বাংলাদেশ :: কর্পো-মিলিটোক্রেসির সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, নয়া ঔপনিবেশিক অভয়ারণ্য

Posted: জুলাই 5, 2012 in অর্থনীতি, দেশ, মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: আলবিরুনী প্রমিথ

বিদ্রোহএক.

বাপদাদার আমলে, নিজের ছোটবেলায় ভালো ছেলের সংজ্ঞা ছিলো : তারা সিগারেট, মদ, বিড়ি কিছু খায়না, বাবামা, মাস্টারমশাই, গুরুজনদের কথা মান্য করে চলে, কোনকিছুর প্রতিবাদ করেনা, কখনো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার কথা ভাবেনা। এখন তা কিছুটা বদলে হয়েছে অনেকটা এমন : তারা কখনো দু’দন্ড বসে কিছু চিন্তা করেনা, কোন কিছুতেই প্রশ্ন করেনা, বনের মোষ তাড়ানো তো দূরের কথা ঘরে মোষ ঢুকলেও তাড়ায়না, বিনা বাক্যব্যয়ে বুদ্ধিবৃত্তির খাসীকরণ গ্রহণ করে, একপাল শুয়োরের সাথে নরককূন্ডে বসবাস, সহাবস্থানে দ্ব্যর্থহীনভাবে তাকে শুয়োরের খোয়াড় না বলে কাঁপা কাঁপা গলায় আবেগগ্রস্ত কবির ভাষায় বলে, ‘আমি এই দেশকে নিয়ে অনেক গর্বিত’, ‘আমি অনেক আশাবাদী আমার সুজলাসুফলা দেশকে নিয়ে’, ‘এই দেশ একদিন সারা বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াবেই’ব্লা ব্লা ব্লা। বলাই বাহুল্য এসব কথা কর্পোরেট দস্যুদের শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া কিছু প্রলাপ বিশেষ ব্যতীত আর কিছু নয়। নাহলে যখনই সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মূর্খ বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত ফুটবলের বাংলা করেছে– ‘চর্মনির্মিত গোলাকার বস্তুবিশেষ যা পদাঘাতে স্থানান্তরিত হয়’, তখনই তার জাতি গঠনের পথ পিছিয়েছে সহস্রাব্দী বছর। আমাদের ভাবনাচিন্তার আভিজাত্যে এর ফলে যতই ঘা লাগুক না কেন বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে এ এক তর্কাতীত সত্য।

দুই.

সময় যাচ্ছে, নারীর প্রতি নিপীড়নের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, কিন্তু তার কোন ইতিবাচক সুরাহা দেখতে পান? এখনো দেশের ‘নারী নীতিমালা’ প্রণয়ন করার সময়ে মধ্যযুগীয় বর্বরদের সমতুল্য আলেমওলামা, মাশায়েখ নামধারী ধর্মব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে বসতে হয়। যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বাস দিতে হয় ‘কুরআনসুন্নাহ পরিপন্থী কোন নীতি নারী নীতিতে থাকবেনা!!’ সেখানে কি প্রাপ্তির কূহকী আশায় শাসকগোষ্ঠীর নিকট প্রত্যাশা করেন যে নারীর প্রতি নিপীড়নের কোন সুরাহা বা তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ তারা নেবেন? সেই প্রত্যাশার উপর দশকের পর দশক ধরেই কি সকল শাসকগোষ্ঠী মূত্র বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছে না? কেবল শাসকগোষ্ঠীকেই বা কেন দুষছেন? আমরা জনগণও কি হিপোক্রেট নই? নাইলে অন্যসব বিষয়ের মত নারীর প্রতি নিপীড়নের বিষয়তেও আমরা নির্লজ্জ শ্রেণী তোষণ, শ্রেণী মায়া ত্যাগ করতে পেরেছি কোথায়? এই তথাকথিত সভ্য দেশে যে কোন সময় আদিবাসী কোন কন্যা ধর্ষিত হয়, যে কোন সময়ে হতদরিদ্র কেরানীর মেয়েকে রাস্তা থেকে, স্কুল থেকে তুলে নিয়ে একপাল বুনো শুয়োর নিজেদের যৌন যন্ত্রনা মেটাতে পারে। তা নিয়ে কোন তথাকথিত সুশীল কিছু লিখবেন না, কোথাও কোন আওয়াজ হবেনা। ভিকারুন্নিসার কোন ছাত্রী শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষিত কিংবা যৌন নিপীড়নের শিকার হলে তার হাজার হাজার সহপাঠিনী ঠিকই শহীদ মিনারে এসে উপস্থিত হবে এবং ধর্ষণের বিরুদ্ধে গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার করবে কিন্তু সেই সকল নিম্নশ্রেণীর মানুষের ধর্ষণের বিরুদ্ধে তারাও “স্পিক ইট নট”। তাদের আশেপাশের কুলাঙ্গারদের মত তারাও ইতোমধ্যে মৃত্যু ধর্ষণের নির্লজ্জ শ্রেণী তোষণের মহিমা (!) শিখে ফেলেছে।

