ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রশ্নে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও আধিপত্যের ভাষা

Posted: অক্টোবর 6, 2012 in অর্থনীতি, দেশ, প্রকৃতি-পরিবেশ, মন্তব্য প্রতিবেদন, সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: আহমদ জসিম

সেনা শাসনে পর্যুদস্ত পাহাড়ের মাটি ও জনগণ...আমরা বিষয়টা শুরু করতে পারি গত ২০১০এর ১৯ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় ঘটে যাওয়া সংঘাত থেকে। সেই ঘটনায় হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট অগ্নিসংযোগসহ মানবতার চরম লঙ্ঘন হয়েছিল এটা পাহাড়ি জনগণের উপর চলমান রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ছোট্ট একটা অধ্যায় মাত্র। মোটামুটিভাবে আমরা বিষয়টাকে এভাবে দেখতে পারি; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিপীড়নের শুরু ১৯৫৬ থেকে আর সেই নিপীড়নের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে ’৮০ দশক থেকে। তবে ১৯ ফেব্রুয়ারির এই ঘটনা বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে, এই কারণেই যে ক্ষমতাসীন আ’লীগ সরকার শান্তি চুক্তির মধ্যদিয়ে জনগণের কাছে অঙ্গীকার করেছে পাহাড়ে একটা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে, আবার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শাসক আ’লীগ এর দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের মন্তব্যগুলোতেও রাষ্ট্রের রাজনীতি সচেতন সকল নাগরিকেরই উদ্বিগ্ন হবার যথেষ্ট কারণ আছে। ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পাহাড়ে সেনা বৃদ্ধির কথা (অথচ পাহাড় থেকে সেনা প্রত্যাহার হচ্ছে শান্তি চুক্তির অন্যতম এজেন্ডা), ঘটনায় দাতাদের উদ্বেগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংসদ উপনেতা বলেছেন, ‘তারা শুধু পাহাড় নিয়ে ভাবে বাংলাদেশ নিয়ে ভাবে না’ (!) স্বাভাবিক নিয়মেই প্রশ্ন জাগে শাসকশ্রেণী কি তবে পাহাড় কিংবা পাহাড়ি জনগণকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি না! শাসক দলের দুই দায়িত্বশীল ব্যক্তির মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় শান্তিচুক্তি নামক কাগজটা আসলে পাহাড়ি জনগণের সাথে আরেকটা প্রতারণা।

এবার আমরা ১৯ ফেব্রুয়ারির ঘটনার দিকে একটু নজর দিব। ঘটনার সূত্রপাত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি নামক স্থানে। পাহাড়িদের জমি দখলকে কেন্দ্র করে। একদল সেটেলার পাহাড়িদের জমি দখল করতে গেলে পাহাড়িরা বাঁধা দেয়। উশৃঙ্খল সেটেলাররা ক্ষিপ্ত হয়ে নির্বিচারে পাহাড়িদের ঘরে অগ্নিসংযোগ করতে থাকে, সেটেলারদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে সেনাবাহিনী এবং শুরু করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। গুলিবর্ষণের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হন বুদ্ধপ্রতীম চাকমা নামে এক পাহাড়ি নারী। পরে আরো কতজন পাহাড়ির মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। তবে ঘটনার পরম্পরায় একজন সেটেলরের মৃত্যু ৩৭৫টি পাহাড়ির ঘরে অগ্নিসংযোগ চার হাজার পাহাড়ি গৃহহারা হয়ে প্রাণ ভয়ে গভীর অরণ্যে আশ্রয় গ্রহণের কথা আমরা জানতে পারি। পক্ষান্তরে, শতাধিক সেটেলারের ঘরে অগ্নিসংযোগ এবং চার শতাধিক সেটেলার গৃহহারা হবার তথ্য আমরা নানান সংবাদ মাধ্যমগুলো থেকে জেনেছি। ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির আনুপাতিক বৈষম্য ও প্রেক্ষিত বিচার করলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ। পাহাড়িরা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত ভাবে বসতি করে; এত দীর্ঘ এলাকায় এত দ্রুত অগ্নিসংযোগ ও অগ্নিসংযোগকারীদের নিবৃত্ত করার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের গণহারে আটক পাহাড়ি জনগণের প্রশ্নে রাষ্ট্রের অবস্থান সুস্পষ্ট করেছে।