কমরেড, তুমি কার?

Posted: জুলাই 28, 2012 in আন্তর্জাতিক, দেশ, মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: বন্ধু বাংলা

কার্ল মার্কসআজকের নানা রকম ঐক্য, ভুয়া সমাজতন্ত্রী, খাটি সমাজতন্ত্রী, সংস্কারবাদী, সংশোধনবাদীরা মার্কসবাদের নাম ভাঙ্গিয়ে; যুদ্ধ নয়, বিপ্লব নয়, লড়াই নয়, শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়, কিন্তু মার্কসবাদের রাজনীতি করছে । মার্কস প্রেমিক সেজে শ্রমিক শ্রেণীর দরদি হয়ে, তীর্থের কাকের মত বসে আছে আখের গুছানোর ‘যদি কিছু পাওয়া যায়’ এই আশায়।

তাই আসুন মার্ক্সের জীবন ও তার মতবাদের বিরুদ্ধাচারনকারীদের বিরুদ্ধে স্বয়ং মার্কস কিভাবে লড়াই করেছেন কিংবা কিভাবে বিপ্লবকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, সেই পাঠ আবার গ্রহণ করি, নতুন করে জানি। তার বিপ্লবী সংগ্রামী জীবন ও মতবাদ হয়ত আমাদের কে সত্য মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণে সাহায্য করবে। যদিও এখানে আমি অল্প কথায় তার মহান বিপ্লবী জীবনের একটা ছবি আঁকার দুঃসাহস দেখাচ্ছি, তাতে অনেক কিছুই বাদ থেকে যাবে হয়ত। তবুও একটু দেখি, কেমন ছিল বিরুদ্ধাচারনকারীদের বিরুদ্ধে স্বয়ং মার্কসের লড়াই। আজকের যুগে হয়ত অনেক কিছুর সাথে মিলে যাবে প্রায় দেড়শত বছর আগেকার ইতিহাস।

স্বর্গ ও মর্তের সমস্ত দেবতার বিরুদ্ধে যেমন তাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে, তেমনি করতে হয়েছে বিরুদ্ধবাদী, সংশোধনবাদী, সংস্কারবাদীদের বিরুদ্ধে। বস্তুত সমাজতন্ত্রের একটি অবিন্যস্ত তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারণা আগে থেকেই বর্তমান ছিল, কার্ল মার্কস সেই অবিন্যস্ত ধারণা ইউটোপিয় সমাজতন্ত্রকে সুবিন্যস্ত করে বিশুদ্ধ রাজনীতি বিজ্ঞানের রূপ দান করেছেন। যার বিনিময়ে আমরা পেলাম মার্কসবাদ বা সমাজতন্ত্রকে। সমাজতন্ত্রের উত্তরণ প্রসঙ্গে মার্কস বলেন, “ যে বনজ সম্পদ অপহরণ সংক্রান্ত আইন ও মোসেলের কৃষকদের দুর্দশা পর্যালোচনাই তাকে বিশুদ্ধ রাজনীতি থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক চর্চায়, আর এইভাবে সমাজতন্ত্রে উত্তরণে উদ্বুদ্ধ করে” (, ফিসার সমীপে এঙ্গেলস ১৫ ই এপ্রিল ১৮৯৫)

যাইহোক, আমরা জানি মার্কসবাদ বিজ্ঞান হয়ে উঠতে থাকে শ্রেণী সংগ্রামের বিপ্লবী প্রয়োগের অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্রে। মার্কস ১৮৪৮ সালে প্রকাশ করেন সর্বহারা শ্রেণীর জন্য প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিভিত্তিক অমূল্য এক দলিল ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার’ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদের তত্ত্বগত পূর্বশর্তের ভিত্তিতে শ্রেণীভিত্তিক, বৈরীভাবাপন্ন সমাজের পরিস্থিতিতে বিকাশের চালিকা শক্তি রূপে শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্বকে যথাযথ সূত্রবদ্ধ করে ঘোষণা করেন, “আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাঁদের সকলের ইতিহাস; শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস”।

যুগপৎ একই সময়ে ফ্রান্সেইউরোপে জ্বলে উঠে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আগুন। মার্কস তার পৈত্রিক সম্পত্তির একটা বড় অংশ দাণ করেন বিপ্লবে অংশ গ্রহণকারী শ্রমিকদের অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। এর ফল ভালো হলো না। বিপ্লবের কেন্দ্রস্থল ফ্রান্সে যাওয়ার জন্য মার্কস উদগ্রীব ছিলেন, কিন্তু তার আগেই এই প্রথম মার্কস গ্রেফতার হলেন। স্বামীর খোজ নিতে আসা স্ত্রী জেনীও গ্রেফতার হলেন ও তাকে বেশ্যাদের সাথে কারাবাসে আটক রাখা হয়।