সর্বত্র অ্যাবসলিউট সাইলেন্স, অল কোয়াইট ইন দ্যা বাঙ্গালী ফ্রন্ট! শ্রদ্ধেয় স্যার সরদার ফজলুল করিম যেই নারী গার্মেন্টস শ্রমিকদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তারা যখন সকালে কারখানার উদ্দেশ্যে হেঁটে যায় তখন বিপ্লব হেঁটে যায়’। তারা প্রথম থেকেই গার্মেন্টসের মালিক থেকে শুরু করে ম্যানেজার, বায়ার, এমডিদের সকলের খাদ্য আর ভাড়াখাটা বুদ্ধিজীবী এবং স্টুপিড, অসংবেদনশীল পাবলিকদের কাছে জিডিপি বৃদ্ধির টুল বিশেষ। যাদের কথা উল্লেখ করলাম এরা সবাই তথাকথিত এই ডেভেলপড, আরবান, আপরাইজিং সিভিলাইজড সোসাইটিতে অচ্ছ্যুত, ব্রাত্য। সুযোগ সুবিধামত টেমপ্লেট হিসাবে কেবল তারা ব্যবহৃত হয় আর নাইলে সর্বত্রই তারা আমাদের নিকট অদৃশ্যমান, অস্পৃশ্য, অনাহুত। নারীর প্রতি নিপীড়নের কারণ, ধরণ ইত্যাদি বুঝতে হলে গূহ্যদ্বারের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দাঁত ভাঙ্গা কিছু ফেমিনিস্টের নাম মুখস্থ করা, তাদের রচনা সমগ্র পড়ে কন্ঠস্থ করবার প্রয়োজন পড়েনা। না প্রয়োজন পড়ে বাঘা বাঘা সব পন্ডিতদের নিয়ে প্রতি বছর সেমিনারসিম্পোজিয়ামের নামে প্রহসন আয়োজন করার। সেই ১৮৭৭ সালে লুইস হেনরী মর্গানের ‘অ্যানসিয়েন্ট সোসাইটি’ এবং ১৮৮৩ সালে ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ বইগুলোতে তো তারা বিশ্লেষণ করেই দেখিয়ে দিয়েছেন ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্রমবিকাশের পর কিভাবে গোটা পৃথিবী পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোতে গড়ে উঠে। সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন নারীদের প্রকৃত মুক্তি অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়; তাও তারা বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, যা এই ২০১২ সালে এসেও স্বমহিমায় ভাস্বর। তার সাথে এই উপলব্ধিও আসে যে, হাজারো শ্রেণী বিভাজনের এই সমাজে পুরুষদের যদি একশোটা ফ্রন্টে লড়তে হয় তবে নারীদের লড়তে হয় একশো একটা ফ্রন্টে। কিন্তু কিসের কি? হতদরিদ্র নারীর ছেড়া শাড়ী দেখিয়ে বিদেশ থেকে ডলার ভিক্ষা করে তার সিকি অংশ দিয়ে কর্পোরেট বেশ্যা থেকে শুরু করে শাসকগোষ্ঠীর বেনিফিসিয়ারী বেশ্যাদের সংলাপ, আলোচনা অনুষ্ঠান আর ‘নারী মুক্তির’ ছেনালীর কোন শেষ নেই, তা চলছে এবং চলবে।

তিন.

