক্রমশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকাশ ঘটছে। এই দেশগুলোতেও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণের অধীনে বহু বছর ধরে দালাল মুৎসুদ্দি শাসকদের দুঃশাসন কায়েম ছিল। কিন্তু তার বিপরীতে প্রতিরোধের সংগ্রামও বজায় ছিল। দেশের সিংহভাগ ক্ষমতা এবং সম্পত্তি যখন মুষ্ঠিমেয় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করত সে সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্পত্তিহীন শ্রেণী থেকে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধির উত্থান ঘটে এবং তারা জনস্বার্থ রক্ষার উপযোগী সংগঠন গড়ে তুলে যথাযথ রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করে। বর্তমানে ঐ অঞ্চলের অনেক দেশেই সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার শাসক গোষ্ঠীর কায়েমী স্বার্থ উচ্ছেদ হয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয়েছে। অন্যান্য কয়েকটি দেশেও তা হওয়ার পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনমনে এ বিষয়ক সক্রিয় চিন্তাভাবনা বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগত কারণে মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি ভিন্নতর রূপ পরিগ্রহ করেছে। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রয়োজনে শেখআমীরওমরাবাদশা আর দুর্নীতিপরায়ণ নির্যাতক সামরিক শাসকদের শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক আন্দোলন সেখানে সংগঠিত হয়ে উঠতে পারে নি। গত বছরের গোড়া থেকে শুরু হওয়া ‘আরব বসন্তে’র গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য রেখেও একথা বলা যায়।

এটাও সাম্রাজ্যবাদের লীলাখেলার অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সাম্রাজ্যবাদী মিত্ররা দৃশ্যমান প্রতিপক্ষ হিসেবে কোনো প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান দেখতে চায় না। কেননা সেক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে এবং বহির্বিশ্বে তাদের নীতি, তৎপরতা ও কার্যকলাপের বিষয়ে জনমনে যে সমস্ত প্রশ্নের উত্থান ঘটবে তার ফলে অনেক রকম জবাবদিহিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। তাই তাদের অভিপ্রায় এ ধরনের পশ্চাৎপদ, প্রতিক্রিয়াশীল, ধর্মীয় গোষ্ঠীই গ্রাহ্য শত্রুপক্ষ হিসেবে বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান থাকুক। ধর্মান্ধ জঙ্গিরা সর্বদা মার্কিন স্বার্থের ওপর আক্রমণ করতে উদ্যত একথা বিশ্ববাসী জানুক। তাহলে সবদিক থেকেই তাদের লাভ।

প্রথমত, ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের মার্কিনবিরোধী তৎপরতাকে গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত হিসেবে জনসম্মুখে উপস্থাপন করে নিজেদেরকে এসব কিছুরই সোল এজেন্ট হিসেবে প্রচার করার সুযোগ গ্রহণ করা যায়। দ্বিতীয়ত, এদেরকে দমনের নামে উপযুক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটানো যায়, সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের সহযাত্রী হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সামরিক চুক্তির মারফত বিভিন্ন দেশে বিক্রি করা সম্ভব হয় প্রভূত পরিমাণ অস্ত্রসস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম। তৃতীয়ত, নিজস্ব প্রয়োজনমাফিক জঙ্গি ও জঙ্গিবাদী তৎপরতা সৃষ্টি করা যায় এবং এই অজুহাতে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া রাষ্ট্রে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে তার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, অথবা নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে হুমকিধমকি আর আদেশনির্দেশের মাধ্যমে তার অভ্যন্তরীণবৈদেশিক নীতির ওপর শাসনের ছড়ি ঘোরানো যায়। সম্ভাবনার আকারে কথাগুলো বলা হলেও তা সেই পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই আর, বিগত কয়েক দশকে এই সুযোগগুলোর পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার আমরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের নেতৃত্বে অন্যান্য মিত্র রাষ্ট্রের দ্বারা হয়ে আসার বাস্তব বহু উদাহরণ লক্ষ্য করেছি।

.

