লিখেছেন: আহমদ জসিম

এম এম আকাশ

এম এম আকাশ

সমাজতন্ত্র যেমন শ্রমদাসত্ব থেকে মুক্তির সনদ, তদরূপ বিশ্বাসঘাতকদের ভাল মুখোশও হতে পারে! আমাদের সামনে মুসোলিনী কিংবা হিটলারের নাম যেমন আছে তদরূপ একেবারে দেশীয় অভিজ্ঞতায় আছে শেখ মুজিবের নামও। এই মুখোশদারি প্রতারকদের ইতিহাস কোন এক সময়ের কোন এক ব্যক্তির ইতিহাস নয়। এটা চলমান প্রক্রিয়া।

শ্রমিকশ্রেণীর নামধারী যেসব দল আদপে বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করে, যারা কৌশল হিসেবে নয় বরং নীতি হিসেবে নির্বাচন করে, ক্ষমতার হালুয়ারুটি ভাগের জন্য বুর্জোয়া দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে এবং মুখে শ্রমিকশ্রেণীর কথা বলে তাদেরকে চিহ্নিত করা আজ আমাদের সামনে কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনই এক বিশ্বাসঘাতকতার নমুনা আমরা দেখলাম গত ১৩ জুলাই প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের সংগ্রাম নিয়ে, জনাব এম এম আকাশের ‘ন্যায্য মজুরি দিয়েও শিল্পের বিকাশ সম্ভব’ শিরোনামের কলামে।

আকাশ সাহেবের লেখা নিয়ে সুবিস্তারিত বলার পূর্বে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কিছু বলাটা জরুরী মনে করছি। এম এম, আকাশ এদেশের প্রাচীনতম বাম নামধারী সুবিধাবাদী দল, সিপিবির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তার দলের এই দেশের শ্রমিকশ্রেণীর চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস সর্বজন জ্ঞাত। আপাত দৃষ্টিতে প্রগতিশীলতার কথা বলে চরম ফ্যাসিবাদী বুর্জোয়া দল আওয়ামীলীগের লেজুড়বৃত্তি, সমাজতন্ত্রের নামে শেখ মুজিবের একদলীয় শাসন বাকশালে নিজেদের বিলোপ করা এবং এই ধারায় সর্বশেষ উদাহরণ, ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের বর্তমান যুদ্ধাপরাধের বিচার (শাসকশ্রেণী যার রিমিক্স নাম দিয়েছে “মানবতা বিরোধী অপরাধ”, যেহেতু যুদ্ধাপরাধের বিচার তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়) নামক প্রহসনের সাথে নিজেকে যুক্ত করা। সেই দলেরই গুরুত্বপূর্ণ নেতা এম এম আকাশ।

তার আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে লেখা, যে লেখার শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে কোন এনজিও প্রতিনিধি যিনি শ্রমিকদের জন্য মালিক পক্ষ থেকে কিছু সুবিধা আদায়ে জন্য দরকষাকষি করছে, অথচ পুরো লেখাটা পড়লে আমরা দেখতে পাবো, এর পরতে পরতে শ্রমিকশ্রেণীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার নজির। যার অদ্ভুত মিল সরকারের ভাষ্য আর বুর্জোয়াদের পোষা সুশীল বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার সাথে। আমরা এবার তার লেখাটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারি।