প্রলয়তারিয়েতের পার্টি গঠনের সূচনা লগ্নে বিরাজমান ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিজমের অনুসারীরা ধর্মঘট, ট্রেড ইউনিয়ন ও প্রলতারিয়েতের রাজনৈতিক সংগ্রামের বিরোধিতা করতেন। তারা শ্রমিক শ্রেণীকে শ্রেণী সংগ্রামের পথ থেকে বিচ্যুত করে নিয়ে যান ‘স্থূল মেকী সমতা বিধান তত্ত্ব, সকল মানুষের ভ্রাতৃত্ব ও প্রেমের’ কল্পলোকের জগতে। ধর্মীয় ও মরমীবাদের মোড়কে তারা এর নাম দেন ‘খাঁটি সমাজতন্ত্র’। মার্কস প্রমাণ করেন রাজনৈতিক সংগ্রাম তথা শ্রেণী সংগ্রাম ব্যতীত সর্বহারা শ্রমিককৃষক কিভাবে শাসক গোষ্ঠী ও সামন্ততান্ত্রিক প্রভুর হাতের পুতুল হয়ে পড়ে। ১৮৪৬ সালের মে মাসে এই ‘খাঁটি সমাজতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে মার্কস ও এঙ্গেলস লিখিত একটি ‘সার্কুলার’ উজ্জ্বল একটি দলিল হয়ে আছে। আবার পরের বছর ১৯৪৭ এর জুলাই মাসে আরেক পেটি বুর্জোয়া দার্শনিকঅর্থনীতিবিদ প্রুধোঁর বিরুদ্ধে মার্কসকে ‘দর্শনের দারিদ্রের জবাব’ প্রকাশ করতে হয়। প্রুধোঁ মালিকানাকে অপহরণের পর্যায়ে দেখলেও; পুঁজিবাদ অপরিহার্য বলে মত প্রকাশ করেন। প্রুধোঁর মতে পুঁজিবাদের মন্দ দিক বিলোপ করে এর ভালো দিক সংরক্ষণ করে সমাজ কাঠামো নির্মাণ করা। প্রুধোঁবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির ব্রাসেলস কংগ্রেস (১৮৬৮) এবং বাসেল কংগ্রেসেও (১৮৬৯) চলে। ঐ দুই কংগ্রেসে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর এই মতাদর্শবাদীরা ও ব্যক্তিগত মালিকানার সমর্থকরা চূড়ান্ত পরাজয় বরন করে।

১৮৪৮ সালে গণতন্ত্রী ডূশেলডোরফ লাসালের সাথে মার্কসের পরিচয় ঘটে। লাসাল প্রথমে নিজেকে মার্কসের শিষ্য ও সমর্থক রূপে ঘোষণা করে। প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন হেগেলপন্থী এবং সর্বহারার রাজনৈতিক সংগ্রামকে উপলব্ধিতে অক্ষম।

লাসালপন্থী ও মার্কসবাদের মৌলিক পার্থক্য কেবল তত্ত্বের ক্ষেত্রে নয় রাজনৈতিক প্রয়োগ ক্ষেত্রেও স্পষ্ট হয়ে উঠে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও প্রলয়তারিয়েতের একনায়কত্ব সম্পর্কে মার্কসের মতবাদ না মেনে তিনি শ্রমিক শ্রেণীকে কেবল মাত্র শান্তিপূর্ণ প্রচলিত বৈধ পথে পরিচালিত করার পক্ষপাতী ছিলেন। লাসালের মতে তৎকালীন প্রুশিয় রাজ্যকে মুক্ত ও ‘গণ’ রাষ্ট্র করার জন্য জার্মানিতে সার্বজনীন ভোটাধিকার প্রবর্তনই যথেষ্ট। লাসাল শ্রমিকদের মাঝে চরম অনিষ্টকর যে ভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করেন তা হলো, যে প্রুশিয় রাষ্ট্র তাঁদের উৎপাদন উপকরণ অর্জনে সাহায্য করে, শোষণের হাত থেকেও রাষ্ট্র তাঁদের উদ্ধার করতে পারে। শ্রেণী সংগ্রামকে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল রূপে বিবেচনা করতেন। উল্লেখ্য যে আরেক ভণ্ড বিসমার্কের সাথে লাসালের গোপন পত্রালাপ অবহিত না হলেও প্রুশিয় সরকারের সাথে লাসালের বিশেষ গা মাখামাখি মার্কসের নজর এড়ায়নি। যাইহোক, আঘাত প্রাপ্ত হয়ে সহসাই লাসালের মৃত্যু ঘটায় পুঁজির প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় মার্কস তাকে স্রেফ তোতা পাখি ও কুম্ভিলক আখ্যা দিয়ে শেষ করেন এই লাসাল পর্ব। (মার্কস, পুঁজির প্রথম খণ্ডের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা)

