লিখেছেন: মাহাবুব হাসান

শুরুর আগে

শিল্পসংস্কৃতি এক অশেষ পথ রেখা ধরে এগিয়ে চলে। সংস্কৃতিকে সময়পর্ব দিয়ে ভাগ করা অনেকটাই যান্ত্রিক ব্যাপার। যে কোন ধরণের ক্ষমতা কাঠামো (সেটা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক) ভারসাম্যপূর্ণ বা ন্যূনতম ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারলেও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তা কিন্তু একেবারেই সরাসরি ও দৃশ্যমান ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া তৈরী করে না। তার বিকাশ ও ক্রিয়া প্রক্রিয়া চলে সুস্থির একটা নিবিড় পর্যায়ের মধ্য দিয়ে। সময়ের ধারাবাহিক এগিয়ে চলায় ঐতিহাসিকভাবেই শ্রেণী তার নিজস্ব ক্ষমতা কাঠামোকে (মানবিক বা অমানবিক) টিকিয়ে রাখার জন্য সংস্কৃতিকে বারংবার রূপান্তায়িত করে বা সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটে যায়। এটা মনে করারও কোন কারণ নেই যে রাজনৈতিকঅর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেসব কাঠামোর বিবর্তন বা পরিবর্তন ঘটে, সেই সব ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার কোন কিছুই সংস্কৃতির উপর পরে না। অবশ্যই পড়ে। কেননা এটা আরো ঘনিষ্টভাবে মনে রাখতে হবেযে কোন ধরণে উৎপাদনই (শিল্পসাহিত্য) সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থার বাইরের কিছু নয়। মানুষ একই সাথে সামাজিক সত্ত্বা ও একক সত্ত্বা। যে কোন ব্যক্তির কাছেই ‘সমাজ’ এ আপাত বিমূর্ত ধারণাটির প্রকৃত অর্থটি বলতে গেলে বলতে হবে সমসাময়িক ও পূর্ববর্তী সকল গোষ্ঠী বা প্রজন্মগুলোর পরোক্ষ ও প্রতক্ষ্য সকল মানুষের সম্পর্কের একটি যৌথ যোগফল।

একক সত্ত্বা হিসেবে ব্যক্তি নিজেই চিন্তা, অনুভব ও নানাবিধ প্রকল্প ও প্রচেষ্টা চালাতে সক্ষম। কিন্তু এই দৃশ্যের গহীনের প্রকৃত উন্মোচনটি হলো ব্যক্তি তার সকল অনুভূতিময় কর্ম বা অস্তিত্বের মধ্যে শারীরিক ও চৈতণ্যের বিকাশ ও উপস্থাপনের জন্য সমাজের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তাই সমাজ কাঠামোর বাইরের অংশ হিসেবে তাকে কোনভাবে চিন্তা করা বা অন্য কোন প্রক্রিয়া যদি থেকে থাকে তা দিয়ে বোঝার ও গভীরভাবে অনুশীলন করা এক কথায় হবে অলিক ও অসম্ভব। মানুষ তার সব প্রয়োজনীয় সকল কিছুর যোগানকাজের জন্য হাতিয়ার, হাতিয়ার ব্যবহারের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল,নানা রকমের বিকশিত শ্রমশিল্প, আর মৌলিক চাহিদাগুলোতো রয়েছেই; আরো রয়েছে প্রাণী হিসেবে মানুষের সবচেয়ে বিশেষ বিকশিত অবস্থানটি, তার চিন্তা করার সক্ষমতা, ভাষা ও চিন্তা করার নানা রূপ ও কৌশল এবং সর্বোপরি চিন্তার সকল বিষয়াদিসহ মানুষের ইতিহাসটাই গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানুষের একটু একটু কাজের অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে, আর তা লুকানো রয়েছে ছোট একটি শব্দের মাঝে, সে শব্দটি হলো ‘সমাজ’। এখন এটা একেবারেই সুস্পষ্ট যে সমাজের ওপর একক ব্যক্তি সত্ত্বার নির্ভরশীলতা পৃথিবীর সমান বয়েসী বিবর্তনশীল বিকাশমান মানুষের সব চেয়ে সরল প্রকৃতিজাত ঘটনা। এই মানুষই এখন তার নিজের জন্য উৎপাদন ও ভোগের এক ‘গ্রহভিত্তিক’ সমাজিক ক্ষমতা কাঠামো অন্যায্যতার ও নিপীড়নের এক মুনাফা উন্মাদ পুঁজির গারদ বানিয়েছে। এবং কী আশ্চর্য এ অভিজ্ঞতা! নিরুত্তাপ মানুষের মাঝে আমরা বেঁচে আছি, আমাদের স্পর্ধীত সকল আগুনের তাপ ও সংকল্পগুলোর পসরা সাজিয়ে মুক্তবাজারের হাটে !

