এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক সুসমাচার এবং বর্তমান ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক দলের অবস্থা

Posted: জুন 30, 2012 in দেশ, মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

গণতান্ত্রিক সামরিক স্বৈরতন্ত্র...বাংলাদেশের মহান ‘গণতন্ত্রী’,বহু চমকপ্রদ কর্মের অপনায়ক, পীরবাদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের রূপকার, রাষ্ট্রধর্ম নামক অভিনব ধারণার প্রবর্তক সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ গত ২৬ জুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তাকে আর ‘স্বৈরাচারী’ না বলার জন্য সবাইকে ‘অনুরোধ’ জানিয়েছেন। তার এই অনুরোধের বিশেষত্ব এই যে, সরকারি ক্ষমতার রক্ষণব্যূহের অভ্যন্তরে বসেই তিনি তার এই ‘সবিনয়’ বক্তব্য পেশ করেছেন। ১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় এই জাতীয় ‘অনুরোধ’ করার মতো অবস্থা তার ছিল না। কারাবন্দী অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে দর কষাকষি, মাথার ওপর ঝুলে থাকা মামলার খড়গ অপসারণ, রাষ্ট্রপতি কিংবা ক্ষমতাসীন দলের শরিক হওয়ার জন্য উপর্যুপরি আলোচনা চালানোপর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো পেরিয়ে আসবার পর নিজের এতো সাফল্যে মোহিত হয়েই এখন তার মনে হচ্ছে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শরীরে লেগে থাকা কলঙ্কের শেষ পঙ্কিল ছাপটুকু মুছে ফেলা দরকার। এই কারণেই সংসদে বাজেট আলোচনার ওপর বক্তব্য প্রদান করতে গিয়ে তার এই স্বৈরাচারী প্রসঙ্গের অবতারণা। এই বক্তব্য প্রদানের সময় তিনি আরো বলেছেন, তাকে স্বৈরাচারী বলা হলে তিনি নাকি ‘মনে ব্যথা’ অনুভব করেন! সরকার দলীয় অন্যান্য সংসদ সদস্যও তার এই বক্তব্যকে এই সময় সমর্থন জানান (সূত্র: bdnews24.com)

এরশাদের এই কথার সূত্র ধরে বলতে হয়, এখন যদি রাজাকারকুল শিরোমণি গোলাম আজম কারাগারের প্রকোষ্ঠে বসে বলেন যে তাকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে আখ্যায়িত করলে তার বুকের বাম দিকে বিদ্যুৎ চলকের মতো কিঞ্চিৎ বেদনার উদ্ভব হয় এবং এ কারণে তাকে আর যুদ্ধাপরাধী না বলাই উচিত, তখন কী করা যাবে? সরকারি দলের লোকজন কি তার এই কথা মেনে নেবেন? নাকি গোলাম আজম এবং তার দল এখন ক্ষমতায় নেই বলে তাদের বক্তব্য এক্ষেত্রে উপেক্ষিত হবে এবং মহান ‘গণতন্ত্রী’ এরশাদ বর্তমান সরকারের শরিক হওয়ার কারণে তিনি সংসদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘেরাটোপে দাঁড়িয়ে এ জাতীয় বক্তব্য দিতে পারেন এবং সংসদে উপস্থিত সরকারের সংসদ সদস্যরা এ কথা মেনে নেন?

