সিপিবি-বাসদের দাবিনামা এবং শেয়ালের কাছে মুরগী গচ্ছিত রাখার উপাখ্যান!

Posted: অগাষ্ট 9, 2012 in অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, দেশ, প্রকৃতি-পরিবেশ, মতাদর্শ, মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

সর্বহারার প্রতীক...সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সিপিবি (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) ও বাসদ (বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল) ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলদুটির নীতিনির্ধারণী নেতারা, সেখানে তারা ১৫ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। এই ১৫ দফায় মূলতঃ তারা কী বলতে চেয়েছেন, আর বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় তা কতোটুকু প্রাসঙ্গিক, এ বিষয়ে মঙ্গলধ্বনি’র মূল্যায়ণ নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ

(সকলের বুঝার সুবিধার্থে ক্রমান্বয়ে সিপিবিবাসদ এর ১৫ দফা ও আমাদের মূল্যায়ণ তুলে ধরা হলো)

. মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের সকল বিকৃতি ও অসম্পূর্ণতা দূর করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সংবিধানকে আরো গণতান্ত্রিক ও গণমুখী করা।

* বিগত ৪০ বছরে ১৫ টি সংশোধনীর মাধ্যমে সাধিত সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চরিত্র ক্ষুণ?কারী সকল বিকৃতি দূরী করা।

* মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের সকল অসম্পূর্ণতা দূর করে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা তথা রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতি (সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ) এবং সাম্রাজবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতীয় চেতনা সমুন্নত রাখা।

* অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান এই ৬টি মৌলিক অধিকারকে সংবিধানের মৌলিক অধিকাররূপে সংযুক্ত করা।

* সংখ্যানুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্র এই ছয় স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে স্বশাসিত স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

* নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে কমপক্ষে আরও দুটি নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে সম্পন্ন করা। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচনে টাকার খেলাপেশী শক্তিসাম্প্রদায়িক প্রচারপ্রচারণা ও প্রশাসনিক কারসাজিমুক্ত করতে স্বাধীন ও আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা।

* মুক্তবাজার অর্থনীতি পরিহার করে সংবিধান অনুযায়ী পরিকল্পিত অর্থনীতি চালু করা।

————————–

আমরা সকলেই জানি যে, মুক্তির লক্ষ্যে যে যুদ্ধ করেছিল এদেশের জনগণ তা অর্জিত হয়নি। ১৯৭১ সালে অসমাপ্ত এই মুক্তি সংগ্রামের মাঝপথেই জন্ম লাভ করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি, যার নেতৃত্বে ছিল এখানকার উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণীর দল আওয়ামী লীগ, যার সাথে গাঁটছড়া বাঁধা ছিল সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের। তৎকালীন বিশ্ব তথা ভূরাজনীতির প্রভাবে সেই দলটির নেতৃত্বে যে সংবিধান রচনা করা হয়, তাতে কিছু স্ববিরোধী বক্তব্য উপস্থিত ছিল। তবে মূলতঃ সে সংবিধানটি রচিত হয়েছিল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা ও তৎকালীন সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের এখানকার এজেন্ট ভারত রাষ্ট্রের সাথে লেজুড়বৃত্তি চালিয়ে যাওয়ার নিমিত্তে।

মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিচার করলে এই ১৯৭২ সালের সংবিধানকে কোনভাবেই শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থে করা হয়েছে, তা বলার কোন অবকাশ নাই। প্রথমেই এই সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়ে বলার চেষ্টা করছি। এখানে যে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে, আমলাতন্ত্রকে না হটিয়ে সেই গণতন্ত্রের বুলি আওড়ানোটা কেবলই পোষাকী গণতন্ত্রের লেবাস মাত্র। এই গণতন্ত্রে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের কোন লাভই আদতে হবে না। এই গণতন্ত্র কেবলই মধ্যবিত্তউচ্চবিত্তের গণতন্ত্র। এতে সর্বহারা শ্রেণীর কোন গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষিত হয় না। এই সংবিধানে বলা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা; অথচ আমরা জানি যে, সর্বহারার সার্বভৌম ভূখণ্ডে ধর্ম থাকে গৌণ অবস্থানে, সে কারণে রাষ্ট্রকে হতে হয় ধর্মহীন। তাই সেক্ষেত্রে সর্বহারার সংবিধানে ধর্মের কথাই আসার কথা না। জাতীয়তাবাদ, যা মূলতঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদ; যার মাধ্যমে উক্ত সংবিধান এই ভূখণ্ডের অন্যান্য সকল জাতিসত্ত্বাকে অস্বীকার করে সবাইকে বাঙালি হিসেবে ঘোষণা করে; আর তা আদতে উগ্রজাতীয়তাবাদ ভিন্ন কিছু নয়। কোন সর্বহারার সংবিধান অন্যান্য জাতিসত্ত্বার বিকাশকে অবদমিত করতে পারেনা। সমাজতন্ত্র, যা মূলতঃ তৎকালীন সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের করুণা প্রাপ্তির জন্যই তৎকালীন শাসকশ্রেনী সংবিধানে যুক্ত করেছিল। অবশ্য এমন সমাজতন্ত্র থাকাটা উঠতি দালাল শ্রেণীর জন্য ছিল খুবই উপকারী, কারণ এমন সমাজতন্ত্রে কেবল নির্বাচনী অবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের কথা বলা হয়েছে কর্মসূচীতে। অথচ, এই ঐক্যের মূল লক্ষ্য মোটেই রাষ্ট্র ও সমাজে কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন নয়, শাসকশোষক শ্রেণীকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী শ্রেণী সমূহের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে আসা নয়, তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচনের একটি সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরী করা। কিন্তু তা নির্দলীয় সরকারের অধীনে করতে চেয়ে তারা নিজেরাই কী “অগণতান্ত্রিক” হয়ে গেলেন না!!

১৯৭২এর সংবিধান” জনগণের মৌলিক অধিকার প্রশ্নে বলে

২৬। () এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসমঞ্জস সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধানপ্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।

() রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।

সংবিধানের বিধান সংশোধনের ক্ষমতা সম্পর্কে

১৪২। এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও সংসদের আইনদ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবে।

যা মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক। এমনি আরো অনেক অনেক স্ববিরোধী মন্তব্যে ঠাঁসা এক সংবিধানকে কেমন করে আদর্শ মনে করতে পারে কমিউনিস্ট নামধারী কোন পার্টি, তা বোধগম্য হয় না। উপরন্তু, ঐ সংবিধানে ফিরে যাওয়াটাই যেখানে তাদের প্রথম দাবী, সেখানে সর্বহারার একনায়কত্ব বা বিপ্লব যে সুদূর পরাহত, কেবলই বুলিতে সীমাবদ্ধ, তা বলাই বাহুল্য!

আর এহেন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশন ন্যায়নীতির ভাণ্ডার হয়ে উঠবে তা আষাঢ়ে গল্পের মতোই শোনায়! আর তা করবেই বা কে, এই শাসকশ্রেণী, নাকি সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা?