সৎভাবে বাঁচা আর সাচ্ছন্দ্য দুটোই পরস্পর বিরোধী

পুঁজি ও প্রথাগত মুনাফা প্রতিষ্ঠানের বাইরে একজন নির্মোহ শিল্পী বা শব্দশিল্পীর কাজের যে সৃষ্টিশীল ধরণ সেটা বা তার যা মানসিক উৎপাদন তার একাগ্রতা ও মুনাফাহীনতার যে বিকল্প সৃষ্টির প্রয়াস ও প্রক্রিয়া তা কখনোই আদর্শগত অবস্থানের বাইরে গিয়ে বা বিভ্রান্তির বিলাসিতায় ভোগবে না। এক দৃঢ় সংকল্পের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলবে সে লড়াই। আর প্রতিটি সংগ্রামেরই একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। যেমন যে কোন আন্দোলনের একটি সফলতা বা সংস্কৃতিক বা শিল্প,সাহিত্য ভিত্তিক অন্দোলনগুলোর ক্ষেত্রে আমরা অবগত আছি যে সেগুলো অতীতের প্রচলিত সকল শৃঙ্খল, আগ্রাসন, আধিপত্যবাদীতার সমাজ ও রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরাচারিতা ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ধারালো তুলি বা ‘কালির গমক’ নিয়ে এগিয়ে এসেছে স্পর্ধার স্ফুলিঙ্গের জ্বলজ্বলে আগুনের সুপরিকল্পিত ও চেতনার স্ফুরিত বলগে। শার্ল বোদলেয়রএর কথায়ই বুঝে নিতে পারি যে মুনাফাপুঁজির নগ্নতাকে আরো নগ্ন করে দিয়ে তিনি মারলেন এক লাথি এ কথার মধ্য দিয়ে যে – ‘জীবিকা উর্পাজন করা যায় না এমন লেখা লেখাটা প্রতিভা। জীবিকা উর্পাজন করা যায় না এমন লেখা লিখতে হবে।’

লিখতে হবে সেই সব শব্দ বাক্যের ধারালো ব্লেডক্ষর যার প্রতিটি উচ্চারণের ফলে পুঁজির মুনাফাখোরদের মানসিকতায় তীব্র এক যাতণার জলোচ্ছাসের ঘূর্ণী ঝড়ের তাণ্ডবের তছনছ করা এক মানবিক প্রশান্তির উন্মাদনা নিয়ে আসে। কেননা ‘মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে,মেহনতী মানুষের ওপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন (বিকল্প) ব্যবস্থাই হল মুক্তির অর্থ। যে মুক্তির তীব্রবোধে তাড়িত হয়ে একজন শিল্পী বা শব্দশিল্পী তার সমস্ত চৈতন্যের ভেতর রোপন করে নেন এক বিপ্লবী মনস্তত্ত্বের নিখাঁদ বীজ। সে অঙ্কুরিত বিষের যন্ত্রণাময় জ্বালাভরা শিল্প চেতনার মধ্য দিয়ে উৎপাদন করে চলেন একক সত্ত্বা হয়েও সামাজিক দ্রোহ। প্রচণ্ড এক যুদ্ধে নেমে পরে সাম্যের মানবিক সেই সূর্য উজ্জ্বল্যের আবিষ্কারে। যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে অবিশ্বাস, মধ্যবিত্তিয় সংর্কীনতার ষড়যন্ত্রময় প্রতারণার খেলা চলে মানুষের স্বাভাবিক সরল সব অভিব্যক্তির প্রকাশ্য খুনের মুনাফায়!

