১। সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই

দুঃসম্পর্কের ছোট্ট বোনটি আমার

আমার মা তোমার মায়ের সাথে আমাকে পরিচয় না করিয়ে দিলে

হয়তো আমার জানাই হত না তুমি থাক কুমিল্লার কোথাও!

ঠিক যেমন অনেকেই পড়ে আছে বাংলাদেশে যাদের আমি এবং আমরা জানি না,

ঠিক যেমন তোমাকেও আজকের আগে জানতাম না কখনো।

এই উচ্চবিত্ত আত্মীয়ের উত্তরবিবাহ রিসিপশন পার্টির আলোঝলমলে পরিবেশে

তুমি বড়ো বেমানান।

এখানে

হো হো করছে,

হি হি করছে,

হা হা করছে,

ছবি তুলছে,

স্মৃতি জাবর কাটছে;

সব কিছুই করছেতুলছেকাটছে অসাধারণেরা।

কিন্তু তুমি তো খুবই সাধারণ!

তোমার

চুল সাধারণ,

চোখ সাধারণ,

মুখ সাধারণ,

পোষাক সাধারণ;

যা কিছু দিয়ে মানুষকে মূল্যায়ন করতে শিখেছি আমরা

তোমার ক্ষেত্রে তার সবই সাধারণ।

তুমি বসে আছ এক কোণায়; মা ছাড়া তোমার পাশে আর কেউ নেই

এই অল্প বয়সেই তুমি শ্রেণীবৈষম্যের পাঠ নিচ্ছ পৃথিবীর বৃহত্তম পাঠশালা থেকে;

আমরা যাকে জীবন নামে ডাকি।

তুমি বসে আছ

এক টুকরো অবহেলা হয়ে,

এক টুকরো বিষণ্নতা হয়ে,

এক টুকরো মনখারাপ হয়ে।

তোমাকে খুব বোকা বোকা লাগছে।

তুমি তোমার আম্মুর দিকে তাকাচ্ছ না,

তাকালে দেখতে পেতে তোমার মায়ের মুখেও এক ধরণের অপরাধবোধ।

তাকেও খুব বোকা বোকা লাগছে।

তুমি জানো না,

তোমরা জানো না,

তোমাদের জানতে দেওয়া হয় না,

আমরা তোমাদের জানতে দেই নাঃ

কেন তোমাদের অবহেলার মত লাগে,

কেন তোমাদের বিষণ্নতার মত লাগে,

কেন তোমাদের মনখারাপের মত লাগে,

কেন তোমাদের মুখে অপরাধবোধ লেগে থাকে,

কেন তোমাদের বেমানান লাগে উচ্চবিত্তের উৎসবে;

কেন…কেন…কেন…

কেন জানো না?

কেন জানতে দেওয়া হয় না?

জানলেই তো তোমরা প্রশ্ন করতে শিখবে;

আর যারা প্রশ্ন করতে শেখে

তারা একটা ছোট দেশলাই কাঠির মতই বিপজ্জনক!

জানতে দেওয়া হলেই তো তোমরা শ্রেণীস্বার্থে বুঝে নেবে

বৈষম্যের ব্যকরণ,

শোষণের রাজনীতি,

পীড়ণের করণকৌশল;

আর যারা শ্রেণীস্বার্থ বুঝতে শেখে

তারা নির্দ্বিধায় ভেঙে ফেলতে পারে এব্যবস্থা

যেখানে এক শতাংশ ভাল থাকে নিরানব্বই শতাংশের খারাপ থাকার বিনিময়ে!

সেটা তো আমাদের জন্য বড় ভয়াবহ হবে,

আমরা যারা অভ্যস্ত হয়ে গেছি বৈষম্যব্যবস্থায়,

আমরা যারা উন্মত্তের মত দৌড়াচ্ছি সামাজিক সাফল্যের রেসকোর্সে;

আমরাঃ যাদের হৃদয় জুড়ে নরক, দুচোখ জুড়ে লালসা।

দুঃসম্পর্কের ছোট্ট বোনটি আমার,

তোমার কাছেতোমাদের কাছে আমিআমরা

সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই।

তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও,

তোমরা আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও।

সাম্যবাদের সংগ্রাম চালাতে হবে তোমাদেরকেই।

দুনিয়াটা দখল করে নিতে হবে তোমাদেরকেই।

হ্যাঁ, শুধুমাত্র তোমাদেরকেই!!!

২। বিশ্বচাকরতৈরিকারখানা

‎“The university will not be manufacturer of slaves. We want to think truly. We want to teach freedom; freedom first, freedom second and freedom always!”

(Sir Ashutosh Mukherji: First Indian Vice Chancellor of the University of Calcutta)

আমরা পণ্য

আমাদের তৈরি করা হচ্ছে বিশ্বচাকরতৈরিকারখানাগুলোতে

কাঠামো দেয়া হচ্ছে বাজারে টিকে থাকার উপযোগী করে

গড়ে তোলা হচ্ছে তীব্র প্রতিযোগিতার বাস্তবতা মাথায় রেখে

আমরা যাতে নিরাবেগ জীবন্মৃত পণ্যে পরিণত হই সেই মহান উদ্দেশে নিরলস খেটে চলেছেন বিশ্বচাকরতৈরিকারখানাগুলোর দক্ষ শ্রমিকেরা

যাঁরা বাই এন্ড সেল ব্যবস্থার কাছে স্বেচ্ছাসমর্পিত, যাঁরা পণ্য তৈরির দক্ষ কারিগর

একদিন তাঁরাও ছিলেন আমাদের মতো

একদিন আমাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ হয়ে উঠবে তাঁদের মতো

বিশ্বচাকরতৈরিকারখানাগুলোর দক্ষ শ্রমিক,

দারুণ দক্ষতায় তারা তৈরি করতে থাকবে নতুন পণ্য

আমাদের অধিকাংশই অবশ্য হবে বিশ্বচাকর, বিভিন্ন ও বিচিত্র রকমের পণ্য, শোভা পাবে তৃতীয় বিশ্বের গৌরব সব কর্পোরেট দোকানের ডেস্কে ডেস্কে

অনেকে অবশ্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে, সব পণ্য তো আর বিক্রি হয় না !