তথাপি লাসালপন্থীদের বিরুদ্ধেমার্কস ও এঙ্গেলস জার্মানির শ্রমিক আন্দোলনে সুবিধাবাদী ও জাতীয়তা বাদী ধারার বিরুদ্ধে সরাসরি সংগ্রাম পরিচালনা করেন।

এ প্রসঙ্গে মার্কস বলেন, “শ্রমিক শ্রেণী হয় বিপ্লবী, নয়ত সে কিছুই নয়”। (এঙ্গেলস সমীপে মার্কস ১৮ ই ফেব্রুয়ারি ১৮৬৫)

মার্কসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুধু ইংল্যান্ড বা জার্মানিতে নয়, সুদূর আমেরিকায় বসে ফরাসী শাসক লূই বোনাপার্টের পেয়িং এজেন্ট গুপ্তচর ফগট এক দশকেরও বেশী সময় ধরে চালায়। এহেন অবস্থায় এঙ্গেলস তার বন্ধূকে লিখেন, “তোমার অবস্থা এখন এমনই ঈর্ষণীয় যে তোমাকে একযোগে আক্রমণ করেছে দুটি মহাদেশ, এমনটি নেপোলিয়নের ক্ষেত্রে একবারও ঘটেনি।” (মার্কস সমীপে এঙ্গেলস, ৯ই মে ১৮৫১)

যে বিপ্লবী তার বিপ্লবী কর্তব্য একমাত্র বিপ্লবী পদ্ধতির দ্বারাই করা সম্ভব: গোলাপ নির্যাস দিয়ে গুরুতর ব্যাধি নিরাময় অসম্ভব”।

বিপ্লবী স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এঙ্গেলস বিপ্লবীদের চরিত্র নিরূপণ করেছেন বিপ্লবী ও প্রতিবিপ্লবী রূপে। লেলিনের মতে সেই সময়ের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এ মূল্যায়ন সঠিক ছিল । ( , ই লেলিনআত্মনিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে বিতর্কের সিদ্ধান্তবলী)

বিপ্লবী যুদ্ধের রণনীতি ও কর্মকৌশলের ব্যাপারে এঙ্গেলস বলেন, “যে জাতি তার স্বাধীনতা অর্জন করতে চায় তাকে যুদ্ধ পরিচালনায় প্রচলিত যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ব্যাপক গণ অভ্যুত্থান, বিপ্লবী যুদ্ধ, সর্বত্র গেরিলাবাহিনীএই হলো একমাত্র উপায়, যার সাহায্যে ক্ষুদ্র জাতি বৃহৎ জাতির উপর, অপেক্ষাকৃত স্বল্প শক্তিশালী সেনাবাহিনী অধিকতর বৃহৎ সংগঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাড়াতে পারে।” (এঙ্গেলস – পীয়েমোপন্থীদের পরাজয়)

শ্রেণী সংগ্রামকে রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপান্তরে ও ভবিষ্যৎ বিপ্লবের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রূপে , মার্কস ও এঙ্গেলস বলেন, এ শর্ত হলো এমন এক শ্রমিক পার্টি গড়ে তোলা, যার থাকবে গোপন ও প্রকাশ্য সংগঠন। শ্রমিকদের প্রধান কর্তব্য হলো পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ ফাঁদে পা না দিয়ে বিপ্লবকে যতদূর সম্ভব, একেবারে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তাদের জঙ্গি শ্লোগান হওয়া উচিতঃ ‘নিরবচ্ছিন্ন বিপ্লব’। (মার্কস, এঙ্গেলস কমিউনিস্ট লীগের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির আবেদন, জুন ১৮৫০)

মার্কস ‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ’ প্রবন্ধে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর সম্পর্ক প্রসঙ্গে বলেন, “স্রেফ তৈরি করা রাষ্ট্রযন্ত্রকে দখল করে নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তা কাজে লাগাতে পারে না”। এই বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে মার্কস ও এঙ্গেলস ১৮৭২ সালে ‘ কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার’ পুনর্মুদ্রণের সময় এটাকে গুরুত্বপূর্ণ পরিশিষ্ট রূপে বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করেন।