যেসব ভাড়াখাটা প্যারাসাইট বুদ্ধিজীবী ঢাকা শহরকে ‘তিলোত্তমা নগরী’ বলে পত্রিকার পাতা থেকে শুরু করে সর্বত্র তাকে নিয়ে মেকি, অন্তঃসারশূন্য উচ্ছাস প্রকাশ করেন তারা নিশ্চিতরূপেই ঢাকা শহরে পায়ে হেঁটে চলাফেরা করেন না। পায়ে হেঁটে চলাফেরা করলে দেখতে পেতেন যে, ঢাকা শহর একটা আস্ত গার্বেজ ছাড়া আর কিছুই নয়। কোটির উপরে মানুষ এই ভূতুড়ে শহরে যেভাবে বাস করে তাতে স্পষ্ট, সোজা ভাষায় একে ‘নির্ভেজাল গার্বেজ’ না বলাটা এক ধরণের ক্রাইম। সেই বুদ্ধিব্যাপারীরা ভাড়াখাটা না হলে দেখতে পেতেন যে, ট্রাফিক যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদিতে সাধারণ জনগণের ‘ভিক্ষা চাইনা মা, কুত্তা সামলাও’ গোছের অবস্থা। প্রতিদিন গড়ে ১৩১ টা করে প্রাইভেট কার এই কিম্ভুতকিমাকার শহরে রাস্তায় নামছে, মধ্যবিত্ত তাদের মৌলিক চাহিদা নিরুপণেই প্রতিনিয়ত জেরবার হলেও তাদের প্রাইভেট কার কেনার ব্যাপারে কোন ছ্যুৎমার্গ পরিলক্ষিত হয়না। প্রাইভেট কার ছাড়া মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর একাংশ সামান্য পায়ে চলার পথটুকুও চলতে চান না, শেরেবাংলা নগরে প্রতি বছরে বাণিজ্যমেলার সময়েই দেখতে পাওয়া যায় যেই পথটুকু পায়ে হেঁটে চলাটাই স্বাভাবিক এবং শোভন সেখানেও তাদের অনেকেই গাড়ী ঢুকিয়ে দিয়েছেন এবং আদিকালের জমিদারের ভঙ্গীমায় গাড়ী থেকে নেমে সরাসরি বাণিজ্যমেলার টিকেট কাটতে ঢুকেছেন। ধানমন্ডিতে ব্যাঙের ছাতার মত এদিকেওদিকে গজিয়ে উঠা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে সকালবেলার সময়ে দেখা যায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে তাদের পরম পূজনীয়, অনুসরনীয় (!) অভিভাবকরা সামান্য পথটিও হেঁটে যেতে দেন না, একেবারে স্কুলের গেটের সামনে নিজেদের আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য কেনা গাড়ী থামিয়ে তাদের নামান। শৈশব থেকেই সন্তানদের পরগাছা, যন্ত্রের প্রতি নির্ভরশীল না করে তুললে এবং তার মাধ্যমে নিজেদের ফাঁপা আভিজাত্য প্রদর্শন না করলে উচ্চ মধ্যবিত্তমধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর অ্যারিস্টোক্রেসির বুকে যেন বর্শার তীক্ষ্ণ ফলা বিঁধে যায়। যেই রাস্তায় ছয় ইঞ্চি বিটুমিন দেওয়ার কথা সেই রাস্তায় দেওয়া হয় এক ইঞ্চি বিটুমিন, এক বৃষ্টিতে নিমেষে সেই এক ইঞ্চি বিটুমিন ধুয়ে মুছে যায়। ব্যাস হয়ে গেলো, তারপর আবার মালকড়ির খেলা শুরু হবে, এরওর মুখে ফিডারের মত টাকার বোতল ঢুকিয়ে দাও আর নোটিশবোর্ডে টাঙ্গিয়ে দাও– ‘এই রাস্তার কাজ চলিতেছে!!’

মোদ্দাকথা হলো, শাসকগোষ্ঠী যেমন প্রত্যাশিতভাবেই প্রতিনিয়ত চলার পথকেও নরকে পরিণত করছে এবং করবে আমরা আবাল, স্টুপিড পাবলিকরাও কোন অংশেই নিষ্পাপ, সাধু নই। নইলে সায়েন্সল্যাব থেকে যেখানে পায়ে হেঁটে নিউমার্কেটে যেতে সর্বোচ্চ মিনিট দশেক লাগে সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে রিকশায় কোন বিচারে বসে থাকি আর উঠতেবসতে সরকারকে শাপশাপান্ত করি? জমিদারীও ফলাবেন, আবার আপনাদের জমিদারীতে ব্যাঘাত ঘটলে তার জন্য সরকারকে উঠতে বসতে গালিগালাজ করবেন, কিন্তু প্রতি পাঁচ বছর পর পর সেই বহুল প্রচলিত বচন ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশী তাকে দেবো’ শুনে গদগদ হয়ে নমঃ নমঃ করে ঈদ উৎসবের মত করে ভোট দিতে যাওয়াটাও বাদ দেবেন না; এতো হিপোক্রেসির বায়োস্কোপ কেন ভাই? এসবের সাথে ফ্রিতে অন্তত একটা লঞ্চডুবি তো আছেই, প্রতিবছর এমন কয়েকটা গণঅপঘাত হবে, প্রতিটার ক্ষেত্রে তথাকথিত একটা তদন্ত কমিটি গঠিত হবে। সেখানে বলা হবে, নৌ চলাচলের সহায়ক যন্ত্রপাতি নেই, চালকের অদক্ষতা, তলা ছিদ্র হয়ে যাওয়া, যাত্রী ও মালামাল ওভারলোডেড, জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের অভাবব্লা ব্লা ব্লা। ব্যাস প্রতি বছরে এই একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি এবং তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ঘুরে ফিরে একই অজুহাত যার আদৌ কোন সুরাহা হয়না, নিহতদের পরিবারের কপালে জোটে ছাগল, তা না পাওয়া গেলে হয়তো কিছু টাকা। বর্তমানে মৃত্যুও হয়ে উঠেছে এক অতুলনীয়, অনবদ্য সেলেবল কমোডিটি। এবার অবশ্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মেঘনা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় পাবলিকও তেমন উচ্চবাচ্য করেনি।

চার.