আফগানিস্তানে সোভিয়েত প্রভাব ধ্বংস করার জন্য জিয়াউল হকের আমলে পাকিস্তানের সাহায্যে যে জঙ্গি শিবিরগুলো খোলা হয় বেলুচিস্তান এবং সোয়াতে সেখানে সিআইএ কর্তৃক অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোকে ক্রমশ শক্তিশালী করে তোলা হতে থাকে। ১৯৯২ সালে তারা নজিবুল্লা সরকারের পতন ঘটায় এবং পেশোয়ার চুক্তি অনুযায়ী জোটবদ্ধভাবে আফগানিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করে। কিন্তু আঞ্চলিক যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীগুলোর প্রধান গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার, বোরহানুদ্দিন রব্বানী, আব্দুর রশিদ দোস্তাম, আব্দুল আলী মাজারি সহ উপজাতীয় নেতারা পরস্পরের মধ্যে যে কলহ ও দ্বন্দ্ববিবাদ শুরু করে তার প্রেক্ষিতে সেখানে শাসন ক্ষেত্রে ব্যাপক নৈরাজ্য দেখা দ্যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, হেকমতিয়ারের নেতৃত্বাধীন হিজবইসলামী দল কিন্তু সব সময়ই ঐ গোষ্ঠীসরকারের বাইরে ছিল। পারস্পরিক এই দ্বন্দ্বে সৌদি আরব, ইরান, পাকিস্তান প্রভৃতি রাষ্ট্র নিজস্ব ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে একেকটা বিশেষ গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে থাকে। পাকিস্তান গোপনে সহায়তা করতে থাকে পশতুভাষী হেকমতিয়ারকে; ইরান শিয়া নেতা আব্দুল আলি মাজারিকে এবং সৌদি সমর্থন দ্যায় ওয়াহাবিপন্থী আব্দুল রসুল সায়াফকে। এভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে দাঙ্গা পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় সেখানে শাসনব্যবস্থা হয়ে পড়ে অস্থিতিশীল। প্রত্যেক গোষ্ঠী নেতাই সরকারের মধ্যে নিজস্ব প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় থাকে এবং তাদের মধ্যে হেকমতিয়ারের দল এককভাবে ক্ষমতায় আরোহণের প্রচেষ্টায় এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে তালেবানদের নেতৃত্বে একটি উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী সেখানে সাংগঠনিকভাবে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পরিশেষে ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে অন্যান্য উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোকে পরাজিত করে তারা দ্রুত ক্ষমতা সংহত করে নিয়ে সেখানকার নৈরাজ্যমূলক পরিস্থিতি কঠোর হস্তে দমন করে। এভাবে অস্থিতিশীলতার পরিবর্তে আফগানিস্তানে কায়েম হয় স্থিতিশীল বর্বরতার শাসন।

এই তালেবানদের সাথে শুরুতে মার্কিনীদের সম্পর্ক ভালোই ছিল। তাদের চরম প্রতিক্রিয়াশীল এবং মধ্যযুগীয় বর্বর নীতি মার্কিনী সরকারকে দ্বিধাগ্রস্থ অথবা বিব্রত করে তোলে নি। এমনকি তাদের হাতে খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দের স্থাপত্যের নিদর্শন বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের সময়ও মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিগণের ভুরুযুগল অকুঞ্চিত অবস্থায় ছিল। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান প্রভৃতি মধ্য এশীয় তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো থেকে অশোধিত পেট্রোলিয়াম বয়ে নিয়ে এসে আরব সাগরে অবস্থিত মার্কিন অয়েল ট্যাঙ্কারে তা বোঝাই করার বিষয়ে তালেবানগণ সহযোগিতা করতে অস্বীকৃত হয়। মধ্য এশিয়া থেকে পাকিস্তান হয়ে আরব সাগরে তেল বহন করতে আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডোরই একমাত্র পথ যেটা তালেবানরা মার্কিনীদের ব্যবহার করতে দিতে সম্মত ছিল না। মার্কিন তেলস্বার্থ এতে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয় এবং তাদের স্বার্থের খাতিরে আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতা থেকে তালেবানদের অপসারণ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলস্বরূপ আমরা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে ঘটতে দেখতে পাই। সে ঘটনাকেই মূল কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ওসামা বিন লাদেনকে এর জন্য দায়ী করে এবং তালেবান সরকারের কাছে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরের নির্দেশনা দ্যায়। তালেবানরা উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া একাজ করতে সম্মত না হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেখানকার বিদ্যমান সরকারকে উচ্ছেদের মাধ্যমে নিজেদের বশংবদ সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে তেল সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করে। এ কারণে ১১ সেপ্টেম্বরের বিমান হামলার ঘটনার প্রেক্ষিত নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা প্রয়োজন।

