লিখেছেন: আলবিরুনী প্রমিথ

Death is a fearful thing .” – William Shakespeare

এই বঙ্গীয় জনপদে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি ‘বচনের’ সাথে আমাদের নিরন্তর বসবাস সহবাস চলে। নাক টিপলে দুধ বের হয় এমন বয়স থেকেই সন্তানকে ‘বাজারজাত পণ্য’ বানানোর জীবনমরণ সংগ্রামে বাবামা তাকে ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ীঘোড়া চড়ে সে’ ধরনের বচন শোনান। সেই যে বচনের সাথে তার পরিচয় ঘটে, মৃত্যু অবধি আর বুঝি তার সাথে আড়ি নেই। কিসে বচন নেই? বাবামায়ের অমোঘ বাণী, হাদিসকোরআন, বাইবেলগীতা নামক ‘সাইলেন্সার বুক’, অফিসের ঘোড়েল বসের আদেশ, সংবিধান সর্বত্রই বচনের জয়জয়কার। তার মাঝে বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গদের মুখ নিঃসৃত বাণী হলে তো কথাই নেই, সেসব জীবনভর গেলাতেই থাকো তো গেলাতেই থাকো। কিন্তু উপরের কোটেশনের দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখুন আর বর্তমানের বাংলাদেশকে তার সাথে মিলিয়ে দেখুন, শেক্সপিয়র সাহেবকে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ‘অকাট মূর্খ’ মনে হবেনা? নিশ্চয়ই হবে, ভদ্রলোক কি গাড়লের মত বলেছিলেন যে মৃত্যু নাকি ‘ভীতিকর জিনিস’। বাংলাদেশের কোথায় তাকালে আপনার মনে হবে যে মৃত্যু কোন ভীতিকর জিনিস? নিশ্চয়ই তা নয়, এ হতেই পারেনা, মৃত্যুর ভীতিকর রূপের অবসান হয়েছে অনেক আগেই। এখন মৃত্যু একটি অত্যন্ত লাভজনক পণ্য, একে বাজারজাত করে প্রতিদিন পত্রপত্রিকা, বড় কর্পোরেট হাউজ, ব্যক্তিবর্গ করে খাচ্ছে তার কোন হিসেব রাখি আমরা? এক রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বাবুরাই তো এখনো মুক্তি পেলেন না, বছরের পর বছর তাদের নিয়ে ‘ফ্যাসিস্ট নির্যাতন’ সমতূল্য বক্তৃতাআলোচনা সভা ইত্যাদি আয়োজন করে কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়ে গেলো, তার কোন খোঁজখবর আমরা নিয়েছি কখনো?