কমিউন আন্দোলনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সাবেকি রাষ্ট্রযন্ত্র ভাঙ্গার আবশ্যপ্রয়োজনীয়তাকে প্রমাণ করার সময় যে কোন রাষ্ট্র বিলোপের চিন্তার সঙ্গে মার্কসের কোন মিল ছিল না। তিনি লিখেন, “যেটা কর্তব্য তা হলো সাবেকি সরকারী ক্ষমতার নিপীড়ক অঙ্গগুলিকে পরিষ্কার কেটে বাদ দেওয়া। সেই ক্ষমতারই ন্যায্য কর্তব্যগুলি সমাজের উপর অন্যায়ভাবে আধিপত্য দখলকারী একটি কর্তৃত্বের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া এবং সমাজের দায়িত্বশীল সেবকদের হাতে অর্পণ করা। (মার্কস– ‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ’ নিবদ্ধে)

যাইহোক, ইউরোপ জুড়ে ফেব্রুয়ারির বিপ্লব নানা সমীকরণে এসে যখন ব্যর্থ হলো, ফ্রান্সে সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ এবং নিপীড়িত শ্রেণীসমূহের উপর নির্যাতন শক্তিশালী হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে মার্কস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, “সমস্ত কূদেতা রাষ্ট্রযন্ত্র ভাঙ্গার বদলে তাকে শক্তিশালী করেছে” (মার্কস, লুই বোনাপার্টের আঠারোই ব্রুমেয়ার)। এখানে মার্কসের এই অসাধারণ সিদ্ধান্তে লেলিন লেখেন, “এই অপূর্ব বিচারে মার্কসবাদ কমিউনিস্ট ইশতেহারের তুলনায় বিরাট অগ্র পদক্ষেপ। পূর্ববর্তী সমস্ত বিপ্লব রাষ্ট্রযন্ত্রের উৎকর্ষ সাধন করেছে, অথচ তাকে ভাঙ্গা দরকার, টুকরো টুকরো করা দরকার। এই সিদ্ধান্তই মার্কসবাদী তত্ত্বের প্রধান ব্যাপার, মূল কথা।” (,ই লেলিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, রাষ্ট্র যন্ত্র ভাঙ্গার আবশ্যপ্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৮৭১ সালের ১২ই এপ্রিল ফুগেলমানের কাছে লিখিত পত্রে মার্কস যে কোন গণবিপ্লবের এই শর্ত ইউরোপ মহাদেশে সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং ইংল্যান্ডকে বাদ দিয়েছেন। তার কারণ, ইংল্যান্ডে সামরিক ও আমলাতান্ত্রিকযন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। ইংরেজ প্রলয়তারিয়েতের শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা আছে ধরে নিয়ে মার্কস এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি যে, “ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে, শ্রেণী শত্রুর হাত থেকে বিপ্লবকে রক্ষা করতে হলে কেবল শান্তিপূর্ণ উপায় অবলম্বন করলেই চলবে না।” যেমন ১৮৭১ সালের ৩রা জুলাই ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড’ পত্রিকায় সংবাদদাতার গৃহীত সাক্ষাতকারে ইংল্যান্ডে বিনা বল প্রয়োগে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে মার্কস বলেন, “ভোটের অধিকারের উপর ইংরেজ বুর্জোয়া শ্রেণীর যতক্ষণ একচেটিয়া আধিপত্য আছে ততক্ষণ সে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সদাপ্রস্তুত। কিন্তু একথা মানতেই হবে যে কোন প্রশ্নকে রীতিমত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে, তাতে যে মুহূর্তে সে সংখ্যালঘিষ্ঠ হয়ে পড়বে তখনই ঘটবে দাস আর মালিকের নতুন যুদ্ধ।” (‘দ্যা ওয়ার্ল্ড’ পত্রিকার সঙ্গে মার্কসের আলাপ আলোচনার লিখিত বিবরণী)

ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ” প্রবন্ধটির কথা বলতে গেলে বলতে হয়, গৃহযুদ্ধ চলাকালেই এই প্রবন্ধ মার্কসের লিখিত ঐতিহাসিক রচনার এক অপূর্ব দলিল ও নিদর্শন। এটা ইতিহাসে বিপুল গুরুত্বপূর্ণ এক তাত্ত্বিক দলিল। কমিউনিজমের ভাব সম্পদের ভাণ্ডারে এক মহা মূল্যবান অবদান।