এ বিষয়ে এরশাদের বক্তব্যের মূল সুর হলো, যেহেতু তিনি ১৯৯০ সালে ‘স্বেচ্ছায়’ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তার এই মহান কর্মের জন্য এদেশে ‘গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত’ হয়েছিল; তাই তিনি একজন ‘গণতন্ত্রী’ এবং এ কারণে তাকে ‘স্বৈরাচারী’ বলা মহা অন্যায়! তিনি তার এ বক্তব্যের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে জেলখানায় বন্দী অবস্থায় তার সাথে সরকার কর্তৃক কী ধরনের অন্যায্য আচরণ করা হয়েছে তার ফিরিস্তি দেন এবং বাংলাদেশের ‘অখণ্ডতা’ রক্ষার স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে কী ‘মহান কর্মে’ লিপ্ত ছিলেন, সে বিষয়ে উল্লেখ করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ওপর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেতৎকালীন শেখ মুজিবের সরকার, তথা রাষ্ট্রযন্ত্র বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে; যখন শেখ মুজিব আদিবাসীদের সামনে ‘বাঙালি’ হওয়ার তত্ত্ব হাজির করেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্ম পরবর্তী প্রতিটা সরকার আদিবাসী, বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির সাথে কোন ধরনের আচরণ প্রদর্শন করে এসেছে, সে বিষয়ে সামগ্রিক মানবমুক্তির সংগ্রাম সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখা ব্যক্তিবর্গ কমবেশি অবগত আছেন। পরবর্তীতে, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হওয়ার পর, তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পাহাড়ি অঞ্চলে বাঙালি সেটলারদের ভূমিস্বার্থ সৃষ্টি এবং এই ইস্যুতে সে অঞ্চলের সামরিকায়নের মাধ্যমে অশান্তির এক দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতির সূচনা করা হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে পাহাড়ি জনগোষ্ঠিকে মাইনরিটি করার মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবেই পাহাড়কে সামরিকায়ন করা হয়। সেই সাথে চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আদিবাসীদের জোরপূর্বক গুচ্ছগ্রাম তৈরী; তাদের বাসস্থান ও চাষের জমি কেড়ে নিয়ে সেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাস্তুহারা বাঙালি সেটেলারদের ‘পুনর্বাসন’ করা হয়। কোন বাঙালি সেখান থেকে চলে যেতে চাইলে তাদের ধরে এনে আর্মি ক্যাম্পে আঁটকে রাখা হতো এবং এখনো এই ঘটনা চলমান। এক কথায় জিয়াউর রহমান এই পাহাড় দখল ও আদিবাসী নির্যাতনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেন। এরপরে ১৯৯৭ সালের তথাকথিত ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ স্বাক্ষরের পর এতোগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও নির্যাতনের জের পুরোদমে এখনো সেখানে রয়ে গেছে। পাহাড়িবাঙালির মধ্যে পারস্পরিক সাধারণ অবিশ্বাসের যে বাতাবরণ এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল, তা এ দেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্যভাবে যোগ করেছে নেতিবাচক মাত্রা।

জিয়াউর রহমানের পর একই শ্রেণীচরিত্রসম্পন্ন আরেক সামরিক শাসক সর্বজনাব এরশাদ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জাতিবিদ্বেষের পটভূমিকাটি কৃতিত্বের সাথে স্বমহিমায় অনড় রাখেন এবং এই বিষয়ে সম্ভাব্য যা কিছু করা দরকার সবই করেন। এরশাদ এখন দাবি করছেন তিনি সেখানে তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করলে পার্বত্য অঞ্চলটি কার্যকরভাবে তার ভাষায় ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ করায়ত্ত হতো এবং ভূখণ্ডটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ দেশের অখণ্ডতা বিনষ্ট হতো। সংসদে তার এই ভাষণ শুনে মনে পড়ে যায় প্রতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের প্রচারণায় ভিয়েতনাম যুদ্ধে তাদের কৃতিত্বের ফিরিস্তি তুলে ধরে প্রতিযোগিতায় নামার কথা। তারা প্রত্যেকেই ঐ যুদ্ধে নিজের ভূমিকাকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অপেক্ষা বড় করে দেখানোর প্রচেষ্টায় প্রাণপাত করেন। অথচ রাজনৈতিকভাবে সচেতন বিশ্বের জনগণের সমগ্র অংশ জানেন যে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল বিগত শতাব্দীতে একটি স্বাধীনচেতা রাষ্ট্রের ওপর মার্কিনীদের অন্যতম নিকৃষ্ট একটি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। সেই সামরিক আগ্রাসনে স্বস্ব ভূমিকাকে মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেটনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে বেশ ফলাও করে প্রচার করা হয়ে থাকে। আকারে এবং ব্যাপকতায় তার তুল্য না হলেও বাংলাদেশের অখণ্ডতা রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এরশাদ নিজের অবদান সম্পর্কে সদম্ভে যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানে ঐ মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীদের ভিয়েতনাম যুদ্ধে তাদের ভূমিকা নিয়ে করা বাগাড়ম্বরের কিঞ্চিৎ ছাপ পাওয়া যায়! তিনি যেই সুরে সংসদে দাঁড়িয়ে এ কথা বলেন, তাতে মনে হয় বাস্তবিকই তাকে ‘স্বৈরাচারী’ না বলে এ দেশের রাজনীতির একজন ‘ট্র্যাজিক হিরো’ এবং ‘জীবিত শহীদ’ বলাই অধিক যুক্তিসঙ্গত!