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলারদের পরিকল্পিত পুনর্বাসন সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়ার সময়কাল থেকে। এর আগেও বাঙালি সেটেলাররা সেখানে পুনর্বাসিত হয়েছে, তবে তা পরিকল্পিত প্ল্যানমাফিক নয়। সমতল থেকে নদী ভাঙ্গা, ভূমিহীন, ভবঘুরে, বিক্ষুব্ধ এবং জেল থেকে মুক্ত করে মারাত্মক অপরাধীপ্রবণ আসামিকেও জমি, নগদ অর্থ ও রেশনের লোভ দেখিয়ে পাহাড়ে পাঠানো হয়েছিল। শোনা যায় এ সমস্ত প্রলোভন উপেক্ষা করে যারা শেষ পর্যন্ত যেতে রাজি ছিলনা তাদের অনেককে জোর করেও পাঠানো হয়েছে। এমনকি, যারা পাহাড়ে পৌঁছানোর পর মোহভঙ্গ হয়ে সমতলে পালিয়ে আসতে চেয়েছিল, তাদের ক্যাম্পে আঁটকে রাখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, পাহাড়ের মানুষকে পাহাড়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা এবং রাষ্ট্রের এক অংশের নিপীড়িত মানুষের বিরুদ্ধে অপর নিপীড়িত মানুষকে লেলিয়ে দিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি ও তার মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটা। আর শাসকশ্রেণীর এই দূরভিসন্ধির ফলও ভোগ করতে হয়েছে সেটেলারদের। সশস্ত্র সংগ্রামরত পাহাড়িদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে জীবন দিয়েছে হাজার হাজার বাঙালি। তাছাড়া পাহাড়ের ভূপ্রকৃতিও সেটেলারদের প্রতিপক্ষ। একজন মানুষের জন্ম থেকে বেড়ে উঠা পর্যন্ত প্রকৃতির সাথে একটা সুনিবীড় সম্পর্ক থাকে। চর, সমতল ও পাহাড়ের প্রকৃতি নিঃসন্দেহে এক নয়। নানা অঞ্চল থেকে যাওয়া সেটেলারেরা যখন পাহাড়ে বসতি স্থাপন করেছে। তখন থেকেই ম্যালেরিয়া তাদের পিচু ছাড়েনি। সমস্যাটা বিশেষভাবে বাঙালিদের জন্য। কারণ পাহাড়িরা তাদের জীবনের শতশত বছরের অভিজ্ঞতা দিয়েই এমন খাদ্যাভাস গড়ে তুলেছে যার কারণে ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা পাহাড়িদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠেছে। অথচ এই ম্যালেরিয়া রোগেই প্রতি বছর পাহাড়ে শতশত সেটেলারের মৃত্যু হচ্ছে। সেটেরার দিয়ে পাহাড়ি জনগণের ভূমি দখল ও প্রশাসনের সহযোগিতা দেখে আপাতদৃষ্টিতে আমাদের মনে হতে পারে, বুঝি শাসকশ্রেণীর বাঙালি প্রেমেরই বহিপ্রকাশ। কিন্তু সমতলে আমরা ঠিক তার উল্টো চিত্রটাই লক্ষ্যকরি, দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে বাঙালিরা ভূমি রক্ষার সংগ্রাম করছে, সংগ্রাম করেছে আড়িয়াল বিলের বাঙালিরা। শাসকশ্রেণীর একাংশের (আওয়ামী লীগ) প্রভুরাষ্ট্র ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে গিয়ে যে পরিমান ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে, এই ভূমি ষোলকোটি মানুষের দুইদিনের আহারের জোগান দেয়। অতএব বাঙালির আরেকটা ভূমিরক্ষার সংগ্রাম আসন্ন। তদুপি বলা যায়, পাহাড়ে যে বাঙালিরা বসবাস করছে তাদের ক’জনের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তার বিধান শাসকশ্রেণী করেছে? নিশ্চিত করেই বলা যায় শাসকশ্রেণীর কৌশল হলোকাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। অর্থাৎ, নিপীড়ক যন্ত্র রাষ্ট্রের এক অংশের নিপীড়িত মানুষের বিরুদ্ধে আরেক অংশের নিপীড়িত মানুষকে লেলিয়ে দেওয়া।

