লিখেছেন: আহমদ জসিম

২০১০এর আগস্টে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেতনফি বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে লাঞ্চিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর পুলিশের হাতে। ঠিক তার এক বছর পর, অর্থাৎ, গত বছরের আগস্টের তিন তারিখ দেশের প্রধান জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম, ছাত্রলীগের দুর্ব্যবহার, প্রক্টরসহ চার শিক্ষকের পদত্যাগপত্র জমা।’ এই যেন কিউবান বিপ্লবের জীবন্ত কিংবদন্তি ফিদেল কাস্ত্রো’র সেই উক্তিটাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল, ইতিহাস আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।’ ব্যাপারটা এমন নয় যে শিক্ষার্থীরা এই চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। আন্দোলন ছিল মূলত শিক্ষার বাণিজ্যিকায়ন, বেতনফি’র নামে শিক্ষার্থীর উপর নানাভাবে করের বোঝা আরোপ সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী মহাজনি সংস্থা বিশ্বব্যাংকএর শিক্ষাকর্মসূচি বাস্তবায়নএর বিরুদ্ধে।

আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে আচরণ করেছে এই আচরণকে শাসকদল আওয়ামলীগের নেতা মাহামুদু রহমান মান্না তুলনা করেছিলেন উগাণ্ডার স্বৈরাশাসক ইদ আমিনের আচরণের সাথে। সেই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আচরণ আর ছাত্রছাত্রীর উপর পুলিশি নির্যাতন মিলিয়ে ন্যুনতম বিবেকসম্পন্ন কোন মানুষের পক্ষেই নিরপেক্ষ থাকা ছিল অসম্ভব। কিন্তু জাতির বিবেক বলে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষকই ছিলেন নিরপেক্ষ। না, সকলে নয়! সেই আন্দোলনে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দু’টা ভাগে ভাগ করতে পারি, যাদের বৃহৎ অংশ ছিল তথাকথিত নিরপেক্ষ গ্রু, আর দ্বিতীয় গ্রুপটা ছিল কতিপয় আন্দোলনবিরোধী গ্রুপ। পাঠক, ক্ষমা করবেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কতিপয় শব্দটা প্রয়োগ কররাম। ব্যাপারটা এমন নয় যেবিপরীত মত সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের নেই। বিরোধিতা যদি সৎ অবস্থান থেকে হয়, তা মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু আমরা বেতনফি বিরোধী আন্দোলনের সময় লক্ষ করলাম, একদল শিক্ষক আন্দোলন বিরোধিতার নামে নেমেছিলেন শাসকশ্রেণীর নির্লজ্জ দালালিপনাতে। যারা আন্দোলনের বিরোধিতা করে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেছেন তাদের যুক্তি ছিল রীতিমতো হাস্যকর ও অসৎ উদ্দেশ্যের প্রকাশ। বিষয়টা পরিস্কার করার জন্য আমি দু’জন শিক্ষকের সে সময়ের লেখার উদ্ধৃতি দিচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক মিল্টন বিশ্বাস তার এক লেখায় এই আন্দোলনকে ‘অর্ধশিক্ষত অশিক্ষিত গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন’ বলে তিরস্কার করেছিলেন। আর সাবেক ভিসি আবদুল মান্নান চিহ্নিত করেছিলেন মুখে রুমাল বাঁধা শিবিরকর্মীর “ষড়যন্ত্র” হিসেবে! নৈতিক স্খলনজনিত কারণে পদাবনতি হওয়া মিল্টন বিশ্বাস বৈশ্বিকমোহে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে সাধারণ বোধবুদ্ধি পযন্ত তার লোপ পেয়েছিল। গার্মেন্টস শ্রমিকদের অবজ্ঞার দৃষ্টিতে না দেখে আত্মমর্যাদাবোধের দিক থেকে বিবেচনা করলে বুঝতে পারতেন, এই পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় সকলেই আসলে পুঁজির দাস। হোক সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গার্মেন্টস শ্রমিক কিংবা মেথর। আমরা বরং একজন শিক্ষকএর সাথে মেথরের পার্থক্য করতে পারি এই বলে যে, মেথর মানববর্জ্য পরিষ্কার করেন আর শিক্ষক পুঁজিবাদের বর্জ্য মানুষের মস্তিকে প্রবেশ করান। মানুষের সাথে মানুষের পার্থক্য হয় আদপে জীবনকে গ্রহণ করার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে গার্মেন্টস শ্রমিকরা দাসত্ব করলেও এই দাসত্ব তারা মানসিকভাবে মেনে নেননি, যেভাবে মেনে নিয়েছেন মিল্টন বিশ্বাসরা।