আবার কর্পোরেট বাহিনীর সিল মেরে দেওয়া ‘ক্রিকেটের মাঝেই নিহিত আছে প্রকৃত দেশপ্রেম’ আদর্শে বিশ্বাসী পাবলিক সাকিব, তামিমের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের মাঝেই নেশাগ্রস্তের ন্যায় বুঁদ ছিলো। কর্পোরেট আড়ৎদারদের কল্যানে এখন আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই ক্রিকেটের মাঝেই কেবল দেশপ্রেম খুঁজে পায়। কর্পোরেট বটিকা গিলে এটুকু বোঝার ক্ষমতাও আমরা হারিয়েছি যে, ক্রিকেট খেলায় জয়লাভে দেশের সম্মান সামান্য যাও একটু অর্জিত হয়, (আদৌ অর্জিত হয় কিনা সেই বিতর্ক তোলা থাকলো) গণঅপঘাতের জবাবে আমাদের সামষ্টিক নীরবতায় সেটা ধুয়েমুছে যেতে মোটেও সময় লাগেনা। কিন্তু কি আর করা? কর্পোরেট ব্যাপারীদের দেখিয়ে দেওয়া পথ অনুসরণ করার কারণে ১০ বছর আগের বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ১০ জন খেলোয়াড়ের নামও বলতে না পারা নব্য ক্রিকেটপ্রেমীরাও আজকাল একেকজন বিরাট বড় ক্রিকেটবোদ্ধা! দেশপ্রেম কেবল ক্রিকেটেই পুঞ্জীভূত হতে থাকে, আর সবই তো লবডংকা, কর্পোরেট ভানুমতির এই হল অভূতপূর্ব এক খেল।

পাঁচ.

পূর্বেই বলেছি, আমরা নির্লজ্জ্ব শ্রেণী তোষণ আর শ্রেণী মায়া ত্যাগ করতে সক্ষম নই। আর তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হলো, সাম্প্রতিক সময়ে র‌্যাব, ক্রসফায়ার ইত্যাদি নিয়ে সহজিয়া, মেঠো সংস্কৃতির! বাঙ্গালীর যথাকিঞ্চিত মেঠো সুরের, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ মার্কা প্রতিবাদ তাও ভিকটিমের শ্রেণী চরিত্র বুঝে। বলছি বটে, নাইলে দেখতে সমর্থ হতাম যে আজকে কালকে নয় সেই ১৯৭২ সাল থেকেই বিশেষ একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের নির্বিচারে এবং অবাধে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যেই রক্ষীবাহিনী, চিতা, কোবরা এবং সর্বশেষে র‌্যাবের জন্ম দেওয়া হয়েছে। একদিকে, সুশীলেরা এসি রুমে বসে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ইত্যাদি প্রলাপ বকবেন; অন্যদিকে, মাও সেতুঙ অনুসারী কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ‘চরমপন্থী’ আখ্যা দিয়ে দক্ষিনাঞ্চলে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, আধুনিক মারনাস্ত্র দিয়ে র‌্যাবকে সাজিয়ে ‘অপারেশন স্পাইডার ওয়েভ’ চালানো হবে। কেবলমাত্র ‘গোপন দল’ করার অপরাধে কোথাও কোন পুলিশ কেস না থাকা সত্ত্বেও ৬৩ বছরের বয়োঃবৃদ্ধ কমিউনিস্ট বিপ্লবী মোফাখ্খারুল ইসলাম চৌধুরীকে ঠান্ডা মাথায় র‌্যাব কর্তৃক হত্যা করা হবে এবং আবার সেই ঘটনা ঘটবে বিজয় দিবসেই! (তারিখটা হলো ১৬ ডিসেম্বর ২০০৪)। কথায় কথায় যে কোন সরকারকে সমালোচনায় উড়িয়ে দিলেও গোপন দলগুলো ‘এক পাল সন্ত্রাসীদের আখড়া’ এবং ‘মাওবাদী সন্ত্রাসী’ সেই বিষয়ে শাসকশ্রেণীর সাথে আমাদের বিশ্বাসের এক অপূর্ব মিল। আমরা তখন স্বেচ্ছায়, নিজেদের সম্পূর্ণ সমর্থণে শাসকশ্রেণীর কোলাবরেটর। এমনকি ৫৬ বছর আগে যেই বাংলা ভাই কর্তৃক বগুড়ায় একজনকে পিটিয়ে তার লাশ উল্টো ঝুলিয়ে রাখার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো সেই মানুষটিও একজন কমিউনিস্ট ছিলেন। মৌলবাদী গোষ্ঠী, চোর ছ্যাচ্চোড়, চাঁদাবাজদের কেউ কখনো র‌্যাবের ক্রসফায়ারে না পড়লেও প্রয়োজন হলে গভীর সুড়ঙ্গ পর্বত থেকে হলেও মোফাখখার ইসলাম চৌধুরী, : টুটুলদের ধরে ধরে এনে মেরে ফেলা হবে এবং যথারীতি সর্বত্রই “নো কমেন্টস”।