টুইন টাওয়ারে বিমান নিয়ে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী যে ছিল সিআইএ এবং মোসাদএটা নিরপেক্ষ ভাষ্যকারগণ অনেকেই এখন পর্যন্ত বলেছেন। তার সপক্ষে ইতোমধ্যে বহু সন্দেহজনক প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। প্রাক্তন ইতালীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ফ্রান্সিসকো কোসিগা একবার বলেছিলেন এরকম একটি হামলা চালানোর মতো প্রযুক্তি ও সক্ষমতা কেবল বিশ্বের দুইটি গোয়েন্দা সংস্থারই রয়েছে। ওপরে যে দুটি সংস্থার নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের কথাই তিনি বলেছিলেন। প্রখ্যাত বৃটিশ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক তার নিবন্ধে বিমান দিয়ে টাওয়ার দুটো ধসিয়ে দেয়ার প্রচলিত ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। প্রচারমাধ্যমে বলা হচ্ছিল জেট ফুয়েল থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ফলে ইস্পাত গলে গিয়ে স্থাপনা দুটো ভেঙে পড়ে। এর বিপরীতে ফিস্কের বক্তব্য ছিল টাওয়ারগুলো এমন প্রযুক্তিতে নির্মিত, যাতে বিমান দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হলেও তা সম্পূর্ণ একটি দিন নিজস্ব কাঠামোর ওপর অভঙ্গুর অবস্থায় থাকতে পারত। এর ইস্পাতের মোটা বিমগুলো কংক্রিটের সুপ্রশস্ত কলাম দ্বারা চারিদিকে পরিবৃত অবস্থায় ছিলযাতে এভাবে তা অগ্নিকাণ্ডের ফলে গলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও কংক্রিটের কাঠামোর কারণে তা চব্বিশ ঘণ্টার মতো সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এবং যাতে ভেতরে থাকা জীবিত মানুষজন নিরাপদে বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট সময় হাতে পান। তাছাড়া জেট ফুয়েল সর্বোচ্চ যতোটা উত্তাপ (,১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) উৎপন্ন করতে পারে ইস্পাতের গলনাঙ্ক (,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তারচেয়েও অনেক বেশি। এছাড়া বিমানের কারণে ধসে পড়লে টাওয়ারগুলোর কাত হয়ে পড়ার কথা ছিল, কিন্তু যেভাবে সেগুলো নিজেদের শরীরের ওপর সোজাসুজি ভেঙে পড়েছে সেটা একমাত্র অভ্যন্তরে শক্তিশালী ডিনামাইটের বিস্ফোরণের সাহায্যেই সম্ভব। ২০০১ সালে ঘটনাটা ঘটার পর টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সাথে তাৎক্ষণিক সাক্ষাতকারে প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই টাওয়ার ধ্বংসের আগে অভ্যন্তরে ডিনামাইটের শব্দ শুনতে পেয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। এছাড়া বিমান হামলার ভিডিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে প্রথম বিমানটি আঘাত হানার দুয়েক সেকেন্ড আগেই নাকি উত্তর দিকের টাওয়ারের শরীরে বিস্ফোরণের চিহ্ন দেখা গেছেসাধারণ অবস্থায় যেটা ছিল অস্বাভাবিক বিষয়। তাছাড়াও বিমানের কোর্স পরিবর্তন হওয়ার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও বিষয়টি সম্পর্কে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরও দায়িত্বশীল মহলের উদ্দেশ্যপূর্ণ নিষ্ক্রিয়তা, হামলার সংবাদ লাভের পর তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ জুনিয়রের প্রতিক্রিয়া, ছিনতাইকারী হিসেবে সিআইএর তালিকায় নাম থাকা একজন জঙ্গিকে পরবর্তীতে জীবিত আবিষ্কার করা সহ হাজারো সন্দেহজনক, প্রশ্নচিহ্নিত বিষয় ঘুরেফিরে আলোচিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন মহলেই।