এরশাদ যেই যুক্তি দেখিয়ে নিজেকে গণতন্ত্রী প্রমাণ করতে চাচ্ছেন, সেই একই যুক্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সাবেক রাষ্ট্রপতি ডব্লিউ ডি ক্লার্ককে সে দেশের বর্ণবাদ বিলোপের অন্যতম পুরোধা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। একইভাবে কিউবার ফ্যাসিস্ট বাতিস্তাকেও তার দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রধান পুরুষের তকমা আটানো যায়। কেননা এরা ক্ষমতা ছেড়েছিলেন বলেই (বাস্তবে এদের বাধ্যতামূলক পতনের মধ্যে দিয়ে) দক্ষিণ আফ্রিকা এবং কিউবায় যথাক্রমে বর্ণবাদী ও ফ্যাসিস্ট শাসনের বিলোপ ঘটে এবং বর্ণবাদবিরোধী ও সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এভাবে নিজ নিজ দেশে ক্ষমতা থেকে বাধ্যতামূলক অপসারণের পূর্বে উভয় শাসকই তাদের শাসননির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী অভিযান পরিচালনাকারী (দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে নেলসন ম্যান্ডেলার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং কিউবার ক্ষেত্রে ক্যাস্ট্রোর নেতৃত্বাধীন একদল বিপ্লবী, পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টি) রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে চরম ফ্যাসিস্ট আক্রমণ বজায় রেখেছিলেন। নিতান্ত বাধ্য না হলে এবং এই সংগ্রাম কোনো কারণে সফল না হলে তারা যে শুধু ক্ষমতা ছাড়তেন না তাই নয়, ম্যান্ডেলা এবং ক্যাস্ট্রোকে শারীরিকভাবে হত্যা করে তাদের আন্দোলনের পূর্ণ মৃত্যু ঘটাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না। কিন্তু বিপ্লবী গেরিলা অভিযান, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং তীব্র গণরোষের মুখেই তাদেরকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছিল। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা কিউবাই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এ রকম নজির রয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষমতা হতে বিদায় নেয়ায় শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিলোপে ডি ক্লার্ককে ম্যান্ডেলার সাথে সমানভাবে কীর্তিমান নেতা হিসেবে দেখিয়ে ১৯৯৩ সালে যৌথভাবে দুজনকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, ডি ক্লার্ক ম্যান্ডেলার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ানোর কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবলোপন ঘটেছেনোবেল পুরস্কার প্রদান ছিল এমন ধারণারই চক্রান্তমূলক স্বীকৃতি যা কার্যকর করা হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির গোপন রাজনৈতিক কার্যকলাপের দ্বারা। সেই হিসেবে ১৯৯১ সালে এরশাদপরবর্তীকালে বাংলাদেশে যে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন হয়, তাকে যদি আমরা ‘গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে আখ্যায়িত করি, তাহলে এরশাদ অবশ্যই বাংলাদেশে এই ‘গণতন্ত্র’ প্রবর্তনের সিদ্ধপুরুষ!

