লিখেছেন: সত্যজিত দত্ত পুরকায়স্থ

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহামান্য (!) পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন বাংলাদেশে ২৪ ঘন্টার একটি সংক্ষিপ্ত সফর করে গেলেন। আমাদের মত তথাকথিত ৩য় বিশ্বের দেশের কাছে, বিশেষত এর শাসকগোষ্টির (ক্ষমতার ভিতরবাহির উভয় পক্ষ) কাছে তার এই ২৪ ঘন্টার ছোট সফর গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহের মধ্যে এ এক পরম শান্তির সুবাতাস। তার এই সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ সফরকে ঘিরে নানা আলোচনাআশাবাদশঙ্কা তৈরী হচ্ছে। পক্ষেবিপক্ষে আলোচনা চলছেই। হিলারী ক্লিনটনের এই সফরে এ ভুখন্ডে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যে আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছিল, তা স্পষ্টতই স্পষ্ট।

যতটুক বুঝা যাচ্ছে হিলারী ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরের সময় আলোচনায় উভয় দেশের মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার বিষয়, এমন কি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পায়। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হবার পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারাবিশ্বে বন্ধু (!) সংখ্যা বাড়াতে সবসময়য়ই সচেষ্ট এবং এই ক্ষেত্রে তারা সামরিক, বিশ্বায়নের নামে ফিন্যান্স পুঁজির অবাধ প্রবাহ এবং নিরাপত্তা ইস্যুকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। একসময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি বাংলাদেশ যে তাদের নয়াউপনিবেশবাদের ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হয়ে উঠছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের মালিকানা নিশ্চিত হবার ঠিক পরপরেই এই সফর অনুষ্টিত হচ্ছে। এই নতুন মালিকানার জোরে বাংলাদেশ তার সমুদ্রবক্ষের ব্লকগুলো আবার নির্ধারণ করবে এবং সারা বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর মার্কিনীদের সু(!)নজর সম্পর্কে আমরা সবাই জ্ঞাত। ফলে পুনঃনির্ধারিত তেলগ্যাস ব্লকগুলোতে মার্কিন কোম্পানীগুলোর উপস্থিতি সুনিশ্চিত করার জন্য একটা ওয়াদা ওয়াশিনংটন ঢাকার কাছে চাইতেই পারে। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভালো করেই জানে তার চিরশত্রু গণচীন কে কড়া নজরদারীর মধ্যে রাখতে হলে বঙ্গোপসাগরে তার অবস্থান শক্তিশালী করা ছাড়া গতি নাই। কারণ মায়ানমার যতই তার কাছ থেকে হাতিগাধার গণতন্ত্রের সবক শিখুক না কেন, সে কখনই তার প্রতিবেশী চীনকে ক্ষ্যাপাতে চাইবেনা। তাছাড়া এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই প্রকল্পের জন্য তার আজ্ঞাবহ পাকিস্তানের উপর সে নিজেই বিশ্বাস রাখতে পারছে না। আফগানিস্তানে তার ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু হওয়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষমেষ “ছেড়ে দে মা কেদে বাচি” অবস্থা, মার্কিন নেত্বতৃধীন ন্যাটো বাহিনীর এখন আফগানিস্তানে ন্যাংটা হবার দশা।

পুঁজিবাদী কর্পোরেট বিশ্বের নিকট আগামীর উজ্জ্বল তারকা, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত শক্ত প্রতিদ্বন্ধী ভারত; সে কৌশলগত বন্ধুত্ব মেনে নিলেও কারো ঘাঁটি হতে চাইবেনা। কারণ সে নিজেই এখন সারা বিশ্বে তার ঘাঁটি (বাজার) সম্প্রসারণে ব্যস্ত এবং বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের ৫২৭ টি দ্বীপের মালিক ভারত কৌশলগত কারণেই প্রতিনিয়ত তার শক্তি বাড়াচ্ছে। আন্দামানে সে আরো বিমানঘাটি নির্মাণ করবে, তৈরী করবে গভীর পোতাশ্রয়। তাছাড়া বাংলাদেশের সাথে তার সমুদ্র বিরোধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার শুনানী আসন্ন, এই মুহুর্তে সে এই নিয়ে কোন বিতর্কে জড়াতে চাইবে না।

