লিখেছেন: খোন্দকার সোহেল

রোদ-বৃষ্টি সয়ে টেনে যায় রিকশাওয়ালা, আর তাতে বসে দুই মিনিটের সাহেব-মেম'রা...রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলাম। সাথে ল্যাপটপ এবং ক্যামেরার ব্যাগ। সারাদিন কাজের ঝক্কি ঝামেলায় এমনিতেই মন মেজাজের উড়াল চন্ডি দশা। তাই মনমেজাজটা ভাল ছিল না। সিগারেটের প্যাকেট বের করে পকেটে আর দিয়াশলাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞাস করলাম

তোমার কাছে দিয়াশলাই আছে?

রিকশা চালাতে চালাতেই পিছু ফিরে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল

আছে স্যার। এই নেন।

দিয়াশলাই নিয়া সিগারেট ধরিয়ে দেখলাম তখনও রিকশাওয়ালা আমার দিকেই তাকিয়ে হাসছে। বললাম

হাসছ কেন?

স্যার আমনের ব্যাগের মধ্যে কি কম্পুটার?

হুম, কেন?

আইজ একটা ছ্যারা মোর রিকশায় বইয়া ক্যারে জানি খালি কইতাছে “ফেবু” আর “স্টেটেস” এর কতা। স্যার এইগুলা কি?

কোনগুলা?

ফেবু আর স্টেটেস

তুমি বুঝবা না, সামনে তাকিয়ে রিকশা চালাও।

স্যার, হেই বেইন্নাহাল অইতে খালি মানু বিচরাইতে আছেলাম ক্যার ধারে ফেবু আর স্টেটেস এর মাইনে জিগামু। আমনেরে যহণ দ্যাখছি তহণই চিন্তা করছি আমনের ধারে জিগামু।

তুমি এগুলো শুনে কি করবা?

না স্যার কিচ্ছু করুম না। তয় হেই ছ্যারা যেইরহম কইল হ্যাঁতে মনে অইল হ্যাঁয় হ্যাঁর ডার্লিংয়ের ব্যামালা পেয়ার করে।

হুম, তা হয়তো করে। কিন্তু তুমি কি করবা?

স্যার কিযে কন? মুই অহনও বিয়া করি নাই। মোরও ফুলজান আছে। মোরে খুব ভালবাসে।

তো

স্যার মোরে একটা ফেবু আর স্টেটেস দিবেন ফুলজানরে দিতাম। বিশ্বাস করেন স্যার হ্যায় আমারে খুব ভালবাসে।

মাথায় যেন বাজ পড়ল। কিছুক্ষণ থ হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু ওর হাসি আর থামছে না। বললাম

শোন, এইটা কাউকে দেয়ার জিনিস না, তুমি এটা বুঝবা না, রিকশা চালাও।

না স্যার। মোর ভাড়া লাগবে না, আমনে খালি মোরে এট্টু ফেবু আর স্টেটেস দিবেন কন।

মাথাটা প্রচন্ড গরম হয়ে গেল। বললাম

শোন আর একবার যদি কথা বল তাহলে তোমাকে….

কি করবেন স্যার, মারবেন? মারেন, তবুও……….

বুঝলাম, এ নাছোর বান্দা ছাড়ার পাত্র না, এর মাথায় ফেবু ভাল করেই ঢুকেছে। একে না বুঝিয়ে আর নিস্তার নাই। তাই বললাম

থাম, রিকশা থামাও।

রিকশা থামিয়ে ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ বের করে এফবিতে সাইনইন হলাম। এরপর হোমপেজের বিভিন্ন পোস্ট দেখিয়ে তাকে বললাম

শোন এই যে উপরে ইংরেজীতে লেখা দেখ না, এখানে লেখা আছে Facebook. এটাকে সংক্ষিপ্ত করে “ফেবু” বলা হয়। “ফে” মানে “ফেইস” আর “বু” মানে “বুক”. আর এই যে বিভিন্ন জনের লেখা দেখ না, এটা হল “স্ট্যাটাস”। এবার কি বুঝতে পারছ যে এটা ফুলজানদের জন্য নয়?

লক্ষ্য করলাম ওর মুখটা অনেকটা মলীন হয়ে গেছে। ভারাক্রান্ত গলায়ই বলল

জি স্যার, বুজজি। এইডা আমাগো জইন্ন না। এইডা দামি মাইনষের লইগ্যা অইছে।

তাহলে এখন বল, আমি কি করে তোমাকে “ফেবু” আর “স্ট্যাটাস” দেব?

স্যার আমারে দেওয়া লাগবে না, আমনে খালি এইহানে একটা কতা লেইখা দ্যান “আমাগো কষ্ট কেউ বোজে না। রৌদে পুইড়া বৃষ্টিতে ভিইজ্যা আমনেগো টানি। আর হেই আমনেরাই আমাগো প্যাডে লাতি মারেন।”

লিখব অবশ্যই লিখব। তবে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, “এটা কে বলেছে, তখন কি বলব?”

তাইলে স্যার হ্যাগো কইবেন, “এইডা একটা রিকশাওয়ালার স্ট্যাটাস।”

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s