একজন নিষ্ঠানবান লেখক যিনি প্রথমেই হয়ে উঠবেন একজন সামাজিক মানুষ। সেই সত্ত্বাটি তার পরিবেশপ্রতিবেশের যে লাঞ্চিতনীপিড়িত মানুষের যন্ত্রণাকে,শিহরণকে,আকাঙ্খাকে এবং শ্রেণীগত বৈষম্যের কারণে নানা রকমের আধিপত্যের শিকার হয়েও সমানুভবতা দিয়ে উপলব্দি করে এবং সে উপলব্দির নিরিখে মুহূর্তগুলোকে রঙ বা ভাষার বিবরণের মধ্য দিয়ে নিখাঁদ বাস্তবতার স্বরূপটাকে বিশ্লেষনী প্রকরণ বা ভঙ্গিতে রচিত করে জীবন্ত করে তুলেন,তিনিই তো প্রকৃত শিল্পী বা শব্দশল্পী। যখনই প্রকৃত সৃষ্টিশীল কাজে নিযুক্ত হচ্ছেন তখন থেকেই শিল্পী বা শব্দশিল্পী তার আদর্শ ও নিজ ভূখণ্ডের মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। তার শিল্পকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়ে নেমে পড়ছে একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মীর মতোই। এ জায়গাটিতেও একটি বিষয়ে আরো একটু ফর্সা হওয়া অনেকটাই প্রয়োজন যে, শিল্পী যিনি তার নিজস্ব সৃষ্টিসৃজনশীল মাধ্যমের চর্চ্চাকে পুঁজিতান্ত্রিক এ বিশ্বায়নের মুক্ত বাজার ব্যবস্থার নির্মম পরিস্থিতিতে তার শিল্পকে কোন পণ্য হিসেবে দেখতে নারাজ। এবং এ পণ্যায়ন করে তোলার যে প্ররোচিত প্রক্রিয়া চারদিকে চলমান এবং বুর্জোয়া পুঁজিপতিদের যে যে আসল উদ্দেশ্য সৃজনশীল বিকাশকে মুনাফার ফাঁদে আটকিয়ে যেমনতেমন একটা ভালো মোড়ক সংবলিত বাস্তবতা বিবর্জিত পণ্য গড়ে তোলা।

সে সমস্ত প্ররোচনা, প্রলোভন ও তথাকথিত স্বীকৃতিকে বুঁড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, আদর্শিক চেতনার দৃপ্ততায় আবিষ্ট থেকে একজন সংগ্রামীর ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে একটি বিকল্প গণমানুষের প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করে শ্রেণীহীন এক সমাজের আকাঙ্খাকে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরে একটি বৈপ্লবীক কাজকে এগিয়ে নেয়ার বিপ্লবী দায়িত্বটি পালন করেন যিনি, তিনি শিল্পী বা শব্দশিল্পী। এ ক্ষেত্রে আমরা অনেকেরই নাম নিতে পারি যারা সারাটি জীবনযৌবন মানব মুক্তির লড়াইয়ের পাশাপাশি সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেও বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তার একটা প্রধান কারণ হিসেবে বলা যায় যে জীবন যাপনের এমন একটা নিবিড় অবস্থায় তারা মেহনতী সাধারণের সঙ্গে এক অলিখিত আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে, যে কারণে তাদের সকল অনুভূতির সঙ্গেই একটা সম্পর্ক স্থাপন হয়ে উঠেছিলো। যার ফলশ্রুতিতে সামাজিকভাবে যেমন একটা উৎপাদন তারা করেছেন (গল্প,কবিতা বা উপন্যাসে’র) ক্ষেত্রে, তা একেবারেই হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত বস্তবতার দলিল।

এ পথের শেষ কোথায়, ও পথিক?