২৬ তারিখ এরশাদ সংসদে দাঁড়িয়ে যেসব কথাবার্তা বলেছেন তা এভাবে প্রকাশ্যে উচ্চারণের জন্য যে সাহসের প্রয়োজন তার যোগান দেয়ার ভিত্তি আরো অনেক দিন আগে থেকেই এ দেশের মাটিতে স্থাপিত হয়ে তা ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে আসছিল। অর্থাৎ, রাজনৈতিকভাবে প্রচারিত মতবাদকে যদি আমরা কোনো বৃক্ষের সাথে তুলনা করি তাহলে বলতে হয় যে, এর বীজ দেশের রাজনৈতিক মাটিতে অনেক আগেই অঙ্কুরিত হয়েছিল এবং ক্রমাগত তা চারিদিকে তার শেকড় ছড়াচ্ছিল। তবে ভিত্তি স্থাপন বা বীজের অঙ্কুরোদগম যে নামেই আমরা আখ্যায়িত করি না কেন সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়নি। গণস্মৃতি খুবই স্বল্পস্থায়ী (Public memory is too short) বলে একটি মতবাদ রাজনৈতিক মহলে খুব চালু আছে। অর্থাৎ, জনগণ খুব দ্রুত তার ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো সাবেক ফ্যাসিস্টদের প্রকৃত স্বরূপ ভুলে যায়। এটি সত্য হলেও কোনো স্বাধীন স্টেটমেন্ট নয়। কেননা এই ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটি আপনাআপনি ঘটে না, এটাকে ত্বরান্বিত করে সাবেকদের বদলে ক্ষমতায় আসা নতুন ফ্যাসিস্টদের আরো অধিক হারে জনগণের ওপর শোষণনিপীড়ননির্যাতন চালানোর বিদ্যমান শাসন প্রক্রিয়াটি। বাংলাদেশে নির্যাতক এই মৌল শাসন প্রক্রিয়া এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতির পরও পূর্ণ মহিমায় বলবৎ আছে। এরশাদের দীর্ঘ এক দশকের অপশাসনের স্মৃতি তাই জনমনে ধূসর হয়ে আসে, পরবর্তী দুই দশকের অধিককাল ধরে চলে আসা নির্বাচনী রাজনৈতিক দলগুলোর ‘গণতান্ত্রিক’ দৌরাত্ম্যে। এ কারণে ক্ষমতায় থাকাকালীন এরশাদ কী কী অপকর্ম করেছেন তার তথ্যপূর্ণ আলোচনার চেয়ে ক্ষমতা হতে বহিষ্কৃত হয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দলগুলো কর্তৃক কতোখানি অন্যায় আচরণের শিকার হয়েছিলেন, তার আবেগময় আলোচনা বিভিন্ন মহলে বেশি হতে দেখা যায়। এর অন্য একটি চেহারাও রয়েছে। শুধু যে ক্ষমতাসীন ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক দলগুলোর ‘সুশাসনের’ কারণেই এমনটা ঘটে তা নয়। সম কিংবা ততোধিক দক্ষতায় কার্যকর রয়েছে দেশিবিদেশি কর্পোরেটপুঁজিপতিদালাল এবং অধিপতি (মূল ধারার) দালাল মিডিয়ার অদৃশ্য মিথষ্ক্রিয়ায় দেশের জনগণকে রাজনৈতিক ইতিহাস ভুলিয়ে রাখার প্রজেক্ট। এই প্রজেক্ট অত্যন্ত দক্ষ এবং নিজ কার্যসিদ্ধিতে সক্ষমজনগণের চিন্তার জগতে তার মুহুর্মুহু পদচারণায় গণমানস হতে ইতিহাসসংলগ্ন দায়বদ্ধতা তিরোহিত হয়ে তা পরিণত হয়েছে বোধহীন, স্ববিরোধী চেতনার আস্তাকুঁড়ে। এদের মূল লক্ষ্যবস্তু তরুণ প্রজন্ম। এ দেশের স্মার্টতরুণ সমাজ আজ প্রায় ভুলেই গিয়েছে সেই শাসনামলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার ইতিহাস, বিস্মৃত হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের’ কথা। কেননা তারা আজ এই দিনটিতে মত্ত হয়ে ওঠে ‘ভালোবাসা দিবস’ নামক এক শেকড়হীন, সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত উৎসব পালনের প্রতিযোগিতায়। ১৪ ফেব্রুয়ারির স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসকে এভাবে ভুলিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে এই ভালোবাসা দিবসের ‘অবদান’ অনস্বীকার্য! এই দিবসটিকে এভাবে মানুষের চিন্তাজগতে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে ‘সুশীল’ হিসেবে অভিহিত মূলধারার দালাল পত্রপত্রিকা এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বাড়াবাড়ি রকম উৎসাহের কারণ দ্বিবিধ। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যায় যে মধ্যবিত্তশ্রেণীর ভোগপ্রবণতাকে উষ্কে দিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধি এবং প্রতিরোধের সংগ্রামী চেতনা ও এর রাজনৈতিক ইতিহাসকে বিস্মৃত করার এই কার্যকর প্রক্রিয়া প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে বেশ ভালোমতোই বলবৎ আছে। এ ক্ষেত্রে প্রচার মাধ্যমের (যাকে গণমাধ্যম বলেও অভিহিত করা হয়ে থাকে) মালিকদের শ্রেণীচরিত্র এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বলয়ে এদের অবস্থানকে চিহ্নিত করতে পারলে এর উদ্দেশ্যটা বোঝা সহজ হয়। তাদের এই উদ্দেশ্যমূলক তৎপরতার চোরাবালিতে অপহৃত হয় সঠিক ইতিহাস, চেতনা, প্রতিরোধের সংস্কৃতি। কিন্তু বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, এভাবে কোনো স্থান অপূর্ণ থাকতে পারে না। কোনো নির্দিষ্ট জায়গা হতে বস্তু সরিয়ে নিলে চারিদিক হতে বায়ু এসে যেমন সেই স্থান পূর্ণ করে, তেমনি জনগণের মানসজগৎ হতে এই সমস্ত বিষয় অন্তর্হিত হলে তার জায়গায় ফাঁপা মূল্যবোধ, ভোগপ্রবণতা, উদ্দেশ্যহীন উৎযাপনের বিকারগ্রস্থতা, অহেতুক উচ্ছ্বাসএসব সমবেতভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নেয়।