১৮৬৪ সালের ২৮ সে সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতি গঠিত হয়। যার মূলনীতি ছিল: শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি স্বয়ং শ্রমিক শ্রেণীর দ্বারা অর্জিত হতে হবেশ্রমিকদের সংগ্রামের উদ্দেশ্য হলো ‘যে কোন শ্রেণী প্রভুত্বের বিলোপ’। ১৮৭১ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতি’র গোপন সম্মেলনে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা সংক্রান্ত এক প্রশ্নে অর্থাৎ, প্রলয়তারিয়েতের রাজনৈতিক কর্মকৌশল নিয়ে মার্কস বলেন, “আমাদের উচিৎ হবে সরকারগুলিকে জানিয়ে দেয়া যে, যেখানে আমাদের পক্ষে সম্ভব সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে আপনাদের বিরুদ্ধে কাজ করব। অস্ত্র দিয়ে করব তখনই যখন তা হয়ে উঠবে অবশ্যপ্রয়োজনীয়। (শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক কার্যকলাপ প্রসঙ্গে মার্কসের বক্তৃতার লিখিত বিবরণী)

লন্ডন সম্মেলন শেষে আন্তর্জাতিকের ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে শ্রেণী প্রভুত্ব ও যাবতীয় নির্যাতন বিলোপের উদ্দেশ্যে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক শাসনাধিকার অর্জন প্রসঙ্গে মার্কস বলেন, “তবে এ ধরনের পরিবর্তনের পূর্ব শর্ত রূপে যা দরকার তা হলো প্রলয়তারিয়েত বাহিনী। নিজের মুক্তির অধিকার শ্রমিক শ্রেণীকে অর্জন করতে হবে যুদ্ধ ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিকের কর্তব্য হলো আসন্ন সংগ্রামের জন্য শ্রমিকের শক্তিকে সংগঠিত করা ও সম্মিলিত করা। (মার্কসআন্তর্জাতিকের ৭ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী প্রসঙ্গে)

এবার আসি আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির ভাঙ্গন প্রসঙ্গে। এ ক্ষেত্রে অন্যতম ছিল বাকুনিনপন্থীরা। মার্কসবাদ যখন প্রুধোঁবাদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করল, ঠিক সেই সময়ে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয় মার্কসবাদের আরেক বিপদজনক, নতুন কিন্তু আরও খল শত্রু বাকুনিনবাদ। ১৮৪৩ সালে প্যারিসে থাকা কালে মার্কসের সাথে পরিচয় ঘটে রুশ বিপ্লবী মিখাইল বাকুনিনের। ১৮৬৪ সালে বাকুনিন আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির হয়ে কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। ১৮৬৯ সালে বাকুনিন তার “সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রী জোট” বিলীন করে আন্তর্জাতিকে অঙ্গীভূত হওয়ার আবেদন করে। এই জোটের মুল মন্ত্র ছিল ‘বিদ্যমান শ্রেণী সমূহের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমতা বিধান’। বাকুলিনের মতে, প্রধান অনিষ্টকারী যে বস্তুটি অপসারণ করা দরকার তা পুঁজি নয়, উৎপাদন উপায়ের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা নয়, কিন্তু রাষ্ট্র। যে কোন রাষ্ট্র ক্ষতিকর – এই মত পোষণের ফলে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতি তার মনোভাব হলো নেতিবাচক। প্রুধোঁর সংস্কারধর্মী নৈরাজ্যবাদের সাথে বাকুনিনের পার্থক্য এই যে, বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদের চরিত্র ছিল যেমন বিদ্রোহ ধর্মী তেমনি স্বেচ্ছানুগত্যমূলক। বাকুনিন ট্রেড ইউনিয়ন ও ধর্ম ঘটের ব্যাপারে এক মত দিলেও জমি ও উৎপাদনের উপায়ের সামাজিকীকরণের সংক্রান্ত সমস্যা যত বেশি সামনে এসে পড়ল এই নেতারা তত বেশি আন্তর্জাতিকের মধ্যে অসন্তোষ খুঁজে বের করতে লাগলেন। মার্কস বাকুনিনবাদের সমালোচনা করে বলেন, “শ্রেণী সমূহের সমতা বিধান নয়তা অর্থহীন, কার্যত অসাধ্যবরং তার বিপরীত, শ্রেণী সমূহের বিলোপ – ই হলো প্রলয়তারিয়েতের যথার্থ গোপন রহস্য, যা আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির পরম লক্ষ।” ( মার্কসসমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের জোটের কেন্দ্রীয় ব্যুরোর উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির সাধারণ পরিষদ)

