লিখেছেন: আলবিরুনী প্রমিথ

If you talk to a man in a language he understands, that goes to his head. If you talk to him in his language, that goes to his heart.” – Nelson Mandela

দুই’শ বছর ধরে ব্রিটিশদের পায়ের নিচে থেকে সাদা চামড়ার পাড় ভক্ত এই আমরা নেলসন ম্যান্ডেলার মর্ম বুঝতে কোনদিনই সক্ষম ছিলাম না। স্কুলে থাকতে বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত নষ্ট হবার পথে পা বাড়ায়নি ততক্ষণ পর্যন্ত পরীক্ষায় যদি ‘তোমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব’ নামক রচনা আসে তবে তাতে হয়ত হাতেগোনা দুই একজন নেলসন ম্যান্ডেলার কথা লিখবে। ব্যাস এই পর্যন্তই, আর হয়ত আমাদের গাত্রবর্ন কৃষ্ণ বলেই ভদ্রলোককে আমরা নিদেনপক্ষে ঘৃণা করিনা। এমতাবস্থায় তার উপরিউক্ত উক্তিটির মর্ম এই জনপদের মানুষ বুঝবে এমনটা প্রত্যাশা করা আর ক্রিকেট খেলার কোন বড় আসরে দক্ষিন আফ্রিকা জিতবে সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার (!) মাঝে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু তারপরেও উক্তিটির কথা চলে আসে, ২১ ফেব্রুয়ারী নামক একটি দিনকে আমরা অস্বীকার করে যেতে পারিনা বলেই।

২১ ফেব্রুয়ারী নিরীহ ঘরানার ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ নয়, তাকে এমনটা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমরাও সাগ্রহে মেনে নিয়েছি। ২১ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাষাভিত্তিক বিদ্রোহ, প্রতিবাদ। কিন্তু এখন কি দেখা যাচ্ছে? ৪ দশক ধরেই এর বৈপ্লবিক দিকটি আপামর জনসাধারণের নিকট বিস্মৃত, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর মর্ম প্রতিটি দিনে ভুলুন্ঠিত। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রতিটি ২১ ফেব্রুয়ারীতে অনানুষ্ঠানিক কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত ‘প্রভাতফেরী’ দেখা যেত, দেখা যেত ভাইয়ের বোনের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা নিবেদন। কিন্তু আমাদের আর তর সইলোনা, রাত বারোটা বেজে এক মিনিটে সৈন্য সামন্তদের নিয়ে রাষ্ট্রের কুশীলবদের রাষ্ট্রীয় পদানুযায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়ে দাঁড়িয়েছে আনুষ্ঠানিকতা। প্রভাতফেরীর ধব্বংসাবশেষ টুকরা টাকরা হয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এদিকে ওদিকে। আমরা হাত তালি দিয়েই যাচ্ছি তো দিয়েই যাচ্ছি, প্রভাতফেরী নয় তালেবরদের পুষ্পস্তবক অর্পণেই আমরা খুশী!

বছরের পর বছর ধরে কর্পোরেট মিলিটারী চক্রের কি অনবদ্য উপস্থিতিই না আমরা দেখে আসছি এবং বিনা দ্রোহে মেনে নিয়ে আসছি! এখন আর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহনকারীরা ‘ভাষা শহীদ’ কিংবা ‘ভাষা সংগ্রামী’ নন, মিলিটারী শাসনে আস্থা রাখা বাঙ্গালীর কাছে তারা পরিচিত এখন ‘ভাষা সৈনিক’ হিসাবে। ১৯৭৫ সালের পর থেকেই চলছে এই ভাষা সৈনিক, ভাষা সৈনিক রব। সংগ্রামী শব্দটিকে প্রতিস্থাপিত করেছে সৈনিক, আমাদের সকলেরই সমর্থনে। এই সামরিকায়নের সাথে যুক্ত হয়েছে কর্পোরেট নষ্টামী, কি চমৎকারই না দেখা গিয়েছিলো ২০১০ সালে! “১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর আন্দোলন কোন ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিলোনা, সেটা ছিলো সংগ্রাম বিচ্ছিন্ন”, তা প্রমাণ করতে কর্পোরেট দালালেরা আন্দোলনের পূর্বের ঘটনা পরিক্রমা হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ‘দুনিয়া কাঁপানো তিরিশ মিনিট’ নামক এক তৃতীয় শ্রেণীর নির্লজ্জ্ব প্রহসনের আয়োজন করলো, যাকে আবাল পাবলিকেরাও আলিঙ্গন করে নিয়েছিলো।