সুতরাং ১৯৮৩ সালের এই দিনে এরশাদ সরকারের মজিদ খান শিক্ষা কমিশনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদের আন্দোলনে জয়নাল, দীপালি সাহাদের রক্ত ঝরানোর কথা কারো আর মনে থাকার কথা নয়। একইভাবে যুবমানসের স্মৃতির ক্যানভাস হতে মুছে গেছে ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রসমর্থিত ছাত্র সমাজের সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ছাত্রকর্মী রাউফুন বসুনিয়ার নাম। ডঃ মিলন কিংবা নূর হোসেনকে কেন্দ্র করে বছর ঘুরে তাদের আত্মদানের তারিখ ফিরে ফিরে এলে আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব স্মৃতিচারণের মেলা বসেযার সাথে স্বৈরাচারবিরোধী চেতনার কোনো কার্যকর সম্পর্ক থাকে না। বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যখন এরশাদকে জেলে বন্দী রেখেছিল, তখন তাদের পক্ষ থেকে দিবসগুলো লোক দেখানো হলেও পালন করা হতো। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে এরশাদকে জেল থেকে বের করে আনার পর রাজনৈতিক দলগুলো তার সাথে বিভিন্ন সময় দরকষাকষির এক পর্যায়ে পারস্পরিক হাত মেলানোর পর তাদের এইসব স্বৈরাচারবিরোধী দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটেছে! এই ঘটনা আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয়ের জন্যই সমানভাবে এক নির্জলা সত্য। সেই সাথে এ কথাও সত্য যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন এই রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদ আমলের চাইতে উৎকৃষ্ট কোনো শাসন দেশবাসীকে উপহার দিতে পারেনি। সুতরাং ক্ষমতাসীন অবস্থায় এরশাদের স্বৈরাচারী আচরণের সমালোচনা করার নৈতিক অবস্থান এই মুহূর্তে তাদের কারোই নেই। সেই অভিপ্রায়ও যে তাদের নেই এ কথা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল, পাল্টা দখল, সকল ধরনের দুর্নীতিসহ অন্যান্য অপকর্মের সুযোগসুবিধার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে শাসকশ্রেণীর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে চুলোচুলি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাকে এ দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ বলে কথিত মহলের একাংশ ‘দুই মহিলার ঝগড়াঝাঁটিহিসেবে আখ্যায়িত করে ‘পুরুষ’ এরশাদের শাসনামলের ‘মধুময় স্মৃতিচারণের’ পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।

