লিখেছেন: মেহেদী হাসান

এক

কতদিন নারী মাংশের স্বাদ পাই না, কতদিন যৌনপল্লীতে যাইনি; দীর্ঘ একমাস পূর্বে একবার গিয়ে শরীরের ক্ষুধা মিটিয়ে এসেছিলাম। মেয়েগুলো কত সস্তায় যে তাদের দেহ বিক্রি করে! পঞ্চাশ টাকা, একশ টাকা, দুইশ টাকা, তিনশ টাকাএত কম দামে এমন ভাল জিনিস পৃথিবীর আর কোথায় পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ! আর আমি অভাগা এমন সুযোগ নাকের ডগায় পেয়েও সামান্য কটি টাকার অভাবে, দেহের লালসা নিয়মিত নিবৃত্ত করতে পারিনা।

মেয়েগুলো কত যে ভালো! কোন আবদার নেই, বিশেষ বাহানা নেই, চটুলতা নেই, ছেনালীপনার ছিটেফোটা নেই, কত সহজ,কেমন সুন্দর সরল! আর যা কিছু করে, সকল তাদের ব্যাবসার খাতিরে, খদ্দেরদের সামনে কাঁচা মাংশের পসরা সাজিয়ে বসে থাকে, বিভিন্ন ভঙ্গিমায় দেখায়, গুনাগুন বর্ণনা করে; মানিব্যাগ খুলে কয়েকটা কড়কড়ে নোট বের করে দিলেই, সুবোধ বালিকাদের মত; নিম্নাঙ্গ উন্মুক্ত করে বিছানায় শুয়ে পড়ে।

আর ভদ্র ঘরের সামাজিক মেয়েরা,যারা সমাজ সংসার থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলেদের সাথে প্রেম প্রেম খেলে; তাদের কত যে তাল বাহানা, ছেবলামো, ছেনালীপনা, ধূর্ততা তা বলে শেষ করা যাবে না! ওদের মনের মধ্যে যেন গুবরে পোকা সবসময় কিলবিল করে; কুকুরের মত, জিহ্বা দিয়ে সবসময় লালা টপটপ করে পড়তে থাকে; থ্রিপিছ, শাড়ী, চুড়ি, কানের দুল, সাবান,শ্যাম্পু,সুগন্ধি তেল, পারফিউম কিনে দাও, ফোনে ব্যালান্স ভরে দাও, মিসড কল মারলে ফোনে ভালাবাসার চটুল কথাবার্তা বলতে বলতে; নাকি কান্না শুনতে শুনতে সমস্ত রাত্রি কাবার, মানি ব্যাগের সব টাকা শেষ। তার পরেও রেহাই নেই, টাকা ধার করে হলেও সপ্তাহে একদিন চাইনিজে; দুই দিন পার্লারে নিয়ে যাও। আগের দিনে দুই টাকার বাদাম কিনে পার্কে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রেম করা যেত, এখন সেই দিন শেষ; নতুন যুগ এসেছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে,নইলে আর প্রেমিকার মুখ দেখতে হবেনা।

আর এত কিছুর পরেও কাজের কাজ কিছুই হবেনা, যে কাজের জন্য এতকিছু তার ধারে কাছ দিয়ে ঘেঁষা যাবে না। হাতটা একটু ধরতে গেলেই মুখের মধ্যে একটা তিক্ত ভাব ফুটিয়ে তোলে ঝটকা মেরে সরিয়ে দেবে – শুরু হবে ভেক ভেক করে কান্না, দুগন্ড বেয়ে দরদর করে পড়তে থাকবে মুক্তোর দানার মত ফোটা ফোটা নোনা জলতুমি আমাকে একটুও ভালবাসনা, শুধু আমার দেহ পেতে চাও, তোমার চোখ শুধু আমার দেহের দিকেই নিবিষ্ট থাকে, একটু অন্ধকার পেলেই শুধু জড়িয়ে ধরতে চাও, তুমি নষ্ট হয়ে গেছো, আমাকে শুধু কষ্টই দিতে পার, আমি চলে যাচ্ছি, তোমার কাছে আর আসবো না। তারপর কত হাতে পায়ে ধরা ধরি, আক্ষরিক অর্থে অবশ্য তাও ধরা যায় না, হাতে ধরি, পায়ে ধরি বলেই ক্ষান্ত থাকতে হয়। শুনেছি মফস্বলের এই মেয়েরাই বড় শহরের গিয়ে নাকি ঝোপের আড়ালে, চাইনিজ রেস্টুরেন্টের খোপের ভেতরে, সাইবার ক্যাফেতে হাত ধরতে দেয়,মাঝে মাঝে চুমুও নাকি খেতে দেয়। তাও ভালো!