পাহাড়ি জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাটা দৃশ্যমান হতে শুরু করে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকের সময়কাল থেকেই, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কাপ্তাই লেকে বাঁধ দিয়ে। এই বাঁধের ফলে লক্ষলক্ষ পাহাড়িকে ভূমিহীন করা হয়েছে। পানির নিচে চিরতরে তলিয়ে গেছে পার্বত্য অঞ্চলের মোট আবাদি জমির শতকরা ৪০ ভাগ। সেসময়ের সম্মিলিত ক্ষোভের সংঘটিত রূপ প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন পরবর্তী সময়ে। তৎকালীন শাসক দল আ’লীগের কাছে সমগ্র জনগণের মতো পাহাড়িদের প্রত্যাশা ছিল ন্যায় বিচারের। আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করিপাহাড়ি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সূচনা করলো নবগঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবই। তিনি বললেন– “তোরা সব বাঙালি হয়ে যা”, উনার চাটুকারেরা দেখালেনবাঙালি হওয়াতেই কি করে আদিবাসীদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়! ঠিক যেভাবে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণী বলেছিল পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। ইতিহাসের কালক্রমে শাসকশ্রেণীর বদল হয়েছে কিন্তু পাহাড়ি জনগণের ভাগ্যের বদল হয়নি মোটেও। বরং শাসকশ্রেণীর বদলের সাথে সাথে পাহাড়ি জনগণের উপর শোষণের নতুননতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ক্ষমতাসীন শাসক দল আ’লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাই এসে পাহাড়ি বিদ্রোহীদের সাথে শান্তি চুক্তি করেছিল, সেই চুক্তির আজ প্রায় দেড় দশক অতিক্রম হতে চলল, এই চুক্তির একটি ধারাও বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নিল না রাষ্ট্র, কালক্রমে এখন আবার সেই আওয়ামী লীগই ক্ষমতায়। এতেই প্রমাণিত হয় এই চুক্তি আসলে পাহাড়ি জনগণের সাথে প্রতারণা মাত্র।

শাসকশ্রেণীর অপর অংশ বিএনপি, এই চুক্তির বিরোধীতা করে বলেছিল চুক্তির ফলে তিন পার্বত্য জেলা ভারতের দখলে চলে যাবে। বিএনপি’র আসলে যুক্তিহীন চুক্তি বিরোধীতার মধ্য দিয়ে এই দেশের জনগণের সম্প্রসারণবাদী ভারতের আগ্রাসন বিরোধী মনোভাবকে পুঁজি করে পাহাড়ি জনগণের উপর শোষণমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেছে। মজার ব্যাপার হলোতারা ক্ষমতায় গিয়ে, এই চুক্তি বাতিলের কোন প্রয়োজনই অনুভব করেনি! বাংলাদেশের ইতিহাসে যে ক’জন শাসক এসেছে তাদের মধ্যে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের সময়কাল পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়ি জনগণের ইতিহাসে আলাদা করে চিহ্নিত করার দাবি রাখে। বিশেষ করে তার বিশ্বস্ত সহযোগী পার্বত্য অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ইব্রাহিমের তৎপরতা (এই ইব্রাহিম ২০০৭ সালের সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের সময়ে “বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি” নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছেন)। এই সেনাকর্তা তার দূরভিসন্ধিতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে তেরোটি নৃগোষ্ঠী বাস করে, তাদের মধ্যে চাকমা জনগোষ্ঠি সংখ্যাগরিষ্ঠ। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মারমা। মানবসভ্যতার ইতিহাস থেকেই আমরা জানিএকই স্থানে যখন একাধিক জনগোষ্ঠী বসতি স্থাপন শুরু করে পরষ্পর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব সংঘাত অনির্বায হয়ে উঠে। এই সংঘাত সিন্ধু সভ্যতার আগন্তুক আর্যদের সাথে আদি অধিবাসীদের হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের গারোদের সাথে হাজংদের হয়েছে। অনুরূপভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী নানা জনগোষ্ঠী সমূহের মধ্যেও হয়েছে। তবে ইতিহাসের পরিক্রমায় এই দ্বন্দ্ব এক সময় বিলীন হয়ে যায়। ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে তৈরি করে এক বৃহত্তর মানবসমাজ অথচ এই তামাদি দ্বন্দ্বগুলোকেই অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে কাজে লাগিয়েছে স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের সেনা কর্মকর্তা ইব্রাহিম। দ্বন্দ্বটা আসলে প্রকট হয় ১৯৮১ সালে দাভেং প্রুএর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। দাভেং প্রু ছিল জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। পরবর্তীতে সংগঠনের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে সাভেং রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে যুক্ত হন শিক্ষকতায়। শিক্ষাকতা করা অবস্থায় তিনি নিখোঁজ হন। আজ পর্যন্ত তার খোঁজ মেলেনি। এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মারমা জনগোষ্ঠীর দৃষ্টি পড়েছে চাকমা জনগোষ্ঠীর উপর। অথচ এই সম্ভাবনাকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে শাসক শ্রেণীই দাভেং প্রু’কে গুম করেছে। আর তারা তা করেছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে ফাটল ধরাতে। পরবর্তীতে কল্পনা চাকমার অনুরূপভাবে গুম হওয়ার ঘটনা আমাদের সন্দহ আরো যৌক্তিক প্রমাণ হয়। দাভেং হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের দুই জনগোষ্ঠীর (চাকমা ও মারমা) যে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সূচনা হয়েছে, তার পুরোপুরি ফায়দা লুটেছে শাসকশ্রেণী। আপাতত হলেও শাসকশ্রেণী সংগ্রামের একটা বিভক্ত রেখা অঙ্কন করতে সক্ষম হয়েছে।


সংবিধান ও বৈপরিত্য:

বাংলাদেশের সংবিধান ৪২এর ১ ধারা মোতাবেক রাষ্ট্রের সমস্ত নাগরিক ধর্মবর্ণজাতি নির্বিশেষে সমান অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ তিন দশক কালেরও অধিক সময় ধরে চলছে অঘোষিত সেনা শাসন, যে শাসনের মধ্য দিয়ে কেড়ে নেওয়া হয়েছে সমস্ত পাহাড়িদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপায়। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে দখল করে নেওয়া হয়েছে তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নৃগোষ্ঠী সমূহের ভূমি এবং এই প্রক্রিয়া চলমান। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরীহ পাহাড়িদের ভূমি দখল করার জন্য ১৯৭৯ সালে মেজর জিয়া একটা প্যাকেজ প্রস্তাব করে। প্রস্তাবে বলা হয়, কোন বাঙালি যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করতে চায় তাহলে সে বাঙালিদেরকে দেওয়া হবে, পরিবার পিছু পাঁচ একর জমি ও নগদ ৩ হাজার করে টাকা এবং কয়েক মাস পর্যন্ত রেশন সুবিধা। মেজর জিয়ার এই প্রস্তাব পাওয়ার সাথে সাথে প্রথম দেড় বছরে প্রায় ২৪ হাজার বাঙালি ছুটে যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে। দ্বিতীয় পর্যায়ে অধিবাসন শুরু হয় ১৯৮০ সালের আগস্ট থেকে। এই পর্যায়ে ঘোষিত হলোপরিবার পিছু আড়াই কাঠা সমতল ভূমি। এক একর পাহাড়ি ও সমতল মিশ্র ভূমি অথবা এক একর পাহাড়ি ভূমি, এককালীন ৭০০ টাকা ও ৬ মাস পরিবার পিছু ১২ কেজি করে গম। এই ধারায় ১৯৮৪ সালের মধ্যে পাহাড়ে অধিবাসী হলো ৪ লক্ষ বাঙালি। এই বাঙালিদের ভূমি ব্যবস্থা করতে গিয়ে আবারও উদ্বাস্তু হয়ে পড়লে লক্ষ লক্ষ পাহাড়ি এই অবৈধ অধিবাসন নিয়ে শাসকশ্রেণী যে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে তাহলোএকটা দেশের নাগরিক সে দেশের যেকোন স্থানে বসতি স্থাপনের অধিকার রাখে।’ কথাটা যদি যুক্তি হিসেবে মেনেও নেয়া হয়, মনে রাখতে হবেসেই অধিবাসন যদি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রের অপর অংশের নাগরিকদের ভূমি দখল করে হয়, এটা নিঃসন্দেহে নীতি বিরুদ্ধ। তাছাড়া অনেক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহের স্বতন্ত্র জীবন প্রণালী ও ভাষা সংস্কৃতি রক্ষার জন্য আলাদা শাসন ব্যবস্থা স্বীকৃত। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াই প্রবলভাবে ভারত বিরোধী জনমত গড়ে উঠেছে। এদেশের শাসকশ্রেণীর একটা অংশ (বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি প্রমুখ) সেই জনমতকে ব্যবহার করেছে পাহাড়ি জনগণকে নিপীড়নের জন্য। এটা ঠিক যে দক্ষিণ এশিয়ায় যে কোন ধরনের গণঅসন্তোষ ভারত তার সম্প্রসারণবাদী উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করবেই। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্থ করেছে এদেশের শাসকশ্রেণীই। একটা রাজনৈতিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে সামরিক শক্তি দিয়ে দমনের চেষ্টা, যার ফল শেষ পর্যন্ত একটা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরিণত হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের দিকে, একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যেও যদি জাতিগত সংখ্যালঘুর ভাষাধর্মসংস্কৃতি রক্ষার নিশ্চিত বিধান করতে পারে তার ফল কী হয়, সেটা বর্তমানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দখল কবলিত ইরাকের দিকে লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে। ইরাকের আদিবাসী সম্প্রদায় যারা খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দখলদারিত্বর বিরুদ্ধে তারাও সাধারণ ইরাকিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের প্রতি অনুগত থেকেছে। অথচ অনেক সিয়াসুন্নি নেতারই বিশ্বাসঘাকতার উদাহরণ আছে। মনে রাখতে হবে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় চাকমা রাজার ভারতের পতাকা উত্তোলন কিংবা মারমা রাজার বার্মার পতাকা উত্তোলন কোনটাই সাধারণ পাহাড়িদের মতের প্রতিফলন নয়। অর্ধশতাব্দীর পুরোনো সেই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি জনগণকে মুসলমান বিদ্বেষী কিংবা বাঙালি বিদ্বেষী মনে করার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া ভারতের পতাকা উত্তোলনের মাত্র ২৪ বছরে মাথায় চাকমা রাজন ত্রিদিব রায় যখন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে তখন ধরেই নেওয়া যায়, এটা তার সুচিন্তিত রাজনৈতিক মতের প্রতিফলন ছিলনা। অথচ শাসকশ্রেণীর একটা অংশ পাহাড়ি জনগণকে নিপীড়নের জন্য এটাকেই ইস্যু করছে। পাহাড়ের বিষয় রাষ্ট্রের আচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইহুদীবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল অথবা সাবেক বর্ণবাদী রাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকার কথা। বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে এধরনের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান ব্যক্ত করে আসছে, অথচ রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরে একই রকম রীতি কায়েম করে আছে!


সেনাবাহিনীর ভূমিকা:

পযন্ত যেসব ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটিয়েছে তার বিষদ বিবরণ না দিয়ে একটা ঘটনার উল্লেখ করছি। ১৯৮০ সালে কাউখালী বাজারে মেজর কামালের নেতৃত্বে পাহাড়িদের শান্তি আলোচনার নামে ডেকে এনে দুই শতাধিক পাহাড়িকে গুলি করে এবং গুলি খাওয়ার পরও যারা বেঁচে ছিল তাদেরকে দা দিয়ে কুঁপিয়ে হত্যা করা হয়। এমন ঘটনা পাহাড়ে অসংখ্যাবার ঘটেছে। যার ধারাবাহিকতার ফল হচ্ছে ১৯ ফেব্রুয়ারি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এদেশের হতদরিদ্র জনগণের অর্থে পোষা এই সেনাবাহিনী দেশের এক অংশের মানুষের উপর এমন খড়গহস্ত হলো কেন? প্রথম বিবেচনায় সকলেই বলবেন রাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন, বিষয়টা নিয়ে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে এই এজেন্ডার বাইরেও সেনাবাহিনীর একটা নিজস্ব স্বার্থ লুকিয়ে আছে। আমরা কালেভাদ্রে হলেও মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি, বুজোঁয়া রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির নানা ফিরিস্তি। কিন্তু সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে সামরিক আমলারা কী ভয়ানক দুর্নীতি করছে এদেশের সাধারণ মানুষের জানার কোন সুযোগ নেই তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আইনের কারণে। বিস্ময় জাগে জনগণের সামরিক বাহিনী সম্পর্কে জানার অধিকার না থাকলেও ঠিকই জানে তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগী সাম্রাজ্যবাদী দাতা গোষ্ঠী। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে এই পর্যন্ত শাসকশ্রেণী হাজার হাজার টাকা ব্যয় করেছে পাহাড়ি জনগণের আন্দোলন সংগ্রামকে দমন করার জন্য। এই টাকা কোথায় এবং কি ভাবে খরচ হলো তার কোন তথ্যই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনগণকে জানানো হয়নি। তবে এই কথাটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়এই অর্থলোপাটের হাতছানিই সেনাবাহিনীকে এইসব হিংস্র হত্যাকাণ্ডের উৎসাহ যুগিয়েছে। ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সম্পূর্ণরূপে সেনা প্রত্যাহারের কথা। এই প্রত্যাহার প্রস্তাবটা সেনাবাহিনীর মেনে নেওয়ার কথা না। কারণ কোন সেনা কর্মকর্তার পার্বত্য চট্টগ্রামের দায়িত্ব পাওয়ার অর্থই হচ্ছে আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার। পার্বত্য অঞ্চলের ঘন অরণ্যঘেরা পাহাড় আজ ন্যাড়া শুকনো খড়খড়ে মরুভূমির মতো দাঁড়িয়েছে আছে, গাছগুলো সব পাচার হয়ে গেছে। এই গাছ পাচারের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত পার্বত্য অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা সদস্যরা। কথিত আছে, পাহাড় থেকে পাচার হওয়া প্রতি ইঞ্চি কাঠ থেকে সেনাবাহিনী চাঁদা নেয়। এ যেন ডিম পাড়া সোনার হাঁস। যে হাসের লোভে সেনাবাহিনী আজ মনুষ্যত্ব হারিয়ে হিংস্র দানবে পরিণত হয়েছে। এই সেনাবাহিনী পাহাড়ে যে পরিমাণ মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে তার অতি সামান্য অংশই আমরা শেষ পর্যন্ত জানতে পারি। তবে আজ প্রশ্ন জাগে, যারা নিজ দেশের জনগণের উপর এমন হিংস্র হত্যাকাণ্ড চালাতে পারে, তারা কীভাবে বিশ্বব্যাপী শান্তি রক্ষার দায়ত্ব পালন করছে? কারণ, আর কিছু নয়, সেখানেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই তথাকথিত শান্তিরক্ষীদের ব্যবহার করা হয় জনগণের বিদ্রোহকে দমানোর জন্যই, সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে।


সংস্কৃতিগত আধিপত্য:

শোষণমূলক সমাজে সবসময় শোষকরা হয় অতি সংখ্যালঘু, এই সংখ্যালঘু শোষক কী করে বিপুল জনগোষ্ঠীকে শোষণ করছে? বিশিষ্ট চিন্তক আন্তানিউ গ্রামসি যার নাম দিয়েছেন, “ইডলজিকেল হেজিমনি” বিষয়টাকে বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায়, শোষকশ্রেণী তৈরি করে এক সংস্কৃতিক বলয়, যে সংস্কৃতিক আধিপত্য শোষিতের মধ্যে বিস্তার করেই শোষণ প্রকৃতিটা টিকিয়ে রাখা হয়। একই ভাবে সাম্রাজ্যবাদ তৈরি করে তার আগ্রাসনের ভাষা, যে ভাষা তৈরি করে শোষিতের মধ্যে উপনিবেশিক মানস। সুহৃদ পাঠক, লক্ষ্য করুনআমরা যখন বলি, এটা কী মগের মুল্লুক হয়ে গেল? এই বাক্যের মধ্যদিয়ে আমাদের চোখের সামনে যে দৃশ্যকল্প ভেসে উঠে তা হলো, মগ শাসন মানেই হলো চরম নৈরাজ্যিক, বর্বর, অসভ্যের শাসন। ঐতিহাসিক ভাবে এটা সত্য পূর্ব বাংলার পূর্ব অংশে দীর্ঘদিন যাবত মঙ্গলাইট জাতিগোষ্ঠির শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকৃত অর্থে কেমন ছিল সেই শাসন ব্যবস্থা? আমরা বর্তমানে যে বাংলাদেশে বাস করছি তার চেয়েও জঘন্য! যে দেশে ২১ বছরের পুত্র তুল্য পুরুষের হাতে ধর্ষিত হয় ৪৫ বছরের নারী, ৫২ বছরের বৃদ্ধের হাতে ধর্ষিত হয় ৭ বছরের শিশু কন্য। যে দেশে পিতার বুকে দেড় বছরের সন্তানকে গুলিতে মরতে হয়। যে ভাবে বর্তমান সময়ে এসে শাসকশ্রেণী ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা সমুহকে উপজাতি শব্দে পরিচিত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। এই