লিখেছেন: মেহেদী হাসান

সূযের্র প্রখর আলো নয়, চাদের নরম আলো নয়, তারার মিটমিটে আলো নয়, বৈদুতিক বাতির স্থির আলো নয়, কুপির কাঁপা আলো নয়। এ আলো শিক্ষার আভা, জ্ঞানের জ্যোতি। এ আলো জাগতিক অন্ধকারকে দূর করেনা ঠিকই কিন্তু সরিয়ে দিতে পারে মনের তমসা, হৃদয়ের কুপমন্ডুকতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোরামীকে। আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ এ আলোর স্বর্গীয় আভা থেকে বঞ্চিত। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এ বঞ্চনাই তাদের সকল নিগ্রহের মূল কারণ। এ আলোয় অবগাহন করে জ্যোতির্ময় না হতে পারলে তাদের মনুষ্যত্বের হানি কোনদিন ঘুচবে বলে আমার মনে হয়না।

ছোট একটি দীপ শিখা জ্বালিয়ে, শিক্ষার আলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে একটি অজপাড়া গাঁয়ের কয়েকজন উদ্যমী, উৎসাহী তরুণী, তাদের মা, চাচী, ভাবী, ফুপু, দাদীদের মধ্যে। অনেক আগ্রহ করে, অনেক কষ্ট স্বীকার করে, অনেক বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে একটি নৈশ বিদ্যালয়; শখ করে তারা এটির নাম রেখেছে আলো। এটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তারা কারও নিকট চাঁদার জন্য দ্বারস্থ হয়নি, কোন ধরনের এনজিওএর নিকট কোন প্রকারের সহযোগিতা গ্রহণ করেনি। কেউ বাবার পকেট মেরেছে, কেউ মায়ের জমানো টাকায় হাত দিয়েছে। হৃদয়ের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে, বেবাক উদ্যম মিশ্রিত করে তারা আলো এর কার্যক্রম শুরু করেছে। আলো প্রত্যাশীদের তারা খাতা, কলম, বই কিনে দিয়েছে, পাশের প্রাইমারী স্কুলের নিকট থেকে তারা পরিত্যাক্ত ব্ল্যাকবোর্ড ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে নতুন করে গাঢ় কালো রঙ করে দিয়েছে অন্ধকার কে আলোয় ভরবে বলে। নিজেদের বাড়ীর গাছ কেটে চিড়াই মিলে নিয়ে গিয়ে তক্তা বানিয়ে নিয়ে এসেছে, জ্ঞান বৃক্ষ লাগাবে বলে। সেই তক্তা দিয়ে গ্রামের ছুতারেরা বেঞ্চ চেয়ার টেবিল বানিয়ে দিয়েছে আলো গ্রহীতারা বসবে বলে। তারপর গ্রামের মাঝখানের একটি উঠোনে বৈদুতিক বাতি জ্বালিয়ে আলোর মেলা বসেছে। মুঠো মুঠো আলো ধরার তীব্র বাসনায় একে একে দল বেধে শোরগোল তুলতে তুলতে উপস্থিত হতে থাকে যুবতী মধ্যবয়স্কা, পৌঢ়া, বৃদ্ধা নারীরা।

যে রাত্রে প্রথম উঠোনটি আলোকিত হয় সে রাত্রে উদ্যোক্তা তরুণীরা তদের হৃদয়ের কথা ব্যক্ত করে। কথা বলার সময় তাদের চোখ মুখ থেকে এমন আভা ছড়িয়ে পরেছে যেন মনে হচ্ছে তারা একেকটি তারার ফুল।