তারপর একদিন রক্তিম চোখ, মুখের মধ্যে একটি ফোলা ফোলা ভাব নিয়ে এসে হাজির হবে, সামনে বসে অঝোরে কাঁদবে, ওড়নার খুট দিয়ে মাঝে মাঝে চোখ মুছবে আর ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে থাকবে তার বাবামা, সদ্য পাস করা এক ডাক্তারের সাথে তার বিয়ে ঠিক করেছে, কিন্তু সে কিছুতেই রাজী না, তার বাবা মাকে সে প্রেমের ঘটনা খুলে বলেছে,আর এ কথা শোনামাত্রই তার বাবার হার্ট এট্যাক হয়েছে, অনেক ক্ষণ যমে মানুষে টানাটানির পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছে। ডাক্তার এসে বলে গেছে, বাবার মনে কোন ধরনের আঘাত দেয়া যাবেনা, আবার কোন ধরনের আঘাত পেলে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। সে এখন কি করবে তা বুঝে উঠতে পারছেনা, তার বাবাকে সে তো আর মেরে ফেলতে পারে না। তারপর পিছনের দিকে তাকাতে তাকাতে, নাকের সর্দি, চোখের জল ওড়না দিয়ে মুছতে মুছতে, বিয়ের অনুষ্ঠানে অবশ্যই যেতে বলে, সারাজীবন বন্ধু থাকবে এই ওয়াদা দিয়ে ধীরে চলে যাবে।

তার চেয়ে পল্লীর মেয়েগুলান কত ভালো, দুইশ টাকা দিলেই কচি ডাবের মত মেয়ের নিম্নাঙ্গের ভেতরে নিজেকে সেঁধিয়ে দেয়া যায়। মাঝে মাঝে শুধু একটু দর কষাকষি করতে হয় এই যা।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছি শুধু, বুকের ভেতরে অসীম শূন্যতা অনুভূত হচ্ছে। এতো গরমের মধ্যেও একটি তীব্র কনকনে বাতাসের ছুরি যেন হৃদপিন্ডটিকে এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে। একটি তুলতুলে মাংশ পিন্ডকে জড়িয়ে ধরতে, নিষ্পেশিত করতে মনটা আকুলি বিকুলি করছে। আমার ভেতরের কালো লোমশ শুয়োরগুলো প্রচন্ড জৈবিক ক্ষুধায়,ক্রোধোন্মত্ত হয়ে, ঘোৎ ঘোৎ করতে করতে ঘুরপাক খাচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে। ব্লেডের মত ধারালো দাঁত দিয়ে, তীক্ষ্ণ নখর সমেত মনের নরম মাটি, প্রচন্ড হিংস্রতায় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে তুলছে। শুয়োরগুলো আমাকে স্থির থাকতে দিচ্ছেনা, হিংস্র করে ফেলছে, আমার মুখটিকে ওদের রোমশ মুখে পরিণত করে তুলতে চাইছে।

আমার একটু স্থির হওয়া বড়ই প্রয়োজন, এত অস্থিরতার মধ্যে কোন কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব হবেনা। এর জন্যেই আমি লেখাপড়ায় মন দিতে পারছিনা, অথচ সামনে কিছুদিন পরেই আমার ফাইনাল পরীক্ষা,পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। একবার একটু শরীরের জান্তবতা মিটিয়ে নিলে কিছুদিন অন্তত স্থিতু হয়ে বসা যাবে। নাআর পেরে উঠছিনা,কালকে আমাকে পতিতালয়ে যেতেই হবে। তারপর বেছে বেছে খুঁজে বের করতে হবে চৌদ্দপনের বছরের একটি কচি মেয়ে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে হাতে একটি টাকাও আর অবশিষ্ট নেই। বাড়ি থেকে মাসোহারা বাবদ যে সামান্য কটি টাকা পাঠায়, তা দু দিনও হাতে থাকেনা। খাবারের জন্যে টাকা জমা দাও,আছে রুমের ভাড়া, দোকানের বাকী টাকা শোধ করতে হয়, বন্ধু পাওনাদারদের যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্ত হতে হয়। তার পর সব শেষ – আবার দোকান থেকে সিগারেট বাকী খাও, কোন জরুরী প্রয়োজন হলে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার কর, এখন যেমন প্রয়োজনটা অনেক বেশী জরুরী হয়ে পড়েছে। দেখি, কালকে সকালে সোহেলের কাছ থেকে টাকা ধার করে তারপর ওকে সাথে নিয়েই সোজা বেশ্যাপাড়া।