জোট ভেঙ্গে আন্তর্জাতিকের পক্ষে কাজ করার কথা বললেও বাকুলিন আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির মধ্যে গুপ্ত সংগঠন রূপে কাজ করতে থাকেন। বাসেল কংগ্রেসে তিনি নেতৃতে আসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। বাকুনিনপন্থীরা তখন দলে ভারি না হলেও তারা ছিল প্রচণ্ড রকম সক্রিয়। তাঁদের মতবাদ প্রসঙ্গে মার্কস বলেন। “তাঁদের এই ভূমিকা আপাদমস্তক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত বুর্জোয়া শ্রেণীর সামনে প্রলয়তারিয়েতের নিষ্ক্রিয়করণের উপায় স্বরূপ।” (মার্কস ও এঙ্গেলস– ‘আন্তর্জাতিকের তথাকথিত ভাঙ্গন’ )

এদিকে মার্কস ও এঙ্গেলস ১৮৭২ সালের এপ্রিলে স্পেনে অবস্থানকারী লা ফারগের (মার্কসের জামাতা) কাছ থেকে এই মর্মে সংবাদ পেলেন যে, বাকুলিন গোপনে আন্তর্জাতিক সংগঠন “সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রী জোট” তৈরি করেছেন।, এর ফলে সংগ্রামের চরিত্র বদলালো। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতির অভ্যন্তরে যে গোপন তৎপরতা ও শত্রু সংগঠন বাসা বেঁধেছে তা থেকে মুক্ত করার জন্য ভাবাদর্শগত সংগ্রাম মার্কস ও এঙ্গেলসের জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ল।

বাকুনিনপন্থী জোটের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ডের ট্রেড ইউনিয়নের সংস্কারবাদী নেতৃবৃন্দ ও আন্তর্জাতিকের লন্ডন সম্মেলন শেষে গঠিত ‘ব্রিটিশ ফেডারেল কাউন্সিলে’র গুটিকয়েক সদস্য। আন্তর্জাতিকের কতিপয় মার্কিন শাখার উপর সুবিধাবাদের এই প্রভাব পড়ে বিশেষ ক্ষেত্রে নিউইয়র্কের ১২ নং শাখার উপর যার অধিকাংশ সদস্য ছিল বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত। মার্কসের প্রস্তাব অনুসারে, তাঁদের বহিষ্কার করা হয় এবং মেকি সংস্কারক, হাতুড়ে বুর্জোয়া ও ভাড়াটে রাজনৈতিকদের হাত থেকে অন্যান্য মার্কিন শাখাকে রক্ষার জন্য এই মর্মে নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় যে, শাখার সদস্য মণ্ডলীর দুইতৃতীয়াংশ মজুরী শ্রমিক হওয়া চাই।

তথাপি এদের তৎপরতা ছিল লক্ষণীয় যা গড়ে উঠেছিল ১৮৭২ সালের সেপ্টেম্বরে পরবর্তী সম্মেলনকে উপলক্ষ করে। কংগ্রেসের প্রাক্কালে তাই শঙ্কিত মার্কস জোর্গেকে লিখেছিলেন “এই কংগ্রেসে কথা হবে আন্তর্জাতিকের জীবন অথবা মৃত্যু নিয়ে।” ( , , জোর্গে সমীপে মার্কস, ২১ সে জুন১৮৭২)

তথাপি পরবর্তী হেগ সম্মেলনে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় মার্কসের জামাতা পল লাফারগ ও ইংরেজ প্রলয়তারিয়েত নেতা মালটম্যান বেরিকে। হেগ সম্মেলনে প্রবেশাধিকারে বাধা দান ছিল এই গুটিকয় বাকুনিনপন্থীদের এক দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা। এইরূপ বাধাদান ও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা সত্বেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পূর্বশর্ত রূপে রাজনৈতিক সংগ্রামের অপরিহার্যতা ও প্রলয়তারিয়েতের পার্টি গঠনের দাবী সর্বসম্মতি ক্রমে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ও গৃহীত হয়। যা আন্তর্জাতিকের সকল সদস্যের জন্য আইন স্বরূপ প্রযোজ্য হয়। বাকুনিনপন্থীদের গোপন বিরুদ্ধবাদী সংস্কার তৎপরতার জন্য হেগ কংগ্রেস উক্ত চক্রের দুই দলপতি বাকুনিন ও গিলমের বহিষ্কারাদেশ সহ তাঁদের সকল কুচক্রিবাদী দলিল প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