সাবেক ভিসি আবদুল মান্নান উন্নিশ হাজার ছাত্রের আন্দোলনকে অবহিত করলেন শিবিরের “ষড়যন্ত্র” হিসেবে। আবিষ্কার করলেন মুখে রুমাল বাঁধা শিবিরকর্মীদের তৎপরতা। রাজনৈতিক কারণেই চবি’র ছাত্রদের একটা অংশের সাথে আমার যোগাযোগ আছে। তাদের একজন, অজিত রায় (ছদ্মনাম) এই অভিযোগ প্রসঙ্গে আমাকে আক্ষেপ করে বলেছে, আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা, ভোট দিছি আওয়ামলীগরে, পুলিশের টিয়ার সেলের ধোঁয়া থেকে বাঁচার জন্য মুখে রুমাল বেঁধে আমি হলাম শিবির কর্মী।’ সত্যিইতো, যুদ্ধাপরাধের বিচার আর ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নবিভোর ছাত্রদের একটা বড় অংশইতো ভোট দিয়েছে আওয়ামলীগকে। আবার এই ছাত্ররাই শিক্ষাজীবন যখন সংকটের মুখোমুখি, তখন পঙ্গপালের মতো নেমেছিল আন্দোলনে। মোটামুটি এরকমই হচ্ছে বেতনফি বৃদ্ধির পক্ষে মতাবলম্বনকারী শিক্ষকদের আন্দোলনবিরোধী যুক্তি। এবার আমরা সেই নিরপেক্ষ দর্শনধারী শিক্ষকদের পরিণতির দিকে নজর দিতে পারি। একই পত্রিকার দু’দিন পরের রিপোর্ট, শিক্ষকের সাথে দুর্ব্যবহার/ ছয়মাসে চার ঘটনা শাস্তি হয়নি কারও।’ বছর দেড়েক আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের জাহেদুর রহমানকে বহিষ্কার করা হয়েছিল শিক্ষক লাঞ্চিত করার মিথ্যা অভিযোগে। যে অভিযোগের কথা তার চরম শত্রুদেরকেও বিশ্বাস করানো যায়নি। মূল ঘটনাটা ছিল এইরকমছাত্রীনিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনের সময় জাহেদুর রহমান ছিলেন আন্দোলনের পক্ষে একজন বামরাজনৈতিক কর্মী। অথচ আজ যখন শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের ছেলেদের হাতে শিক্ষকরা দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন, লাঞ্চিত হচ্ছেন, এবং পিটুনি খেয়ে আহত হচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা না করে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়াতেই শিক্ষকরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। এই যেন চকলেটের সেই বিজ্ঞাপন চিত্রের মতো, যেটা খেলে শুধু লোহা নয় অপমানও হজম হয়ে যায়। অথচ আমাদের দেশে ছাত্রশিক্ষকের সম্পর্কের ইতিহাস হচ্ছে সমব্যথিত হবার ইতিহাস। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করার ইতিহাস। যেটা আমরা বিগত শতাব্দির নব্বই দশক পযন্ত প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের স্মৃতিতে এখনো ভাস্বর হয়ে আছে ছাত্র আর শিক্ষকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামরিক শাসক বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস।

ছাত্ররাজনীতি বিরোধী প্রপাগান্ডাটা নব্বইয়ের পরবর্তী তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসন কাল থেকেই শুরু হয়েছে। এই প্রপাগান্ডার সূচনা হয়েছিল বুর্জোয়া মিড়িয়া ও শাসকশ্রেণীর পোষা বুদ্ধিজীবিদের দ্বারা। বুর্জোয়া রাজনীতির আদর্শহীনতা ও তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর চরম নৈতিক স্খলনএর রাজনৈতিক কারণ ব্যাখ্যা ছাড়াই ঢালাওভাবে ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতার ফলে আজ ছাত্রসমাজের সবচেয়ে বড় অংশাটাই রাজনীতিবিমুখ। অথচ আমরা আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বুঝতে পারি, রাজনৈতিক চেতনা ছাড়া কোন মানুষের সামাজিক দায়বোধ জন্মাতে পারে না। এই রাজনীতিবিমুখিতার অপরিণামদর্শিতা আজ আমরা লক্ষ করছি ছাত্রশিক্ষক উভয়ের কাছে। রাজনীতিবিমুখতার অর্থতো শুধু রাজনীতিবিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সামগ্রিক বিচারে সমাজ বিচ্ছিন্নতাও বটে। তাইতো আমরা আজ লক্ষ করলাম, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নামধারী হাতেগোণা কিছু সন্ত্রাসীছাত্রের হাতে পিটুনি খেয়ে পাঁচজন শিক্ষক আহত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারহাজার ছাত্র তখনো অবলম্বন করেন নিরপেক্ষতা। শুধু ছাত্রদের কথা বলছি কেন? একই স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ যে শিক্ষক তাদের অবস্থানইবা কী! একজন শিক্ষকের অপমানতো সমগ্র শিক্ষকসমাজকেইতো দগ্ধ করার কথা ছিল। অথচ আমরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখলাম ঠিক তার উল্টো চিত্র। ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের সাথে করতে হলো আপোষ। বৈশ্বিক উন্নতির মোহ, আত্মপ্রেম তাদের এতটাই মেরুদণ্ডহীন করে ফেলেছে, আজ তারা একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যুনতম সৎ সাহস পর্যন্ত দেখাতে পারে না। এত লাঞ্চনার পরেও তারা নিরপেক্ষ থাকে।।

 

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s