দুই

প্রতিদিনকার মত আজকেও বিভিন্ন ধরনের,গড়নের,বর্ণের নরম তুলতুলে মাংশ পিন্ডগুলো বিভিন্ন আবেদনময়ী ভঙ্গিমায় ক্রেতা আকর্ষণ করার তীব্র প্রতোযোগীতায় অবতীর্ণ হয়েছে। ওরা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে, রাস্তা দিয়ে ইতস্তত সঞ্চরণশীল ক্রেতার যৌন উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে নিজের দেহটাকে বিক্রি করতে চাচ্ছে। একাজে ওদের কোন বিরাম নেই, চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ ঢেকে রাখার সযত্ন প্রয়াস। চেষ্টা অবিরত চালিয়েই যাচ্ছে, কেউ সফল হচ্ছে আবার অনেকেই ব্যর্থ, ব্যর্থ হলেও কেউ মুষড়ে পড়ছেনা; নতুন উদ্যমে, নবীন আশায় আবার আরেকজন কে টার্গেট করছে। ওদের অধ্যবসায় দেখলে অবাক হতে হয়, কোন দিক দিয়েই ধৈর্যের কোন ঘাটতি নেই, চেষ্টার নেই কোন ত্রুটি, উদ্যমের শেষ নেই যেন, সফলকাম তাদেরকে হতেই হবে; কারন এই দেহ বিক্রি করেই যে, ওদের দেহ ভরতে হয়।

যারা বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খদ্দের ডাকে তারা অধিকাংশই দেখতে খারাপ এবং বয়স্ক, পুরুষের শরীরমনে কোন ধরনের আবেদনই তারা আর তৈরী করতে পারেনা। আসল জিনিস থাকে সব পল্লীর ভেতরে, ওদের অনেকেই দেখতে খুব সুন্দর ও আবেদনময়ী, ওদের প্রয়োজন হয়না কাউকে ডাকতে, ক্রেতারাই ওদের খুঁজে খুঁজে বের করে, ঘরে নিয়ে খিল মারে। সমস্যা হল তাদের যারা সুন্দর না বা যাদের আবেদনময়তা কালের পরিক্রমায় ইতিমধ্যেই শুন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। তারা ঘন্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বুক উন্মূলিত করে চিৎকার করেও কোন খদ্দেরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে পারে না।

আমি আর সোহেল রিক্সা থেকে নেমেই, পল্লীর ভেতরে ঢুকে পড়ি। পল্লীর ভেতরে সরু গলি রাস্তার ধারে, দোকানের সামনে যৌনকর্মীরা দাঁড়িয়ে আছে আর হাই সেক্সি, অই লাল সার্ট, হেই লুঙ্গি পড়া, ঐ লম্বু, আরে বাইট্যা ইত্যাদি বিভিন্ন সম্বোধনে ডাকছে, সার্ট ধরে টানছে, হাত চেপে ধরছে, বুকের কাপড় ফেলে দিচ্ছে, স্তন ছুইয়ে দিচ্ছে, হেসে গলে পড়ছে, মুখে ঝামটা মারছে –ভদ্র সমাজে অশ্রাব্য, এরকম শব্দ ব্যাবহারে পুরো পরিবেশটিকে মোহনীয় করে তুলছে।

