লিখেছেন: কল্লোল কর্মকার

আমি লিখতে চাইনি। কারণ আজকাল লেখা আর কারও মনে আঘাত কিংবা প্রতিঘাত করে না। মানুষের মন আজ কর্পোরেট কোম্পানির বাগানে লাগানো প্লাস্টিকের ফুল। তবুও আজ সকালে ঘুম থকে উঠে কলম ধরতে হলো নিজের কাছে নিজের দায় থেকে। সকালে একদিনের বাসি পত্রিকায় একটা নিউজ দেখে নিজেকে সামলে রাখা কষ্টকর হলো। লেখাটা ছিল আমি সর্বহারাশিরোনামে সাংবাদিক মিনার মাহমুদের লেখা একটা চিঠি। আত্মহত্যা করবার আগে স্ত্রী লাজুককে লেখা তার এই শেষ চিঠিতে তিনি লিখে গেছেন তার যন্ত্রনা ও এই সমাজের কুৎসিত ক্ষতগুলোর কথা।

মিনার মাহমুদ

মিনার মাহমুদ যখন সকাল বেলা বাসা থেকে বের হন তখনও তিনি জানতেন যে তিনি আর ফিরে আসবেন না বাসায় নিজের স্ত্রীর কাছে। কতটা স্বপ্নভঙ্গ হলে একজন মানুষ এতটা পরিকল্পিতভাবে নিজেকে সর্বহারা ঘোষণা করে আত্মহত্যা করতে পারে। তার এই আত্মহত্যার জন্য দায়ী এই রাষ্ট্র, এই ব্যবস্থা এবং এই রাষ্ট্রের মিডিয়ার কুৎসিত সম্পাদকরা।

মিনার মাহমুদের চিঠির বয়ানে আত্মহত্যা প্রসঙ্গে: মোটেও না, আসলে নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। কারও প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ আছে আমার বাংলাদেশের সার্বিক সমাজ ব্যবস্থায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরবর্তী সময় থেকে এযাবৎকাল এদেশের মিডিয়ার উপর এসেছে একের পর এক আঘাত। কখনও মিডিয়াকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। একটা সময় মিডিয়া দাসত্ব করেছে কোনো দলের আর এখন দাসত্ব করছে কর্পোরেট কোম্পানির। শেখ মুজিব থেকে শুরু করে নব্য শাহেনশাহী শেখ হাসিনা পর্যন্ত কেউই মিডিয়ার উপর তাদের কালো ডান্ডা ঘুরাতে এতটুকু কার্পণ্য করেননি। যার কারণে বাংলাদেশে এক সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা সাপ্তাহিক বিচিন্তানিষিদ্ধ হয়ে যায়, বন্ধ হয়ে যায় এর কার্যক্রম। আর এই পত্রিকার সম্পাদক মিনার মাহমুদকে আর দশটা খুনী দাগী আসামীর সঙ্গে কারাবর করতে হয়। একজন সাংবাদিকের জন্য এ চরম অপমানের। আর এই অপমানের কারণে আত্মহত্যা প্রকারান্তে খুন হয়ে রাষ্ট্রের কাধেই বর্তায়। আর রাষ্ট্রকেই নিতে হবে এই বিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ভার। ইতিহাস অন্তত ক্ষমা করবে না।