দিন দিন এমন অনুষ্ঠানগুলোই হয়ে উঠেছে গৌরবাজ্জ্বল দিনগুলোকে স্মরণ করার নামে তার প্রকৃত চেতনা থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার সফল প্রয়াসে! আমরা সবই মেনে নিয়েছি, আমরা সবই মেনে নিচ্ছি। এগুলোকে সাথে নিয়েই চলছে আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারীর চেতনাকে ধারন করার লুকোচুরি লুকোচুরি খেলা। ২১ ফেব্রুয়ারীর ব্র্যান্ডেড চেতনার বড়ি গিলে দিনে দিনে দিনটির প্রধান অনুপান বিদ্রোহকে দূরে সরিয়ে রেখে, ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা মেনে না নেবার একরোখা জেদ বিস্মৃত হয়ে এই আমরাই দিনটির উদযাপনকে করে তুলেছি যান্ত্রিক, প্রানহীন, ভন্ড দেশপ্রেমের এক অভূতপূর্ব এক্সিবিশনে!

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পরে ৪১ টা ২১ ফেব্রুয়ারী চলে গেলো, এই আমরা আজও সক্ষম হলাম না আদিবাসী থেকে শুরু করে বাংলাদেশে অবস্থিত উর্দুভাষী, বাংলাদেশে অবস্থিত বিহারীদের ভাষার অধিকার সংরক্ষণ করতে। এর উদযাপনের ধারা বর্তমানে যতটাই রঙ্গীন, এর মর্ম উপলব্ধী করার মানসিকতা আমাদের ততটাই কৌলীন, ততটাই বিবর্ণ। আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আজও আমরা কেউই সোচ্চার নই, কিন্তু আমরা ২১ ফেব্রুয়ারীকে ভালোবাসি, বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে সারা বিশ্বে দিবসটি প্রতিষ্ঠিত এই নিয়েও গর্ববোধ করা ছাড়তে পারিনা। কি অদ্ভুত স্ববিরোধীতার মাঝে আমাদের নিরন্তর বসবাস! এই বাংলাদেশে এখন লক্ষ লক্ষ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে আর তসবি জপ করে যাচ্ছে ‘বাংলাই হল বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’, আর আমরা কি করছি? যথারীতি কোরাসে গান গেয়ে যাচ্ছি– ‘আহা বেশ বেশ বেশ!!’

আমাদের চিন্তার আভিজাত্য, বিত্তের গরীমা, শিক্ষার সংকীর্ণ দৃষ্টি আমাদের এমন এক জাতে পরিণত করেছে যার ব্যাখ্যা সঠিকভাবে করতে পারা নিঃসন্দেহে একটি হারকিউলিয়ান টাস্ক। তবে সবচেয়ে মর্মবেদনার দিকটি হল আমাদের এই কিম্ভুতিকামার ‘ভাষা প্রেম’ দেখলে যেই মানুষটি সবচাইতে বেশী খুশী হতেন তার নাম ‘মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’। আমরা প্রতিটি ২১ ফেব্রুয়ারী উদযাপনের নামে যেই ছেনালী করে বেড়াই তাতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অমর হয়ে থাকেন। কেননা তার রেখে যাওয়া জুতাতেই আমরা পা গলিয়ে যাচ্ছি বছরের পর বছর, আমাদের প্রতিটা প্রহসনে তার অট্টহাসি শুনতে পাওয়া যায়, একটু কান পাতলেই শোনা যাবে তার কন্ঠকি পারলে তোমরা আমাকে অস্বীকার করতে? আমি মৃত্যুর পরেও তোমাদের মাঝে আজো বেঁচে আছি।”

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s