আমরা দুই বন্ধু গলি রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছি, যাচ্ছি নিরীক্ষণ করতে করতে। চলার পথে অনেকেই সার্ট ধরে টানা টানি করছে, যদিও দুইজন দেখে খুব বেশী কাছে ঘেঁষতে সাহস পাচ্ছেনা; আর আমরাও সাথেই সাথেই ধমক দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছি। একটিও তীব্র আবেদনময়ী কচি কোন মেয়ে দেখতে পাচ্ছিনা, আমাকে মনে হয় আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, কারন কচি মেয়েরা সব সুনির্দিষ্ট একটি জায়গায় থাকে, যেখানে সেখানে ওদেরকে পাওয়া যায় না।

সোহেলের আবার পছন্দ আঠার বিশ বছরের পূর্ণ যুবতী নারী। চলতে চলতে হঠাৎ করে টের পাই ও আমার সাথে নেই, পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখি; একটি মেয়ের সাথে দরদামে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে। মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দর ও আবেদনময়ী, একনজর দেখলেই চোখে লাগার মত। আমার পছন্দ যেহেতু কচি মেয়ে, ঐ মেয়েটির দিকে তাই আমার চোখ যায়নি। সোহেল ঠিকই খুঁজে খুঁজে বের করে ফেলেছে। দেখতে পেলাম মেয়েটি তিনশ টাকা দর হাঁকছে আর সোহেল দুইশ টাকার উপরে উঠতে চাচ্ছেনা, কিন্তু মেয়েটিকে ওর বেশ মনে ধরেছে বলেই মনে হল। দেখা গেলো বেশ কিছুক্ষণ দর কষাকষির পর, সোহেল মেয়েটিকে নিয়ে রুমের ভেতরে চলে গেলো। যাওয়ার সময় পিছন ফিরে তাকিয়ে, গলা উঁচিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোর জন্য বটতলায় অপেক্ষা করবো; তাড়াতাড়ি কাজ সেরে চলে আসিস।

অগত্যা আমি একাই সামনের দিকে চলে এগোতে লাগলাম। আমাকে একা পেয়ে লালনীল,সাদাকালো মাংশপিন্ড গুলো মৌমাছির মত ছেকে ধরল। কেউ হাত ধরে টানছে, কয়েকজন সার্টের কোনা চেপে ধরছে,অনেকেই সামনে এসে পথ আগলে ধরছে; ধমকে আর কোন ফল হচ্ছেনা। তখন দুজন ছিলাম তাই কাছে ঘেঁষতে খুব একটা সাহস পায় নি, এখন একা পেয়ে ছাই দিয়ে চেপে ধরেছে। দেখতে দেখতে ওরা আমাকে ঘেরাও করে ফেলল, এই মুহূর্তে যেকোন একজনের রুমে আমাকে যেতেই হবে কিন্তু আমার কাউকে পছন্দ হচ্ছেনা আর এরা কেউ কচি ডাবের মতো না। আমি অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ি, নিরুপায় হয়ে স্থানুর মত দাঁড়িয়ে থাকি। হাঁটু দুটো পরস্পর ঘর্ষিত হতে থাকে, দাঁতে দাঁত লেগে শব্দ হয় ঠক ঠক ঠক

সামান্য একটু দূর থেকে একটি কর্কশ গলার স্বর আমার কর্ণকুহরে এসে প্রবেশ করে। ‘ অই তরা ছেড়াডারে অমন কইর্যাস চাইপ্যা ধরছস কেন ? বেশ্যা বইল্যা তগোরে কি কোন লজ্জা শরম নাই, সব কি পানের সাথে চিবায়্যা খাইয়্যা ফালাইছস ? ছাড় অহনি ছাইড়্যা দে কইলাম; বলতে বলতে একজন বয়স্ক যৌন কর্মী এগিয়ে আসে। আমি একটু আস্বস্ত হই, সামান্য নিরাপত্তা বোধ করি। তার ধমক খেয়ে মেয়েগুলো আমাকে ছেড়ে দিয়ে একে একে যার যার জায়গায় ফিরে যায়। সে এসেই পরম নির্ভারতায় আমার হাত দুটি চেপে ধরে। মনে হল বাঘের তাড়া খেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে, নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে কোন আপনজনের কোলে চলে এসেছি।