ক্ষমতাবানেরা, মানে এ মুক্ত পুঁজির সওদাগরেরা যারা সব ঠিক করে দেয় যে,আমরা কখন কি করবো? কি খাব? কি মাখবো? কি পড়বো? কতটুকু স্বাধীনতা আমাদের জন্য রক্ষিত? কোন ভাষায়, কি ভঙ্গিতে কথা বলবো? আমাদের জন্য ঠিক কোনটা সঠিক মূল্যবোধ? তারা একের পর এক নৈতিকতার শৃঙ্খলও আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখে। কি এক ভয়াবহ চেতনার নৈরাজ্যের ভেতর আজ আমাদের সকল ‘সৎচৈতণ্য’ অবরুদ্ধ। কি নিষ্ঠুরভাবেই না মানবিক বোধগুলোকে শোষণের সক্রিয় আক্রমনের মধ্য দিয়ে পুরো সমাজ কাঠামোটিকেই আত্মসম্প্রসারণশীল এক পতিত সার্কাসে পরিণত করা হয়েছে। আর আমরা সেই মশলা ও মখমলের লোভে পণ্য হয়ে উঠেছি যে কখন তা নিজেরাও খোঁজ করে পাচ্ছি না। এর কারণ কি শুধুই আমাদের ভীরুতা আর আত্মলিপ্সার আদর্শহীন এক বিচ্ছিন্ন বোধের ঘোরে’র উন্মাদ ঘোড়ায় চেপে তথাকতিথ স্বাধীনতার (স্বেচ্ছাচারিতা) নামে এক ধরণের সকল কিছুকে অগ্রাহ্য করে, সমস্ত ধরণের উৎপাদন থেকে নিজেকে বিরত রেখে বা কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন উৎপাদনের মধ্য দিয়ে আত্মগরিমায় ভোগা বৈপ্লবীক সাজার সঙ হয়ে ঘুরে বেড়ানো। আর নানাবিধ বিচ্ছিন্ন চিন্তার সম্মিলিন ঘটিয়ে এক অস্থির চেতনালোক তৈরী করার মধ্য দিয়ে সামাজিক মানুষ হয়ে উঠার পরও একক সত্ত্বাকে সর্বোচ্চ প্রাধাণ্য দিয়ে শিল্প বা তার নাম করে এক ভাগাঢ়ে পরিণত হওয়া বা নিজেকে বা নিজেদের (দলগতভাবে)বিচ্ছিন্ন এক প্রকল্পের অংশ ভাবা। এটা পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থারই মানসিকতা। যাকে কাজে লাগিয়ে পুঁজি সে বই হোক আর সাবান হোক তা বিক্রির পথ করে নেয়। যতো বেশি বিচ্ছন্নতা ততো বেশি আগ্রাসন চালানোর পরিস্থিতি তৈরী হয়। শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঘটনা একই। এক ধরনের বাঁধাছকে আটকিয়ে ফেলে শিল্পীর বা শব্দশিল্পীর যে সৃজনশীলতা তাকে নষ্ট করে ফেলবে। এই নষ্টতা থেকে সৃজনশীলতাকে বাঁচাতে হবে। এবং সময় এসেছে একেবারে পরিষ্কার করে বলবার যে, মানবিকবোধের সমাজ নির্মাণ করতে হলে– ‘পুজিবাদের একমাত্র বাস্তব ও বাস্তবায়নযোগ্য উত্তম বিকল্প হিসেবে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নেওয়ার এখনই সময়’।