ধরনের শব্দগুলো সৃষ্টি করে শাসকশ্রেণী তার ঔপনিবেশিক আগ্রাসন টিকিয়ে রাখার জন্য। উপজাতি শব্দটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই কী প্রশ্ন জাগে না, এই ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলো আসলে কাদের উপজাত, হতে পারে চাকমার উপজাত তচঙ্গ্যা, মারমার উপজাত চাকা, ত্রিপুরার উপজাত ঊষা, বনোযোগির উপজাত লুসাই। সেক্ষেত্রে বিষয় ভিন্ন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে উপজাতি শব্দটা যখন ব্যবহার করা হয় তখন এর অর্থ দাঁড়ায় বাঙালি হচ্ছে মূল জাতি আর এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হচ্ছে বাঙালির উপজাত। যাদেরকে আমরা উপজাত হিসেবে চিহ্নিত করছি তাদের স্বতন্ত্র কৃষ্টি কালচার আছে, আছে ভাষাইতিহাস ও ঐতিহ্য। জাতি হিসেবে তাদের বিবর্তনের ইতিহাস বাঙালি থেকে স্বতন্ত্র। আবার আদিবাসী শব্দটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি ও জাতিসংঘ ঘোষিত ট্রাইবএর বাংলা করণ। এই আদিবাসী শব্দটা দিয়ে আদিঅধিবাসী নয় বরং বর্বর অসভ্য ও চলমান সভ্যতা থেকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বুঝানো হয়েছে। পাঠক একবার ভেবে দেখুন, উন্নত বিশ্বের সর্বোচ্চ আধুনিক সুবিধা ভোগী কোন মানুষ বাংলাদেশে এসে মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চর কিংবা উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত ন্যুনতম আধুনিক সুবিধা বঞ্চিত মানুষের জীবন যাপিত দেখে ট্রাইব বলে মনে করতে পারে। পক্ষান্তরে, পার্বত্য জেলার কোন বোম কিংবা লুসাই পল্লীতে গিয়ে টিশার্ট, জিন্স পড়া তরুণতরুণীদের দেখে প্রচলিত আধুনিকতা থেকে পিছিয়ে পড়া মনে করার কোন কারণ আছে বলে তো মনে হয় না। এই শব্দগুলো শাসকশ্রেণীর আধিপত্য সৃষ্টির প্রয়াস মাত্র। তা হলে আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পথ কী? নিঃসন্দেহে পাল্টা মতাদার্শিক সংগ্রাম। এই ক্ষুদ্র জাতিগুলো থেকেই বেরিয়ে আসতে হবে তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর। জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিগত স্বতান্ত্রিকতার ঝান্ডা উর্ধ্বে তুলে ধরার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে। তবে কাজটা সহজ নয়। শাসকশ্রেণীর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মতই এখানে আরেক প্রতিপক্ষের নাম সাম্রাজ্যবাদী মদদপুষ্ট তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগী ও মিশনারী তৎপরতা। এই মিশনারীদের তৎপরতায় সমতলের মান্দি, ওঁয়াও, মুন্ডা অনেক আগেই তাদের ধর্মসংস্কৃতি হারিয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বোম ও লুসাইয়ের ক্ষেত্রে। কেউ যদি তার বিশ্বাসের জায়গা পরিবর্তন করে ধর্মান্তরিত হয় কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু কোন জনগোষ্ঠীর দারিদ্রতাকে পুঁজি করে, রুটির লোভ দেখিয়ে তাদের ধর্মসংস্কৃতি যদি কেড়ে নেওয়া হয় এটা নিঃসন্দেহে মানবতা বিরোধী। ধর্ম আসলে একটা জনগোষ্ঠীর তার বিবর্তন ও বিকাশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরেই অংশ। একটা জনগোষ্ঠীকে তার ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা মানে তার সংস্কৃতি থেকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। যার পরিণতিতে, ব্যক্তি শারীরিকভাবে নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বহন করলেও শেষ পর্যন্ত চেতনা ও সংস্কৃতিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় মূল স্রোতের সাথে। ইউএনডিপি’র মতো সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাগুলোর তৎপরতা আমরা ভিন্নভাবে দেখি। এরা ক্ষুদ্রজাতিসত্ত্বার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মেধাবী তরুণতরুণীদেরকে চড়াদামে