এমনকি শাহবাগ, প্রেসক্লাব, কলাভবন, টিএসসিতে দাঁপিয়ে বেড়ানো তথাকথিত বামদলগুলোও তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করবেনা। একদিকে, সুশীলেরা গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার নিয়ে সেমিনারসিম্পোজিয়াম ইত্যাদি করে একাকার করে ফেলবেন, ইন্টেলেকচুয়ালিটির তোড়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করা বুদ্ধিব্যাপারীরা আধা সামন্তবাদী, নয়া ঔপনিবেশিক, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির আগ্রাসনে পীড়িত দেশে জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠা করার অলীক স্বপ্ন দেখবেন; অন্যদিকে, বিনা বিচারে, উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে ধরে ধরে মেরে ফেলা হবে ‘গোপন দল’ করা বিপ্লবীদের। পত্রিকার ভেতরের কোন পৃষ্ঠায় কিংবা শেষ পৃষ্ঠায় লিখে দেওয়া হবে অমুক জায়গায় র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে অতজন চরমপন্থী সন্ত্রাসী নিহত, ব্যাস কাহিনী খতম। ২০০৪ সালে র‌্যাবের জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত যেই ২৪০০ জন বিপ্লবী কর্মীকে হত্যা করেছে মিডিয়া, পত্রপত্রিকার কল্যানে তারা সকলেই গোটা বিশেক খুন, গোটা দশেক ডাকাতি এবং গোটা পাঁচেক ধর্ষন মামলার আসামী! তখন কিন্তুসেই সকল বুদ্ধিজীবী বেশ্যা থেকে শুরু করে আমাদের কারো মনে হয়না গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিই সার্বভৌম। ব্যক্তির ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে ধারণ করে গড়ে উঠা এবং পরিচালিত হওয়ার মধ্যেই রাষ্ট্রের নিজের নায্যতা নিহিত। কিন্তু সেটা যদি বিদ্যমান রাষ্ট্র ধারণ না করে তাহলে, খোদ রাষ্ট্রটিকেই আমূল বদলে ফেলার তাগিদ বোধ করাটাই স্বাভাবিক এবং তা নায্য হতে বাধ্য। ফলে রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন যে কোন ব্যক্তি মানুষের যে কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শে বিশ্বাস করার অধিকার আছে। এমনকি দলটি সশস্ত্র রাজনৈতিক দল হলেও তাতে কিছু যায় আসেনা। এটাই কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতাদর্শ এবং প্রায়োগিক বিভিন্নতা থাকবেই। সেক্ষেত্রে সকল দ্বন্দ্বের মীমাংসা রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। ফৌজদারী কায়দায় বা পাল্টা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পথ অনুসরণ করা হলে ফলাফল বিপদজনক হতে বাধ্য, সেই রাষ্ট্রকে কোনভাবেই তখন আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা যায়না, যাবেনা। এর জবাবে কি তারা কেউ কিছু কখনো বলবেন? কিংবা আমরা কি এসব শুনে নিজেদের মানসিকতা বদলে নিরাপত্তা বুঝে, ভিকটিমের শ্রেণী চরিত্র বুঝে মেঠো মেঠো স্বরে মৃদু প্রতিবাদ না করে দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে, স্পষ্ট করে বলতে সক্ষম হবো যে, র‌্যাবের মতো রাষ্ট্রীয় খুনে, ফ্যাসিস্ট বাহিনী যতদিন থাকবে, ততদিন কোনভাবেই এই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়? নৈবঃ নৈবঃ চ, আমরা এখনো তা পারিনি। কারণ চেষ্টাই করিনি কখনো, এটাই ঐতিহাসিক সত্য, বজ্র কঠিন বাস্তবতা।

They are celebrated because they are displayed as celebrities, their very image is dependent upon publicity . – C . Wright Mills

ছয়.

বিজ্ঞান ও টেকনোলজির উল্লম্ফনের এই যুগে কিন্তু দ্বান্দ্বিকভাবে অস্থির, অশান্ত এই সময়ে সবাই সেলিব্রেটি হতে চায়। কেউ দু’দন্ড বসে কিছু নিয়ে চিন্তা করবে, তার সামান্যতম ফুরসতটুকুও নেই, কারণ তাহলে সেলিব্রেটি হবার পেছনে সময় দেওয়া কমে যাবে। পিছিয়ে পড়তে হবে লক্ষ্যহীন, তাৎপর্য্যহীন কিন্তু নানাবিধ মাদকতাময় আকর্ষনের হাতছানি দেওয়া এই সমাজে, স্থান পাওয়া যাবেনা তথাকথিত এই আরবান, আপরাইজিং, ডেভেলপড, কালচার্ড, সিভিলাইজড সোসাইটিতে। অ্যাফ্লুয়েন্ট বা প্রতুল সমাজে ক্রমাগত অভাব সৃষ্টি হতে থাকে, অভাব পূরনের মধ্য দিয়ে যাকে সূত্রাকারে লিপিবদ্ধ করেছেন গলব্রেথ, আমেরিকান খাদকসমাজের আচরণ লক্ষ্য করে। বিজ্ঞান ও টেকনোলজির যত উল্লম্ফন ঘটে, তত বেশি অভাবও বৃদ্ধি হয় এবং স্বভাবতই চাহিদা বাড়তে থাকে।