অনেকেই হয়তো ভাবছেন যে শিল্পসাহিত্যের আলোচনা করার জন্য এতো দীর্ঘ রাজনৈতিক আলাপের প্রযোজনীয়তাটাই বা কি ছিল? ছিল, কেননা আমরা যখন নতুন কোন ভাবনা বা পর্যবেক্ষণের দিকে আগ্রসর হবো কখন আগেই গোটা সমাজ কাঠামোটি কেমন আছে? আর গোটা সমাজ ব্যবস্থাটাকে যে পাল্টানোর সংকল্প নিয়ে তা সচেতনভাবেই হোক আর অচেতনভাবেই হোক সংস্কৃতিগত ভাবে এ প্রক্রিয়া বহমান। এবং সাহিত্যের বেলায়ও এখানেই ঢুকে পড়ে পুঁজির অন্য এক চেহারা। যেহেতু সে সমস্ত ক্ষমতা কাঠামোটাকেই নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আবরুদ্ধ রাখতে চায় এবং রেখেছে। সে তার মতন করেই, মানে তার চিন্তা প্রক্রিয়া, তার ব্যবসার কায়দা, তার মহানুভবতা (অমানবিকতা)কে সে শিল্পসাহিত্যের মধ্য দিয়েও সমাজের ভেতর তার সম্প্রসারণশীল চরিত্রটাকে সুনিশ্চিত রাখার সকল কলায় মশগুল থাকে সর্বদাই। পুঁজিবাদ এটা ভালো করেই জানে মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিজের করায়াত্তে রাখতে হলে তাকে তার যে মানসিক খোরাক বা মানসিক উৎপাদনের কাছে যেতে হয়, সেখানটাতেও তার মতন করে একটা ক্ষমতা বলয় তৈরী কেরে রাখতে হয়। নচেৎ সৃজনশীল নিপীড়িত মানুষের একত্রিত ও সম্মিলিত হওয়ার যে সহজাত প্রবণতা রয়েছে, সে ব্যাপারে সে বেশ ভালই খোঁজ রাখে। তাই কিভাবে ভাষাকেও নিজের ‘রক্ষিতা’ করে রাখা যায় সেটা সাহিত্যপুঁজিওয়ালারা ভালো ভাবেই রপ্ত করেছে। এই চিন্তালোকের লুটেরাদের বিরুদ্ধেও গড়ে উঠেছে নানা রকম বিরুদ্ধতার দেয়াল। পুঁজিতান্ত্রিক ভাষার বিরুদ্ধে সৃজনশীল সাম্য ভাবনার মুক্ত ভাষার লড়াই। আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে মানবিক চেতনার লড়াই। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সকল বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে সামাজিক নানান মিথষ্ক্রিয়ায় বাস্তবতা ও মননের যে দ্বান্দ্বিক সংগ্রাম ও সংশ্লেষণ তৈরী হয়, তা একজন কবি বা কথা সাহিত্যিক বা সহিত্যের ও শিল্পের অন্যান্য শাখার চেতনায় সংক্রমিত হয়। এ সংক্রমণের বিষক্রিয়ায় যে বাস্তবানুগ পরিস্থিতির নিরিখে উপলব্দি ও অনুভবের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার চেতনার উৎপাদনটি ঘটান, সেটা কোন শ্রেণীর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। এটাই লেখার মূল স্রোত, যেখানে এই মুহূর্তে আমাদের সাথে বিষয়ের আলাপ শুরু হবে।