কিনে নেয় ভাড়া খাটা গবেষক হিসেবে। যাদের কণ্ঠ ও কলম দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারতো রাষ্ট্রীয়সামাজিক ও সংস্কৃতিগত নিপীড়নের কথা। তাদের কলম থেকে বেরিয়ে আসছে জনগোষ্ঠীর গার্হস্ব্য জীবন, পোশাকের রং, বাঁশ নৃত্য, বোতল নৃত্যের মতো সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা সহায়ক গবেষণাপত্র। সাম্রাজ্যবাদী এই তৎপরতা এবং শাসকশ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতাই এইসব নৃগোষ্ঠী থেকে আজ তৈরি হয়েছে একটা বিশেষ মধ্যসত্ত্বভোগী যারা শারীরিকভাবে নৃগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করলেও মানসিকভাবে শাসকশ্রেণীরই অংশ। তারা তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় দিয়ে শাসকশ্রেণী থেকে ফায়দা লুটছে, কিন্তু তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। বিস্ময়করভাবে তারা নীরব ও নিরুদ্বিগ্ন। তাদের বিলাসী জীবনযাপন ক্ষেত্র বিশেষে বাঙালি মধ্যবিত্তকেও হার মানায়। তবে সুখের বিষয় হচ্ছেএইসব পাহাড়ি মধ্যসত্ত্বভোগীকে শাসকশ্রেণী তৈরি করতে পারলেও মানুষের জাগরণ দমন করতে পারে না। কারণ এই সব দালালরা আসলে শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়, ময়ুরের পেখমপরা কাকের মতো। সংখ্যাগরিষ্ঠ নিপীড়িত মানুষ এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেই। প্রশ্ন হচ্ছে এই সংগ্রামের ধরণধারণ কী হবে? কোন আদর্শিক সংগ্রামেই স্বত:স্ফূর্ত ভাবে হতে পারে না।

সঠিক সংগ্রামের জন্য এই মুহূর্তে দরকার সমস্ত নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম ঐক্য, সংগঠন ও সংগ্রামের দিকনির্দেশনা খুঁজে বের করা। এ সমস্ত নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর শিক্ষিত ও সচেতন একটা অংশ শাসকশ্রেণীকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বরং অনেক বেশি নৈকট্য বোধ করে বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির উপর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাম শক্তি কি কর্মসূচি নির্ধারণ করেছে এই রাষ্ট্রিয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে। কোন নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে বাম দল সমূহ থেকে আমরা যে কর্মসূচি লক্ষ্য করি এগুলো তাৎক্ষণিক কর্মসূচি ছাড়া সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার লক্ষণ নয়, বাম রাজনৈতিক দল সমূহের এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে আদৌ কোন কর্মসূচি আছে বলেও আমার জানা নেই। এই নিপীড়নের ব্যাপারে আমি যে ক’টা বাম রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলের সাথে কথা বলেছি তাদের প্রায় সকলেরই মতে, বিপ্লবের পরেই এ সমস্ত নিপীড়িত জাতি সমূহের মুক্তি আসবে। ব্যাপারটা যেন এরকম নয় মণ ঘি গলুক, রাধা ঠিকই নাচবে। শাহবাগ, পল্টন মোড় আর প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে মিছিলমিটিংয়ে মিডিয়ায় খানিক কাভারেজ পাওয়া গেলেও তাতে জনগণের মুক্তি যে আসন্ন নয়, তা বুঝতে রাজনৈতিক বোদ্ধা হতে হয় না! এমন অবস্থায় আশু দরকার, নিপীড়িত জনগোষ্ঠী সমূহের নিজস্ব কণ্ঠস্বর, সমস্ত ক্ষুদ্রজাতিসত্ত্বার বৃহত্তর ঐক্য। সেই সাথে প্রয়োজন প্রকৃত বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী রাজনৈতিক দলসমূহকে পাহাড়িদের মাঝে গিয়ে সেখানে কাজ গড়ে তুলতে হবে, এর কোন বিকল্প নাই। যে ঐক্য ক্ষুদ্রজাতিসত্তার ভাষাসংস্কৃতির স্বাতন্ত্রিকতার দাবিকে উর্ধ্বে তুলে ধরবে। এই সংগ্রামের সহযোদ্ধা হবে মানবিক দায়বোধ সম্পন্ন প্রত্যেক বাঙ্গালিও। কারণ আমরা আমাদের উত্তর প্রজ্ন্মের জন্য হলোকাস্টএর মতো কোন ইতিহাসের দায় রেখে যেতে পারিনা।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s