কিন্তু সিআইএ অথবা মোসাদ কিংবা অন্য যেকোনো গোয়েন্দা সংস্থাই হোক না কেন, তাদের পক্ষে এ ধরনের হামলা চালানো কীভাবে সম্ভব? গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা নিশ্চয় নিজেরা আত্মঘাতী জঙ্গি সেজে বিমান ছিনতাইয়ের মাধ্যমে এই হামলা চালায় নি। এ ধরনের সন্ত্রাসমূলক তৎপরতার জন্য তাদের প্রয়োজন হয় এমন সব ব্যক্তির, যারা মূলত জন্মসূত্রে মধ্যপ্রাচ্য অথবা মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকএসব অঞ্চলে মার্কিন সহ পশ্চিমা মহলের আধিপত্যবাদী তৎপরতা তাদের মনের মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তার ফলে তাদের একটা বড় অংশ প্রতিশোধ নেয়ার বাসনায় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনে যোগদান করে। তাদের অন্তরে তারা লালন করে এই আধিপত্যকে প্রতিরোধের অভিলাষ। কিন্তু সঠিক প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি না থাকার কারণে তারা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হিসেবে না দেখে এই আধিপত্যবাদকে বিচার করে বিশ্বমুসলিম সম্প্রদায় ও ইসলামের ওপর পশ্চিমা ইহুদিখৃস্টানদের অপতৎপরতা হিসেবে। সুতরাং এর প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতে গিয়ে তারা আশ্রয় গ্রহণ করে ধর্মের। আগেই বলা হয়েছে যে, এসব অঞ্চলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে না ওঠায় এবং সঠিক নেতৃত্বের অভাবে এই মার্কিনবিরোধী ক্ষোভকে সঠিক পাত্রে ধারণ করার মতো অবস্থা সেখানে সৃষ্টি হয় নি। এসব দেশের পশ্চাৎপদ আর্থসামজরাজনৈতিক অবস্থাই এর মূল কারণ। অন্যদিক দিয়ে বিচার করলে এ ধরনের পরিস্থিতি এই দেশগুলোতে বিরাজ করার পেছনে পরোক্ষ অনুঘটক কিন্তু পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী মহলই।

যাই হোক, মধ্যপ্রাচ্য হতে উঠে আসা এই ধরনের জঙ্গি মানসিকতার অথবা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কাছে সিআইএ এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন বন্ধুবেশে গিয়ে তাদের অর্থ, অস্ত্র, সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান সহ সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড তাদের দ্বারা নতুন অথবা অসম্ভব কোনো কিছুই নয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত প্রভাব খর্ব করার জন্য পাকিস্তানি ভূখণ্ড ব্যবহার করে তারা এ ধরনের কাজই করেছিল যার উল্লেখ ওপরে একবার করেছি। মুসলিমসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহ থেকে উঠে আসা এইসব ব্যক্তির মার্কিনবিদ্বেষ বহুবিধ কারণে এতো প্রবল থাকে যে পশ্চিমা বিশেষত মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানার জন্য তারা আত্মঘাতী হতেও দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু এভাবে তাদের মানসিকতাকে গঠনের ক্ষেত্রেও আশ্রয় নেয়া হয় ধর্মেরলোভ দেখানো হয় শহীদের মর্যাদা এবং বেহেশতের হুরপরীর। ধর্মীয় পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনায় তাদের মস্তিষ্ক ঠাসা থাকার কারণে তারা পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ এবং সামগ্রিক বিষয়কে স্বচ্ছভাবে দেখতে ও বিচার করতে অক্ষম হয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বসে।