যৌনকর্মীটির বয়স আমার কাছে বছর পায়ত্রিশের মত মনে হল, গাল দুটো বসে গেছে, তাতে মেছতার দাগ সুস্পষ্ট, সিগারেট খেয়ে খেয়ে ঠোঁট দুটোকে কালো করে ফেলেছে, কোণ বেয়ে চিবানো পানের লালরস বেরিয়ে আসছে। দাঁতগুলো পান খেতে খেতে ফ্যাকাশে লাল, চোখদুটো শান্ত ধুসর, একধরনের অস্থিরতা, অসহায়ত্ব চোখের উপর ভর করে রয়েছে। চোখের নীচে কালি, কপালে হালকা সূক্ষ্ম বলি রেখা পড়তে শুরু করেছে, সামনের দিকের কয়েকগুচ্ছ চুল পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে, স্তন দুটি অনেকটাই ঝুলে পড়েছে; ও দুটোকে কাচুলি দিয়ে বেঁধে টানটান রাখার একটি ব্যার্থ প্রয়াস চালনো হয়েছে। কোন পুরুষকে কাছে টানার সমস্ত যোগ্যতা যেন ইতিমধ্যেই হারিয়ে বসেছে। শুধু মাত্র তার সমস্ত শরীর দিয়ে একটি ক্ষীন প্রভা বাৎসল্য রস বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

সে আমার মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলতে থাকে আমার নাম রোজিনা, আমাকে রোজিনা আপা বইল্যা ডাকবি। আর তর নাম কিরে ভাই ?

আমি মাথা নিচ দিকে দিয়ে, বিড়বিড় করে বলি –“নীরব”। আমি আর কোন শব্দ উচ্চারণ করতেপারলাম না, একটি লজ্জাবোধ যেন পেটের ভেতর থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে উপরের দিকে উঠে কন্ঠনালীটি রোধ করে দিল।

রোজিনা আপা হৃদয়ের ঝরে পড়া আবেগ কথার সাথে মিশিয়ে বলতে থাকে, জানস নীরব আমি তহন অনেক ছোট, বয়স তের কি চৌদ্দ অবো, আমার ফুটফুটা ছোট একটা ভাই অইছিলো। ও দেখতে কত যে সুন্দর আছিল, বড় বড় চোখে আমার দিকে কেমন কইর্যা যে তাকাইয়্যা থাকত আর খালি খিল খিল কইর্যাে হাসত! অর দাঁত ছাড়া মুখের হাসি শুইন্যা আমার বুকে সুখের কাঁপন লাগত। একটুর জন্যে চোখের আড়াল অইলেই আমি অস্থির অইয়া যাইতাম, খালি পাগলের মত লাগত, বুকের মইধ্যে ডরাস ডরাস করতো। মায় তালুকদার বাড়িতে ঝিয়ের কাম করত, বাড়ীর হগগল কাম হারতো, আমি বেবাক সোম আমার আদরের ছোট্ট ভাইডারে কোলে কইর্যাম রাখতাম। মায় খালি দুধ দেওনের সোম অর কাছে আইতো। আমার সোনার ছোট্ট ভাইডারে কোলে পিঠে নিয়া,হাইস্যা, খেইল্যা আমার দিন চইল্যা যাইতাছিল।

একদিন আমার এক দুলাভাই আমাগো বাড়িতে আইয়া, মায় বাপের লগে অনেকক্ষণ ধইর্যাা কথা কয়। হেয় নাকি আমারে টাংগাইল শহরে বড় লোকের বাসায় কাম দিব, কাম অইলো সাহেব ম্যাডাম যহন অফিসে থাকবো তহন খালি হেগো বাচ্চা পোলাডারে কোলে কইর্যা রাখতে অইবো। হুইনা আমার মায়বাপে তো খুব খুশি, পারলে তো তহনি দুলাভাইয়ের লগে দিয়া দেয়। দুলাভাই কইয়া গেল, এক হপ্তা পরে আইয়া আমার নিয়া যাবো।