১৯৯০ সালের পর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর অপরিসীম দুর্নীতি, দেশিবিদেশি পুঁজিপতি গোষ্ঠীর বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, জামায়াতের পাশাপাশি খুচরো আরো কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী দলের উদ্ভব হয়ে রাজনীতি ক্ষেত্রে অপরিসীম উৎপাত সৃষ্টি, সাম্রাজ্যবাদী মহলের উদ্দেশ্যমূলক চক্রান্তের বিভিন্নমুখী প্রসারের পর এরশাদের শাসনামলকে যদি অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শাসনকালের ‘সুবর্ণ সময়’, বা ‘স্বর্ণযুগ’ বলে প্রচার করা হতে থাকে, তাতেও আশ্চর্য হওয়ার কিছুই থাকবে না। বাংলাদেশে এ ধরনের সম্ভাব্য প্রচারণার ভিত্তি তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই তথাকথিত গণতান্ত্রিক স্বৈরাচারের ইতিহাস ১৯৭১ হতে আজ অবধি চলমান। এ বিষয়ে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে করা হয়েছে।

এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের পর মহান ‘গণতন্ত্রী’ এরশাদ ক্ষমতারোহন করে সংবিধানে চমৎকার একটি ধারণা রাষ্ট্রধর্মের সংযোজন ঘটিয়ে তার সাথে বাংলাদেশের আপামর আহাম্মক জনতার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, জিয়াউর রহমান কর্তৃক সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’র পূর্ণ মহিমায় অধিষ্ঠানের পর এরশাদ সাহেব প্রেসিডেন্ট হয়ে তাকে যথেষ্ট না মনে করে রাষ্ট্রের মুসলমানী করণের দিকে আরো এক ধাপ অগ্রসর হন। তার এই মহান কর্মের জন্য তাকে বাহবা দিতেই হয়! কেননা এরশাদ এই উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতেই এ দেশের মুসলমান সমাজ ধর্মহারা হতো এবং ৯০% মুসলিমবাঙালি অধ্যুষিত এই রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র পরিচয় বলে কিছু থাকত না! সুতরাং যেই কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কিছু দিনের মাথায়ই শেখ মুজিব ওআইসিতে দৌড় শুরু করেছিলেন, জিয়াউর রহমান কর্তৃক ‘বিসমিল্লাহ’র মাধ্যমে সংবিধানের অক্ষরপরিচয় সূচিত হয়েছিল, সেই একই মহানআবেগের বশবর্তী হয়ে এরশাদ রাষ্ট্রের ধমীর্য়করণের ষোল কলা পূর্ণ করলেন!

তবে এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পীরবাদের সক্রিয় প্রতিষ্ঠাতাও এরশাদ। তার শাসনামলের রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের কারণে এ দেশে এখন অনেক স্বনামধন্য পীরের আবির্ভাব ঘটেছে এবং তারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আস্তানা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে গদীনসীন হয়ে মুসলিমমানস আলোকিত করছেন। শুধু তাই নয়, এরশাদ ছিলেন এমন এক প্রেরিত পুরুষ, যিনি স্বপ্নের মাধ্যমে দৈবনির্দেশ (বুশ যেমনটি করেছিলেন ইরাক আক্রমণের পূর্বে) লাভ করে একেক শুক্রবার একেকটি মসজিদে যেতেন জুমার নামাজ আদায় করতে। এসবই ১৯৯০ সালের পূর্ববর্তী ঘটনাপরিণত বয়সের সমাজসচেতন মানুষের স্মৃতিতে যা এখনো সমুজ্জ্বল।