এই সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হলেও রাষ্ট্র কাঠামোর কোন অংশে এর কোন অনুশীলন হয়নি। কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি সম্পর্কে সংবিধানে বলা হয়

১৪৷ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকেকৃষক ও শ্রমিককেএবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা৷

আর এতে খুব ভাল করেই প্রতিভাত হয় যে, এই রাষ্ট্রযন্ত্রে কৃষকশ্রমিকের শোষণ মুক্তির কথা বলা হলেও তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বা সর্বহারার একনায়কত্বের কথা সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে; যেহেতু এই সংবিধান প্রনয়ণ ও গ্রহণকারীরা তৎকালীন উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণীর ধারকবাহক ছিলেন। আর এই “কাগুজে সমাজতন্ত্র” ছিল মুক্তিকামী জনতার হাত থেকে তাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা আর তৎকালীন মধ্যবিত্তের বাম দল সিপিবি গং’দের আওয়ামী লীগের “বিটিমে” পরিণত করার সুদূর প্রসারী অপতৎপরতা। যার ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৫ সালে সিপিবি’কে গিলে খাওয়ার পরও আজ অবধি সেই মধ্যবিত্ত বামদের “কাগুজে সমাজতন্ত্রের” প্রতি মোহ ভঙ্গ হয়নি। কারণ, শ্রেণী সংগ্রামহীন সুবিধাবাদী রাজনীতির ধারকদের কাছে “প্রেসক্লাব টু পল্টনই” বিপ্লবের সার।

কর্মসূচী পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, মুক্তবাজার অর্থনীতি পরিহার করে সংবিধান অনুযায়ী পরিকল্পিত অর্থনীতি চালু করার কথা।

এই ভূখণ্ডে ভূমি সংস্কার থেকে শুরু করে উৎপাদিকা শক্তি, উৎপাদন সম্পর্ক; সকল ক্ষেত্রেই সাম্রাজ্যবাদের লেজুড় পুঁজির আস্ফালন লক্ষ্যণীয়, সেই সাথে আছে পরিবর্তিত অবস্থার সামন্তবাদ, রূপের পরিবর্তন ঘটলেও সামন্তবাদ রয়েছে বেশ ভাল ভাবেই। আর এই স্ববিরোধী সংবিধানও এই শোষণযন্ত্রকে মদদ দিয়ে চলেছে প্রাণ ভরে। এমন সংবিধানে ফেরত যাওয়ার সাথে সর্বহারা শ্রেণীর মুক্তির যে কোন সম্পর্ক নাই, তা কারো না বুঝার কথা নয়! বরং এই দাবীর অন্তর্নিহিত কারণ হলো, এর মাধ্যমে তারা বুঝাতে চাইছে যে, তারা শাসকশ্রেণীর শত্রু নয়, আর তারা নিজেরাও এই শোষকযন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার “সংবিধান”এর রক্ষক! শোষণযন্ত্রের অংশীদারিত্বটাই এখানে মূখ্য!

———————-

. ৭১এর যুদ্ধপরাধীদের বিচার ও শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাগণআকাঙ্ক্ষার পুনর্জাগরণ ঘটানো।

* মানবতা বিরোধী যুদ্ধপরাধের বিচার ও শাস্তি প্রদানের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা। মৌলবাদীসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিরোধী চেতনার বিকাশ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

* মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা।

—————————-

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনেক আগেই হওয়া উচিৎ ছিল। তবে যেহেতু “বাংলাদেশ রাষ্ট্র” জন্মের ৪১ বছরেও কোন জনগণের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়নি, তাই এই বিচারকে রাখা হয়েছে লোকচক্ষুর অন্তরালে, অথবা কখনো একে রাখা হয়েছে রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজী হিসেবে। বর্তমান আওয়ামী লীগ, তথা মহাজোট সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে এর উপর ভর করে নির্বাচন করেছিল। কিন্তু তাদের যে সে ব্যাপারে স্বদিচ্ছা ছিল না, তথা এটি ছিল স্ট্যান্টবাজী, তা ক্ষমতায় আসার কিছু দিনের মধ্যেই বেশ ভালভাবে বুঝা সম্ভব হয়, যখন তারা এই “যুদ্ধাপরাধের বিচার”কে প্রচার করতে থাকে “মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার” বলে। আর এই আওয়ামী এজেন্ডাই যখন দেখি সিপিবিবাসদের যৌথ কর্মসূচীর ঘোষণায়, তখন বড়ই হাস্যকর ঠেকে!

এর মাধ্যমে শাসকশ্রেণী মূলতঃ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিচার থেকে নিজের মুখ লুকোচ্ছেন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির বিরাগভাজন যেন না হতে হয়! উপরন্তু, শেখ সেলিমের বেয়াই বিশিষ্ট রাজাকার শমসের বিন মূসা’কে (৭১ সালে যিনি ‘নুলা মূসা’ নামে পরিচিত ছিলেন) গ্রেফতারের কোন তৎপরতা চোখে পড়ে না, বরং ৭১ সালে নুলা মূসা’র অন্যতম সহযোগী মাওলানা আবুল কালাম’কে (‘বাচ্চু রাজাকার’ নামে সমধিক পরিচিত) সুকৌশলে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়; যা বর্তমান শাসকশ্রেণীর রাজাকার বন্দনারই নামান্তর। আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হলে সব রাজাকারই মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠে!

সিপিবিবাসদের কার্যক্রমের পরবর্তী অংশে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সকল কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ কোন একক কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়নি, সেখানে কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন কোন বৃহৎ জোটও গঠিত হয়নি, বরং এই যুদ্ধে অনেক পার্টি তাদের নিজেদের লাইন অনুযায়ী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল; আবার কোন কোন বিপ্লবীদের একাধারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, নক্সাল নিধনে জড়িত থাকা ভারতীয় বাহিনী এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের এখানকার এজেন্ট মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল। এই যুদ্ধে অনেক পেটিবুর্জোয়া এবং গণতান্ত্রিক শক্তিও লড়াই করেছিল। যার মূলে ছিল– “জনগণের গণতান্ত্রিক মুক্তির লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম”। আর সেই গণতান্ত্রিক মুক্তি অর্জিত হওয়ার পূর্বেই সুকৌশলে বিজয় অর্জনের রব তোলা হয়, ক্ষমতা হস্তান্তর হয় পাকিস্তানি স্বৈরাচারীদের থেকে সাম্রাজ্যবাদের এদেশীয় দালালদের হাতে; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক মুক্তি থেকে যায় অধরা। অথচ সিপিবিবাসদ তাদের কর্মসূচীতে সে ঐতিহাসিক ঘটনাকে নাকচ করে বলছেমুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা সমাজতন্ত্র”। যা এই বামদের মোটা দাগের বিচ্যুতি ভিন্ন কিছু নয়।

———————–

. রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ এবং রাষ্ট্রের সকল অগণতান্ত্রিক কালো আইন বাতিল করা।

* ক্রসফায়ার, বিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, গুমখুন বন্ধ করা এবং এ সকল কর্মকাণ্ডকে আইনের আওতায় আনা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

* শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের উপর র‌্যাবপুলিশের হামলামামলানির্যাতন বন্ধ করা। “ইন্ডাস্ট্রিয়াল” পুলিশ বাতিল করা।

* সকল ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশী হস্তক্ষেপ ও দমননির্যাতন বন্ধ করা এবং এ ধরনের অপরাধকে শাস্তি যোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য করে তার বিচার করা। সর্বজনীন মৌলিক অধিকার পরিপন্থী সকল কালাকানুন বাতিল করা।