আগুনের প্রকৃত রঙ

লিটল ম্যাগাজিন শব্দটি আমদানিকৃত একটি শব্দ। যা আমাদের এ বাংলাদেশে ৮০এর দশক থেকে চর্চিত হয়ে আসছে। কেন লিটল ম্যাগাজিনের প্রযোজন পড়ল? সোজা এবং সহজ কথায় বলতে গেলে এভাবে বলা যায যে, দাসত্বহীনভাবে চেতনার সত্যকে অবিষ্কার করা ও তা প্রকাশের যে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে একজন শিল্পীর তা প্রতিষ্ঠিত করা। ব্যাপারটা আবার এভাবেও দেখলে বোধ করি ভুলভাবে দেখা হবে না যে, বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার ব্যবসাদারী, মুনাফালোভী, লুটেরাপুঁজিবাজ, বিজ্ঞাপনখোর এবং একমাত্র মুনাফা কেন্দ্রিক যে চিন্তার চর্চ্চা প্রচলিত ও তথাকতিথভাবে প্রসারিতও আছে, তার বিপক্ষে বা বিকল্পে একটা নতুন মানবিক সৃজনশীল সুষম পাল্টা ব্যবস্থা। যাকে লিটল ম্যাগাজিনের নিষ্ঠ কর্মীগণ প্রচলিত পুঁজিতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উল্টা স্রোতে দাঁড়িয়ে বিকল্প একটি সুষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। যার কোন দাসত্ব নেই, মুনাফার মনোভাব নেই, যা আছে নিজের মধ্যে বলকে উঠা সামাজিক বাস্তবতার নিখাঁদ উপলব্দ বিবরণ। যা এ বুর্জোয়া কাঠামোকে ক্রমশ আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে চৈতন্যের সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করে থাকে। এখানেই আসলে মূল কথাটি অন্তর্নিহিতভাব নিয়ে জ্বলে উঠে। যদি চেতনা হয় শ্রেণীবিভক্ত সমাজ পাল্টানোর। লেখা বা আঁকা হয় বুর্জোয়া বাজারী পণ্যের বিরুদ্ধে এক হাতিয়ার। তবে কেন তার একটি রাজনৈতিক সুস্পষ্ট অবস্থান থাকবে না?

