লিখেছেন: যিশু মহমমদ

মার্কিন গোয়েন্দাবৃত্তির শিকার নাফিসষড়যন্ত্র তত্ত্বের নকশায় মালালা তালিবান বিরোধী হলেও নাফিস তালিবান পুষ্ট। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বাম হাতের পাঞ্জা মালালা হলে, ডান হাতের খেলায় নাফিস টেক্কা। এদিকে দুনিয়ার মানুষ হিসেব কষছে নাফিস ও মালালা দুয়ে দুয়ে যোগফল হলো পাঁচ। রাফ খাতায় কাটাকাটি হচ্ছে কম। অংক মিলে যাচ্ছে সহজে। এই অংক বলছে, নাফিস বিষয়ে এফবিআই সত্য। অন্যদিকে, যোগ বিয়োগ করে দেখানো হচ্ছে, মালালার আর যুক্তরাষ্ট্রের মতের মিল ষোলআনাই এক। ফলাফল পাকিস্তানি তরুনী এখন ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’র নায়িকা। খলনায়ক বাংলাদেশী যুবক নাফিস।

অথচ একই অংক ভিন্ন দিক থেকেও কষা যেতে পারে, নিশ্চয়। থাকতে পারে অংক মেলাবার বহুবিধ সূত্র। দরকার শুধু স্রোতে গা ভাসানো কিংবা নেহায়েত সাদাকালো বিভাজন পদ্ধতির বাইরে থেকে ঘটনাকে উপলদ্ধি করা। কিন্তু আমরা আটকে যাই ঘটনার এককেন্দ্রীকতায়। গোয়াতুর্মির কারণে ঘাঁড় চলে না, একচোখামির কারণে বেশীদূর তাকাই না। ফলে যে কোন ভাবেই দুয়ে দুয়ে যোগফল পাঁচ।

কিন্তু রাজনৈতিক গণিত বলে, আজকের বিশ্বে অসংখ্য মালালা ও নাফিসের উত্থানের কারণ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানে পুঁজিবাদের মক্কা। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ তার স্বার্থে হেন কাজ নাই যা সে পারে না। যদি কোথাও লাভের গুড়ের দেখা মেলে, তো এই বিষপিঁপড়ে গভীর অধ্যবসায়ের সাথে সে গুঁড়ের পিছু লেগে থাকে। লেলিয়ে দেয় সব রকমের প্রকাশ্য ও গোপন কৌশল। প্রয়োজনে সে নিজ গলায় ছুরি বসাতেও প্রস্তুত। জগতে এ কথা নতুন নয়, সাক্ষী আছে ভুরিভুরি। উদাহরণ স্বরূপ, ৬০এর দশকে বার্ট্রান্ড রাসেল লিখেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক তৎপরতার জন্য যা খরচ করে তার ১৫ গুণ বেশী খরচ হয় সিআইএ (কিংবা এফবিআই)’এর পেছনে। এই তুলনামূলক হিসেব আজকের ২০১‌২ সালে ক’গুণ বৃদ্ধি পেল তা হয়ত কোন গণিতবিদের ভাবনার বিষয় নয়, কিন্তু মার্কিন যুদ্ধবাজের দ্বারা নির্যাতিত, অনাহারি মুখের দিকে চেয়ে আমাদের সে হিসেব কষতেই হবে।

কারণ রেকর্ড ঘাটলেই চিরপরিচিত সেই বিড়ালের ম্যাও ডাক শুনতে পাই। শুনতে পাই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কিংবা এফবিআই যুগ যুগ ধরে অন্য দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, বিপ্লবী, মুক্তিকামী গেরিলা হত্যা থেকে শুরু করে প্রতিবিপ্লবী, সন্ত্রাসবাদী, সামরিক ও বেসামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে সন্ত্রাসী তৎপরতা সংগঠিত করে এসেছে। তার হাতের নখ অনেক লম্বা ও ধারালো। আর বাংলাদেশে র‌্যাবের ক্রসফায়ারের সাজানো নাটকের চেয়ে সিআইএ বা এফবিআই’এর নাটক বহুগুণ বেশি নাটকিয়তা প্রিয়। এই নাটকের নাম সবকালেই গণতন্ত্রের নামে, কখনো মানবধিকার, মাঝে মাঝে বিশ্বায়নের নামে। আর বর্তমানের স্ক্রিপ্ট লেখা হয় ‘সভ্যতার সংঘাত’ কিংবা ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই’র ছুতায়। নাটকের মূল চরিত্র মুসলমান, শূটিং স্পট মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া।

০২.

