লিখেছেন: আবিদুল ইসলাম

সমুদ্রে ভাসমান শরণার্থী১৯৭১ সালের শেষের দিকে নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর বিশ্বের এই অঞ্চলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে একটি স্বতন্ত্র পতাকা, নিজস্ব সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত, ফুল, ফল, পাখি সহ নিজস্ব মেদবহুল সাংসদমন্ত্রী, সরকারিবেসরকারি আমলা, প্রশাসন, দেশীয় কোটিপতিএসব কিছুই অর্জন করা গেছে। আমাদের সরাসরি শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শ্রেণী, সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী, সমর্থক সংবাদ মাধ্যম এবং সুশীলসমাজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে এসব কিছুর কথাই বারবার বলা হয়ে থাকে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও এবং রাষ্ট্রের নামের অংশ থেকে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ মুছে ফেলা গেলেও মূলগতভাবে রাষ্ট্রের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ, পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রের যে নির্যাতকনিপীড়ক রূপ প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল, তার বিপরীতে আদর্শগতভাবে স্বতন্ত্র কোনো শাসনকেন্দ্র এখানে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। কেননা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই যে শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রতিনিধির হাতে শাসনভার ন্যস্ত হয়, তারাই মূলত নির্ধারণ করে দেয় এই রাষ্ট্রের চরিত্র। এখানে প্রাথমিকভাবে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলটি ছিল মূলত মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আসা একটি সুযোগবঞ্চিত অংশ, যারা পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতা এবং শিল্পপতিব্যবসায়ীদের কাছে পাত্তা না পেয়ে নিজস্ব স্বার্থের উৎস সন্ধানে পৃথক রাজনৈতিক দল গঠন করেছিল। সেই রাজনৈতিক দলটির চরিত্র এবং শ্রেণীগত অবস্থান তাই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক শ্রেণী এবং ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা রাজনৈতিক শক্তির থেকে আদর্শগতভাবে ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। এ কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় লাভ করলেও তার নির্যাতক চরিত্র পরিবর্তিত হয়ে এখানে প্রকৃত মানবিকতাসম্পন্ন শাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শ্রেণীর শাসন বলয়ের বিভিন্ন স্তরে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের আচরণ, কথাবার্তা এবং কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাই বারংবার লাভ হয়েছে।