নাফিসের ক্ষেত্রেও আমরা এমনটি হতে দেখেছি। সে বাংলাদেশের নাগরিক। এখানকার পরিস্থিতি সব দিক থেকে হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের তুল্য নয়। কিন্তু তারপরও বিভিন্ন কারণে এদেশের জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশের ভেতরে মার্কিনবিরোধী চিন্তাধারা প্রবল। এবং এখানেও এই মনোভাবকে সঠিক খাতে পরিচালনা করার মতো সংগঠনের অভাব রয়েছে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সময় জনসংযোগকালে দেখেছি যে বহু শিক্ষিত তরুণ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জেহাদে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমাদেরকে দেখে এগিয়ে এসে তারা ধর্মীয় ভাবধারায় পূর্ণ হয়ে তাদের বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করতে থাকে। এদের প্রতি দশজনের মধ্যে হয়তো এক/দুইজনকে সত্যিকার অর্থেই ‘জিহাদে’ অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা যাবে। নাফিস চরিত্রটি এখানে এই ধরনের তরুণদেরই প্রতিনিধিত্ব করেযে মনের মধ্যে লালন করে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের মাধ্যমে মার্কিন অর্থনীতিকে ধ্বংস করার বাসনা এবং এর ফলে অসাবধানতাবশত অধিকৃত হয় রাষ্ট্রীয় গুপ্তচরের প্রহসনমূলক ক্রিয়াকলাপে। কিন্তু এটিই তো একমাত্র উদাহরণ নয়। সংবাদপত্রের সূত্র অনুযায়ী এই ধরনের স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে ফাঁদ তৈরি করে গত দশ বছরে দুই শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন বাংলাদেশী। বিচারে তাদের সবাইকেই কারাদণ্ড ভোগ করতে হচ্ছে। ২০০৪ সালে মোহাম্মদ হোসেন নামের একজন বাংলাদেশী ইমামকে এ ধরনের নাশকতামূলক পরিকল্পনায় গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে অপরাধ স্বীকার করার কারণে তুলনামূলক লঘু দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় সে পনের বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী পরিকল্পনার অভিযোগে ২০০৯ সালে এহসানুল সাদেকী নামের এক বাংলাদেশী যুবককে সতের বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ম্যাসাচুসেটসে বড় হওয়া বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত রেজওয়ান ফেরদৌস নামের আর এক যুবককেও সতের বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। সে এখন আটলান্টার কারাগারে সাজা ভোগ করছে।

এখানে দুটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। প্রথমটা হলো, ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা জঙ্গি বাহিনী কর্তৃক ঘটনাটি সংঘটিত হতে দিলেও এবার নাফিসের দ্বারা তারা সেটি হতে দেয়নি। কেননা, প্রথমোক্ত ঘটনাটির অন্তরালে ছিল সে বিষয়ে ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী সাব্যস্ত করে তার আশ্রয়দাতা আফগানিস্তানের ওপর আক্রমণ চালিয়ে দেশটি দখল করে নেয়া এবং মধ্য এশিয়ার অপরিশোধিত তেল সম্পদের সরবরাহ অব্যাহত রাখা। নাফিসের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ছিল না। অর্থাৎ, নাফিসকে দিয়ে রিজার্ভ ব্যাংকে হামলা চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তেমন কোনো স্বার্থ হাসিলের সম্ভাবনা নেই। তাহলে কেন একাজ করা হলো? দ্বিতীয় বিষয় হলো, ইতোপূর্বে আরো তিনজন বাংলাদেশী নাগরিককে একই পন্থায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক আটক করা হলেও সে সময়ে বিষয়টি আমাদের দেশে এতোটা আলোড়ন তোলেনি। নাফিসের বিষয়টা কেন এভাবে প্রচারিত ও আলোচিত হচ্ছে?