এক হপ্তা পরে বিকালে হেই লোকটা আইল আমারে নিয়া যাইতে।আমি শহরে যামু কত কিছু দেখমু, বড়লোকের বাসায় কত বালামন্দ খামু, রঙ্গীন টেলিভিশনে সিনেমা দেখমু, নাটক দেখমু, গান হুনমু। আমার ইচ্ছা অইতাছিল উড়াল দিয়া চইল্যা যাই। খালি আমার ভাইডার লাইগ্যা আমার খারাপ লাগতাছিল। যাওনের সময় আদরের ভাইডা, আমার দিকে বড় বড় চোখ কইর্যাা তাকাইয়্যা আছিল, তয় আর ডর কি দুলাভাই তো কইছে হপ্তায় একদিন আইয়া আমার ভাইরে দেইখ্যা যাবার পারমু।

ঐ পরথম বাস গাড়ীতে উঠলাম, আমার ছোট্ট বুকটা ভয়ে ঢিপ ঢিপ করতাছিল, তয় বালাও লাগতাছিল। দুলা ভাই আমারে শহরের কোনায় একটা বস্তিতে নিয়া গেল, বস্তির মানুষগুলান আমার দিকে কেমুন কেমুন কইর্যার জানি তাকাইতেছিল, কেউ আমার সাথে কোন কথা কয় নাই, আমি তহনও কিছুই বুইঝ্যা উডবার পারিনাই। দুলাভাই আমারে একটা ঘরে নিয়া গিয়া, হোটেল থিক্যা মাংশ ভাত আইন্যা খাওয়াইল। তারপরে জরুরী কাজের কতা কইয়া বাইরে চইল্যা গেল। আমার একা একা খালি ডর লাগতাছিল, মনে কইতাছিল দুলাভাই আইলেই আমার সব ডর কাইট্যা যাব। হ – দুলাভাই আমার সব ডর কাটাইয়া দিছিল। দুলাভাই আইলো, বাংলা মদ খাইয়া মাতাল অইয়া, যহন হগগলেই ঘুমাইয়া পড়ছে। তর সামনে কইতে শরম লাগে, দুলাভাই আইয়াই জোর কইর্যা আমারে কাম করলো, কাচা রক্তে বিছানা বাইস্যা গেছিলো গা। সকালে এহানে আইন্যা খালার কাছে বেইচ্যা দিল, তারপর থিকা এহানেই আছি, হগগলে যেমন থাহে। আমার ভাইডা অহন মনে হয় তর সমান অইছে, খালি তারে দেকতে ইচ্ছা করে আর কাউরে দেকতে ইচ্ছা করেনা, অর কতাই খালি বারে বারে মনে অয়। অরে দেহার ভাগ্য কোন দিন মনে অয় আমার অইবনা।

তারপর রোজিনা আপা,আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,আয় আমার ঘরে যাই,আমার ভাই মনে কইর্যান তরে একটু প্রাণ ভইর্যায় দেহি।

আমি পুরোপুরি সম্মোহিত হয়ে গেছি, ছোট বাচ্চা যেমন করে তার আদরের পোষা ছাগলটিকে দড়ি ধরে টেনে নিয়ে যায়, তেমনি রোজিনা আপা আমার হাত ধরে টেনে তার ঘরের ভেতর নিয়ে গেল।

ঘরটি অনেক ছোট, ভেতরে তেমন কোন আসবাব পত্র নেই, ছোট চৌকিতে বিছানাটি পরিপাটি করে সাজানো, বড় বড় লাল গোলাপ ছাপা পরিচ্ছন্ন বিছানার চাদর, পাশাপাশি দুটি বালিশ রাখা, পাশেই একটি ওয়ারড্রব; তার উপরে একটি সাউন্ডবক্স এবং একটি সিডি প্লেয়ার ও চৌদ্দ ইঞ্চি একটি রঙ্গীন টেলিভিশন পাশাপাশি রাখা। ঘরের কোনে ছোট একটি টেবিলের উপরে একটি পানি রাখার জগ, একটি কাচের গ্লাশ ও একটি মেলামাইনের প্লেট।