উৎপাদকেরা বিজ্ঞাপন ও বিক্রয়কলার মাধ্যমে চাহিদার বাজার অন্বেষণ করেন এবং চাহিদার বীজ নানাভাবে ছড়ান যেন নিত্যনতুন অভাববোধ মানুষের মধ্যে জাগ্রত হয়। আধুনিক ধনতান্ত্রিক সমাজে দুই ধরণের বিজ্ঞাপন থাকে, যার একটি হলো কমব্যাটিভ। এর লক্ষ্য হলো ছলেবলে কৌশলে ক্রেতাকে প্রলোভন দেখিয়ে তার চারপাশের আবহে একটা কৃত্রিম প্রয়োজন সৃষ্টি করে তাকে তাদের পন্যের ভোক্তায় পরিণত করা। এবার উপরিউক্ত কথাগুলোর সাথে ডেসটিনীর কর্মকান্ড এবং তার ফলাফলের তুলনামূলক পর্যালোচনা করে দেখুন, কি পেলেন? মনে হচ্ছেনা ডেসটিনী, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ইত্যাদি গোছের ধান্দাবাজি, বাটপারি সবই সেই কনজিউমারিজমেরই খেল? নিশ্চয়ই তাই (প্রসঙ্গক্রমে রাখঢাক না করে বলেই রাখি ৩ বছর আগে নিজেও প্রলোভনে পড়ে, কিছু না বুঝেই সেখানে জড়িয়ে পড়েছিলাম, ধান্দাবাজিটা যখন বুঝতে পেরেছি ততদিনে পাঁচ হাজার টাকার গচ্চা যাওয়া নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো)। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা খরচ করাও, ধানাইপানাই গোছের একটা আঙ্কিক হিসাব দেখাও, যাতে ছয়মাসের মধ্যে তুমি লাখপতি হয়ে যাবে এমন অলীক স্বপ্নকেও বাস্তব মনে হবে। তাই কি হয়নি? ঠিক তাই হয়েছে, বিপননের এই যুগে লাখ লাখ তরুণ ঠিকই কিন্তু এই আইডিয়া গিলেছে। যেই বুদ্ধিব্যাপারীদের মাথা থেকে এই আইডিয়া বের হয়েছে তাদের বুদ্ধির তারিফ করতে হয় বৈকি!

তাদের শ্রেণী চরিত্র বুঝে নিজেদের ফায়দা হাসিল করার কৌশলের দিকে তাকান, বেছে বেছে তারা তরুণ, যুবক বয়সের ছেলেপেলেদের কাছেই গেছে এবং লাখ লাখ ছেলেপুলেকে সর্বস্বান্ত করে গেছে। কারণ এই অস্থির সময়ে বয়স, বাস্তবতা উভয়ের কারণেই তারাই সবচাইতে বেশি অস্থির এবং অশান্ত। তারা দুই দন্ড বসে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল সেই চিন্তা করবারও ফুরসত পায়না, তাদের কেবল চাই দ্রুত বড়লোক হবার বাসনার পূরন। এই অস্থিরতা কাদের সৃষ্ট? অবশ্যই শাসকশ্রেণীর, তাদের স্বার্থ কি? তাদের স্বার্থ হলো, এই যুবক বয়সের ছেলেপেলেদের ভোগের নেশায় বুঁদ করে রাখা গেলে তারা আর কোনভাবেই বিদ্যমান এই ফ্যাসিস্ট, আপাদমস্তক সর্বনাশা, অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার ইচ্ছা প্রকাশ করবেনা। ভোগের সাগরে, দ্রুত বড়লোক হবার তাড়নায় তাদের বুঁদ করে রাখা গেলে কোনভাবেই তাদের খেয়ালে আসবেনা যে, যেভাবে সব চলছে সেভাবে চলতে পারেনা। রাষ্ট্রের, সমাজের খোলনলচে পাল্টে না দিলে মুক্তি নেই।