ধর্মীয় জঙ্গি’ কাজী নাফিস প্রথমত বাংলাদেশী, দ্বিতীয়ত মুসলমান। আমেরিকার কাছে প্রথম কারণটিই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়টি উছিলা। ‘কিভাবে’সেই সমাধানের জন্য আপাতত উচ্চতর গণিত না জানলেও চলবে। টেনেটুনে অংকে পাশ করার মতো আসুন এই পর্বে আমরা কিছু ছয়নয়ের হিসেব করি। আশা করি, এ হিসেবের ভেতর অতিকায় কোন বাতিক বা ভূত খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করবেন না। কারণ, পরিক্ষার শেষ ঘন্টি বাজার নির্ধারিত সময় কখনোই অপূরন্ত নয়। যদি হিসেব মেলে, যদি সন্দেহ পরিষ্কার হয়, যদি বুঝি আমাদের আতঙ্কিত হবার জায়গা ও প্রতিরোধের জায়গা কোনটি তবে তকদির ভালোই বলতে হবে।

বাংলাদেশের তকদিরের টুপি খুলে সেকুল্যার তিলক পরাবার ইচ্ছা আমেরিকার নাই। বরং আমেরিকা ইচ্ছা পোষণ করে, দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরো পাকাপাকি করতে। এটা কেবল বাংলাদেশের মঙ্গলের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও প্রয়োজন। কথাগুলো আকাশ থেকে পেড়ে আনা নয়। হেঁকে বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কমান্ডার এডমিরাল স্যামুয়েল জে লকলিয়ার। এই শীর্ষ স্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা গেল ১১ অক্টোবর ২০১২ তারিখে দুই দিনের জন্য বাংলাদেশ ‘বেড়াতে’ এসেছেন। আরও বলেছে আগপাশ অনেক কথা। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মনোযোগ ও গুরুত্ব পরিবর্তন হচ্ছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি মনোনিবেশ দেয়া হয়। এখন প্যাসিফিক তথা প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্ব দিচ্ছে। এ অঞ্চলে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হবে। সঙ্গত কারণে বাংলাদেশ ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক কারণে গুরুত্ব পাচ্ছে। (এটি সাম্প্রতিক কালের নমুনা মাত্র।দেখুন: ইত্তেফাক, ১১ অক্টোবর ২০১২)

এমন লাভের অংক অব্যবসায়ীসুলভ কোন রাষ্ট্রই হাতছাড়া করতে পারে মাত্র। নিশ্চয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গদিসীন কোন সরকারের কাছে অতটা বেকুবিপনা আমরা আশা করতে পারি না। দেশ পোড়া ছাই বিক্রি করতেই তারা উদ্গ্রীব। তার উপর বাংলাদেশ চাইলে সমুদ্র সম্পদ রক্ষায়ও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে। এমন বন্ধুত্বের নজির আয়না বাঁধাই করে রাখার মতো! কিন্তু বাঁধ সাধে ইতিহাস। সম্পদ লুন্ঠনে, মুনাফার গন্ধে, নিজ অস্তিত্বের বিকাশের স্বার্থেই পুঁজিকে সাম্রাজ্যবাদী রূপ নিতে হয়। ঠান্ডা ও গরম, আঞ্চলিক ও বিশ্ব যুদ্ধ বাঁধাতে হয়। তাতে লাভ বৈ লোকসান নেই। কেননা, একটি অচল মিসাইল সমান চারটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি টিএসআর২ সমান ৫টি আধুনিক হাসপাতাল, একটি ভূমি থেকে শূন্যে নিক্ষেপনযোগ্য মিসাইল সমান ১০০০,০০টি ট্রাক্টর (বার্ট্রান্ড রাসেলের হিসেব)। অতএব যুদ্ধে অনেক লাভ। বিকোয় ভালো। তাই যুদ্ধ ব্যবসা, অস্ত্র বাণিজ্যে আর সম্পদ দখল ও নিয়ন্ত্রণ এবং একচেটিয়া মুনাফাকরণের জন্য আমেরিকার মরিয়াপনা সত্য।

আর সত্যবাদী হচ্ছে প্রচার প্রপাগাণ্ডায় বিবিসি, সিএনএন’সহ তাদের মতাদর্শে সাংবাদিকতার হাতেখড়ি হওয়া দেশীবিদেশী সকল মুখরাযন্ত্রে আমাদের বশীকরণ। অনুসন্ধানী সংবাদদাতা জানাবেন বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, মুসলমান আছে, সম্প্রদায়িক হাঙ্গামা আছে, তালেবানপন্থী নাফিসেরা আছে। আছে সত্য, তবে তা আমেরিকার রপ্তানি করা। নিজ প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় মুসলমান জঙ্গি নামক কৃত্রিম প্রতিপক্ষ তৈরি করা। আপাতত কমিউনিজমের ভূত ঘাঁড় থেকে নামার পর মুসলমান নামক ‘বর্বর’ হাজির করা। আর এই ‘বর্বর’কে বধ করার নাম করে ও বাংলাদেশের কাঁধে বন্দুক রেখে অন্যদের শাসাতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বাংলাদেশেও আসতে চায়। অনুপ্রবেশের জন্য যুক্তি সঞ্চয়, বন্দুক তাক করার পক্ষে বিশ্ববাসীর সম্মতি আদায়ের জন্য গোপনে এফবিআই’র টিকটিকি নাফিসের ‘আমেরিকা বিরোধী’ সুপ্ত ইচ্ছাকে উৎসাহ দিচ্ছে, আদর্শ বেঁটে খাওয়াচ্ছে।

০৩.