সাম্রাজ্যবাদ ঠেকাও, মানুষ বাঁচাও...এসবই সাম্রাজ্যবাদের কৃপা। তাদের শাসকগোষ্ঠীর সাথে স্বার্থের অভিন্ন গাঁটছড়ায় থাকা প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে কোন সংবাদটিকে হত্যা করা হবে, কোনটা অতিপ্রচারিত হবে এবং কোন সংবাদকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হবে, এসবই ক্ষমতাকেন্দ্রের নির্ধারিত বিষয়। সুতরাং একজন বাংলাদেশী নাগরিককে সন্ত্রাসী হিসেবে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার দায়ে গ্রেপ্তার করে বিষয়টি প্রচারের মাধ্যমে এই ইস্যুতে বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বিবিধ স্বার্থ উদ্ধারের সম্ভাবনার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। কে না জানে, মধ্যপ্রাচ্যের মতো না হলেও বাংলাদেশেরও রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে প্রাকৃতিক জ্বালানির ভাণ্ডার? এই ভাণ্ডারের দিকে উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং তাদের সাথে বিভিন্নভাবে সংযুক্ত মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান ও প্রাক্তন হর্তাকর্তাদের নজরের বিষয়টি কারো অজানা নয়। বাংলাদেশের মুৎসুদ্দি শাসক শ্রেণী, তাদের ভাড়াখাটা বুদ্ধিজীবী আর বিশেষজ্ঞের বাহিনী সামান্য কমিশনের বিনিময়ে এই সম্পদ বিদেশী রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে সদা প্রস্তুত আছে। এ কারণেই জ্বালানি উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মিথ্যে ও খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে কোনো সুযোগ দেয়া হয় না, নিজস্ব সক্ষমতার বিকাশ সাধনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয় না, প্রাকৃতিক সম্পদ পাচারের জন্য অনেক উদ্ভট বক্তব্য হাজির করা হয়। সম্প্রতি মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় এখানে কোন অংশের গ্যাসক্ষেত্রের ইজারা পেতে কোন দেশের সাথে চুক্তি করতে হবে সে বিষয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা নিশ্চিত হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অযাচিত তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সহ বিভিন্ন সামরিকবেসামরিক সরকারি কর্মকর্তার পর্যায়ক্রমিক বাংলাদেশ সফরের ঘটনা ঘন ঘন ঘটতে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন সপ্তম নৌবহর চট্টগ্রাম বন্দরে ঘাঁটি গাড়ার কথা শোনা যাচ্ছে, ‘সক্ষমতা’ বৃদ্ধির নামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ সামরিক মহড়ার নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। অধিপতি মিডিয়া, শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের প্রকৃত প্রভুদের কাছ থেকে এসব তৎপরতার সংবাদ যে মোড়কেই আবৃত হয়ে জনসম্মুখে পরিবেশিত হোক না কেন, ঘটনার অন্তরালে বিদ্যমান অনুঘটকের পারস্পরিক ক্রিয়াশীল চক্রান্তমূলক তৎপরতার স্বরূপ খতিয়ে দেখার সময় আজ সাধারণ জনগণ এবং সচেতন নাগরিকের সম্মুখে উপস্থিত।

মালালার পক্ষে গলা ফাটানোর সময় মূল হোতা সাম্রাজ্যবাদকে আড়াল করা হয়সাম্রাজ্যবাদের লীলাখেলায় পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই আজ হিরোইন এবং বাংলাদেশের রেজওয়ানুল আহসান নাফিস ভিলেন হিসেবে জনসমক্ষে উপস্থাপিত। এই বিপ্রতীপ মেরুকরণের খেলায় চূড়ান্ত লাভের গুড় কার পাতে ওঠে সে বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

 

ওপরের বক্তব্যগুলো কারো কাছে অতিকথন মনে হতে পারে, কেউ ভাবতে পারেন ধান ভানতে গাওয়া হচ্ছে শিবের গীত। অনেকেই আবার সাম্রাজ্যবাদের (তাদের ভাষ্যমতে সাম্রাজ্যবাদের ‘প্রেতাত্মা’) দিকে অঙ্গুলিনির্দেশমাত্রই নাখোশ হয়ে ওঠেন। বলাই বাহুল্য, এই ব্যক্তিগণ প্রত্যেকেই সুশীল, শিক্ষিত, ভদ্র এবং মধ্যবিত্ত শান্তিপ্রিয় নাগরিক। ঝামেলাপূর্ণ বক্তব্য ও বিষয় তারা এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন। অশ্লীল কথাবার্তা ও আলোচনার দ্বারা তাদের কারো শান্তি বিঘ্নিত হয়ে থাকলে বর্তমান নিবন্ধকার তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s