কবিতা লেখার জন্য একটি মাত্র ইশতেহারকে সামনে এনে ৮০এর দশকে যে ‘ছোট কাগজ আন্দোলন’ বলে বিষয়টি বাংলাদেশে প্রচারিত ও প্রসারিত হতে থাকলো। তার দার্শণিক ভিত্তিগুলো কি? এখনো তা পরিষ্কার নয়। কেউ যদি বলতে চান যে তিনি সম্পূর্ণ একটি সমাজিক সত্ত্বা বিবর্জিত একক সত্ত্বার স্বাধীন মানুষ। তার লিখার বা ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে এবং তিনি ঠিক তার মতো করেই এক ধরণের গণবিচ্ছিন্ন হয়েই তার কাজ চালিয়ে যাবেন। তাহলে প্রশ্ন উঠা অনেকটাই স্বাভাবিক যেকোন কিছুই কি সামাজিক ও রাজনৈতিক উৎপাদনের বাইরের বিষয় কি না? এক ধরণের স্বেচ্ছাচারিতার দিকে মোহগ্রস্থ হয়ে নিজেই নিজের ভেতর গড়ে তুলেন নতুন এক মূল্যবোধ। সে মূল্যবোধ কতোটা বাস্তবানুগ বা সমাজ বিকাশের ধারাবাহিক নিরিখে কতোটা মানবিক সমাজ বাস্তবতা তৈরীতে সক্ষম? সে সব ভাবনার দিকে না গিয়ে নিজের হাতে তুলে নিয়ে নিজের বানানো বর্ম নিজেকেই হত্যা করে চলে অবিরাম। ‘লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন’ রাজনৈতিকভাবে আরো শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতো যদি সে তার সকল কাজের ভেতর তার যে বুর্জোয়া শ্রেণী বৈষম্যকে দূর করার তত্ত্ববাজি, তার সমান্তরালে এক প্রগতিশীল রাজনৈতিককর্মীর মতোই একজন বা দলগতভাবে অনেকেই একটা বিকল্প দৃঢ় অবস্থান তৈরীতে আরো বেশি পরিমাণে বিচ্ছিন্নতাবোধের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে সমাজিক মানুষের ভূমিকায় নিজেকে রেখে দ্বান্দিকতার মধ্য দিয়েই লড়াইয়ের একটা অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠতে পারতো। যা এখনো পর্যন্ত সেভাবে দেখতে পাওয়া যায়নি। একজন লেখক ততোক্ষণ পর্যন্ত সৎ, যতোক্ষণ পর্যন্ত তিনি বাস্তবতাকে নিয়ে তার কর্মকে সাজান এবং সে বাস্তবতার সাথে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নিজস্ব সংকটসহ সকলের সংকটকে আবিষ্কার করেন এবং লড়াইয়ে নেমে আসেন স্বশরীরে। লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কথা হচ্ছিল পুরোদস্তুর একজন নিষ্ঠাবান কথা সাহিত্যিক সেলিম মোশের্দের সঙ্গে। তিনি বললেন– “আমরা একটা বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সচেতনতাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছিলাম এবং তার প্রতি এখনো দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছি। প্রচলিত প্রতিষ্ঠানের কোন রকম প্রলোভনেই গা না ভাসিয়ে এখনো লিখে চলছি। বিপ্লবী যে কোন কাজ করতে হলে চিন্তার একটা ডিসিপ্লিন অবশ্যই থাকতে হবে। তবে একটা কথা স্পষ্টভাবেই বলতে চাই যে, প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা বা বিকল্প সংস্কৃতি দাড় করানো প্রধান অন্তরাই হচ্ছে, আমাদের দেশের অধিকাংশ লিটল ম্যাগাজিনগুলোর নৈরাজ্যবাদী চিন্তাকাঠামো। বিকল্প সংস্কৃতি শক্তিশালী না হলে বিকল্প রাজনীতিও শক্তিশালী হয়ে উঠবে না। তাই সকল নৈরাজ্যবাদী চিন্তাকে বাদ দিয়ে বিকল্প একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরীর জন্য বিকল্প সংস্কৃতির যে প্রযোজনীয়তা তা সঠিকভাবে উপলব্দি করে এগুতে হবে। বিশুদ্ধ বিশুদ্ধ সাহিত্য করবো বললেইতো আর সমাজ পাল্টে যাবে না।’’ রাজনীতিহীনতা হল লিটল ম্যাগাজিনের আরেক সংকট। এ সমাজে থাকবে সমাজের সকল সংকটঅসুবিধা ও পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সকল অধিপত্যের শোষণে মধ্যে থেকে গম্ভীর দৃষ্টিতে দেখবে, শুনবে আর ঘরে মধ্যে কোনায় বসে দুই এক ছত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ সমাজ বিশ্লেষণের নানাবিধ অরাজগ অবাস্তব (কেউ কেউ ভালও লেখেন) লিখে বিপ্লবী সাজার ভণ্ডামী করবে। আর এ দিক দিয়ে লুটেরা পুঁজি দেশ ও মানুষের সর্বনাশের সকল আয়োজন করবে ত্যানারা দেখবেন। বহুজাতিক কোম্পানী ও তার দেশীয় দালালরা রাষ্ট্রের সকল সম্পদ বিকিয়ে দিবে। তাতেও তাহাদের কোন টনক নড়িবে না। তারা কেবলই মিহান সাহিত্য চর্চ্চায় মগ্ন হয়ে এক অপার্থিব বাস্তবতাহীন ঘোরের মধ্যে বসবাস করবেন নিবিঘ্নে!! লিটল ম্যাগাজিনের আরেক সম্পাদক কামরুল হুদা পথিকের সাথে কথা হচ্ছিল। কথার এবটা সময় বললেন– “পুঁজি ও মুনাফা মনস্কতার বাইরে আমাদের এ প্রয়াস। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর মধ্য থেকেও এ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ঐ ব্যবস্থার উচ্ছেদের ভাষায় লিখে চলছি। এটাই আমার লড়াই।” বাংলাদেশের ছোট কাগজ আন্দোলনের দীর্ঘ সময়ে যাত্রায় যে পত্রিকাগুলো একটি বিপ্লবী কাজ সম্পাদন করে গেছে বা যাচ্ছে বলে মনে করা হয় তাদের মধ্যে গান্ডীব, অনিন্দ্য, সংবেদ, পেঁচা, খুন, চর্যাপদ, অর্ক, চালচিত্র, পূর্ণদৈর্ঘ্য ঘন্টা, দ্রষ্টব্য, নিসর্গ, প্রতিশিল্প, দুয়েন্দে, শিরদাঁড়া, জঙশন, সূর্যঘড়ি, চারবাক, অঁতর, শব্দশিল্প, ছাঁট কাগজের মলাট, কালনেত্র, ঠিকানা, ল্যাম্পপোষ্টসহ আরো অনেক কাগজ, যারা লেখালেখির মধ্য দিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার এক বিরুদ্ধতা তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করেন। যদিও এখন প্রায় প্রতিদিনই লিটল ম্যাগাজিন নাম করে অনেক কাগজই ছাপা হচ্ছে, যা ন্যূনতম দায়বদ্ধতারও ধার ধারে না। বিজ্ঞাপনে ঠাসা সেই কাগজে কোন নিরিক্ষা নেই, নেই সমাজ বদলের বিকল্প সংস্কৃতি ভাবনার কোন রেশ।