———————————-

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বাতিল করা একটি সাধু প্রস্তাব। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এটা কে করবে? যে রাষ্ট্র এই ধরণের কালাকানুন তৈরি করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় সেই নিপীড়ক রাষ্ট্রের কাছেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বাতিল করতে বলা একটি হাস্যকর ধরণের দাবি। নিশ্চয় করেই সাধারণ মানুষের একটি বিরাট অংশ এ সরাসরি ধরণের কালাকানুনের শিকার। তার পরও তাদের এই কালকানুন থেকে মুক্তি মিলছে না বা মিলবে বলে কোনো ভরসাও তারা পাচ্ছেন না। কেন? কারণ যে রাষ্ট্র এই কালাকানুন তৈরি করে সেই রাষ্ট্রটিকে বহাল তবিয়তে টিকিয়ে রেখে যে কোনো নিবর্তনমূলক আইন বাতিল করানো যায় না, এই সাদামাটা সত্যিটা আগে বোঝা দরকার। এখানে খোদ রাষ্ট্রটিই দ্বন্দ্বের প্রধান দিক। এই রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ এবং তার বিলোপসাধন দ্বন্দ্বের বিশিষ্টতা। এটা না বুঝে রাষ্ট্রের কাছে তার কালাকানুন বাতিল করার দাবি তোলার অর্থ শেয়ালের কাছে মুরগি গচ্ছিত রাখা! ‘ক্রসফায়ার’, গুমখুন এবং এ সকল কর্মকাণ্ড তখনই বন্ধ হবে যখন রাষ্ট্র তার জনসাধারণের কাছে নিজেকে নিরাপদ ভাববে। “ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ” কি দোষ করেছে? পুলিশ এমনই এক ব্যবস্থা, যা নিপীড়ক রাষ্ট্রের শক্তির প্রধান উৎস। রাষ্ট্র সেই উৎসকে বর্জন করবে কি করে? কেনই বা বর্জন করবে? সকল ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশি হস্তক্ষেপ ও দমননির্যাতন বন্ধ করা এবং এ ধরণের অপরাধকে আইনের আওতায় আনা? কোন আইন? এসব যে বেআইনি তা কি নতুন কিছু? পুলিশ তো আইনের আওতায়ই তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে! তাহলে কি পুলিশই তুলে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে? এটা কি কোনো মার্কসবাদী চিন্তাধারা প্রসূত দাবি হতে পারে? এই সব ছেলেমানুষী দিয়ে আর যাই হোক রাষ্ট্রের এক গাছি পশমও ছেড়া যায়না। যাবে না।

——————————–

. সকল প্রকার অবৈধ স্থাবরঅস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসা।

* অনুপার্জিত বা অবৈধভাবে অর্জিত সকল স্থাবরঅস্থাবর সম্পদ ও মূলধন রাষ্ট্র কর্তৃক অধিগ্রহণ করে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা।

* দেশে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা সরকার কর্তৃক শনাক্ত, উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করা এবং কালো টাকার মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

————————————

একটি বুর্জোয়া নিপীড়ক রাষ্ট্র কখনোই এই দাবি মানতে পারেনা। এই কর্মসূচী নিতে পারে কেবলমাত্র কোনো কল্যাণ রাষ্ট্র। সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণে যে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তার পক্ষেই স্থাবরঅস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া সম্ভব। আপনারা এখানেও সেই শেয়ালের কাছে মুরগি গচ্ছিত রেখে মুরগিকে নিরাপদ থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন!

———————————–

. দলীয়করণ, ঘুষদুর্নীতিঅনিয়ম এবং লুটপাট ও দখলদারিত্ব রোধ করা।

* বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রে দলীয়করণ বন্ধ করা। সকল ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি দেয়া।

* ঘুষদুর্নীতিঅনিয়মটেন্ডারবাজতোলাবাজদের শনাক্ত করে তাদের স্থাবরঅস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করাসহ বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

* অর্থ, পেশীশক্তি, ক্ষমতা ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্র সরকার তথা জনগণের সম্পদ যেমননদী, জমি, জলাভূমি, মাঠঘাট, প্রতিষ্ঠান দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

———————————-

এই সম্পূর্ণ দাবিটি হতে পারত একটি জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ জনগণের দাবি। অথচ নিপীড়ক একটি রাষ্ট্রের কাছে দাবিটি উত্থাপন করছে এমনই একটি গোষ্ঠি যারা নিপীড়ক রাষ্ট্রের বিলোপ সাধনের পরিবর্তে সেই রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রেখেই তার শাসকদের কাছে ইনিয়েবিনিয়ে দাবি জানাচ্ছে। আবার তারা সেই নিপীড়ক রাষ্ট্রের ক্ষমতার অংশীদারও হতে চাচ্ছে! যেখানে এই রাষ্ট্রে নির্বাচন মানেই পেশীশক্তিবলে ক্ষমতা দখল, সেখানে সেই পেশীশক্তিকেই বলা হচ্ছে পেশীশক্তি প্রদর্শন না করতে! কী হাস্যকর!

———————————-

. দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধ, খাদ্য পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট ও মধ্যসত্বভোগীর আধিপত্য বিলোপ, সমবায় ব্যবস্থার প্রসার, রেশনিং ব্যবস্থা ও ন্যায্য মূল্যের বিক্রয় কেন্দ্রসহ গণবন্টন ব্যবস্থা চালু করা ।

* উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানী নির্ভরতা কমিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা।

* খাদ্য পণ্যের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু করা।

* নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। খাদ্য দ্রব্যের বিশুদ্ধতা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে অধিক কার্যকর ও যুগোপযোগী করা।

* সিন্ডিকেট চক্র উচ্ছেদ এবং মধ্যসত্বভোগী প্রথা বিলোপ করা।

* রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ক্ষুদে কৃষি ও শিল্প উৎপাদকদের সমবায় ব্যবস্থা জোরদার করা ।

* গ্রাম ও শহরের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আর্মিপুলিশের রেটে রেশনিং ব্যবস্থার প্রচলন এবং সরকারি ন্যায্য মূল্যের বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা।

* শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের স্বার্থ রক্ষায় দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত গণবন্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

———————————-

সাধারণভাবে বলতে গেলে এই দাবিটি মাঝে মধ্যেই বুর্জোয়া শক্তিগুলো তাদের নিজেদের কাছেই করে। অর্থাৎ, দালাল বুর্জোয়া চক্রের ভেতরকার বেনিফিসিয়ারী বাদে ব্যাপক সাধারণ মানুষ যখন অত্যাচারিতনিপীড়ত হতে থাকে এবং সুবিধাভোগী অংশের তোলাবাজীতে অতিষ্ট হয়, তখন তারা নিজেদের শক্তির কাছেই ইনিয়েবিনিয়ে মিনতি জানায়। এই দাবিটি মানার জন্য রাষ্ট্রকে মিনতি জানানোর কিছু নেই। রাষ্ট্রের সুবিধাবঞ্চিত অংশই তা জানায়। জানাবে। যদিও শেষ পর্যন্ত জনগণের এই দাবি কোনো দিনই বাস্তবায়িত হয়নি। হবে না। এখানে এভাবে দাবি জানানোর একটিই অর্থ দাঁড়ায়। আর তা হচ্ছে বিবদমান এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিকেই সিপিবিবাসদ এর নেতারা নিজেদের পছন্দের রাষ্ট্র ভেবে বসে আছেন! শুধু তাই নয়, তারা নিজেদেরকে এই রাষ্ট্রের অংশীদারও ভেবে বসেছেন। কিন্তু এটা বিলক্ষণ জানেন যে, তারা পরিচালনা পর্ষদে নেই। তাই আইন জারি করা বা সেই আইনকে খানিকটা জনমুখি বা গণমুখি করার কাজটি নিজেরা করতে পারছেন না বলে ওপর সারির ক্ষমতাবনদের কাছে মিনতি পেশ করছেন।

———————————-

. ন্যায্য মুজরি এবং ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করে শ্রমজীবীদের অনুকূলে শ্রমনীতি ও শ্রম আইন প্রণয়ন করা।

* শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী সকল আইনকানুন, বিধিবিধান বাতিল করা। শিল্প ও শ্রমিক বান্ধব গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও শ্রমনীতি প্রণয়ন করা। আইএলও চার্টার পূর্ণ বাস্তবায়ন ও মালিকশ্রেণীশাসকশ্রেণীর প্রভাবমুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন সকল প্রতিষ্ঠানে বলবৎ ও কার্যকর করা।

* জাতীয় ন্যূনতম মজুরী ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা এবং বাজার দরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তা প্রতি বছর পুনঃনির্ধারণ করা। এ জন্য শ্রমিক কর্মচারীদের মধ্যে মহার্ঘ ভাতা চালু করা। সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ মজুরির অনুপাত ১:৫ নির্ধারণ করা।