প্রথমে শুরু করে বহ্নি; তার যে কথাগুলো আলোর বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তেছিলো সেগুলো হলআপনারা আমাদের মা, দশ মাস গর্ভে ধারণ করেছেন, মৃত্যু যন্ত্রনা সহ্য করে পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছে্ন, বুকের দুধ খাইয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন মানুষের মত মানুষের হওয়ার জন্য স্কুলে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। লেখাপড়ার ক্ষতি হবে বলে গৃহের কোন কাজে হাত দিতে দেননি। নিজেরা অন্ধকারে থেকে আমাদের আলোর রাস্তায় নিয়ে গিয়েছেন। জ্ঞানের আলোকে আমাদের উদ্ভাসিত করেছেন। আমাদের মনের দরজা জানালা খুলে যাওয়ার কারণে এখন আমরা অনেক কিছুই জানতে পারি, বুঝতে পারি, দেখতে পারি। আফসোসের বিষয় হল, সেই আলোকিত পথ চলায় আমরা আপনাদেরকে পাশে পাইনা। আমরা আমাদের জন্ম ঋণ কিছুটা শোধ করতে চাই এবং আলোকিত পথ চলায় আপনাদেরকে সাথে চাই।

এর পর আসে রাণী, সে স্মিত হাস্যে দিপ্তী ছড়িয়ে দিতে দিতে বলেপৃথিবী আজকে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন আমরা ঘর বসে পৃথিবীর যেকোন জায়গায় অবস্থানরত যে কাউকে সরাসরি দেখতে পারি, কথা বলতে পারি, যেকোন কিছু জানতে শুনতে ও দেখতে পারি। সমস্ত পৃথিবীটা এখন তার নিজের দরজা জানালা খুলে দিয়ে আমাদের দরজার সামনে এসে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এমন সময়ে আপনারা মনের সব অর্গল বন্ধ করে দিয়ে অশিক্ষাকুশিক্ষা কুসংস্কার অজ্ঞানতা অসচেতনতা ও ধর্মীয় গোড়ামীর অন্ধকূপে ঝিম মেরে বসে আছেন। এখন আপনাদের প্রখর জ্ঞানালোকে পুরো দুনিয়ার সামনে এসে দাড়াতে হবে। আমরা আপনাদের এই আলোর মিছিলে সহযোদ্ধা হব।

জিতা, তার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা বেদনাকে ভাষায় রূপ দিতে দিতে বলেআগেকারদিনে চোরেরা সিধকাঠি নিয়ে এসে আমাদের বাড়ীতে এসে হানা দিত কিন্তু এখন আর সিধকাঠি নিয়ে আসার কোন দরকার হয়না। কারণ এখন তারা সাক্ষরতা অর্জন করেছে। কলমকে রূপান্তর করেছে তাদের সিধকাঠিতে, ওরা এখন ঋণ খেলাপী, কালোবাজারী, ও দূর্নীতি করে আমাদের সবিছু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান চক্ষু মুদ্রিত থাকার কারণে কিছুই টের পাইনা, কিছুই বুঝতে পারিনা। আমরা নাক ডেকে ঘুমাই আর ওদিকে আমাদের সহায় সম্পদ এমনকি মনুষ্যত্ব লুট হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন প্রতিরাত্রি। কোন অজানা রাজ্য থেকে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে কোন রাজপুত্র এসে আমাদের কপালে সোনার কাঠি ছুইয়ে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিবেনা। গা ঝারা দিয়ে আমাদের অজ্ঞানতার ঘুম আমাদেরই ভাঙ্গাতে হবে। স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন চোর ডাকাতদের হত্যা করতে হলে আমাদের দরকার পড়বে আলোর বর্শা এবং এ বর্শা হাতেই পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ অন্ধকার রাত্রি।

রিয়া স্বপ্নথোতিতের মত বলেস্বপ্ন দেখার ও বন্ধন ছিন্ন করার কাজে ঝাপিয়ে পড়ার এখনই সময়; আপনাদেরকে জাগতেই হবে। আপনাদের শোষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশী। কারণ এই নষ্ট সমাজে প্রথমত আপনারা নারী, দ্বিতীয়ত গরীব, তৃতীয়ত অশিক্ষিত। এই তিনটি ধাপেই আপনারা শোষিত হন। এবং সময়ের তালে তালে নিগ্রহের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এটা থেকে মুক্তি একমাত্র উপায় হল শিক্ষার অস্ত্রে জ্ঞানের পোশাকে নিজেদেরকে সজ্জিত করা। তাহলেই আপনাদের মনের অন্ধকার ঘুচবে, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, বলিষ্ঠ কণ্ঠে নিজেদের অধিকার দাবী করতে সম্মুখ লড়াইয়ে নামতে পারবেন।