অন্য দিকে দেখুন, প্রতিবছর কত বিচিত্র ভাবেই না মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে নিঃস্ব মানুষকে যাঁতা দিয়ে মেরে ফেলা হয়, গার্মেন্টস শ্রমিকদের পিষে ফেলে দিয়ে, চুষেছিবড়ে সামন্তীয় ঘরানার বাবুরা মুনাফার হার উচ্চ থেকে উচ্চতর করেই যান তো করেই যান। গ্রামের কৃষকরা আজও তাদের উৎপাদিত ফসলের নায্য মূল্যের দাম পাওয়া তো দূরের কথা, বরং প্রতিনিয়ত তাদের উপরে শোষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলে তো বেড়েই চলে, আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধুঁকে ধুঁকে মরাই তাদের পরিণতি। নারী গার্মেন্টস শ্রমিকদের মেরে ফেলার কায়দার তো আরও অভাব নেই, গার্মেন্টস ম্যানেজার থেকে শুরু করে মাস্তান, সকালদুপুর ধরে এই বিকৃত সভ্য (!) সমাজের আদলে তৈরী হওয়া একেকজন যৌনদাসীদের চটকেও মালিক বাবুদের খায়েশ মেটেনা। রাতের বেলায় তীব্র অনাহারে, শোষণের ফলে চিমসানো নারী দেহগুলোকেও তাদের চিবিয়েকামড়েগিলে খেতেই হবে। উপর্যুপরী ধর্ষণ চলতেই থাকে তো চলতেই থাকে, নারী শ্রমিকরা দুই ধরনের কাজ করতে বাধ্য থাকেন। প্রথমে মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলতে সহায়তা করেন, তারপর সেটাকে টেমপ্লেট বানিয়ে যেন একশ্রেণীর মানুষ বছরের পর বছর করে খেতে পারেন, যেন প্রতি বছরে সেমিনারের পর সেমিনার হতে পারে, স্টুপিডঅর্ধশিক্ষিত পাবলিকেরা যেন শাসকশ্রেণীর প্রেসক্রাইব করা বড়ি দিনের পর দিন গিলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আহারনিদ্রাসঙ্গম আর সংবাদপত্র পাঠ করে খাটাশের মত জীবনযাপন করাকেই ‘এইতো বেশ আছি, বড় সুখে আছি’ ধরণের শিল্পকর্ম সম্পাদন করতে পারে, তার সবই চলে। আর দ্বিতীয়টি হল গার্মেন্টস ম্যানেজার থেকে শুরু করে পথের মাস্তান, পুলিশ, মালিকবাবুদের যৌন যন্ত্রণা মেটানো। দৌলতদিয়া, মগবাজার, টানবাজারের পেশাদারেরা তাও এই কর্মের জন্য টাকাপয়সা পান, তাদের পেট কিছুটা হলেও চলে। কিন্তু এখানে তার কিছুই নেই, সম্পূর্ণ ফ্রিতে চলে এই যৌন নির্যাতন। যেন বিজ্ঞাপনময় একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিজ্ঞাপন ‘গার্মেন্টসের মালিক হলে নারী শ্রমিকদের যাঁতা দেওয়া ফ্রি, এই সুযোগ অসীম সময়ের জন্য!!!’

আমাদের এই ‘সোনার বাংলাদেশ (!)’ পরিণত হয়েছে সেই দেশে যেখানে এখন মৃত্যও হয়ে গেছে একটি আদ্যপ্যান্ত ‘বাজারজাত পণ্য’। সম্প্রতি খুন হওয়া সাংবাদিক সম্পতি সাগর সারোয়ার এবং মেহেরুন রুনীর ঘটনাটির দিকেই লক্ষ্য করুন। হত্যাকান্ডটি নৃশংস কোন সন্দেহ নেই, এই হত্যাকান্ডটি শিউরে উঠার মত সেটাও তর্কাতীত সত্য। কিন্তু এরকম হত্যাকান্ড কি দেশে ঘটেনা? ঘটেনি? নিশ্চয়ই ঘটেছে, ঘটে চলেছে, ঘটবে। নিরেট মূর্খ ছেলেকে মাস্টারমশাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেননি, ব্যাস হয়ে গেলো। মাস্টারমশাইকে খুন করে ফেলো, তারপর সেই মৃতদেহ বস্তায় ভরে পানিতে ফেলে দাও। মিথ্যাচার, ভোগবাদীতার, হিপোক্রেসির পরাকাষ্ঠার ‘রমজান মাসে’ হাভাতেরা দলে দলে উচ্ছিষ্ট খাবারের লোভে শহরে আসবে আর ফেরার পথে ট্রাক উল্টে মরবে, র‍্যাব, কোবরা, চিতা নামক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে একের পর এক মানুষ মরবে তার কোন হদীস নেই। আবুল, কালাম, রহিম এরা নিমেষে মরে যাবে, তাদের যে কেউ যখন তখন যেভাবে খুশি মেরে ফেলতে পারে আমাদের চোখের সামনেই কিন্তু কিছুতেই কারো কিছু যায় আসেনা। এক সাগররুনীর হত্যাকান্ডের মতো হত্যাকান্ড কিংবা তার চাইতেও নৃশংস হত্যাকান্ড প্রতিনিয়তই আমাদের আশেপাশে ঘটে চলেছে এবং ঘটে চলবে! কিন্তু সেগুলোর সংখ্যা অজস্র হলেও তা নিয়ে কোথাও কোন আলোচনা হবেনা। কারণ খুবই সহজ, সেগুলো ‘বাজারজাত পণ্য’ হিসাবে টেকসই নয়। যেমনটা ছিলোনা ‘বিডিআর মিউটিনি’তে নিহত সেপাহীদের মৃত্যু, এই কারণেই সেই ঘটনায় নিহত অফিসারদের পরিবারের পেছনে শত শত কোটি টাকা খরচ করা হলেও কোন ব্যাঙ্ক কিন্তু নিহত সেপাইদের পরিবারকে একটি টাকাও দেয়নি, তাদের বেলায় ঘন্টা! যেই সময় ভিকারুন্নিসার ছাত্রীটি পরিমল নামক সেক্স ম্যানিয়াকের কাছে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় এবং হাজার হাজার ছাত্রী থেকে শুরু করে সবাই যখন শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আকাশবাতাস কাঁপিয়ে শ্লোগান দেয়, সেই সময়তেই বরগুনার জেনীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়, ধর্ষকের ছবিও চলে আসে সর্বত্র। কিন্তু কোথায় কি? কোন উচ্চবাচ্চ্য হয়নি কোথাও, ভিকারুন্নিসার কোন ছাত্রীর মনে হয়নি নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজনের সাথে সাথে জেনীকে ধর্ষণের বিরুদ্ধেও কিছু বলা যায়। বরগুনার জেনী, তার পরিবারের জন্য হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত নাটকটির নামই ধ্রুব সত্য হয়ে গিয়েছিলো, ‘কোথাও কেউ নেই’! তাদের জন্য কোন কালেই কেউ থাকেনি, থাকেনা এবং থাকবেওনা।