বাকি থাকলো বাংলাদেশ। আমাদের মধ্যকার অনৈক্য, জাতীয় স্বার্থ বরবাদ করে বন্ধুর স্বার্থ বড় করে দেখার প্রবনতা সেই কাজকে আরো সহজ করে দেবে। আমরা বিদেশী পেলেই শুধু নালিশ করতে জানি, কারণ আমাদের চাই ক্ষমতার ভাগ এবং স্বাদ। কারণ নয়াসাম্রাজ্যবাদ ভালো করেই জানে বর্তমান সময়ে উপনিবেশ স্থাপন করবার চাইতে তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা নিরাপদ, সহজ এবং ঝুঁকিমুক্ত। ঐ দেশগুলোর বিদ্যমান অর্থনৈতিক সমস্যা এবং ঝগড়াটে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এই প্রক্রিয়াকে আরো সহজ করে দেয়। এর জন্য সে ঋণ দেয়, প্রাকৃ্তিক সম্পদের দিকে হাত এবং পা দু;টোই বাড়ায়। এর বাস্তব প্রমাণ আমাদের দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। গত ২০২২ বছরে এদেশে বিদেশী কুটনৈতিকদের আমরা যেভাবে ক্ষমতায়নের সুযোগ দিয়েছি, আমাদের আভ্যন্তরীন সকল বিষয়ে কথা বলার এমনকি নীতিনির্ধারনের সুযোগ দিয়েছি, তারা যে এখনো আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়নি এই আমাদের ভাগ্য। আর অসম পিএসসি, বহুজাতিক কোম্পানিকে ৯৪ ভাগ রয়েলিটি দেয়া, ইত্যাদির মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ তাদের থালায় তুলে দেবার আয়োজন যত সুন্দর করে করা যায় তাও আমরা করতে জানি।

এই সফরের সময় এদেশের জনগণের সামনে “নতুন বোতলে পুরানো মদ” যার শুধু লেবেলটাই পরিবর্তন করা হয়েছে, তা হয়তবা পরিবেশিত হচ্ছে না। এই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি “ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোঅপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টটিআইসিএফএ” সই না হলেও। তার বদলে দেয়া হয়েছে “বাংলাদেশযুক্তরাষ্ট্র অংশীদারী সংলাপ” এর যৌথ ঘোষণা । এটি মুলত টিআইসিএফ সহ অন্যান্য চুক্তি যেগুলোতে আমাদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হতে পারে যেমন সোফা, টিফা বা ভবিষ্যত কোন পিএসসির ভিত্তি ভূমি তৈরী করবে। কারণ এই সংলাপের অধীনে প্রতিবছর উভয়দেশের উচ্চপর্যায়ের যে বৈঠক অনুষ্টিত হবে এতে আমাদের প্রাপ্তির খেড়োখাতা হবে শুন্য, আমাদের বাকপটু আমলা এবং নীতিনির্ধারক রাজনীতিবিদগণ যে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে কিছু আদায় না করে শুধুমাত্র বন্ধুত্বের খাতিরে সবকিছু দিয়ে আসতে পারদর্শী তার প্রমান তারা অতীতে বহুবার দিয়েছেন। একি ধরনের চুক্তি ভারত, চীন এবং পাকিস্তানের সাথেও করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, ভারতও একই পথে হাঁটছে। বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম সেনাবাহিনী এবং বিশাল জনগোষ্টির দেশ ভারত তার আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বড়ভাই সুলভ আচরণ করে চলেছে। তার পুঁজির চরিত্র খুবই সাম্প্রতিক এবং সে জানে আঞ্চলিক অধিপত্য বিস্তার করে সে তার মুনাফাকে দ্বিগুণ করে তুলতে পারবে। সেজন্যই সে বাংলাদেশ থেকে নিতে চায় বেশী, দিতে চায় কম। সাম্প্রতিক তিস্তা ও টিপাইমুখ ইস্যু, ট্রানজিট নামক করিডোর, এমন কি বাংলাদেশকে দেয়া ঋণ সাহায্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বন্ধুত্বের পুরানো কাসুন্দি, নালিশ এবং প্রেসক্রিপশন এবং বোরখা