* গার্মেন্টস শিল্পসহ সকল শিল্পকলকারখানায় ৮ ঘন্টা শ্রম দিবস চালু করা। দ্বিগুণ হারে মজুরি প্রদান স্বাপেক্ষে ওভারটাইম ২ ঘন্টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা।

*কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা বাধ্যতামূলক করা।

* গার্মেন্টস শিল্পসহ সকল ক্ষেত্রে মালিকপক্ষকে শ্রম আইন যথাযথভাবে মানতে বাধ্য করা এবং আইন ভঙ্গকারীদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

* কলকারখানার শ্রমিকদের উপর সরকার ও মালিকপক্ষের যৌথ হামলামামলা, ভয়ভীতি, হুমকি প্রদর্শন বন্ধ করা।

* অপ্রাতিষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা।

* বিধান অনুযায়ী মুনাফার ৫% শ্রমিক কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন নিশ্চিত করা।

———————————-

ন্যায্য মজুরি এবং ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করে শ্রমজীবীদের অনুকুলে শ্রমনীতি ও শ্রম আইন প্রণয়ন করা গেলে কি এই দাবির উপদাবিগুলো পেশ করার যুক্তি থাকে? একটি পুঁজিবাদী নিপীড়ক দালালশাসিত রাষ্ট্র কি করে শ্রমিকের কল্যাণে শ্রম আইন তৈরি করবে? আর যদি করতে পারেও তাহলে কি আর সেই রাষ্ট্র পুঁজিবাদের সেবা করতে পারবে? যেহেতু সিপিবিবাসদ নিজেদেরকে এই রাষ্ট্রের অংশীদার, ভাগিদার এবং বেনিফিসিয়ারী মনে করেন, সেহেতু তারা ‘নিজেদের’ রাষ্ট্রের কাছেই দাবিটি জানাচ্ছে। কিন্তু তারা বিলক্ষণ জানেন যে, এই দাবিটি বর্তমান রাষ্ট্রের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়, তাই যতটুকু সম্ভব ততটুকু যেন হয়, সেটা ভেবেই দাবি উত্থাপন করছেন। ট্রেড ইউনিয়ন কায়েম হলেই যদি অধিকাংশ অনাচারঅবিচার দূর হয় বা নিপীড়ননির্যাতন বন্ধ হয়ে এই সেক্টরে সুবাতাস বইতে থাকে তাহলে শুধুমাত্র ‘ট্রেড ইউনিয়ন করতে দিতে হবে’ বললেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। ট্রেড ইউনিয়নই যে শ্রমিকের কল্যাণে একমাত্র জিয়নকাঠি নয়, এই সাধারণ সত্যটিও সিপিবিবাসদ এর বন্ধুরা আমলে নিতে পারেননি। বরং তাদের এই দাবির চেয়ে আরো কার্যকর যুৎসই দাবি করতে পারে (এবং করেও) দালাল বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর শ্রমিক সংগঠনগুলি। এমনকি খোদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট বা তাদের সেবাদাসরাও হরহামেশা এই দাবি জানিয়ে আসছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর তথাকথিত মার্কসবাদী দলগুলোর কর্মসূচীতে কোনো অমিল পাওয়া যাচ্ছে না! এই কারণে এটা বলা অন্যায় নয় যে, এই দলদুটি কোনো না কোনোভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাস বা এর বেনিফিসিয়ারী। সাম্রাজ্যবাদও চায় যেন তেন উপায়ে একটা ট্রেড ইউনিয়ন গোছের কিছু থাকলেই হয়। তাতে শ্রমিকমালিক উভয় শ্রেণীর স্বার্থ হাসিল হতে পারে!

———————————-

. আমূল ভূমি সংস্কার করা। গ্রামশহর সর্বত্র জমির সিলিং করা। সারবীজসহ কৃষি উৎপাদন সহায়তা ও কৃষি পণ্যের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে কৃষি ভর্তুকি, ক্ষেতমজুরদের রেজিস্ট্রেশন করা, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করা। এনজিওঋণ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতার স্বার্থ সংরক্ষণ করা।

* ভূমি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন। পরিবার প্রতি সর্বোচ্চ জমির সিলিং: এক ফসলী৩০ বিঘা, দুই ফসলী২০ বিঘা ও তিন ফসলী১৫ বিঘা নির্ধারণ করা। সিলিং ঊর্ধ্ব জমি ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে সমবায়ের ভিত্তিতে বন্টন করা। ঢাকাচট্টগ্রাম শহরে পরিবার প্রতি ৫ কাঠা ও অন্যান্য শহরে ১০ কাঠা জমি সিলিং করা।

* অনুপস্থিত মালিকদের কৃষি জমি ও জলাভূমি সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করে প্রান্তিক কৃষক ও ভূমিহীনদের মধ্যে সমবায়ের মাধ্যমে বণ্টন করা।

* সরকারি খাস জমি ও জলাভূমি নদনদী চিহ্নিতকরণ এবং অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে মুক্ত করে ভূমিহীনদের মধ্যে বন্টন নিশ্চিত করা।

* কৃষকদের সার, ডিজেল, বীজ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ ইত্যাদি কৃষি উপকরণ ও সহায়তা ন্যায্যমূল্যে সময়মতো, পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে বিএডিসিকে শক্তিশালী করা।

* স্বল্পমূল্যে কৃষি সহায়তা ও ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং তা কৃষকের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা।

* কৃষি উপকরণের বেসরকারি/ ব্যাক্তিগত বাণিজ্য ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে রাষ্ট্রের আওতায় আনা।

* মধ্যসত্বভোগীদের দৌরাত্ব বন্ধে কৃষি পণ্যের বাজার সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং হাটে হাটে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র চালু করা।

* খোদ কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য ও লাভজনক মূল্যে ফসল ক্রয় করার ব্যবস্থা চালু করা।

* আবাদী জমির সংকোচন রোধ করা।

* ভেজাল ও নকল সার এবং নিম্নমানের বীজ ও কীটনাশক বিক্রেতা দেশীবিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

* ক্ষেতমজুরদের জন্য সারা বছরের কাজের নিশ্চয়তা বিধান। এ জন্য একশ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্প অব্যাহত রাখা এবং এ ধরনের সকল গ্রামীণ প্রকল্পের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণ বন্ধ করা।

* কৃষি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রদান এবং তাদের রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা।

* এনজিও ঋণের বোঝায় আক্রান্ত গ্রামীণ জনগণকে ঋণমুক্ত করার জন্য “খাইখালাসি”র ব্যবস্থা করা। এ জন্য এনজিও’র সুদ ১০%-এর মধ্যে সীমাবন্ধ রেখে চক্র বৃদ্ধি সুদের হার রোধ করা। ১০% হারে সরল সুদের হিসাবে আসল প্রদানকারী ঋণ গ্রহীতাকে ঋণমুক্ত ঘোষণা করা।

———————————-

এই ৮নং দাবিটি কোনো মার্কসবাদী দাবিদার দল বা জোট করতে পারে সেটা এই দলদুটির দাবিপ্রসবের আগে অনুমানেও আনা যেত না! ধন্যবাদ তাদের, যে এমন একটি দাবি তারা উত্থাপন করে নিজেদের ‘সাচ্চা মার্কসবাদী’ সাব্যস্ত করেছেন! আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে এরা বিবদমান বর্তমান রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রেখে শুধু নয়, এর বিকাশ সাধন করে, এই রাষ্ট্রকেই জনকল্যানের একমাত্র মাধ্যম মনে করছেন। এবং সেই মতে ইচ্ছেমাফিক রাষ্ট্রের কালাকানুনগুলোকে সহজপাচ্য করে সাধারণকে গেলাতে চাইছেন। সাধারণ গিলুক না গিলুক নিজেরা যে গিলেছেন তা তাদের তৃপ্তির ঢেকুর তোলা দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে। আপাদমস্তক হিপোক্র্যাসিতে আক্রান্ত এই বিশাল দাবিনামার অন্যতম এই আট নম্বর দাবিটি গুরুত্ব বহন করে বলে এটা পার্ট বাই পার্ট আলোচনা করা হচ্ছে:

* পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কখনো আমূল ভূমিসংস্কার করেনা। করতে পারেনা। যদিও বা করে, তা করবে তার স্বার্থ অটুট রেখে। সেই স্বার্থ হচ্ছে ভূমি মালিকের স্বার্থ।

* সিলিং প্রথার সহজ অর্থ হচ্ছেক্ষমতাবানের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। যার ভূমি আছে তাকেই সিলিংয়ের আওতায় আনা হতে পারে, কিন্তু যার জমি নেই সিলিংয়ে তার কি লাভ? দেশে এখন কমবেশী সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি বেকার। এই বিশাল বেকার শ্রেণী যাদের অধিকাংশই খণ্ডকালিন ক্ষেতমজুর, তারা সিলিংয়ে কি পাবে? সিলিং তো শেখ মুজিব একবার করেছিল। ২০ বিঘা জমির খাজনাও মওকুফ করেছিল। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কি তা ধরে রাখতে পেরেছিল? না পারে?

* অনুপস্থিত মালিক বলতে কি বোঝানো হচ্ছে? এতটুকু একটি দেশে ত্বরিত যোগাযোগের উপায় থাকাকালীন অনুপস্থিত মালিক বলে কি কিছু থাকে, না থাকতে পারে? আর তার জমিই বা কি করে সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারে?

* সরকারি খাস জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করবে কে? সরকার? কোন সরকার? ভূমিহীনদের মাঝে বিতরণের জন্য যে সমবায় সংস্থা গড়ে তোলা হয়েছে তা কারা চালায়? সরকারেরই কর্মচারী। সেই কর্মচারী কার স্বার্থ দেখবে? সরকারেরই। তাহলে সমবায় করতে পারলেই মোক্ষলাভ হবে, এই অসার ধারণা কি করে আসে?

* কৃষকদের কাছে সার কীটনাশক, বীজ, কৃষি উপকরণ স্বল্প মূল্যে এবং সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার জন্য বিএডিসিকে শক্তিশালী করার কথা বলে কি বোঝানো হলো? বিএডিসি কি বৈপ্লবীক কোনো সংস্থা? এরা কি শ্রমিককৃষকের স্বার্থরক্ষাকারী কেউ? ধরা যাক, বিএডিসি এই দল দুটির আহ্বানে সাড়া দিয়ে সার, কীটনাশক, বীজ, কৃষি উপকরণ নিয়ে হাজির হলো। কিন্তু কার কাছে? যার এসব প্রয়োজন হবে তার কাছেই তো? অর্থাৎ, কিছু পরিমানে জমি যার আছে তার কাছে বিএডিসি যাবে। তাহলে ওই সাড়ে চার কোটি থেকে পাঁচ কোটি ভূমিহীনের কি উপায় হবে? সে সার, বীজ, কৃষি উপকরণ দিয়ে কি করবে?

* কৃষিতে ভর্তুকিও তো সেই জমিঅলাদের জন্য। যার জমি নেই তাকে ভর্তুকি দেবে কে? তাকে ভর্তুকি পাইয়ে দেবার উপায় কি? সুতরাং ধরে নেয়া যায় যে, এই দল দুটি বা জোট যাই পরিকল্পনা করছে তা ধনী, মাঝারি কৃষক বা কিছু পরিমানে জমি আছে এমন কৃষকের কথা মাথায় রেখেই করছে। তাহলে আমরা সহজেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, এরা কোনো ভাবেই ক্ষেতমজুর বা ভূমিহীনদের স্বার্থ রক্ষাকারী নয়।

* আপনাদের কথামতো কৃষি উপকরণের বাণিজ্য রাষ্ট্রের হাতে যেটুকু আছে তা কি কৃষকের রক্ষাকবজ? যদি তা হয় তাহলে বিএডিসি’র মত সংস্থা আরো ডজন ডজন গড়ে উঠুক। তাতে কৃষকেরই লাভ, কিন্তু তা কি হয়েছে, না হবে? বিএডিসিও বাণিজ্য করে। মুনাফা করে।

* আপনাদের দাবি জানাবার আগেই তো সরকার হাটে হাটে ক্রয়কেন্দ্র চালু করেছে! অর্থাৎ, কোনো না কোনো ফর্মে সরকার এবং এশটাবলিশমেন্ট আপনাদের চেয়েও গোঁড়া মার্কসবাদী! তবে সমস্যা হচ্ছেহাটে হাটে সরকারী সেই ক্রয়কেন্দ্রগুলো কৃষকের উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ফসল কেনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। আর তার ফলে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে উৎপাদিত পণ্য রাস্তায় ফেলে আসে, আগুণ ধরিয়ে দেয়।

* আবাদি জমির সংকোচন দূর করা কি ভাবে সম্ভব? প্রতি বছর লোক সংখ্যা বাড়ছে, এবং সেই সাথে বাড়ছে আবাদি জমিতে বসবাসের জন্য দখলিকরণ। এটা থামাতে পারে বসবাসের আধুনিকায়ন বা বসবাসের বহুমুখীকরণ। যা পারে কেবল মাত্র একটি জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

* ভেজাল ও নকল সার এবং বীজ ব্যবহার বন্ধ করার দাবি না জানিয়ে ক্ষতিপুরণের দাবি জানানোর অর্থই হলো অন্যায়অবিচার চলার পক্ষে ওকালতি করা। ক্ষতিপুরণের প্রশ্ন তখনই আসে যখন ‘ক্ষতি’ মেনে নেয়ার ইচ্ছে জাগরুক থাকে!

* ক্ষেতমজুরদের জন্য সারা বছর কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে উৎপাদন উপায় এবং উৎপাদন সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন। সেটা যেহেতু নিপীড়ক বুর্জোয়াশ্রেণী এবং তাদের রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয় সেহেতু ক্ষেতমজুরদের সারা বছর কাজের সুযোগ নেই। হবে না। আর হবেনা বলেই এই শ্রেণীটি বিপ্লবের সম্পূরক শক্তি হয়ে উঠতে পারে (যদিও সিপিবিবাসদ তা চায় না)

* কৃষি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন! এই আহম্মকী দাবিটি প্রমাণ করে সিপিবিবাসদ মার্কসবাদী তো নয়ই বরং কৃষিতে বৃহৎ পুঁজির ফেরিঅলা এবং চূড়ান্ত বিচারে পুঁজিবাদের দালাল! যে দেশে ক্ষেতমজুরকে কৃষি শ্রমিকই বলা হচ্ছে না, সে দেশে সেই কৃষি শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন চাওয়া অর্থ কি এটা নয় যে, কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির আগমন ঘটুক, সেই পুঁজি কৃষিকে গ্রাস করুক, ছোট ছোট জমির মালিক সেই পুঁজিতে বিলীন হোক, ভূমিহীন হোক এবং শেষ পর্যন্ত আক্ষরিক অর্থে কৃষি শ্রমিক হিসেবে বড় বড় কৃষি পুঁজির হাতে দাস হোক। এবং তখন তাদের ‘অধিকার’ আদায়ের জন্য বার্গেনিং অথোরিটি বা ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠুক! এ তো ‘ভাসুরকে’ উচ্ছেদ তো নয়ই বরং ভাসুরের নাম নিতেও লজ্জা!