ঘরের ভিতরে গিয়ে আমি আস্তে করে বিছানার উপর বসলাম। রোজিনা আপা ঘরে ঢুকেই সুইচে চাপ দিয়ে বৈদ্যুতিক পাখাটা চালিয়ে দিল। আর ছোট জানালাটি দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করে ঘরটিকে বেশ আলোকিত করে রেখেছিল। আমি নিজের মধ্যে ডুবে বসেছিলাম, খট করে একটি শব্দ হতেই তাকিয়ে দেখি আপা দরজাটা খিল এটে বন্ধ করে দিচ্ছে। সে যখন পাশ ফিরে আমার দিকে তাকিয়েছে, তখন তার মুখের ভাবটি পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই রোজিনা আপা আমার সামনে এসে দাড়িয়েছে, চোখ দুটো সরু, মুখের মধ্যে একটি অনুজ্জ্বল কাম ভাব, একটু ভয়ঙ্করতার দিকে বাক নিয়েছে যেন, সামনের পাটির লালচে দাঁত দিয়ে নিচের কালো ঠোঁটটিকে কামড়ে ধরেছে, আলগোছে বুকের কাপড়টি ফেলে দিয়েছে, মাঝাটা ঈষৎ বাঁকা, সরু ঘাড়টি একদিকে খানিকটা কাঁত হয়ে রয়েছে।

তার মুখের রূপ আমূল বদলে গেছে, অভিনয়ে অনেকবেশী দক্ষতা না থাকলে এরকমটি হওয়া কঠিন। আমি যেন বনের ভেতর বাঘের দাবড়ানি থেকে রেহাই পেয়ে একেবারে কুলুপ আটা হায়েনার গর্তে এসে আটকা পড়েছি। আমার ক্ষেত্রে যেন হয়েছে বার আসান তের মুশকিল বা তারও বেশি। আমাকে এখান থেকে রক্ষা করতে পারে এমন কাউকে আমি হৃদয়ে মনে কোথাও কল্পনা করতে পারলাম না। আমার যেন অন্তিম দশা উপস্থিত হয়েছে!

রোজিনা আপা আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, কর্কশ গলায় অনেকটা ফিস ফিস করে বলল; দে ট্যাহা দে, দুইশ ট্যাহা দে অহনি।

টাকার বড়ই যন্ত্রনা, আমি শুধু বলতে পারলাম; কেন, টাকা দেবো কেন ?

সে আমার মুখের উপর আঙ্গুল তুলে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল, দেখ কথা বাড়াবিনা, যা কই তাই কর, তুই আর আমি যে ঘরে ঢুকছি তা খালা দেইখ্যা ফালাইছে। ঘর থেকে বাইর অইলেই, হেয় আমার কাছে টাকা চাইবো, তা তুই ট্যাকা না দিলে আমি তারে কি জবাব দিমু ?

আমি ভয় পাওয়া গলায়, পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি আমাকে ছোট ভাইয়ের কথা বলে ঘরে নিয়ে এসে, এরকম ব্যাবহার করছেন,এটা কি ঠিক হচ্ছে ?

সে মুখে ঝামটা মেরে বলল, অ্যাঁখুব সাধু সেজেছিস, এখানে কেন আইছস ক–, ধর্ম বোন বানাইতে নাকি কাজ করতে ? এহানে যারা আহে হগগলেই কাজ করতেই আহে আর আমরা কাজ করতে দিয়া ট্যাহা নেই।

আমি মনে মনে বুঝতে পারলাম, কিছু টাকা দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে নইলে ঘোর বিপদ। কিন্তু আমি তখন কি বুঝতে পেরেছিলাম টাকা দিয়েও আমি রেহাই পাবোনা, আমার সামনে আরো বিপদ অপেক্ষা করে আছে।

আমি কেশে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললাম, আমার কাছে মাত্র একশ দশ টাকা আছে। দশ টাকা রিক্সা ভাড়ার জন্যে রেখে,বাকী একশ টাকা আপনাকে দিয়ে দিতে পারি।

সে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, দে একশ ট্যাহাই দে, জলদি দে।

আমি পকেট হাতড়ে একশ টাকার নোটটি বের করে তার হাতে দিলে, সে নোটটি ভাজ করে ব্লাউজের নিচে রেখে দিল। আমি মনে মনে বললাম, এই যাত্রায় বেঁচে গেছি কিন্তু সে এক ঝটকায় আমার সামনে থেকে সরে গিয়ে ওয়ারড্রবের ড্রয়ার খুলে একটি কনডমের প্যাকেট বের করে, আমার হাতে দিয়ে বলল এইডা পইর্যা কাম কর নইলে অসুখ বিসুখ অবো।