শেষের আগে

একটি লেখা পারে তৈরী থাকা সকল ক্ষমতার দৃশ্যত বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্পর্ধায় সত্যিটা বলে দিতে। এবং ঐটাই লেখা, যা এ সমাজ তার তৈরী থাকা মূল্যবোধের প্রভাবে নিতে পারে না। তাকে বাতিল বলে ঘোষণা করে। ভাষার কারবারিদের কাজটাই তাই গোটা সমাজের সকল বৈষম্যকে দগদগে শব্দের আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিবে পুঁজির সকল ক্ষমতাকে। বাংলাদেশের ছোট কাগজ আন্দোলনকারীদের কাছে কিছু প্রশ্ন রেখে এ লেখার ইতি টানবো, কোন একটি কবিতার ইশতেহার তো আর গোটা একটা আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি হতে পারে না? আন্দোলন শব্দটি যখন উচ্চারিত হচ্ছে তখন অবশ্যই তার একটা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কিংবা দার্শনিক ভিত্তি থাকা জরুরী। সেটা কি এখনো পর্যন্ত নির্দেশিত হয়েছে? আর যদি না হয়ে থাকে তাহলে সমাজ বদলের ঐ পুঁজিবাদী স্টাইলে কথার বা নৈরাজ্যবাদী চিন্তা কাঠামো তৈরী করে কোন প্রজন্মের সাথে প্রতারণা না হয়, সেদিকে অবশ্যই নজর রাখতে হবে। বিভ্রান্তি নয় বিকাশেই প্রত্যাশা। আর রাজনীতিহীনতার কথা বলে যারা একান্ত আপন কোলে বসে শব্দে কারবার করে যেতে চান তাদের জন্য আমাদের কোন অনুভূতিও নেই। কেননা এ সমাজ বাস্তবতার মধ্যে নানান সংকট ও সংস্কৃতিগত বিপর্যয়ের কালেও যারা শুধু নিরুত্তাপ থাকতে চান, তাদের সকল উৎপাদন বুর্জোয়া শ্রেণীরই সহায়ক। তাই কোন পক্ষের হয়ে আপনি আপনার বিপ্লবী দায়িত্ব পালন করছেন, তা নির্দেশিত হওয়া অত্যন্ত জরুরী। আধিপত্যবাদী সমাজ সভ্যতার পুঁজিতান্ত্রিকতার তোষক না পৃথিবীর তাবৎ সংগ্রামী মেহনতী জনতার পক্ষে আপনার শব্দেরা দ্রোহের ঝড় তুলছে, শোষকের অদৃশ্য ক্ষমতার মুখোশগুলো উন্মোচন করে দিচ্ছে। তাই হলো বিকল্প সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনাদের অংশগ্রহণের বিপ্লবী মাপকাঠি। যা একদিন সময় নির্ভুলভাবেই করবে। সমাজকে বা রাষ্ট্রকে পাল্টাতে হলে বা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শব্দের ধার আর মিছিলের কর্কশ প্রতিরোধ আবারো একই পথে হাঁটা ধরলেই আমরা সকলেই কাজে নেমে পড়বো বৈষম্যহীন এক পৃথিবী গড়ার নিজ নিজ সৃজনশীলতাগুলোকে হাতিয়ার বানিয়ে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s