পাকিস্তানি আমলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাতে মূল ক্ষমতা থাকায় এ দেশীয় সম্পদ শোষণের মাধ্যমে এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ায় লুট হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতো। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর অভ্যন্তরীণ সম্পদের ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলে এ দেশে অনেক রকম উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং প্রভূত সম্পত্তির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু জনগণের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে সৃষ্ট এই সম্পত্তির বণ্টনের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় রাষ্ট্রের গণবিরোধী চরিত্র। অর্থাৎ, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে পাকিস্তানি আমলের মতো রাষ্ট্রের অন্য অংশে সম্পদ পাচার হওয়ার রাস্তাটি বন্ধ হলেও অন্য রূপে এবং শোষণলুণ্ঠনের ভিন্নতর প্রক্রিয়ায় আন্তঃশ্রেণী সম্পদ পাচারের প্রক্রিয়াটি বলবৎ রয়েছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মের পর এখানে সংবিধানের মূল চার স্তম্ভের একটি হিসেবে গ্রহণ করা হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদকে। অর্থাৎ, বাংলাদেশকে একটি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা প্রদান করা হয়। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাতাবরণে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে অস্বীকার করা হয় পাহাড়ি অঞ্চল এবং সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব। একই কারণে সে বছর পাহাড়ি উপজাতিদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের বিষয়টি তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পেশ করা হলে তিনি তার বন্ধু এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নেতা মানবেন্দ্র লারমার দাবিদাওয়াগুলো সরাসরিই অস্বীকার করেন এবং তাদের সবাইকে বাঙালি হয়ে যাবার পরামর্শ দেন। শেখ মুজিবুর রহমানের এই আচরণের সাথে বিস্ময়কর সাদৃশ্য লক্ষ করা যায় পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা লিয়াকত আলী খান এবং মুহম্মদ আলী জিন্নাহর, যারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে পূর্ব বাংলার জনসাধারণের মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি অস্বীকার করে আসছিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল প্রবর্তিত এই জাতীয়তাবাদের চরিত্র মূলত কেমন? এটা কি কোনো প্রগতিশীল চেতনা উদ্ভূত? বাংলাদেশে অবস্থিত অবাঙালি জনগণের অধিকারের বিষয়টি অস্বীকার এবং বাংলাদেশ বহির্ভুত অন্যান্য অঞ্চলের (মূলত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা) বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতি মনোভাব এবং তৎপ্রসূত আচরণ ও কর্মকাণ্ড থেকে তার খানিক আঁচ পাওয়া যায়। মূলত এই সাম্প্রদায়িকতার পোকায়খাওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদের হাত ধরেই পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদপাহাড়ি অঞ্চলে বাঙালি সেটলারদের জোরপূর্বক অবস্থান তৈরি এবং ঐ এলাকার সামরিকীকরণের মাধ্যমে তিনি শেখ মুজিবের আমলে পোষণ করা রাষ্ট্রীয় মনোভাবকে অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। ১৯৭২৭৫ সময়কালের সরকারের আমলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে যা ছিল অনেকখানি অস্পষ্ট আর অস্বচ্ছ আবরণসজ্জিত, জিয়াউর রহমানের আমলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নামে তার নগ্নরূপ উন্মোচিত হয়।

আবারও একই প্রশ্ন তোলা যায়, এই জাতীয়তাবাদের স্বরূপ কী? আগেই যখন বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রবর্তিত তথাকথিত বাঙালি অথবা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অধীনে অবাঙালি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর প্রান্তিক অবস্থান নিশ্চিত হয়েছিল, তাহলে এটা ধরে নেয়া কি সঙ্গত হবে যে এর মাধ্যমে বাঙালি বিপুল জনগোষ্ঠী, যারা দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৭%, এ দেশে তাদের সব রকম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? পাকিস্তানি আমলে সাংবিধানিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সৃষ্ট বৈষম্য তারা স্বাধীন বাংলাদেশে উত্তীর্ণ হয়ে কাগজেকলমে কেন্দ্রীয় অবস্থানে এসেছিলেন এ কথা সত্য, কিন্তু বাস্তব অর্থে সামগ্রিকভাবে তাদের অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এ কথা বলার উপায় আছে কি? এটা ঠিক, পাকিস্তানি আমলে যারা রাষ্ট্রীয় উপেক্ষার শিকার হয়েছিলেন তাদের একটি ক্ষুদ্র অংশ স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার করে প্রভূত সম্পত্তির মালিক হয়েছেন যেমন, তেমনি তারা রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছেন। এই শ্রেণীর লোকজন এখন ছড়িয়ে আছেন রাজনৈতিক দলগুলোতে, সামরিকবেসামরিক প্রশাসনে, শিল্পপতিবণিক সমাজে, এনজিও মালিকক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায়ীদের ভেতর, বেসরকারি প্রচারমাধ্যম সহ সুশীল হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিবর্গের মাঝে, ক্ষমতাকেন্দ্রিক অপরাধ বলয়ের অধিকর্তা হিসেবে।