আমি মুখের মধ্যে একটা বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে তুলে বললাম, আমি আপনার সাথে এই কাজ করতে পারবোনা। টাকা চেয়েছিলেন দিয়েছি, এখন আমাকে যেতে দিন দয়া করে।

তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি সেটি রীতিমত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। এরকম ভয়ঙ্কর নারীমূর্তি এর আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না, ভয়ে আমার হৃদপিন্ড পাকিয়ে যেতে থাকে, পুরো মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আমি তখনও ভাবতে পারিনি আরো ভয়ঙ্কর কিছু আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।

সে বলতে থাকে, কাম তরে করতেই অইবো।

আমি প্রতিউত্তরে আবার ‘না’ করতেই, সে আবার ওয়ারড্রবের দিকে দৌড়ে যায়, ড্রয়ারের ভেতর থেকে চকচকে ধারালো একটি ছুরি বের করে আনে।

আমার জিহ্বা শুকিয়ে যায়, হৃদস্পন্দন দ্রুততর থেকে দ্রুততর হয়, কে যেন বুকের ভেতরে ড্রাম বাজাচ্ছে। ফুল স্পীড পাখার নিচে বসেও সমস্ত শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকে।

সে আমার দিকে ছুরিটি বাগিয়ে ধরে, রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলে, কাম তরে করতেই অইব, নইলে ছুড়িডা তর পেটের ভিতরে ঢুকাইয়া দিমু।

এরকম পরিস্থিতিতে পড়েও মনকে বোঝানোর চেষ্টা করি, সে আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে মাত্র, এত বড় সাহস সে কখনই পাবেনা।

আমি বলি, পারবনা, আপনার সাথে কাজ করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে; আপনি যা ইচ্ছা করতে পারেন আমাকে।

হঠাৎ সে ছুরিটি ফেলে দিয়ে দু হাত দিয়ে মুখটি চেপে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে, সেই কান্না মেকী ছিল কিনা বলতে পারিনা। আমি পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেছি ততক্ষণে। কিন্তু আমার হতভম্ব হওয়ার তখনো আরো বাকী ছিল। মুখ থেকে হাতটি সরিয়ে সে যখন সকরুনভাবে আমার দিকে তাকালো তখন দেখতে পেলাম তার চোখ দুটো পান খাওয়া দাঁতের মতই ঘোলাটে লাল। মোটা কালো ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে।

ততক্ষণে আমি উঠে দাড়িয়েছি, সে একশ টাকার নোট খানি ব্লাউজের নিচ থেকে বের করে আমার হাতে দিয়ে, তারপর দরজার খিল খুলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়ে আবার খিল লাগিয়ে দেয়।

ইতিমধ্যেই আমার নড়াচড়ার শক্তি সম্পূর্ণভাবে লোপ পেয়েছে, ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে না দিলে আমি সম্ভবত বের হতেই পারতাম না। আমি স্থানুর মত দাঁড়িয়ে থাকি, আমার চোখ দুটি যেন ঝাপসা হয়ে গেছে কিছুই স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছিনা, কান দিয়ে কোন শব্দ ঢুকছেনা। আমি যেন হঠাৎ করেই আলিফলায়লার জগতের পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছি। কতক্ষণ ধরে যে দাঁড়িয়ে আছি তা বোঝার বোধটুকুও হা্রিয়ে ফেলেছি। আস্তে আস্তে যখন কিছুটা অনুভূতি ফিরে পেলাম, তখন বুঝতে পারলাম ফুপিয়ে কান্নার একটি সকরুন সুর ধীরে ধীরে আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে। মনে হল কে যেন আমার কানের ভেতর গলিত সীসা ঢেলে দিচ্ছে। আমার পুরো মুখ গহ্বর একটি অব্যক্ত তিক্ততায় ভরে উঠেছে, একজোড়া সজল চোখের ফোটা ফোটা নোনা জল গড়িয়ে গড়িয়ে এসে আমার জিহ্বার উপর পড়ছে যেন!!

Advertisements
মন্তব্য
  1. হাসান বলেছেন:

    আসলে আমিও চাই এমন কাজে যেতে,কিন্তু যখন এদের কথা নিজের করে ভাবি তখনি যামেলা হয়

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s