দোষ কি কেবল শাসকশ্রেণীর? নিশ্চয়ই নয়, দোষ আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের উপরেও অবশ্যই অনেকাংশে বর্তায়। এই সমাজে পরিবার হতেই সর্বপ্রথম একটি শিশু কিভাবে স্ট্যাবলিশমেন্টের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে উপরে উঠতে হয়, তা শিখে। ছোট একটি উদাহরণ দেই : কয়টি পরিবারে আছে যেখানে একটি শিশুকে ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ীঘোড়া চড়ে সে’ ধরণের বচন শোনানো হয়না? এক্ষেত্রে লেখাপড়া করার বিষয়টি শিশুটির মনে যতটা না রেখাপাত করে, তার চেয়ে অনেক বেশি রেখাপাত করে গাড়ীঘোড়া চড়ার বিষয়টি কারণ অভিভাবকেরা সেই দিকটাকেই ক্যাশ করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করার জন্য অনুপ্রাণিত করার অপচেষ্টা করেন। তা স্ট্যাবলিশমেন্টের সাথে ফষ্টিনষ্টি না করে বেড়ালে গাড়ীঘোড়া চড়া সম্ভব নয়, তা কি আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের মানুষেরা, যারা এখন অভিভাবক তারা জানেন না? বিলক্ষন জানেন। উপরিউক্ত বচনটি আরো অনেক আগে থেকেই প্রচলিত হলেও শৈশব হতেই একটি শিশুকে এই বচন শুনিয়ে যাবার পরিনাম বর্তমানের ভোগবাদী, বিপননময় সমাজেই সবচাইতে বেশি ভয়াবহ হয়েছে। এখন আর কেউ তার ছেলে কিংবা মেয়ে লেখক হতে চায়, কিংবা হতে চায় বিজ্ঞানী, এটা সহ্যই করতে পারেন না, তাদের সেই ব্যাপারে একেবারে হিটলারের নির্বিচারে ইহুদী নিধনের মত জিরো টলারেন্স পলিসি। তার ফলাফল? ফলাফল হলো, শিল্পসাহিত্য ইত্যাদি সবই বর্তমানে কর্পোরেট কর্তৃক কেনাবেচা হয় এবং এই বিপননকে আদর করে বলা হয়– “মর্ডানাইজেশন, নেক্রোপলিশন”। আর তার সাথে ছোটবেলা থেকেই প্রত্যেকের মাঝে সামষ্টিক চিন্তার পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার জয়জয়কার। দীর্ঘমেয়াদে তার পরিনাম কিন্তুসেই অভিভাবকদেরও ভুগতে হয়, দিনকে দিন বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি সেই পরিনতিকেই চিহ্নিত করে।

সাত.

আমরা জাতিগতভাবেই যে কোন কিছুকে নিজেদের সুবিধামত অনুকরণ করতে সিদ্ধহস্ত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার পরিনামটা হয় ভয়াবহ। এই দেখুন না, লেনিন নামক টেকো মাথার এক মহান নেতার নামে ‘লেনিনবাদ’ হতে সময় লেগেছিলো তিন দশক। কিন্তু আমাদের বাম রাজনীতির পয়গম্বর হিসাবে বিবেচিত কিছু বাম দলের সম্মিলিত ঐক্য প্রচেষ্টার নাম ‘ঐক্যবাদ’ হতে এক দশকও লেগেছে কিনা সন্দেহ। সেই তথাকথিত ‘ঐক্যের’ ফলাফল এবারে হাতেনাতে দেখা যাচ্ছে। তিন মাস আগেই ঢাকাকে বিভক্ত করার প্রতিবাদে যাদের বিভিন্ন প্রোগ্রাম করতে হয়েছিলো, তিন মাস পরে এসে দেখা যাচ্ছে তারাই সুড়সুড় করে আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা ঔপনিবেশিক, সম্প্রসারনবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির চাপে পিষ্ট একটি দেশে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। আহা! আহা!! কি চমৎকারই না দেখা গেলো, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতাধারী বিদ্যমান বুর্জোয়া ফ্যাসিস্ট দলগুলো যেন বসে আছে বামপন্থীদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার জন্য! বামদলগুলো যেন তাদের ইশকের দোস্ত, বাচপানকা সাথী!! পার্লামেন্ট যে প্রকৃতপক্ষে ব্যাপক জনগণকে আইনি উপায়ে শোষনলুন্ঠন ও নিপীড়ন করার প্রতিষ্ঠান ব্যতীত আর কিছু নয়, তা যেন আমরা কেউ আমাদের বাপের জন্মেও শুনিনি এবং জানিনা। তাও বিশেষত সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ দ্বারা পীড়িত এই বঙ্গদেশের বেলায় এই বিষয়টি আরো স্পষ্ট সত্য।

কিন্তু কিসের কি? ‘সৎ লোককে নির্বাচনে জিতিয়ে ক্ষমতায় বসিয়ে জনগণের ঢাকা প্রতিষ্ঠিত করবো’ ধরণের জামাতি স্টাইলের শ্লোগানে বাম রাজনীতির পয়গম্বর দলগুলোর কড়াইয়ে সমগ্র বাম রাজনীতিই ভাজাভাজা হয়ে যাচ্ছে। মাও সেতুঙ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও’ পদ্ধতি সূত্রায়িত করে তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর আমাদের এই বাম পয়গম্বর দলগুলো আরো এককাঠি সরেস। তাদের কান্ডকীর্তি দেখে মনে হচ্ছেতারা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ‘শহর দিয়ে গ্রাম ঘরাও’ এর অতুলনীয় এবং অভূতপূর্ব পদ্ধতির সূত্রায়ন এবং তার যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়েই ছাড়বেন!