তিনি লেখাটার সূচনা করেছেন হামিম গ্রুপএর শ্রমিক বিদ্রোহ, যা পরবর্তিতে সমগ্র আশুলিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে সেখান থেকে। তারপর ২০০৮ সালের শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে ছোট একটা গতানুগতিক বিবরণ এবং শেষে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ তথ্য দিয়ে। তার মতে, ২০০৯ সালে এক হাজার ৬৬০টাকা থেকে মজুরি ৮১ শতাংশ বাড়িয়ে করা হলো তিন হাজার টাকা, শ্রমিকদের দাবি ছিল পাঁচ হাজার টাকা। তিন হাজার টাকা বাড়ানো নিয়ে শ্রমিকদের ক্ষোভ থাকলেও তারা তা মেনে নিয়েছিল। কি বিস্ময়কর তথ্য! তিন বছর আগের ইতিহাস আকাশ সাহেব ভুলে গেলেও শ্রমিকরা ভুলেনি, ভুলেনি এদেশের বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতাকর্মীরাও। এই মজুরি কী শ্রমিকরা মেনেছিলেন? নাকি তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মালিক, সরকার আর শ্রমিক প্রতিনিধি নামে যাদের সাথে চুক্তি নামক প্রহসন করা হয়েছিল, সেই চুক্তিতে শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে কারা প্রতিনিধিত্ব করেছে? সেই চুক্তিতে প্রতিনিধি হিসেবে এম এম আকাশের পার্টির মন্টু ঘোষও তো ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছে সেই কমরেড মোশরাফা মিশু, কমরেড মাহাবুবু রহমান ইসমাইল কিংবা মন্টু ঘোষদের বাইরে রেখে সরকারমালিকশ্রেণী কারসাজি করে রাতারাতি ভুইঁফোড় কিছুলোককে শ্রমিক নেতা সাজিয়ে যাদের সাথে চুক্তি করেছে, তাদের তো স্বয়ং শ্রমিকারও চিনে না।

আকাশ সাহেব শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ব্যাপারটা যুক্তিযুক্ত বলে মেনে নিয়েছেন। তার মতে, শ্রমিকরা কিছু মজুরি বাড়িয়ে নিতেই আন্দোলন সংগ্রামে নেমেছিল। তার মতে, শ্রমিকদের দুর্ভাগ্য, কোন ট্রেড ইউনিয়ন তাদের দাবিগুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট সঠিক সময় পাশে এসে দাঁড়ায়নি। কত সহজেই তিনি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতি দায় চাপিয়ে গেলেন! অথচ একবারও বললেন না যে, শ্রমিকদের দাবি উত্থাপন করার জন্য কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারটুকু থেকেও মালিকরা শ্রমিকদের বঞ্চিত করে রেখেছে। নিজেকে একজন বামপন্থি পরিচয়ে জাহির করার পরও তার চিন্তার সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে সরকারের ভাষ্য। গার্মেন্টস শ্রমিকরা যখনই তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে, তখনই শাসকশ্রেণী আবিষ্কার করেছে বায়বীয় এক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত, বিস্ময়কর ব্যাপার হলো জনগণের সামনে সেই ষড়যন্ত্রকারি কখনো আবিষ্কার হয় না।

এখানে আমরা দেখছি সরকারের মতো আকাশ সাহেবও ইন্ধনদাতা আর বিদেশী ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন। সরকারের ভাষ্যের সাথে তার পার্থক্য হলো, সরকার কখনো সেই বিদেশী শক্তিকে জনগণের সামনে উন্মোচন করেনি, যেটা আকাশ সাহেব ইঙ্গিতে করলেন, তার সন্দেহের তীর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মজিনার দিকে। তার এই ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে তিনি শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র হিসেবে হাজির করে শ্রমিকশ্রেণীর চেতনার সাথেই যে বিশ্বাস ঘাতকতা করলেন, আর তা করেছেন স্বজ্ঞানে, যা তার রাজনৈতিক অবস্থান! মজিনার গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে মাথা ঘামানোর কারণ, এই ধরণের অর্থনীতিবাদী আন্দোলনগুলো শ্রেণীরাজনীতি বিকাশে সহায়তা করে। আর আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল হিসেবে এই বিষয়গুলো দেখভাল করার দায়িত্ব তাদের উপরেই তো বর্তায়। আকাশ সাহেব তার লেখাতে হিসেব কষে দেখাচ্ছেন, প্রত্যেক গার্মেন্টস যদি তাদের লাভের ৫% করে দেয় তাহলে প্রত্যক শ্রমিক ৫০০ টাকা করে পায়, এতেও সমস্যা অনেকটা সমাধান হয়, এই টাকা মালিকরা ছাড়তে রাজি হবে কিনা?

কিন্তু আমরা বলি ভিন্ন কথা, “বকশিস চাই না, হিসাবের পাওনা চাই”। সংগ্রাম ৫০০ টাকার নয়, শ্রমিকের ন্যায্য পাওনার। তাই যারা ৫০০ টাকা দিয়ে সমস্যা সমাধানের হিসেব কষেন, তারা বিশ্বাসঘাতক!!

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s