পরে একটি চাকরির জন্য কত চেনা অচেনা পত্রিকা মিডিয়ায় চেষ্টা করেছি কেউ নেইনি। অবাক হয়েছেন নিয়মিত লেখা এক সাংবাদিক। হাজিরা দেব, নিয়মিত লিখব, মাস শেষে একটা বেতন কোথাও হয়নি। কাউকে অভিযোগ করিনি আমাদের মিডিয়ার সম্পাদকরা একেকজন হলেন নর্দমার কীট মাফিয়া। মতিউর রহমান থেকে শুরু করে আবেদ খান পর্যন্ত সবাই কর্পোরেট মালিকদের ধামাধরা। কথায় কথায় চাকরি খাওয়া এবং সত্য প্রকাশে বাধা দেওয়া তাদের কাছে নিতান্ত মামুলি ব্যাপার। এছাড়াও আছে সাংবাদিকদের পাওনা বেতন দেওয়া নিয়ে চুড়ান্ত খাচরামি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, আমি নিজেও একজন সাংবাদিক। আমার শেষ কর্মস্থল বাংলানিউজে আমি এখনও বেতনের টাকা পাই। কিন্তু আজও মেলেনি সেই টাকা আমার। সম্পাদকদের এই ধরণের কুৎসিত কার্যকলাপে প্রতিদিন কোনো না কোনো সাংবাদিক হচ্ছেন নির্যাতিত। নিয়মিত মনে মনে আত্মহত্যা করছেন অনেকেই। অথচ দেশের কথা ভেবে, সত্য প্রকাশের জন্যই এরা জীবন বাজি রেখে এই পেশায় আসেন। তাদের খবর কেউ রাখে না। অন্তত মিনার মাহমুদের মতো প্রবী সাংবাদিকদের জন্য দ্বারে দ্বারে ধন্যা দিয়ে চাকরি না পাওয়া অনেক বড় অপমানজনক। আর সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে তার এই আত্মহত্যা খুন হয়ে সবগুলো মিডিয়া সম্পাদকের উপরও বর্তায়। সম্পাদকদের কোমরে দড়ি পড়িয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত কেন্দ্রিয় কারাগারে এই অপরাধের দায়ে।

একজন সাংবাদিক যে কিনা জীবনের বিশাল একটা সময় পার করেছেন শুধু খবরের পেছনে ছুটে। মৃত্যুর আগে তার ব্যাংকে টাকা ছিল মাত্র চার হাজার টাকা। নেই এক খন্ড জমি, নেই একটা ফ্লাট পর্যন্ত। অথচ এখন সাংবাদিকদের ব্যাংকে চার হাজার টাকা আছে তা কল্পনা করা যায় না। আমার এই কথা শুনে অনেকেই হয়তো বলতে পারেন সময় বদলেছে, মালিকরা এখন অনেক বেশি টাকা দিচ্ছে। যারা একথা বলছেন তারাও ধামাধরা। অবস্থার পরিবর্তন হয়নি একটু। শুধু নতুন বোতলে পুরোনো মদ মাত্র। বেড়ছে সাংবাদিকের ভেতর অপসাংবাদিকতার ঝোক। কথায় কথায় হলুদ খামের প্রচলন। ক্যামেরা নিয়ে খেপের কাজ করা। এনজিওর কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে হলুদ খামের জন্য অপেক্ষা করা, বসুন্ধরা কোম্পানির মতো বিশাল কর্পোরেট কোম্পানির দরজায় গিয়ে নতুন পত্রিকা করার প্রজেক্ট গেলানো আর নিজের বেতনটাও তিন লাখ ছাড়িয়ে নেওয়া। এসবই চলছে, আর এ কারণেই সাংবাদিকরা আজকাল কিছু দেখেও দেখে না। সাংবাদিকরা আজ হয়ে গেছে পর্নো ছবির নায়ক যে বিরামহীনভাবে কয়েকঘণ্টা ধরে কোমর দুলিয়ে তো দুলিয়েই যাচ্ছে। যখনই পর্নো পরিচালক বলছে এবার ঢালো, তখনই তিনি ঢালছেন।

অনেক কিছুই লেখা যায় এই সামগ্রিক অবস্থার বিপরীতে গিয়ে। কিন্তু সব নষ্টদের রাজ্যে বসে বেশি কিছু লিখতে মন চায় না। তাই প্রকৃতির কাছেই এই অন্যায়ের বিচার চেয়ে প্রার্থনা করলাম, আর যেনো কোনো মিনার মাহমুদকে এভাবে আত্মহত্যা করতে না হয়।

(লেখাটা কয়েকদিন আগেই লিখেছিলাম, কিন্তু ব্যক্তিগত অস্থিতিশীলতা এবং ইন্টারনেট সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তা প্রকাশ করতে পারিনি। লেখক)

 

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s