কিন্তু শাসকশ্রেণী কথিত এই জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের বিপুল অংশের সাধারণ জনগণের জন্য কী আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে এসেছে? আমরা নিকট অতীত থেকে শুরু করে সুদূর অতীত এবং বর্তমানের বিভিন্ন ছোটবড় অভিজ্ঞতায় দেখেছি বিদেশি পুঁজিপতি গোষ্ঠী, বহুজাতিক কর্পোরেশন, তেলগ্যাসসহ খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী কোম্পানি, জাতিসংঘের অধীন এবং জাতিসংঘবহির্ভূত ঋণ প্রদানকারী অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান এবং সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে অধীনতামূলক চুক্তি সম্পাদন এবং এর মাধ্যমে দেশের জনসাধারণের অধিকার হরণ ও দেশীয় সম্পদ অপহরণের ঘটনাগুলোয় শাসকশ্রেণী প্রবর্তিত এই জাতীয়তাবাদ কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণভাবে এ দেশে শোষণনিপীড়নের যে প্রক্রিয়া বিদ্যমান তার কথা বাদ দিলেও বহির্বিশ্ব থেকে আমদানি হয়ে আসা জনস্বার্থবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিপরীতে এই তথাকথিত জাতীয়তাবাদ এ দেশের জাতীয় স্বার্থের সংরক্ষক কিংবা সক্রিয় পাহারাদার হয়ে উঠতে পারেনি। প্রধানত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ এবং তার সাথে ক্ষমতা বলয়ের কাছাকাছি থাকা এ দেশীয় কমিশনখোর উচ্ছিষ্টজীবী আমলাকেন্দ্রিক প্রশাসন ও তাদের ঊর্ধ্বতন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মন্ত্রীসাংসদরাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ব্যক্তিগত উন্নয়নের প্রয়োজনে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইত্যাদি অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলো হতে কঠিন শর্তে এবং অধিক সুদে ঋণ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এই ঋণের অর্থে অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের বিরোধী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, আবার কখনো যেসব প্রকল্পের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয় চূড়ান্ত বিচারে তার কোনো ইতিবাচক তাৎপর্য গোচরীভূত হয় না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণের অর্থের সিংহভাগ বিশেষজ্ঞ আর পরামর্শদাতা নিয়োগ এবং লজিস্টিক সাপোর্টের নামে আবার ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে ফিরে যায়। এছাড়া একটা বড় অংশ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বলয়ের কেন্দ্রে এবং কাছাকাছি অবস্থান করা ব্যক্তিবর্গের মধ্যে দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়ে যায়। অথচ গ্রহণ করা এই ঋণের মূল এবং সুদ সহ এর সমগ্র দায়ভার চেপে বসে সাধারণ জনগণের কাঁধে, সাম্রাজ্যবাদী ঋণের অভিঘাতে সংকুচিত হয় জনসাধারণের শিক্ষা, চিকিৎসা সহ রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা এবং অধিকারের ক্ষেত্রগুলো। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রতি ক্ষতিকর এই ধরনের চুক্তিগুলো সম্পাদনের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী রাজনৈতিক দল এবং তাদের ছাতার তলায় আশ্রয় নেয়া বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী, প্রচার মাধ্যম এবং সুশীল সমাজকে কোনো প্রতিরোধক ভূমিকা নিয়ে দাঁড়াতে দেখা যায় না।