* এনজিও ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত করার জন্য খাইখালাসির ব্যবস্থা! এ জন্য এনজিও’র সুদ ১০% এ সীমাবদ্ধ রেখে চক্রবৃদ্ধি সুদের হার রোধ করা! তার মানে এনজিও কর্মকাণ্ডকে আপনারা বৈধতা দিচ্ছেন? এনজিও চালু থাকুক, কিন্তু তাদের দেয়া ঋণ যেন ১০% সুদের হার অতিক্রম না করে? হা হোতষ্মি! একটি মার্কসবাদী দাবিদার জোট বা দল এনজিও’র মত নব্য নীলকরের শোষণকে বৈধতা দিচ্ছে! এনজিও ব্যবস্থা এমনই এক ব্যবস্থা যে ভূমিহীনের বিদ্রোহ করার সম্ভবনাকে ঋণের জালে হত্যা করে। যা ক্ষুদে কৃষক, ভূমিহীন এবং ক্ষেতমজুরকে ধর্মীয় ধাপ্পাবাজীর আফিমের মত নেশা করিয়ে বিবশ রাখে। যা ভূমিহীন কৃষক এবং ক্ষেতমজুরের বিদ্রোহবিপ্লব সম্ভাবনাকে ঘুম পাড়িয়ে পরমুখাপেক্ষী করে রাখে;সেই এনজিও’কে আপনারা বহাল তবিয়তে ছড়ি ঘোরানোর অধিকার দিয়ে তাদের সুদ কমানোর মামাবাড়ির দাবি জানাচ্ছেন! সুদ এবং ব্যাংক ব্যবস্থা যে নিয়ম মেনে চলে তার অন্যতম হচ্ছে সুদ এবং সুদের চক্রবৃদ্ধি। সুদ খেতে দেবেন, কিন্তু তা যেন ১০% এর উপর না যায়! মার্কসলেনিনের কোন কিতাবে লেখা আছে যে এনজিও বিরোধীতা করা পাপ? যদি তা না থাকে তাহলে এনজিও নির্মূলের কর্মসূচী নেই কেন? সত্তরের দশকে যখন এদেশে এনজিও দোকানগুলো বসতে শুরু করে সে সময় আপনাদের দলের (সিপিবি’র) শত শত ‘পরীক্ষিত’ কর্মী দলে দলে এনজিও দোকানগুলো আলোকিত করেছিল। তারা তাদের মগজ ভাড়ায় খাটিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে ভূমিহীনের, ক্ষেতজুরের আজন্ম ক্ষোভকে লোভলালসা আর প্রলোভনে শান্ত করে তার বিপ্লবী আকাংখার কবর দেয়া যায়। সেইসব তালেবর নেতাকর্মীদের ‘ঐকান্তিক’ চেষ্টায় বিদেশি এনজিওর টাকায় দেশি মালিকরা বড় বড় এনজিও দোকান খুলে বসেছিল। সেই দোকানগুলো এখন রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা অর্জন করেছে।

বিনামূল্যে রাতকানা রোগের ক্যাপসুল আর ভিটামিন বিতরণ করতে করতে করতে তারা এখন বাণিজ্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে বাণিজ্য বেসাতি গড়ে তোলেনি। সত্তরের দশকের সেই সব এনজিও ফর্মূলা আরো পরে এসে এমএলএম বাণিজ্যে টার্মিনেট হয়ে একেবারে নিঃস্ব ভূমিহীনের ঘরে ঢুকে গেছে। তাদের সুদের মরণ খাই মেটাতে প্রায় গিলে ফেলা খাবারও মুখ থেকে টেনে বের করা হচ্ছে। তাদের ঋণের দায় শোধ করতে প্রতি বছর অনেককে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হচ্ছে। সেই সব অসহায় দরিদ্র মানুষের বাঁচার উপায় করার জন্য আর এক সওদাগরি কারবারি প্রফেসর থেকে বিশ্ব সুদখোর হয়েও নোবেল পুরষ্কার বগলদাবা করেছে। এই নব্য নীলকর হার্মাদদের আধুনিক শোষণেরযাঁতাকলে পিষ্ট ভূমিহীন, ক্ষেতমজুর বিদ্রোহ দূরের কথা, টু শব্দ করতে পারছে না। অথচ এ দেশের প্রাচীনতম এবং ‘ঐতিহ্যবাহী’ বামপন্থী দলটি আর একটি জগাখিচুরি বামমনষ্ক দলের সাথে ঘোট পাকিয়ে সেই হার্মাদ দস্যু এনজিওদের সাফাই গাইছে! মিন মিন করে ১০% সুদ নিতে বলছে! অতঃপর বাজারে চালু সেই সন্দেহটিকে এই বেলা সত্য বলে মনে করাই যায়। সিপিবিবাসদ এখন আর কোনো বামপন্থী দল নয়, এরা আর দুধশটা এনজিওর থেকে আরো পরিশীলিত আরো সুদাকাঙ্খা সম্পন্ন এনজিও বিশেষ!

———————————-

. গ্যাসবিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা, যানজট রোধ, বাসস্থান সংকট দূরী করা এবং রেলনৌ পথ সম্প্রসারণসহ গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা।

* গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করে গণসরবরাহ ব্যবস্থা বৃদ্ধি করা। এ জন্য ব্যয়বহুল/বেশি দামের দেশীবিদেশীরেন্টালকুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বদলে গ্যাস ভিত্তিক বৃহদাকার সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা।

* গ্রামে ও শহরে জনগণের সমবায়ী অংশিদারীত্বে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনসহ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা।

* কলকারখানা ও কৃষি সেচের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

* অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিবেচনা করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি না করে বরং ভর্তুকির মাধ্যমে ব্যয় সাশ্রয় ও সিষ্টেম লস রোধের মাধ্যমে জনগণের নাগালের মধ্যে রাখা।

* সরকারিভাবে নতুন নতুন প্লান্ট তৈরি ঢাকাসহ সারা দেশের বিশুদ্ধ পানীয় জল নিশ্চিত করে পানি ব্যবসা বন্ধ করা।

* ঢাকাসহ সমস্ত শহর অঞ্চল ও গ্রামে স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু করা এবং রাজধানীসহ শহর অঞ্চলে সরকারি উদ্যোগে গণশৌচাগার স্থাপন করা।

* রাজধানীসহ বড় বড় শহরে যানজট নিরসনে দ্রুত কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ লক্ষ্যে ঢাকায় মেট্টো রেল, ইলেকট্রিক ট্রেন এবং দ্বিতল বাস চালু করা। ঢাকার পাশ্ববর্তী সকল জেলার সাথে ট্রেন চালু করা।

* প্রাইভেট কার আমদানি সংকোচন করে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা।

* দেশের রেলপথগুলির উন্নতি সাধন ও নতুন রেল পথ স্থাপন এবং রেলইঞ্জিন ও বগিসহ রেল কর্মচারির সংখ্যা বৃদ্ধি করা। সারা দেশে নৌপরিবহন ব্যবস্থা বৃদ্ধি ও উন্নত করা।

* দুর্নীতিমুক্ত করে বিআরটিসিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে দক্ষ পরিচালনায় গণপরিবহণে রূপন্তর করা।

———————————-

এই দাবি এবং উপ দাবিসমূহ মেনে নিয়ে বাস্তবায়নের সাথে সাথে এই দেশটির আনাচেকানাচে দুধের নহর বয়ে যাবে! দেশটির উত্তরদক্ষিণে হিমালয়ের সমান ক্ষীরের পাহাড় খাড়া হয়ে যাবে! এবং দেশটির সাংবিধানিক পরিচয় হবে সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং ক্রমশঃ কমিউনিজমে ধাবিত! মোটা দাগে বলতে গেলে বলতে হবে শুধু বাংলাদেশ নয়, এ ধরণের জগাখিচুড়িমার্কা খানিকটা বুর্জোয়া, খানিকটা পুঁজিবাদী এবং খানিকটা সামন্তবাদী দেশের ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের পক্ষে কস্মিন কালেও এই দাবিটি মেনে নেয়া সম্ভব নয়। দাবি উত্থাপনকারীদের দাবিনামার আকারআয়তন দেখে মনে হতেই পারে যে দেশটিতে সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতাসীন কিন্তু কোনো কারণে সেই সরকার ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে দেখে ‘জাতির বিবেকরা’ তাদের প্রিয় সরকারের কাছে কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি দিয়ে জনকল্যাণে ব্রতী হতে পরামর্শ দিচ্ছে!