সফরের শেষ দিন রোববার হিলারি ক্লিনটন প্রাতঃরাশ করেন তার তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ইউনুস বনাম সরকারের বিবাদ ভাল চোখে দেখছে না, তা বিভিন্ন সময়ে তারা প্রকাশ করেছে। সবটুকুই যে বন্ধুত্বের টানে তা নয়, কারণ ইউনুসের মত মার্কিন প্রতিনিধি এই অঞ্চলে আর দ্বিতৃীয় একজন কোথায়। অর্থাৎ, এখানেও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ।

ইউনুসের মত করে সুন্দর মিথ্যা কথা আর কেউ বলতে পারে না। যেমন তিনি বলেন, তিনি ক্ষুদ্রঋণের জনক, যা একটি ডাহা মিথ্যা কথা। এই উপমহাদেশে কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ বলা যায়। কারণ তিনি তার জমিদারীর প্রজাদের মহাজনী সুদের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ও নিজের নোবেল প্রাপ্তির টাকা বিনিয়োগ করে স্থাপন করেন ‘শিলাইদহ কৃ্ষি ব্যাংক’ যা শুধু কৃ্ষকদের ঋণই দিত না, তাদের সমবায় ভিত্তিক চাষাবাদেও উৎসাহিত করতো। স্বাধীন বাংলাদেশে ব্র্যাক প্রথম মাইক্রোফিন্যান্স নামে এই কর্মসুচী চালু করে। তবে এটা ঠিক, ইউনুস ক্ষুদ্রঋণকে এবং এর সুদের উচ্চ হারকে এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, তা আর কেউ পারেনি। আর ব্র্যাককে সাথে রাখার অন্যতম কারণ হতে পারে মার্কিন বাহিনীর দখলকৃ্ত আফগানিস্তানে এই পর্যন্ত তাদের বেশ কয়েকজন কর্মী তালেবানী হামলায় মারা গেছেন, তাই একটু স্বান্তনা দেওয়া আর কী!

সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো বিরোধীদলীয় নেতার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত। সাক্ষাতের সময় বিরোধীদলের নালিশের প্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রি দুই দলকে সংলাপে বসার প্রেসক্রিপশন দিলেন এবং এর ঠিক একদিন পর আত্মগোপনে থাকা বিরোধীদলীয় নেতারা বোরখা পড়ে আদালতে গেলেন জামিনের জন্য। পরবর্তী সময় আপাত মুক্ত বিএনপি’র মহাসচিব এই কথা বেশ জোরের সাথেই বললেন যে, পদ্মাসেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে হবে এবং এতে আমাদের উপর ঋণের বোঝা বাড়বে না ইত্যাদি।

শেষ হয়েও হলোনা শেষ

আমাদের জনসংখ্যা ১৫ কোটির কাছাকাছি হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর লেখা কবিতার সেই দুই লাইন এখনও প্রাসংগিক…

সাড়ে সাত কোটি সন্তানের হে বংগ জননী,

রেখেছ বাংগালী করে মানুষ করো নি।’

আমরা শুধু নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই লালন করছি না, ক্রমাগত একটি পরনির্ভরশীল, আত্মপ্রতারক এবং আত্মঘাতী জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এর থেকে মুক্তির পথ আমাদেরই খুঁজতে হবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s