সবার মাঝখানে বসে থাকা আশি বছরের এক বৃদ্ধাকে উশখুশ করতে দেখে রাণী আর বহ্নি এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে নিয়ে এসে, সবার সামনে বসিয়ে দিল। বৃদ্ধা খনখনে গলায়, সবার দিকে অস্পষ্ট ঘোলা দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে করেতে বলল, আমি পড়মু, পইড়্যা আমি স্বাধীন অমু। বিটিশ আমলে হুনছি, দেশ বাধীন অইলে আমরা হগ্গলেই অনেক কিছু পামু, আমাগো কেউ আর ঠোক্কর দিবনা। পাকিস্তান অইলো, আরো বেশী ঠোক্কর খাইলাম। তারপরে শেখ মুজিবের কতা হুইন্যা স্বাধীন বাংলাদেশ বানাইলাম। এইহানেও খালি ঠোক্কর খাইতাছি। আমার আর কুলায় না! আমি আর ঠোক্কর খাইতে চাইনা। আমি অহন নিজে স্বাধীন অইবার চাই। নিজের স্বাধীনতা না থাকলে দেশের স্বাধীনতা দিয়া আমি কি করমু। ধুইয়া ধুইয়া পানি খামু! আমার স্বাধীনতা আছিলনা বইল্যাই হগগলে আমারে ঠোক্কর দিতে পারছে। হারাডা জীবন অন্ধকারের মধ্যেই কাটাইয়া দিলাম, অহন আমি একটু আলো দেখতে চাই, দেহি কেমুন লাগে।

বসে থাকা তরুণীদের গলার কাছে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠে, কে যেন তাদের দিকে প্রচন্ড জোরে নিক্ষেপ করে কাদুনে গ্যাস। তীব্র যন্ত্রণায় তদের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। পুরোটা পরিবেশ জুড়ে নেমে আসে অদ্ভুত রকমের নিস্তব্দতা, যেন নতুন প্রাণের উত্তাপ বইবে বলে নেমে এলো মৃত্যুর শীতলতা। এমন সময়ে হালকা বাতাসের আলোড়নে গাছ থেকে কয়েকটি শুকনো পাতা খসে পড়ে। একখন্ড কালো মেঘ উত্তুরে বাতাসে ভেসে এসে থালার মত গোল ভরা পূর্ণিমা চাঁদের অর্ধেক অংশকে ঢেকে ফেললে বাকি অর্ধেক অংশ আরো বেশী উজ্জ্বলতায় জ্বল জ্বল করতে থাকে।

আলোকোজ্জ্বল দিন যতই সামনের দিকে এগুতে থাকে শিক্ষানবিশীদের সংখ্যা ততই বাড়তে থাকে। পতঙ্গ যেমন আলোর আভায় উন্মাদের মত ঝাকে ঝাকে এসে আগুনে পুড়ে ভস্মীভুত হয়ে যায় তেমনি আলোর কার্যক্রম শুরু হওয়ার সাথে তারা দলবেধে ছুটে আসতে থাকে নিজেকে, পুরাতনকে, জড়তাকে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে নতুন আলোকে নতুন ধরনে জন্মগ্রহণ করবে বলে। অন্ধকার কূপের বদ্ধ পানির মধ্যে থাকতে থাকতে তাদের শরীর মন হৃদয় পচা পানির দুর্গন্ধে ভরে গিয়েছে,,তারা এখন নতুন পানির স্রোতস্বীনি নদীতে নিজেদের কে ভাসাতে চায়। ভাসতে ভাসতে তারা মিশে যেতে চায় বিশাল গভীর তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ সাগরের নোনা জলে। প্রাণের তীব্র জলোচ্ছাসে নষ্ট, গলিত, পচে যাওয়া ভ্রষ্ট সমাজের সকল প্রথানিয়ম বৈষম্যকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলতে।