একই কথা বলা যায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, তেলগ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানি, বিদেশি পুঁজিপতি এবং ইউরোপযুক্তরাষ্ট্র সহ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে। এর মধ্যে একদম সাম্প্রতিক দুটো দৃষ্টান্ত হলো ভারতের সাহারা গ্রুপ ও তার মালিক সুব্রত রায় কর্তৃক মাতৃভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে রাজধানীর কাছাকছি অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ভূমি দখলের পাঁয়তারা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তাদের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে মোতায়নের চক্রান্ত। এই দুটিই যে এ দেশের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হলে ভবিষ্যতে চরম বিপর্যয়ের কারণ হবে সেটা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না। আর সব কিছু বাদ দিলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন মার্কিন সপ্তম নৌবহরের ভূমিকা কারো অজানা নয়। সেই নৌবহর এখন বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে জলসীমায় বিদ্যমান খনিজ সম্পদ সহ এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ঘটনাবলির ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত করছে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত যে সব খবরাখবর পাওয়া গেছে তাতে দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা যে এক্ষেত্রে তাদের সহযোগী হবে এটা বোঝা যাচ্ছে। আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের মুখপাত্র রাজনৈতিক দল এবং বুদ্ধিজীবীদের কথায় কথায় দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গালভরা বুলি আওড়াতে দেখা যায়। এ বিষয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে অনেক সময় তারা রাজপথও কাঁপিয়ে তোলেন। অথচ ১৯৭১ সালে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার বিজয়কে নস্যাৎ করতে উদ্যত হওয়া মার্কিন এই নৌবহরের বাংলাদেশের সীমানায় উপস্থিতির সম্ভাবনার বিষয়ে তাদেরকে আমরা শুধু যে নিশ্চুপ দেখতে পাই তাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা এই ষড়যন্ত্রের স্থানীয় পক্ষও বটে। প্রায় একই ভাবে অজ্ঞাত পরিমাণ অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে হাতবদলের প্রক্রিয়ায় সুব্রত রায়ের সাহারা গ্রুপ এখন বাংলাদেশে মাতৃভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত, বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে ইতোমধ্যে দুর্মূল্য হয়ে ওঠা জমি লিজের নামে তাদের হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত প্রায়, নিজ দেশে ভুয়া প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে গরীব জনগণের প্রায় চল্লিশ হাজার কোটি রুপি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে। এখনো পরিমাণ নির্ধারিত না হওয়া এই জমির ওপর স্যাটেলাইট সিটি নামক কৃত্রিম নগর গড়ে তোলার কথাবার্তা চলছে, যেখানে বাংলাদেশের নব্য ধনিক সম্প্রদায়ের বসবাস এবং তাদের জীবন যাপনকে আরামপ্রদ করে তোলার জন্য সবরকম আধুনিক সুযোগসুবিধা থাকবে বলে শোনা যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় যে জমি সাহারা গ্রুপের অধিকারে আসবে সেখানে এবং তার আশপাশে অবস্থানকারী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অবশ্যম্ভাবীরূপেই তাদের বসত এবং জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হয়ে সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে এবং অপরাধিকৃত সামাজিকরাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের বিশাল একটি অংশের অন্ধকার বলয়ের অধিবাসী হওয়ার বিষয়টি পাকাপোক্ত হবে। একই সাথে বাংলাদেশের অত্যন্ত মূল্যবান এবং দুর্লভ সম্পত্তি যে ভূমি, তার একটি অংশ রাষ্ট্রীয় অধিকারের বাইরে চলে যাওয়ায় যে সামাজিকঅর্থনৈতিকরাজনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেবে এবং এর ফলে যে সমস্ত অভিঘাত সৃষ্টি হবে তার প্রকৃত পরিমাণ ও নেতিবাচক ফলাফলের পূর্ণাঙ্গ রূপ এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বরাবরের মতো এখানেও জাতীয়তাবাদীরা নিশ্চুপ।

এবার আসা যাক বর্তমানে জ্বলন্ত ইস্যু হয়ে ওঠা মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যে উদ্ভূত রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়টিতে। এই অঞ্চলের অধিবাসী এবং অনুন্নত রাষ্ট্র মিয়ানমারের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন একটি পরিচিত এবং পুরোনো বিষয়। কিন্তু বর্তমানে রাখাইনদের সাথে চলমান সংঘর্ষ ও এর ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ছেড়ে পলায়ন এবং উদ্বাস্তু হওয়া এমন এক মানবিক সঙ্কটে পরিণত হয়েছে যা আশু সমাধানের দাবি রাখে। বলা হচ্ছে, গত মে মাসে কয়েকজন রোহিঙ্গা যুবক কর্তৃক একজন রাখাইন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার সূত্র ধরেই এই সাম্প্রদায়িক সংঘাতের উদ্ভব। এই সংঘাতের ফলাফল হিসেবে দুপক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