মতাদর্শগতভাবে সারা পৃথিবীতে অসংখ্য নাফিসেরা আমেরিকার ধ্বংস চায়। এই মতাদর্শের উৎস ফিলিস্তিনি শিশুর রক্তাক্ত মুখ। বাগদাদ কিংবা বসরা শহরের ধ্বংসাবশেষের চিৎকার। আফগান আকাশে উড়া ড্রোন বিমানের দম্ভ চুরে দিতে সারা পৃথিবীতেই হয়ত উৎ পেতে আছে অসংখ্য নাফিস। হয়ত তারা ভুলভাবেই দেখছে, এ লড়াই আমেরিকা বনাম মুসলমানের। আমেরিকাও চায় বড়িটা এভাবেই গিলুক। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুলে যাক গোড়ার কথা। অসুখ বিসুখের কারণ।

আমেরিকা ছুঁতা দেয় মুসলমান মানে বর্বর আর নাফিসেরা এর বদলা নিতে ইসলামের আদর্শ কায়েমের আবেগ খুঁজে হয়রান। অথচ কে বোঝাবে এই মাটিতে ইসলাম অলৌকিক কোন পবিত্রতার সুধা নয়, আগাগোড়াই লৈকিকতায় পূঁত। এখানে ধর্মের ইতিহাস স্বর্গীয় লোভে নয়; বর্ণবিভেদ, জাতপাত, আশরাফআতরাফ, আতর আর ঘামের গন্ধের পার্থক্য মুছতে ব্যাকুল। যে পার্থক্যের বিস্তার করে পুঁজি, ব্যক্তিআমি বা মালিকানাবোধ, তার মরণ চায় বঙের ইসলাম। আউলবাউলফকিরদের কাছেই যার নমুনা মেলে, কাঠমোল্লার কাছে নয়।

অতএব লড়াইটা পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেই। লড়বে শ্রমিক ও কৃষক নাফিস, লড়বে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নাফিস, চাকমামারমা ও তাদের বাঙাল বন্ধু নাফিস। শূদ্র, বৌদ্ধ ও নির্যাতিত মুসলমান নাফিস। কিন্তু তার ধরণ ‘ছটাকে মোল্লা’র বুঝজ্ঞান দিয়ে নয়। এভিন্ন আমাদের বোঝাপড়ায় যদি সাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার হীনমন্যতা থাকে, তো যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদের তাতে লাভই হবে। ইসলামের সাথে পশ্চিমা সভ্যতার লড়াইয়ের নামের আড়ালে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার সাথে দেশে দেশে নিপীড়িত মানুষের প্রকৃত দ্বন্দ্ব আড়াল হয়ে যাবে। হয়ে পড়বে ধর্মযুদ্ধ। সেটাই যদি হয়, তো এটা আত্মঘাতি, আমাদের চিন্তার দেউলিয়াত্ব। আর কয়েক গণ্ডা লোক আছেন, যারা তালেবান কিংবা মুসলমান জঙ্গির উত্থানের উৎসদাতা মার্কিনিদের এড়িয়ে গিয়ে ঢালাও দোষবন্টনের পক্ষে গলাবাজি করেন। এ সেক্যুলার হীনমন্যতা শেষতক সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাসের কাজ করে। সাম্রাজ্যবাদীদের দেয়া সূত্রে এই সেক্যুলারগোষ্ঠি অংক মেলান। ধার্মিক দেখলেই এরা ‘শ্রেণীশত্রু খতম’র মতো লাফিয়ে পড়েন। হুঁশ থাকে না, কোনটা সাম্প্রদায়িকতা আর কোনটা সাম্রাজ্যবাদের গুঁটির চাল। বোঝার দরকার মনে করে না, কোনটা ধর্মযুদ্ধ বা সাম্প্রদায়িকতা আর কার নাম নিপীড়িত মুসলমান। ফলাফল রামু, উখিয়ার আগুনের আঁচ বাচবিচার করার তাৎপর্য ভুলে যান। তাদের হেদায়েত হোক!

আমরা গরিব দেশের লোক ভায়া, হোয়াইট হাউজ দিখিয়ে আমাদের হাইকোর্ট শেখানো সহজ। কিন্তু ধর্মীয় বিভাজনের কারণ থেকে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি টের না পেলে আমাদের ভবিষ্যৎ হবে আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো। আমরা হব মার্কিন সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের উপযুক্ত জায়গা। পাকিস্তানের ‘আইএসআই’, ভারতের ‘র’, ইসরাইলি ‘মোসাদ’ মার্কিনি ‘সিআইএ’ ও ‘এফবিআই’র ফাঁদে পড়ে আমরা হাত পা হারাতে থাকবো। আমাদের এই পঙ্গু দশা থেকে ভাড়াটে আর্মি, র‌্যাব, পুলিশ কেউ আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। জনগণকে তার প্রতিরক্ষা নিজেই ঠিক করতে হবে। ব্যরিকেডের একদিকে সাম্রাজ্যবাদ ও তার তাবেদার গোষ্ঠি, অন্যদিকে নিপীড়িত জনগণ। আপনার অবস্থান কোন দিকে???

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s