দলগুলোর কোন নেতাকে আপনি নির্বাচনের বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করুন, সাথে সাথে লেনিনের নাড়িভুড়ি আপনার সাথে কপচাবেন নিশ্চিত। মহামতি লেনিন ১৯১২ সালে রাশিয়ায় ‘ডুমা’ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাই স্থান, কাল, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটকে বৃদ্ধাঙগুলি দেখিয়ে ১০০ বছর পরেও বাংলাদেশে অবিকৃতভাবে ঠিক তাই করতে হবে। ইদানিং বামদলগুলোর এসব কান্ডকীর্তি দেখে মনে হচ্ছে ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ নন, মহামতি লেনিনই বাংলাদেশের বামদলগুলোর কথা কল্পনা করে লিখে গিয়েছিলেন। লেনিন ১৯১২ সালে সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের সোভিয়েতে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসাবে যথার্থভাবেই ‘ডুমা’ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর ২০১২ সালে এসে আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা ঔপনিবেশিক, সম্প্রসারনবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির চাপে পিষ্ট বাংলাদেশে বামদলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের কৌশল হিসাবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে পাথেয় ধরে নিয়েছেন। সেটাও লেনিন যে ডুমাকে ব্যবহার করেছেন তার বিশিষ্টতা, লেনিনের সংগ্রামের স্থানকালের স্বতন্ত্রতা ও বিশ্বসমগ্রতাকে পর্যালোচনা না করেই। অথচ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে পার্লামেন্ট রাজনীতিতে কৌশল হিসাবে অংশগ্রহণ যে রাষ্ট্র কর্তৃক তিরোহিত একটি বিষয় এবং সেটাও যে বুর্জোয়া সংবিধানের কাঠামো দ্বারা নির্দিষ্ট শর্ত পালনের শর্তাধীন যা কৌশলকে নীতি হিসাবে গ্রহণের শর্তাধীন করে এই বিষয়টিও তথাকথিত বামদলগুলো সন্তপর্ণেই তাদের স্বীয় রাজনৈতিক ফায়দার উদ্দেশ্যে এড়িয়ে যায়।

সেই রাজনৈতিক স্বার্থের মাঝে যে কৃষকশ্রমিক, সর্বোপরি শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের কণামাত্র উপস্থিতি নেই, তা বলাই বাহুল্য। অথচ হাতের কাছেই পার্লামেন্ট ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার পরিনামের কত শত উদাহরণ আছে। চিলির দিকে তাকানো যায়, ইন্দোনেশিয়ার দিকে তাকানো যায়। নেপালের পুষ্পকমল প্রচন্ড ও বাবুরাম ভট্টারায় বর্তমানে পার্লামেন্টারিয়ান ব্যবস্থায় চলে গিয়ে নিভৃতচারী সুবিধাবাদীতে পরিণত হয়েছেন। সবচাইতে বড় এবং তাৎপর্য্যপূর্ন্য উদাহরণ ভারতের দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়। ১৯৬৭ সালে কমরেড চারু মজুমদার ‘নকশাল আন্দোলন’এর মাধ্যমেই কিন্তু তৎকালীন ভারতের অন্তঃসারশূন্য, সংশোধনবাদী ঘেরাটোপে ঘুরপাক খাওয়া আন্দোলনকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বিপ্লবের চৌরাস্তায় টান দিয়ে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এবং সেই কাজটি তিনি করেছিলেন তৎকালীন ভারতের বাম দলগুলোর পার্লামেন্টারিয়ান রাজনীতির পশ্চাতদেশে লাথি মেরেই। এসব কান্ডকীর্তি দেখার পরে সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ উপন্যাসের অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে ‘সুবাস দা’ চরিত্রে অভিনয়কারীর সেই উক্তিটির কথা মনে পড়ে যায়– ‘আমরাই তো আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু অনিমেষ’; আলবৎ তাই। আমরাই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।

শেষ কথা

স্কুলকলেজে রচনা লিখার সময়ে শেষে এসে উপসংহার লিখতাম, এই লেখাতেও সেই উপসংহার টানছি। বাংলাদেশকে নিয়ে কর্পোরেট দস্যুরা আমাদের অনেক অলীক স্বপ্ন দেখাতে পারে। পেইড আপ বুদ্ধিজীবীরা পত্রপত্রিকায়, টকশোতে এসে অনেক আশাবাদ শোনাতে পারেন কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে ৪০ বছরের মধ্যে ১৭ বছরই সামরিক শাসনের অধীনে থেকে সামরিক শাসনের সিল মোহরাঙ্কিত হওয়া এবং ক্রমাগত কর্পোরেট আড়ৎদারদের কাছে সবকিছু বিকিয়ে দিয়ে বসা বাংলাদেশ বর্তমানে কর্পোমিলিটোক্রেসির অভূতপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত একটা স্বাধীন, সার্বভৌম, নয়া উপনিবেশের অভয়ারণ্যের অপর নাম ছাড়া আর কিছু নয়। কখনো ঘুরে দাঁড়িয়ে তা আমাদের সবার প্রত্যাশিত ও কাম্য সোনার বাংলা হতে পারবে কিনা সেই প্রশ্ন আরেকদিনের জন্য তোলা থাকলো॥

(লেখাটি মঙ্গলধ্বনির ২য় প্রিন্ট সংখ্যায় [জুন ২০১২ সংখ্যা] প্রকাশিত হয়েছে।)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s