জাতি হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভেতর অপরাধপ্রবণতার বিস্তারসংক্রান্ত কথাবার্তা নতুন নয়। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কর্তৃক কুখ্যাত নাগামিন অভিযানের পর প্রায় দুই লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। এরপরও তাদের আগমন অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়া এই সমস্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশের বিরুদ্ধে সীমান্তে চোরাচালান এবং ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টিসহ মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এবং আরো কিছু অপরাধে জড়িত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু জাতিগতভাবে একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীকে অপরাধী আখ্যা দিয়ে তাদের সবাইকে এর জন্য দোষী সাব্যস্ত করে চালানো প্রচারণার চরিত্র কী?

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের ভূমিপুত্র নয়, কিংবা এখানকার ক্ষমতা বলয়ের কাছাকাছি অবস্থানকারী কোনো গোষ্ঠীও নয়। তারা বাইরে থেকে আসা শরণার্থী। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে যদি অপরাধপ্রবণতা বিস্তারের শর্ত বিদ্যমান না থাকে তাহলে বাইরে থেকে আসা একটি গোষ্ঠী কর্তৃক সে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ফাঁকা এবং হাস্যকর ছাড়া কিছুই নয়। লক্ষ্য করার বিষয়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ কিন্তু অপরাধের উদ্ভব কিংবা নতুন কোনো অপরাধ সৃষ্টি নয়; স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান অপরাধ সমূহে জড়িত হয়ে পড়া এবং মৌলবাদী রাজনৈতিক চক্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা। এই যখন পরিস্থিতি তখন গণহারে তাদের সবাইকে অপরাধী আখ্যা দিয়ে জাতিবিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার চালানো উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছু নয়।

বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে অপরাধপ্রবণতার সম্প্রসারণে রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা কী এবং তার পেছনে বিদ্যমান কারণ ও শর্তসমূহ কী কী সে বিষয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে বর্তমান রচনাটির পরিসর বৃহৎ হতে বাধ্য, যা নিশ্চিতভাবে পাঠকদের ধৈয্যচ্যুতি ঘটাবে। তাই এ বিষয়ে আর অধিক অগ্রসর না হয়ে বর্তমান সঙ্কটের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যেতে পারে।

একজন রাখাইন নারীকে কয়েকজন রোহিঙ্গা যুবক কর্তৃক গণধর্ষণের পর হত্যা এবং তৎপ্রেক্ষিতে এক বাসভর্তি রোহিঙ্গার ওপর রাখাইনদের আক্রমণের মাধ্যমে এই সাম্প্রদায়িক সংঘাতের শুরু এবং তার সূত্র ধরে এই রোহিঙ্গারা বিপুল সংখ্যায় তাদের বসত ত্যাগ করে পালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা যায়। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের দুরাবস্থার জন্য তাদের নিজেদের সৃষ্ট অপকর্ম; অর্থাৎ, একজন রাখাইন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগের ওপর আলোকপাত করা হচ্ছে। আমরা একই রকম প্রচারণা দেখতে পাই ভারতের গুজরাটে ২০০২ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সমর্থনপুষ্ট ব্যাপক মুসলিম গণহত্যার ক্ষেত্রে, যেখানে অজুহাত হিসেবে গোধরা ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডে হিন্দু তীর্থযাত্রী হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তারও আগে ১৯৮৪ সালে দিল্লীতে কংগ্রেস সরকারের আমলে সংঘটিত শিখ ম্যাসাকারের মূল কারণ হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার বিষয়টি আলোচিত হতে দেখি। অর্থাৎ, এই ক্ষেত্রগুলোতেও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ব্যাপকভাবে হত্যা এবং উচ্ছেদের কারণ হিসেবে তাদের কৃত অপরাধকেই সামনে আনা হয়েছিল। কিছু উগ্র মুসলিম কর্তৃক সবরমতি এক্সপ্রেসে আগুন লাগিয়ে ৫০ জনের অধিক হিন্দু তীর্থযাত্রীকে জীবন্ত দগ্ধ করার অভিযোগে সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় সবাইকে এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্য গুজরাটের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ব্যাপক গণহত্যা এবং ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত শিখ দেহরক্ষী কর্তৃক তাকে খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এর জন্য দিল্লীতে শিখ জনগোষ্ঠীর লোকজনদের ওপর রাষ্ট্রীয় সমর্থনে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড পরিচালনার ভেতর আমরা মূলত একই জাতীয় ঘটনার দেখা পাই। উগ্র সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ কীভাবে একটি অজুহাতকে কেন্দ্র করে এর সামগ্রিক দায়ভার সম্পূর্ণ জাতিগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে তার উদ্দেশ্য সাধন করে এসব ঘটনার মধ্যে তার স্পষ্ট চেহারা ফুটে ওঠে। ভারতের বর্তমান কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার কর্তৃক শিখ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত একজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী করা এবং পূর্ববর্তী বিজেপি জোট সরকারের আমলে একজন মুসলিম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার মাধ্যমে তারা যতোই চেষ্টা করুক, তাদের মুসলিমঅথবা শিখবিদ্বেষী চরিত্র ঢেকে রাখা যায় না।