আমাদের জীবনযাপন হতে শুরু করে সর্বত্র যেইরূপ কৃত্রিম আভিজাত্যের জয়জয়কার, আমাদের চিন্তাচেতনায় ঠিক সেই রূপ কৌলীণ্যের জয়জয়কার। তারেক মাসুদ, মিশুক মনির সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তাদের জন্য ঈদের দিনে শহীদ মিনারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু তার আগেই আরিচা সড়ক রোডেই সড়ক দুর্ঘটনায় তিন মাসে ১৮০ জন মারা গিয়েছিলো, সেই বিষয়ে একটা কথাও হয়নি! আমাদের চিন্তাভাবনার আভিজাত্য সেগুলো নিয়ে কথা বলার কোন অনুমতি আমাদের দেয়নি, দেয়না। আমরা এভাবেই মৃত্যুকে ‘বাজারজাত পণ্য’ বানিয়ে ফেলেছি, যথেচ্ছা শ্রেণী তোষণ আর নির্লজ্জ্ব মিথ্যাচারের এক্সিবিশনের ক্ষেত্র ছাড়া মৃত্যু আমাদের নিকট আর কোন তাৎপর্য্য বহন করেনা। এর সাথে তথাকথিত ডেভেলপড, প্রগ্রেসিভ সমাজের এই আমাদের দেয় সেই সন্তুষ্টি ‘আমি তো বেঁচে আছি এই মৃত্যুৎসবে’। এই বেঁচে থাকা ‘বাইপেড ম্যামাল’ কিংবা ‘দ্বিপদী স্তন্যপায়ী’দের বেঁচে থাকা, ‘হোমো সেপিয়ান্স’দের বেঁচে থাকা নয়। যতদিন এই দ্বিপদী স্তন্যপায়ীদের মত করে বেঁচে থাকাই পরম আরাধ্য হবে ততদিনের মধ্যে নিজের এপিটাফ নিজেই বানিয়ে রাখুন, আসছে সময়ে মৃত্যুর বিকিকিনী আরো চড়া হবে। আপনার মৃত্যুতে আশেপাশের মানুষ সত্যিকারেই ভারাক্রান্ত হবে কিনা সেটা বেঁচে থাকা অবস্থাতে আপনার কাজকর্ম, মতাদর্শ দ্বারা নির্ধারিত হবেনা, তা নির্ধারিত হবে আপনার ক্ষমতা দিয়ে, এই ক্ষমতা হল ‘নিজের এপিটাফ নিজেই বানিয়ে রাখার ক্ষমতা’।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s