দৈনন্দিন কাজে তাদের ধৈর্য্য সহিষ্ণুতা অধ্যবসায় ভালোবাসার শক্তি, হাড়ে মাংশে সৃষ্টির বেদনা দেখে এটাই মনে হয়, তারাই পারবে গতিশীল বৈষম্যহীন, সৌহার্দ্যের নতুন সমাজ প্রসব করতে। এবং সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর মত আদরে ভালোবাসায়, মায়ামমতায়, স্নেহের স্তন্য পান করিয়ে বুকের উষ্ণতায় কোলের নির্ভরতায় গড়ে তুলতে। কিন্তু এই নতুন সমাজের জন্ম প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে পুরুষতান্ত্রিকতা। যদি তারা নতুন আলোর তরবারীকে প্রচন্ড সাহসে উদ্দীপিত আশায় সামনের দিকে বাগিয়ে ধরতে পারে তাহলে অচল স্থবির বর্বর পুরুষতান্ত্রিকতা, আলোর তীব্র ঝলকানিতে যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে মৃত্যুর শীতলতায় স্থবির হয়ে যাবে।

নতুন প্রাণের জোয়ারে তারা শুধু উচ্চস্বরে স্বরে অ স্বরে আ ক খ উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকতে চায়না। তারা পুরাতন জীবনের যন্ত্রনায় এবং নতুন জীবনের আহ্বানে ছটফট করতে থাকে। তারা অন্ধকারের মধ্যে সহস্র বছর ধরে পড়ে রয়েছে। সীমাবন্ধ গন্ডীর খোলস ছেড়ে তারা এখনই বেরিয়ে আসতে চায়। তাদেরকে প্রত্যেকদিন খবরের কাগজ, সপ্তাহে একদিন গল্প কবিতা উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে পড়ে শোনাতে হয়। মাসে একদিন প্রজেক্টর লাগিয়ে বাছা বাছা আর্ট ফিল্ম দেখাতে হয়। এসময়ে তারা উজ্জ্বীবিত হয়, আন্দোলিত হয় মোহিত হয়, আমোদিত হয়, শোকার্ত হয়, চোখে মুখে আলো ঝিলিক দিয়ে উঠে।

তারা এখন বেশি বেশি হাস মুরগী পালন করে বাড়ীর মধ্যে গর্ত করে, অল্প পানিতে থাকতে পারে এমন কুমড়ো ইত্যাদির চাষ করে। এভাবে তারা ধীরে ধীরে নিজেরা সাবলম্বী হয়ে উঠতে চায়। এভাবেই তারা দৃঢ় পদক্ষেপে লক্ষ্যের দিকে স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তাদের সামনে রয়েছে পর্বত তুল্য বাধা বিপত্তি। পথ পুরোটাই কাঁটায় ভরা, যেকোন সময় সমাজের চোরাবালিতে ডুবে যাবার সম্ভবনা। শত শত হায়েনা তীক্ষ্ণ দাঁত ধারালো নখর সমেত এগিয়ে আসছে তাদেরকে ক্ষতবিক্ষত করতে, রক্তাক্ত করে তাদের প্রাণ বায়ু শুষে নিতে। বার হাত শাড়ী তাদের অজগরের মত পেঁচিয়ে রাখে, ধর্ম তাদের মুখের সামনে ফনা তুলে থাকে, মিছরির ছুরির মত ভালবাসা নামধারী তীক্ষ্ণ শর পেছন দিক থেকে ধেয়ে আসে কলিজাকে ভেদ করে যেতে, মায়া মমতা নামধারী জোঁক তাদের তাদের সর্বাঙ্গে কামড়ে ধরে আছে সব রক্ত শুষে নিতে। সব কিছু কে টেক্কা মেরে পেছনে ফেলে তারা কি পারবে নতুন স্বপ্নের জাল বুনতে, নতুন আলোয় স্নিগ্ধ হতে!!

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s