এখন মিয়ানমার থেকে তাড়া খেয়ে বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ সরকার তার সীমান্তের দ্বার রুদ্ধ রেখেছে। গত কয়েক দিনে নাফ নদী দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে যাওয়া কয়েকটি রোহিঙ্গাভর্তি নৌযান বিজিবি ফেরত পাঠিয়েছে। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেনযেহেতু শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়াসংক্রান্ত কোনো চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেনি, তাই তাদেরকে আশ্রয় দিতে তারা বাধ্য নন! বাংলাদেশের এই প্রভাবশালী মন্ত্রী হয়তো ভুলে গিয়েছেন, যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকারের মাথায় বসে তিনি এখন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা ভোগ করছেন সেই দলের লোকজনও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানের মুখে হতবিহ্বল হয়ে এ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরিস্থিতির ভিন্নতার যে যুক্তিই এখন উপস্থাপন করা হোক না কেন, তারা যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে সেদিন ভারতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এ কথা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই।

রোহিঙ্গা নির্যাতন এবং সীমান্তে তাদের প্রবেশাধিকার বন্ধে সরকারের ভূমিকা নিয়ে এ দেশে ধর্মের কারবারী রাজনৈতিক দলগুলো এখন নিজেদের শরীর গরম করে নিচ্ছে। তারা এখন এ দেশে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের প্রবেশাধিকার দাবি করছে এই যুক্তিতে যে যেহেতু এরা ধর্মীয় দিক থেকে মুসলিম, তাই ‘মুসলিমপ্রধান’ বাংলাদেশের উচিত তাদের জন্য অবিলম্বে সীমান্ত খুলে দেয়া। তাদের এই প্রচারণার আরেকটি অর্থ হলো, বিদ্যমান পরিস্থিতির আর সব উপাদান অক্ষুণ্ন রেখে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা প্রতিস্থাপিত হলেই তারা বর্তমান সরকারের সাথে অভিন্ন অবস্থানে সামিল হতো! ধর্ম নিয়ে বহুদিন ধরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে আসা এই রাজনৈতিক দলগুলোর গণবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং প্রচারণা সম্পর্কে সত্যিই নতুন করে আর কিছু বলার অবকাশ নেই।