তো, নিঃসন্দেহে বেশ চমত্‍কার চলছে এই বাজার অর্থনীতির যুগের বিশ্বচাকরতৈরিকারখানাগুলো

অতএব, আসেন আমরা উল্লাস করি বন্ধুগণ

আমরা বিশ্বচাকরতৈরিকারখানাগুলোতে পণ্য হিসেবে তৈরি হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, কী সৌভাগ্য আমাদের !!!

আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতির অদৃশ্য শেকলে বাঁধা চাকর হতে যাচ্ছি অচিরেই, কী সৌভাগ্য আমাদের !!!

প্রতিবাদের শ্লোগানে বিভ্রান্ত হবেন না বন্ধুগণ,

দেয়ালে দেয়ালে প্রতিবাদের জ্বলন্ত অক্ষর ভুলেও দেখবেন না কেউ

সিপাহী বিদ্রোহের কথা ভুলে যান

তেভাগা আন্দোলনের কথা ভুলে যান

একুশে ফেব্রুয়ারীর কথা ভুলে যান

নকশালবাড়ির বিপ্লবপাগল ছেলেমেয়েগুলোর কথা ভুলে যান

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা ভুলে যান

আর লাইফ এনজয় করার যে পথে হাঁটছে সবাই আপনিও হাঁটেন সেই পথে

মূলধারায় থাকেন

ঠেডা প্রকৃতির কেউ মানুষের মুক্তির কথা বিড়বিড় করে বলতে চাইলে মুখ বিকৃত করে বিপরীত দিকে হাঁটা শুরু করেন,

আরে ভাই, এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না !

ঠিক যেমন স্বাভাবিকঃ একটার পর একটা খুনের খবর প্রতিদিন পত্রিকার পাতায়, বড়লেখায় তিন বছরের কণ্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার, ক্রমবর্ধমান শ্রেণীবৈষম্য, রায়েরবাজার বস্তিতে আগুন, মেঘনা পারের বাতাস দুদিন পর পর ভারী হয়ে ওঠা স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে, বসুন্ধরা সিনপ্লেক্সে দল বেঁধে হৈ হৈ রৈ রৈ সিনেমা দেখতে যাওয়া, যশোরে বাম চরমপন্থী নেতার মৃত্যুতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো কারা যেন, চিটাগং হিল ট্র্যাকসে বাঙালি অবাঙালি পারস্পরিক খুনোখুনি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল হাটহাজারিতে ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি

সুতরাং বন্ধুগণ ! আসেন আমরা স্বাভাবিক থাকি

আসেন আকর্ষণীয় টেকসই পণ্যে পরিণত হই

আর উজ্জ্বল করতে থাকি বিশ্বচাকরতৈরিকারখানাগুলোর ভাবমূর্তি !!!

৩। “আরে, তারা তো মানুষ না; বস্তিতে থাকে”

(কড়াইল বস্তির সেই সাড়ে তিন বছরের মেয়েটিকে, যে সেদিন রাষ্ট্রীয় বুলডোজারের নিচে চাপা পরে মারা গিয়েছিল। মামণি, আমরা তোমাকে বাঁচাতে পারিনি। আমাদের মতো জানোয়ারদেরকে তুমি কখনো ক্ষমা কোরো না।)

যত শিশু যেখানেই নামহীন ঝরে যায়

আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই!” (সুনীল গঙ্গ্যোপাধ্যায়)

বাতাসে রটনা আর রটনা সর্বত্র এই মহানগরীর,

কড়াইল বস্তি উজাড়,

তার প্রতিবাদে পথে নেমে এসেছে অজস্র বস্তিবাসী,

আর এতেই ভীষণ ক্ষতি হয়ে গেছে এই নগরটির,

নাগরিকদের পোহাতে হয়েছে অসহ্য যন্ত্রণা।

তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে এই কলরবকারীর দল নগরে থাকলেও তারা নাগরিক না,

তারা ”বস্তিবাসী”।

এতে আপাত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই পারি আমি ও আমরা;

যাদের জানা নেই নিজের শেকড় থেকে সমূলে উৎপাটিত হলে কিরকম লাগে একজন মানুষের;

যাদের জানা নেই মাথার ওপর অনিশ্চয়তার আকাশ আর পায়ের নিচে টলোমলো জমিন থাকলে কিরকম লাগে একজন মানুষের।

এভাবেই আর কিছুদিন কেটে গেলে

উত্তেজনা নীরবতা শেষ হয়ে গেলে,

আমরা বেশ হাসিমুখেই শুনব পড়ব নতুন কোনো বস্তি উজাড়ের গল্প

এবং হাওয়ায় হাত নেড়ে হাসি মুখে অমলিন রেখে সহজেই বলব অনায়াসেঃ

আরে, তারা তো মানুষ না; বস্তিতে থাকে”!!!

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s