———————————-

১০. রাষ্ট্রীয় খরচে সকলের জন্য বৈষম্যহীন শিক্ষা এবং সকল নাগরিকের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা।

* সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, সেক্যুলার, বৈষম্যহীন, গণমুখী ও একই পদ্ধতির গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলন।

* বেসরকারি স্কুলকলেজ শিক্ষকদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধাসহ সকল ন্যায্য দাবিদাওয়া পূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ।

* বিনামূল্যে সবার জন্য মানসম্পন্ন বাধ্যতামূলক মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এক বেলা খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করা।

* প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, বেতন ও অন্যান্য ফিসহ তাদের সামগ্রিক শিক্ষা পদ্ধতিটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা।

* কোচিং ও নোট বই ব্যবসা বন্ধ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই উপযুক্ত শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা।

* সকল শিক্ষার্থীর যানবাহনে ভাড়া কনশেসন করা।

* সকলের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গণমুখীবৈষম্যহীন স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচি শক্তিশালী করা।

* বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ও মেডিকেল কলেজগুলোকে মান সম্পন্ন দায়বন্ধ ও জবাবদিহিতামূলক করার জন্য সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

* স্বাস্থ্যখাতে ডাক্তার নার্স ও টেকনিশিয়ানসহ দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি ও উন্নত করা।

* যেকোন ধরণের অপচিকিৎসা সংক্রান্ত অপরাধকে আইনের আওতায় আনা।

* নকল ও ভেজাল ঔষধ বিক্রি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

* সরকারি হাসপাতালে দরিদ্র সাধারণ রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ঔষধসহ চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

* জীবন রক্ষাকারী ঔষধের দাম সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করা।

* সরকারি বিশেষায়ীত হাসপাতালগুলির স্বাস্থ্য সেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা।

———————————-

ইউরোপের কয়েকটি ওয়েলফেয়ার স্টেট আর গুটিকয় সমাজতান্ত্রিক দেশে ছাড়া এই কর্মসূচী আর কোনো দেশে নেই। কিন্তু এখানে অর্থাৎ, এই বাংলাদেশে যদি তর্কের খাতিরে সরকার এই আব্দারটি মেনেও নেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে বৈষম্যহীন শিক্ষা জিনিসটা কি? ঢাকাসহ দেশের ধনিক শ্রেণী কি সরকারের খরচে পড়ার জন্য বসে থাকবে? নাকি নিজের ট্যাকের জোরে দেশেবিদেশে চড়ামূল্যে উচ্চতর এবং একসেপ্শনাল শিক্ষার জন্য ছুঁটবে? এখন যদি বিণীত প্রশ্ন রাখা হয়কমরেড, ধরে নিন আপনারা কোনো এক ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতাবলে কিংবা আলাদীনের চেরাগের বদৌলতে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলেন, তখনও কি এই দাবি পূরণ করতে পারবেন? সত্যিকারের গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র মানে এটা নয় যে ঘরে বসে বসে হাত বাড়িয়ে এটা সেটা টুক করে পেড়ে এনে মুখে পুরে দেয়া যাবে! সমাজতন্ত্র মানে এটাও নয় যে সমাজে বিদ্যমান সকল শ্রেণীর ভেতরকার আন্তঃসংঘাত নিমিষেই বিলীন হয়ে যাবে! যত দিন সমাজে শ্রেণীর এবং শ্রেণীবৈষম্যের কারণে শ্রেণী সংগ্রাম থাকবে ততদিন সকল শ্রেণীর জন্য একই ধরণের কোনো টেম্পলেট তত্ত্ব কাজে আসবে না। দেখতেশুনতে ভালো লাগে এমন দাবি উত্থাপন করে দিলেই জনদরদী বা জনহিতৈষী হওয়া যায় না। যাবে না।

———————————-

১১. জাতীয় স্বার্থে জাতীয় সম্পদ অনুসন্ধান, সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা।

* জাতীয় সম্পদ তেলগ্যাস ও কয়লাএসব জাতীয় সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন, বিক্রি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল চুক্তি বাতিল করা।

* তেলগ্যাসসহ সকল জাতীয় সম্পদের উপর শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা।

* জাতীয় সম্পদের উপর দেশীবিদেশী অপশক্তির দখলদারিত্ব ও লুটপাটের সব ধরণের অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র বন্ধ করা।

* জাতীয় উন্নয়ের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ও নিয়ন্ত্রণে তেলগ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধান, উত্তোলন ও ব্যবহার নিশ্চিত করা।

* জাতীয় সংস্থা বাপেক্সপেট্রোবাংলাকে শক্তিশালী করতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও জাতীয় সক্ষমতা অর্জন করা।

———————————-

হ্যাঁ, এই দাবিটি ইচ্ছে করলে একটি বুর্জোয়া রাষ্ট্রও পালন করতে পারে। এ জন্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে হয়না। কিন্তু আপনাদের গত এক যুগের অভিজ্ঞতা কি বলে? জনগণের জন্য অশ্রু বিসর্যনের চোটে গঙ্গা বইয়ে দেয়া শাসকশ্রেণীর কাছ থেকে কি এক চিলতে দাবিও আদায় করা গেছে? এক ইঞ্চি পরিমাণে হটানো গেছে সরকারের বিধ্বংসী পরিকল্পনা থেকে? এর সহজ উত্তর হচ্ছে “না”। তাহলে কেন আপনাদের এক যুগ বয়সী পরিপক্ক আন্দোলনের পরও সরকারের দেশদ্রোহী সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে এক চুলও সরানো যায়নি? কারণ আপনারা এই আন্দোলনটিকে একটি নির্দিষ্ট স্তরে নিয়েই বিক্রি করে দিয়েছেন। কয়েক জন মানুষের নেতা হিসেবে এককভাবে টিকে থাকার এজমালি বাসনা এবং নেতৃত্বলোভের বলি হয়েছে জাতীয় তেলগ্যাসবন্দর রক্ষা আন্দোলন। এ আন্দোলনটি এখন এমন এক ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে এই আন্দোলনকে আর এক পাও এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। এবং সেই ‘অসম্ভব’ অবস্থানটি আপনাদেরই সৃষ্ট।

———————————-

১২. জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকরা

* জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত নিরাপত্তা ও অংশিদারিত্ব চুক্তি, হানা চুক্তি, পিস কোর, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত চুক্তি, তথ্য বিনিময় চুক্তি, পিআইএসসিএস (PISCS) চুক্তি ইত্যাদি জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী সকল চুক্তি বাতিল এবং টিফা (TIFA) চুক্তি সোফা (SOFA) চুক্তি করার পাঁয়তারা বন্ধ করা।

* বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং সংসদে পেশ করা। দেশের স্বার্থবিরোধী সকল চুক্তি বাতিল কর।

* ট্রানজিট, বিভিন্ন নদীর পানি বন্টন, অভিন্ন নদী শাসন এবং টিপাইমুখসহ বিভিন্ন বাধ নির্মাণ সম্পর্কিত চুক্তি/সমঝোতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা এবং এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

* সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক মানুষ হত্যা বন্ধের জন্য অবিলম্বে প্রযোজনীয় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা।

* সার্কভুক্ত দেশসমূহের জনগণের সঙ্গে দারিদ্র দূরীকরণ, টেকসই উন্নয়ন ও সাম্রাজ্যবাদী চাপ মোকাবেলা করার ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

* জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।

———————————-

জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এমনিতেই রক্ষিত আছে। ওটা কেউ লুট করে নিচ্ছে না। তবে যে সব চুক্তির কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তা করার পাঁয়তারা হচ্ছে কোথায়? চুক্তি তো হয়েই আছে। কেন, সোফা, হানা, পিআইএসসিএস যে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেটা কি আপনারা দেখেননি? একমাত্র সোফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই এই দেশটি আমেরিকার কলোনী হয়ে আছে। সেই কলোনীতে বসে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সফেদ পতাকা ওড়ানো যায় বটে, কিন্তু তাতে করে সার্বভৌমত্ব কথাটা স্টাবলিশ হয় না। মার্শাল টিটো, ইন্দিরা গান্ধী, আনোয়ার সাদত মারা যাবার পর জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি বলে কিছু আছে কি? হয়ত ফি বছর বিশ্বের এখানেওখানে জোটনিরপেক্ষ দেশসমূহের (যা প্রকারন্তরে কমনওয়েলথভুক্ত) বৈঠক টৈঠক হয় বটে, তবে তা ওই বৈঠক পর্যন্তই, ন্যাটো বা জি৮ এর রক্তচক্ষুর সামনে তাকে মিনি বেড়াল হয়েই থাকতে হয়!

———————————-

১৩. রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সর্ব ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা।

* সমাজ ও পরিবারের সকল ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনকানুন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

* জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল নারী পুরুষের জন্য অভিন্ন বা একক পারিবারিক আইন প্রণয়ন এবং সম্পদের উত্তোরাধিকারে নারীপুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়ন করা।

* সিডও সহ নারী অধিকার সংক্রান্ত সকল আন্তর্জাতিক সনদ জাতীয়ভাবে পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা।

* পারিবারিক নির্যাতন দমন আইনসহ নারী নির্যাতন বিরোধী সকল আইনকানুন আরো উন্নত করা।

* প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নারী শিক্ষার মান আরো উন্নত করা, ছাত্রী ঝরে পড়ার হার রোধ এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাসহ উচ্চ শিক্ষায় নারীর হার বৃদ্ধি করা।

* শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার রোধ করতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নত করা।

* জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারে নারীর আসন বৃদ্ধি, সরাসরি নির্বাচন এবং তাদের হাতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান।

* সরকারিবেসরকারি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারীর জন্য সুযোগসুবিধা সম্প্রসারণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

———————————-

আপনাদের এই দাবিটি বিনা তর্কে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেয়া যায়। এই দাবিটি এখন অর্থাৎ, বুর্জোয়া রাষ্ট্রে বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমানভাবে বহালের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। আর সে কারণে এই দাবিটি নিয়ে কোনোই সমালোচনা উঠছে না।

———————————-

১৪. আদিবাসি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান ও তাদের ন্যায্য অধিকার এবং ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ সাধন করা।

* আদিবাসি ও ক্ষুদ্র সকল জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

*ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

* বিভিন্ন আদিবাসি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসসহ সকল প্রকার শোষণ নির্যাতন বন্ধ করা।

* আদিবাসি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্ব স্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের সংস্কৃতিক বৈচিত্রতা রক্ষায় কর্যাকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

* অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

———————————-

এই দাবি এবং উপদাবিসমূহও বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা বা সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় জারি রাখতে হবে। সমাজতন্ত্র বা জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সত্যিকারের গণতন্ত্র কায়েম হওয়ার পরও এই দাবিসমূহ উপেক্ষিত হতে পারে, বিকৃত হতে পারে। তাই এই দাবি বিষয়েও কোনো বক্রোক্তি উঠতে পারেনা। উঠছে না। কিন্তু আমরা এটা বিলক্ষণ জানি যে, জনগণের রাষ্ট্র কায়েম হওয়ার আগে এটা কোনো সরকার বা কোনো ইজমই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। পারছে না।

———————————-

১৫. প্রকৃতি ও পরিবেশের বিপর্যয় রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করা।

* প্রকৃতি ও পরিবেশের দুষণ ও বিপর্যয় রোধকল্পে পানি দুষণ, বায়ু দুষণ, ভূমি দুষণ, শব্দ দুষণ ইত্যাদি সকল দুষণ রোধকল্পে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

* বৃক্ষ নিধন, নদীজলাশয়, খালবিল ভরাট ইত্যাদির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

* কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করা এবং জৈব চাষ এবং সমন্বিত বালাই দমন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা।

* কৃষিতে হাইব্রিড, বন্ধ্যা বীজ ও জৈব প্রযুক্তির ক্ষতিকর ব্যবহার বন্ধ করা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

* খরা, বন্যা, নদীভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

———————————-

আপনাদের এই দাবিটির সাথেও আমরা জনতার কাতার থেকে একমত।

আমরা জানি, বর্তমান লুটেরা পুঁজি তার প্রভুর নির্দেশে কৃষিতে পুঁজির অনুপ্রবেশের পাশাপাশি কৃষিকে কুক্ষিগত করে কৃষির একচেটিয়াকরণ করছে, করতেই থাকবে। সুতরাং নিপীড়ক রাষ্ট্র এবং সেই রাষ্ট্রের দালাল শাসকদের উচ্ছেদ ছাড়া এই দাবিটিও অন্য কোনো আবেগ দিয়ে বাস্তবায়ন হবে না। তার জন্য যে ঐকান্তিক সদিচ্ছা, ধনুর্ভঙ্গ পণ, লাগাতার শ্রেণী সংগ্রামের আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়া শ্রমিকশ্রেণীর পরিচালনায় ব্যাপক ভূমিহীন কৃষক তথা ক্ষেতমজুরদের জোটই পারে বলপূর্বক বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ করে জনগণের রাষ্ট্র কায়েম করতে। সেই রাষ্ট্র কায়েম হলে এমন আবেগসর্বস্ব ইউটোপীয় দাবিনামা পেশ করার আবশ্যকতা থাকে না। রাষ্ট্রের চরিত্র এবং তার নীতিআদর্শ বলে রাষ্ট্রই অনেক ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করে। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, আপনাদের এইসব ভালোমানুষী কথাবার্তা আর জনগণের সামনে একের পর এক মূলো ঝুলিয়ে রাখার পরবর্তী স্তর হচ্ছে শেষ পর্যন্ত লুটেরা দালাল বুর্জোয়া সামন্ত দাস এবং সাম্রাজ্যবাদী লেজুর শাসক শ্রেণীর কাছেই ইনিয়েবিনিয়ে এইসব দাবি উত্থাপন করেন এবং যথারীতি তারা যখন এর এক কানা কড়িও মূল্য দেয়না তখন আবার আন্দোলন সংগ্রামের হুমকি দিয়ে দল চাঙ্গা করার চিরাচরিত পদ্ধতিতে আকণ্ঠ ডুব দেন! তারও পর এইসব ছেলে ভুলোনো মায়া মরিচিকা দিয়ে আরো কিছুদিন নির্বিঘ্নে পার করে দেয়া যায়। আর সেই কাজটিই গত অর্ধশতাব্দী ধরে আপনারা নিখুঁত নিপূণতায় করে আসছেন। এবার কি ব্যতিক্রম কিছু হবে? হতে পারে? আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি জেনেছি, “না”, ব্যতিক্রম কিছুই হবেনা। শেষ পর্যন্তও হবে না। যা হবে, যা হয়ে আসছে, তাকে বক্র ভাষায় বলা চলে– “থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়!”

————————————————

এই আলোচনার প্রেক্ষিতে এই কথা স্পষ্টতই বলা চলেবৈরী রাষ্ট্রের নিপীড়ক শাসকের কাছে সিপিবিবাসদ এর এই দাবিনামা উত্থাপন, শেয়ালের কাছে মুরগী গচ্ছিত রাখার উপাখ্যান ভিন্ন কিছু নয়!!

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s