এবার দেখা যাক বর্তমান রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী লোকজনের ভূমিকা কী! তাদের পক্ষ থেকে অনলাইনে এবং অন্যান্য মাধ্যমে বিভিন্ন প্রচারণায় বলা হচ্ছে, এই রোহিঙ্গারা উগ্র মৌলবাদী, তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে এখানেই স্থায়ী আবাস গড়ে তুলবে এবং পূর্বে আসা রোহিঙ্গাদের মতো স্থানীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে যাবে, মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করবে, বাংলাদেশ দরিদ্র এবং এমনিতেই জনবসতিপূর্ণ সুতরাং আরো মানুষ আশ্রয় দিলে এই দেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে, এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের কোনো লাভ নেই ইত্যাদি।

উগ্র জাতীয়তাবাদ যে চূড়ান্ত বিচারে সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের মতোই কুৎসিত প্রতিক্রিয়াশীল এবং মানবিকতাবর্জিত একটি পরিত্যাজ্য বিষয়; সাম্প্রতিক এই ঘটনার মাধ্যমে সেটা আবারো নতুন করে প্রমাণিত হলো। কয়েকজন যুবক কর্তৃক একটি ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তার জন্য দায়ী করে তাদের ওপর আক্রমণের ঘটনায় আরাকানভিত্তিক রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াশীল এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী অংশের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের যে পরিচয় পাওয়া যায়, উপর্যুক্ত কথাবার্তা এবং আচরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী মহলের আচরণে তার অভিন্ন রূপই আমরা দেখতে পাই। বর্তমানে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের এ দেশে আশ্রয় দানের যারা সমর্থন করছেন, তারা কেউই বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী আবাসের সমর্থক নন। তারা সবাই চান এই সমস্যার আশু সমাধান হোক, জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআরএর মাধ্যমে তাদের শান্তিপূর্ণ পুনর্বাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক, বিশ্বব্যাপী সক্রিয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তত্ত্বাবধানে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মহলের চাপে মিয়ানমারের জান্তা সরকার আরাকান রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিক এবং সেখানকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি প্রতিহত করুক। কিন্তু তার আগে সবচেয়ে জরুরি যে বিষয়টি সেটা হলো জীবন বাঁচানোর জন্য পলায়নরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের ব্যবস্থা করা। এই পালিয়ে আসা লোকজনের ভেতর রয়েছেন অসংখ্য নিরীহ নারীপুরুষশিশুবৃদ্ধ যারা কোনো অপরাধের সাথে কখনোই জড়িত নন, যাদের মধ্যে একটা বড় অংশ এখন বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকতে না পেরে নদীর ওপর আশ্রয়খাদ্যসম্বলহীন অবস্থায় অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শ্রেণী যেখানে তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো মানসম্পন্ন জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যারা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীসহ ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত সংখ্যালঘু নাগরিকদের ন্যূনতম অধিকার বা সুযোগসুবিধাদানের বিরোধী তারা ভিনদেশি জাতিগতভাবে অবাঙালি বিতাড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি কেমন মনোভাব পোষণ করবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ক্ষমতায় আসীন এই শ্রেণীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমর্থকপ্রচারকদের ভূমিকা তাদের থেকে অভিন্ন হওয়ার কথা নয়। তারা তাদের ঘৃণ্য ভূমিকা যথার্থতার সাথেই পালন করছেন।

যারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়দানের বিরোধী তাদের আরেকটা হাস্যকর যুক্তি হলো, এই রোহিঙ্গারা বাঙালি নয়। এই যুক্তি যে কতোখানি অসারতাপূর্ণ সেটা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় কারণ যারা এইভাবে আশ্রয়প্রার্থী হয়েছেন তারা কোনো বাঙালিত্বের দাবি নিয়ে এদিকে ছুটে আসছেন না। নিজেদের বিপন্ন অস্তিত্ব রক্ষা করতে এবং জীবন বাঁচাতেই তারা বাংলাদেশে আসতে চাইছেন। এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একটি বিশেষ ভাষায় কথা বলেন এবং সেটি তাদের নিজস্ব ভাষা। এই ভাষার সাথে চট্টগ্রামের অধিবাসীদের আঞ্চলিক ভাষার মিল রয়েছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভাষার এই সাদৃশ্য কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। বাংলার সাথে যেমন অহমিয়া কিংবা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার উচ্চারণ ও বর্ণবিন্যাসগত মিল আমরা দেখতে পাই। সুতরাং বাঙালিত্বের দাবি তাদের এখানে আশ্রয় লাভের নির্ধারক হতে পারে না। এই যুক্তি প্রদানের আরেকটা কুৎসিত অর্থ হলোএ কথা প্রচ্ছন্নভাবে বলা যে, যেহেতু তারা বাঙালি নয়, সেহেতু তারা এই দেশে আশ্রয় পাওয়ার অধিকারী নয়! উগ্র জাতীয়তাবাদপ্রসূত এই বক্তব্য নিয়ে আর অধিক কিছু বলার প্রয়োজন নেই। নিজেদের অসাম্প্রদায়িক হিসেবে প্রচার করা এই মহল এতোটাই ‘অসাম্প্রদায়িক’ যে তারা এ কথাও বলছেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া উচিত হবে না, কেননা তারা মুসলিম এবং বাংলাদেশও মুসলিমপ্রধান দেশ, সুতরাং এদের আশ্রয় প্রদান করলে বিষয়টি সাম্প্রদায়িক হয়ে যেতে পারে!! এই আত্মপ্রচারিত অসাম্প্রদায়িক সমাজ এবং মৌলবাদীসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ানা দেয়ার বিষয়ে যুক্তিতর্ক করতে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত পথ পরিভ্রমণ করে এসে একই বিন্দুতে মিলিত হয়েছে।

বাংলাদেশে অর্থের কাঁড়ি নিয়ে হাজির হওয়া বিদেশি ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেশন, খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী, সামরিক বাহিনী, লগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপর্যয়কর উপস্থিতি এই জাতীয়তাবাদীদের কপালে দুশ্চিন্তার রেখাপাত ঘটায় না। কিন্তু তারা কেঁপে ওঠে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার কথা শুনলে, বাংলাদেশে আটকে পড়া অবাঙালিদের সঙ্কটের সম্মানজনক সমাধানের কথা উচ্চারিত হতে দেখলে। তাদের জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হয় বিতাড়িত ভিনদেশি জনগোষ্ঠীকে এ দেশে আশ্রয় দেবার কথা বলা হলে। তাদের অবস্থা তখন এতো সঙ্গিন হয়ে পড়ে যে, তারা ব্যবসায়ীদের মতো এ ঘটনায় বাংলাদেশের লাভলোকসানের হিসাব নিয়ে বসে কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যচুক্তিগুলোর মাধ্যমে যখন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, পরিবেশগত এবং রাজনৈতিক লোকসানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয় তখন তাদের মুখে কোনো প্রতিবাদী স্বর উচ্চারিত হয় না। বাংলাদেশের ভূমির একাংশ একশ বছরের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেয়া, দেশীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিতে ঋণ নেয়া, উৎপাদন অংশিদারী চুক্তির নামে দেশীয় খনিজ সম্পদ বিদেশিদের হাতে উত্তোলনের ভার তুলে দেয়া, সাম্রাজ্যবাদী সামরিক নৌবহরকে এদেশের জলসীমায় স্থায়ী আসন গেড়ে বসার ব্যবস্থা করে দেয়াএ জাতীয় ঘটনাগুলোর বেলায় তাদের জাতীয়তাবোধের তাড়না অনুপস্থিত থাকে। এ থেকে বোঝা যায়এই তথাকথিত বাংলাদেশি অথবা বাঙালি জাতীয়তাবাদ এদেশে জাতীয় স্বার্থের সংরক্ষক তো নয়, উপরন্তু তা চূড়ান্ত বিচারে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের মতোই সংকীর্ণ, পশ্চাৎপদ এবং পরিত্যাজ্য প্রতিক্রিয়াশীল একটি বিষয়।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s