প্রলয়তারিয়ের এই যে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য কি কৌশল অবলম্বন করা উচিত?মার্কসের মতে, “বিভিন্ন দেশের সমাজ বিধান, রীতিনীতি, ও ঐতিহ্যকে বিবেচনা করা দরকার। আমেরিকা, হল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের মত এমন সব দেশ আছে যেখানে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। তথাপি শ্রমের আধিপত্য কায়েম করতে গেলে সাময়িক শক্তির আশ্রয় নিতে হয়।” তিনি আরও বলেন, “যে কোন শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের সংযোগ সাধনে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ায় শ্রমিকদের উপর উদারনৈতিক বুর্জোয়া ও সংস্কারবাদীদের প্রভাব এবং পেটি বুর্জোয়া, সংকীর্ণতাবাদী সমাজতন্ত্রী ও নৈরাজ্যবাদীতার বিভিন্ন রূপ।” ( মার্কস – হেগ কংগ্রেস প্রসঙ্গে)

এঙ্গেলসের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইংল্যান্ডের প্রলয়তারিয়েতের শাসন ক্ষমতা অধিকারের সম্ভাবনা স্বীকার করে নিয়েও মার্কস একথা যোগ করতে ভুলেননি যে, ইংল্যান্ডের ক্ষমতাভোগী শ্রেণীসমূহ এই শান্তিপূর্ণ ও বৈধ বিপ্লবকে ‘দাস প্রথা রক্ষার জন্য হাঙ্গামা’ না বাধিয়ে মেনে নিবে এমন আশা করার কোন কারণ আছে বলে মনে হয় না। (, এঙ্গেলস “পুঁজি”র প্রথম খণ্ডের ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকা)

তথাপি বিলেতি গণতন্ত্রের স্বরূপ নির্ণয় করতে গিয়ে মার্কস বলেন, “ভোটার তালিকা প্রণয়নের সময় নানা রকম কারচুপি, ঘুষ, ব্ল্যাকমেইলের রীতির ফলে শাসকশ্রেণীর পক্ষে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়। এক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী দুই পার্টি ব্যবস্থার উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে দেখিয়েছেন যে, শাসন ক্ষমতায় পার্টীর অদল বদল আসলে শাসক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পন্থার কোন পরিবর্তন ঘটায় না। ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে পার্লামেন্টারিয় বিরোধিতার যে ভূমিকা, তাকে তুলনা করা চলে বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের বাল্বের সঙ্গে।” ( মার্কসইংল্যান্ডের নির্বাচনটোরি ও উইগ)

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী ভোট কখনও বিপ্লব বয়ে আনে না। আজকের আমেরিকা, হল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বর্তমান চেহারা তার প্রমাণ। তথাকথিত গণ–অভ্যুত্থানও একসময়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ও সুবিধাবাদের পকেটস্থ হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে ৯০এর গণ–অভ্যুত্থানও তাই ব্যর্থ হতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে আরব বসন্তও আসলে কোন বসন্ত নয়, নতুন বোতলে পুরানো মদের মতই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সরবারহ করা এক ধরনের মাদকতা; যে মাদকতায় বারবার বুদ হয় মুক্তিকামী মানুষ।

আজ ভোট, কাল বিপ্লব এই মন্ত্র জপিয়া এই দেশে কারা দলীয় কর্মীদের ঠকাচ্ছে? বর্তমানে তাই এদের নাই কোন শ্রেণী সংগ্রাম, শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি, শ্রেণী চরিত্র বিশ্লেষণ। সর্বোপরি, বিপ্লবী কর্ম কৌশল অনুযায়ী দল পরিচালনা।


মার্ক্সবাদের অনুশীলনে নির্ভুল নেতৃত্ব অপরিহার্য। তাই সকল কমরেডদের উচিত নেতৃত্ব বাছাই করা, বিশ্লেষণ করা, অন্যথায় নিজেই নেতৃত্বে আসা। এটাই আজকের সময়ের দাবী। নেতৃত্বের উপর চাপ সৃষ্টি করে সঠিক মার্কসবাদকে অনুশীলনে বাধ্য করা, তারপরে বিপ্লবী গান গাওয়া।

মার্ক্সবাদীলেলিনবাদী মতাদর্শের সাথে সংশোধনবাদ, নয়া সংশোধনবাদ, সুবিধাবাদীর পার্থক্যরেখা না টানতে পারলে, তদানুযায়ী নিজ দলের ভিতর সংগ্রাম না করতে পারেন, তবে অবশ্যই এই ব্যর্থতা সাম্রাজ্যবাদ, সুবিধাবাদ, নয়া ঐক্যবাদ সহ সকল অপশক্তির হাতকে শক্তিশালী করার নামান্তর বৈকি!!!