এরশাদের আমলে রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অবকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে এখন অনেক গালভরা আলাপ মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্য হতে উঠে আসে। এ কথা সত্য যে সেই সময় এসব খাতে কিছু উন্নয়ন লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু সেটাকে এরশাদের একক কৃতিত্ব হিসেবে ধরে নিয়ে তার মুহুর্মুহু প্রচারণা মূলত বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যক্তিপূজা সংস্কৃতিতে আবদ্ধ অবস্থায় থাকার একটি উদাহরণ। কাজেই যেভাবে রাজনৈতিক প্রচারণার জোরে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন ‘জাতির পিতা’, ‘স্বাধীনতার সমার্থক’, ‘বাংলাদেশের স্থপতি’; জিয়াউর রহমান ‘স্বাধীনতার ঘোষক’, ‘গণতন্ত্রের পুনর্জীবনদাতা’তেমনি এরশাদ আজ ‘পল্লীবন্ধু’, ‘যোগাযোগ উন্নয়নের রূপকার’ হিসেবে এ দেশের রাজনৈতিক আকাশে তারকার মতো জ্বলজ্বল করছেন! বাস্তবে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ এবং ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো থেকে এ দেশে এসেছিল তার একটা অংশ যে শুধু দুর্নীতির মাধ্যমে এরশাদ এবং তার দলের লোকজনের দেশেবিদেশের ব্যাংক ব্যালেন্স ভারি করেছে তাই নয়, এই বিপুল পরিমাণ ঋণ এবং তার সুদের অভিঘাত দেশের দরিদ্র জনগণের গলার ফাঁস হয়ে দেখা দিয়ে ক্রমাগত তার বন্ধন দৃঢ় করে চলেছে।

এরশাদ আমলের দুঃশাসন, দুর্নীতি, ফ্যাসিস্ট সামরিকায়ন প্রভৃতির বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা গণআন্দোলন বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যায়ে এসে যে স্তরে উন্নীত হয়, তার ফলশ্রুতিতেই তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং ১৯৯১ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকে এখনো পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি পর্যায়ক্রমে দেশ শাসন করে আসছে। (লক্ষণীয় বিষয় হলো, ১৯৯৬ সালের পর থেকে এ দেশে একক কোনো দলের পরিবর্তে জোট গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সরকার গঠনের সংস্কৃতি। একদিকে, আওয়ামী লীগজাতীয় পার্টি আরেক দিকে বিএনপিজামাতের সাথে আরো কিছু খুচরো পার্টি সংযুক্ত হয়ে জোট গঠন করে সরকারি ক্ষমতায় অবস্থান করছে অথবা সরকারবিরোধী আন্দোলন করছে। বিষয়টি বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর রাজনীতির একটি বিশেষ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাবহির্ভূত অবস্থায় নিজেদের বিভিন্ন সুকর্মের কারণে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ নিজেরাও এখন আর মনে করে না যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এককভাবে কারো ওপর নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের আস্থা জ্ঞাপন করবে। সুতরাং জোটমহাজোটপাল্টা জোট গঠনের মাধ্যমে সরকারি ক্ষমতার চর্চা কিংবা সরকার বিরোধী রাজনীতি পরিচালনা এখানকার মূল ধারার রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।)

বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক এভাবে শাসনকাজ পরিচালনা হওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এরশাদ আমলের সামরিক শাসন অপেক্ষা গুণগতভাবে উন্নত কোনো শাসনব্যবস্থা আমাদের সমাজে কায়েম হতে দেখতে পাই না। এ ক্ষেত্রে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আবার এক কাঠি সরেস। এরশাদ এবং তার জাতীয় পার্টিকে বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে লেজে বেঁধে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সংশোধনের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের নামে হাইকোর্টকে দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী বিষয়ক রুল জারি করিয়েছে এবং এর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রবর্তিত পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে বলে প্রচারণা চলছে। কিন্তু চমকপ্রদ বিষয় হলো এসব সত্ত্বেও জিয়াউর রহমানের ‘বিসমিল্লাহ’ এবং এরশাদের ‘রাষ্ট্রধর্ম’ এখনো সংবিধানে কার্যকরভাবে বহাল আছে! অর্থাৎ, সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষীকরণের নামে অনেক প্রচারণা চালিয়ে যে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করানো হয়েছে তার শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং শরীরে রাষ্ট্রধর্ম স্বমহিমায় ভাস্বর! আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এই কাঁঠালের আমসত্ত্ব এখন রাষ্ট্রের আমজনতাকে খাওয়াচ্ছে! এখানে উল্লেখ্য যে, ধর্ম ব্যবসায়ী দলের সাথে এই ‘সেক্যুলার’ আওয়ামী লীগের শরীয়াহ আইন কায়েমের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ভণ্ডামী আমরা নিকট অতীতেও প্রত্যক্ষ করেছি, যা আমাদের কাছে মোটেও বিস্মৃত নয়।

শুধু এক্ষেত্রেই নয়, জনগণের ওপর ফ্যাসিস্ট কায়দায় আক্রমণ, বিরোধী মত দলন, ছাত্র নিগ্রহ, রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় এবং তত্ত্বাবধানে গুমহত্যা, ধর্মীয় উগ্রবাদী মহলের আস্ফালন, উন্নয়নের নামে বৈদেশিক ঋণের অব্যাহত প্রবাহ এবং একে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের হস্ত সম্প্রসারণ সহ এরশাদ আমলের যে শাসনবৈশিষ্ট্যসমূহ গুরুতরভাবে লক্ষণীয় ছিল; তা বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে পূর্ণ দৌরাত্ম্য নিয়ে এ দেশে এখনো রাজত্ব করছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই গণনিপীড়নের মাত্রা এরশাদকেও ছাড়িয়ে গেছে। এসব বিষয়ে যেমন সংসদীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, তেমনি অভিন্নতা দেখা যায় ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে স্বৈরতান্ত্রিক এরশাদীয় শাসনামলের। আর এসব ঘটনার বিস্তৃত পটভূমিতে এরশাদ আমলের সামরিক নৈরাজ্য, ছাত্র নির্যাতন, ধর্মাশ্রয়ী চক্রান্তনীতি, সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালালীএসব কিছু এ দেশের জনগণের বিশাল একটি অংশের স্মৃতির সক্রিয় অংশ থেকে মুছে গিয়ে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ বিষয়ে তার অবগতি এরশাদ শুধু সংসদে দেয়া বাজেট আলোচনায় উপরোক্ত বক্তব্যের মাধ্যমেই প্রকাশ করেছেন তাই নয়, ক্ষমতাসীন জোটে তার জ্যেষ্ঠ অংশীদার আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরাও বিষয়টি ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারেন।

এসব কারণে এরশাদ যখন জাফর, জয়নাল, বসুনিয়া, ডঃ মিলন, নূর হোসেনদের লাশ এবং তার শাসনকালের হাজারো অপকর্মের ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে সংসদে বলেন “আমাকে স্বৈরাচারী বলবেন না” তখন এক সময় তার শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করা ক্ষমতাসীন প্রধান দলের সংসদ সদস্যরা তার বক্তব্যকে সমর্থন জানান। কেননা তারা নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসীন হলেও তাদের শাসন প্রক্রিয়া কোনোভাবেই তাদের ‘জাতভাই’ স্বৈরতান্ত্রিক এরশাদের চাইতে কোনো দিক থেকে ভিন্ন নয়। আর বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটাই সম্ভবতঃ সবচাইতে স্বাভাবিক ঘটনা!!

(লেখকের মূল লেখার বাইরে প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় সংযুক্তি হিসেবে কিছু কথা এসেছে, যা লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। – সম্পাদক)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s