লিখেছেন: সত্যজিত দত্ত পুরকায়স্থ

.

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক যেকোন বিবেচনায় ভারতবাংলাদেশের সর্ম্পক দক্ষিন এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ। যদিও কুটনৈতিক পরিভাষায় দিল্লি ঢাকা’কে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ের কারণ সাম্প্রতিককালের চলমান ঘটনাপ্রবাহে বিদ্যমান। বাংলাদেশে ভারতকে নিয়ে দু’ধরনের প্রচারণা রয়েছে। একটা প্রশ্রয়মূলক আর অন্যটা উস্কানীমূলক এবং এই দুই প্রচারণাই যুক্তির বিবেচনায় “অমূলক”। এক পক্ষের যুক্তি ভারত আমাদের বন্ধু। বিভিন্ন সময় বিশেষতঃ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সাহায্যসহযোগিতা এই পক্ষের যুক্তির মূল অস্ত্র। এই প্রচারণার একটা গোপন ধমক হচ্ছে ভারতের সমালোচনা করা শোভন নয় বা অকৃতজ্ঞতার সামিল। আর অন্য পক্ষের প্রচারণা হলো ভারত হিন্দু রাষ্ট্র, এই বিবেচনায় সে আমাদের বন্ধু হতে পারেনা, অর্থাৎ স্পষ্টতঃই সাম্প্রদায়িক প্রচারণা এবং এই প্রচারণা বয়সে বেশ প্রবীন, যার শুরু বঙ্গভঙ্গের সময়কাল থেকে। এই প্রচারণা শুনলে কানে মুসলিম লীগের প্রেত্মাত্বার চাপা আর্তনাদ ভেসে আসে। শেষ বিচারে উভয় প্রকার প্রচারণাই পরিত্যাজ্য।

.

এই লেখার বিষয়বস্তু খুব সাম্প্রতিক ঘটনাবলী। ভারতের সাথে আমাদের সীমান্ত দৈর্ঘ্য ৪১৪৪ কিলোমিটার। আমরা গত কয়েক বছরের ভারতবাংলাদেশ সীমান্ত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাইভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসেফের হাতে বাংলাদেশী হত্যা, গুম, নির্যাতন, সীমান্তে কাটাতারের বেড়া নির্মাণ ইত্যাদি। এখানে বলে নেয়া ভাল বিশ্বে মাত্র তিনটা দেশের সীমান্তে কাটাতারের বেড়া আছে প্রথমটা মেক্সিকোআমেরিকা সীমান্তে এবং পরের দুইটা বাংলাদেশভারত এবং বাংলাদেশমায়ানমার। সবচেয়ে মজার তথ্য হলো পাকিস্তানের সাথে ভারতের সর্ম্পক বৈরীতায় ভরা, সীমান্তের অধিকার নিয়ে যাদের মধ্যে দু’বার যুদ্ধ হয়েছে সেই পাকিস্তানের সাথে কিংবা চীনের সাথেও ভারতের সীমান্তে কাটাতারের বেড়া নেই। এহেন তথ্যগুলো থেকেই ভারতবাংলাদেশ সর্ম্পকের অবিশ্বাসের দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’র তথ্যমতেগত একদশকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে বাংলাদেশের প্রায় এক হাজার নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত ৯৮৭, অপহরণ ১০০০, নিখোঁজ প্রায় ২০০। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে কিশোরী ফেলানীকে হত্যা করে তার লাশ কাটাতারের বেড়ার উপর কয়েক ঘন্টা ঝুলিয়ে রেখেছিল বিএসএফ। এই বছরের ২০ জানুয়ারী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার মৌরসী সীমান্তে বিএসএফ বাংলাদেশের এক গরু চোরাকারবারীকে নির্যাতনের ঘটনা ভারতের এনডিটিভি’তে প্রচার হয় এবং ঐদিনই কুমিল্লার দলকুইয়া সীমান্ত থেকে অপহরণ করা হয় এক বিজিবি (সাবেক বিডিআর) সদস্যকে। এছাড়াও যদি আমরা অভিন্ন নদীগুলোর পানি বন্টন, ছিটমহল সমস্যা, টিপাইমুখ বাঁধ, বানিজ্য ঘাটতি, এমন কি সাংস্কৃতিক মাধ্যমেরও (স্যাটালাইট চ্যানেল) যদি সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করি তাহলে ভারতের বৈষম্যমূলক আচরণের ক্রমঊর্ধ্বমুখী রেখাচিত্র আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।

.

চলমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দু’দেশের শীর্ষ পর্যায়ের মন্তব্য বা আলোচনা বিশেষ বিবেচনার দাবী রাখে। অতীতের ভারতবাংলাদেশের সকল শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক শেষে ভারত প্রত্যেকবার একই ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে চলেছে “বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু ভারত করবে না”, আর আমরা তাতেই ‘তাধেই তাধেই’ করে নেচে বাড়ি ফিরেছি বা ইলিশজামদানী উপঢৌকন পাঠিয়েছি। সর্বশেষ বিজিবিবিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শেষে বিএসএফ প্রধান স্পষ্টতঃই জানিয়ে দিলেন সীমান্তে গুলি বন্ধ করা সম্ভব নয়। গত ২০ জানুয়ারীর ঘটনার পর আমাদের এক মন্ত্রী এটি রাষ্ট্রীয় বিবেচনার বিষয় না বলে উড়িয়ে দিলেন, টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা তো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সুরে কথা বলেই চলেছেন। এমনকি ভারতের সাথে সম্পাদিত ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি অনুযায়ী যে ২১টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে তার মধ্য থেকে কঠিন শর্তের জন্য পাঁচটি বাদ দেবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে আন্তঃমন্ত্রনালয় বৈঠকে। কিন্তু যথারীতি বাঁধ সেধেছেন মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা। তিনি প্রকল্পগুলো বহাল রাখার জন্য অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। আর বহুল আলোচিতসমালোচিত ট্রানজিট (সঠিকার্থে যা করিডোর) নিয়ে কর্তা ব্যাক্তিদের লম্ফ ঝম্ফ তো আমাদের সবারই জানা। ট্রানজিট ফি নেয়াটাকে তারা রীতিমত অশোভন আচরণ হিসাবে বিবেচনা করছেন, যদিও অর্থমন্ত্রী বলেছেন আমাদের অবকাঠামো ট্রানজিটের উপযোগী না। আমরা জাতি হিসাবে অতিথি পরায়ণ, কিন্তু ভারতীয় কনটেইনার যাবার জন্য তিতাস নদীর উপর রাস্তা নির্মান করে দিতে পারি তা থেকে প্রতিয়মান হয় আমরা জাতি হিসাবে আত্মঘাতিও বটে।

.

ভারত–বাংলাদেশ সর্ম্পকের একটা সার্বিক পুনঃমুল্যায়নের সময় এসেছে। মেলানো দরকার অতীতের প্রাপ্তিঅপ্রাপ্তি, বর্তমানের হিসাব এবং সর্ম্পকের ভবিষ্যৎ রুপরেখা। বন্ধুত্বের নামে একতরফা “দিয়ে গেলাম” নীতির বদলে সহযোগিতামূলক গণতান্ত্রিক নীতি এবং “বড় ভাই” সুলভ সামরিক আচরণের পরিবর্তে মানবিক ভ্রাতৃত্বের নীতিতেই বিদ্যমান সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব। আর এটাই এখন সময়ের দাবী।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s