কিন্তু সংগ্রাম করতে গেলে পার্টি ত্যাগ করতে হয়। তাই কাকে আঁকড়ে ধরবেন, পার্টি নাকি মার্কসবাদকে? কথিত মার্কসবাদী নেতা নাকি বিপ্লবকে? এটাই মুল প্রশ্ন!!!


যদি পার্টি বা নেতা আঁকড়ে ধরেন সমস্যা নাই। কেননা হিসেবটা সোজা, হয় দালালী করো, নইলে মৃত্যুবরণ করো। বিপ্লব করতে গেলে আঘাত আসে, গুলি খেয়ে মরতে হয়, রাষ্ট্রের এঙ্কাউনটারের শিকার হতে হয়, সে হিসাবে আপনাদের “গা” বাঁচিয়ে রাজনীতি করা ১০০% ঠিক আছে, কিন্তু সেটা বিপ্লবী রাজনীতি নয়, মার্কসবাদী রাজনীতি নয়!!! আবার পক্ষান্তরে, এই জমানায় মানুষ এখন ভীষণভাবে ব্যস্ত থাকার পুঁজিবাদী বটিকা গিলছে। সাধারণ জনগণকে ভীষণভাবে ব্যস্ত রাখার নিত্য নতুন কলাকৌশল রপ্ত করানোর জন্য আছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বড় বড় পণ্ডিতি মাথা। সেইসব মাথা থেকে অনর্গল হর হর করে এমন এক সংস্কৃতি বেরুচ্ছে যে সংস্কৃতি শেখাচ্ছে– ‘নেভার সে ডাই, লিভ উইদাউট আদার্স, লিভ এ্যালোন’! সেই সংস্কৃতির মূলে আঘাত করে সঠিক মার্কসবাদী রাজনীতি চর্চা, শ্রেণী সংগ্রামকে বেগবান করা তাদের দ্বারা হয়ে উঠে না।

কিন্তু দোহাই লাগে সংশোধনের নামে সুবিধাবাদের; সাম্রাজ্যবাদের দালালি করেন, অক্ষমতায় বেঁচে থাকেন কিন্তু নিজেদের মার্কসবাদী বিপ্লবী দাবী করে; মার্কসবাদ কে, বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না।


বুর্জোয়া সুবিধাবাদী বিপ্লবী নেতৃত্ব ভোটের মাধ্যমে দ্রুত একটি বিজয় আশা পোষণ করে, যাতে তাঁদের নিজেদের (শ্রমিক শ্রেণী, সর্বহারার নয়) জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন হয়। এ কারণে তারা দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবী কাজে ধৈর্যের অভাবে ভোগে, বামপন্থী, বিপ্লবী শ্লোগান, বিপ্লবী বুলিকে পুঁজি করে। এবং মানসিকতায় ও কাজে তারা গোপনীয়তা করে হঠকারিতার আশ্রয় নেয়। অনেক সময় এই বুর্জোয়া মনোভাবসম্পন্ন বিপ্লবীরা শেষ পর্যন্ত হতাশ ও নিরাশ হয়ে ডান বিচ্যুতিকে শেষ ও চূড়ান্ত লাইন হিসাবে গ্রহণ করে অপশক্তির লেজুড়বৃত্তি করে। এরা সর্বহারার একনায়কতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে লব্ধ সংগ্রামকে যুদ্ধবাজ, রোমান্টিকতা ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করে। পক্ষান্তরে, সর্বহারার সাথে শ্রেণী বিচ্যুতি, বাম বিচ্যুতির অন্ধগলিতে বিপ্লবের নামে ইতরামির “শিশ” মারতে থাকে। এই শিশ মারা বিপ্লবীরা; বিপ্লবীদের নয় প্রতিবিপ্লবীদের সাহায্য করে, এক পর্যায়ে প্রতিবিপ্লবীদের গোত্রভুক্ত হয়ে পড়ে।

তাই আজ এই প্রশ্ন খুবেই স্বাভাবিক ভাবে এসে যায়, “কমরেড তুমি কার?”
শুধু মাত্র কমিউনিস্ট পার্টির ঐক্যের মাধ্যমে সমগ্র শ্রেণী ও সমগ্র জাতির ঐক্য অর্জন করা যায়। যা কিছু ঐক্যের ক্ষতি করে সে সব কিছুকে অবশ্যই দূর করতে হবে।” মাও সেতুঙ

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s