এ লিখাটি প্রকাশিত হয় প্রগতিশীল ছাত্রছাত্রী ফেডারেশনের মুখপত্র ‘একটি বিকল্প প্রকাশন’র ‘নয়াউদারনৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা বিরোধী ছাত্রছাত্রী আন্দোলনের নতুন সংজ্ঞা: চিলি’ শিরোনামে। সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে তুলে ধরা হলো। আন্দোলন এবং সমসাময়িক চিলির রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো কোন প্রেক্ষাপটে আন্দোলন গড়ে উঠেছে তা বুঝবার জন্য। চিলিতে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনের আন্দোলনটি আমাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। কারণ একই সময়ে আমরাও সরকারী ভর্তুকী হ্রাসের সিদ্ধান্ত, শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতি আর ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী দখল আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছি। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যেই দিকটা তা হলো চিলিতে আন্দোলন এগিয়ে নেবার জন্য দাবি দাওয়া ভিত্তিক ব্যপক ছাত্রছাত্রীর সমন্বয়ে আন্দোলনের সংগঠন গড়ে উঠেছে। নেতৃত্ববিহীন ভাবে সংগঠন বিহীন ভাবে এগুনো যায় না। সাধারণ একটি লক্ষ্য আদায়ের জন্য গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার ভিত্তিতে চলমান সংগঠন চাই। এই শিক্ষা আমাদের দেশের ছাত্র আন্দোলনে প্রয়োগের সময় এসেছে।

চিলিতে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৮১৩ সাল থেকেই অর্থাৎ চিলি স্বাধীন হবার পর থেকেই। সারা দেশব্যাপী এ শিক্ষাব্যবস্থাকে ছড়িয়ে দেওয়ার সর্বাঙ্গীন কাজ শুরু হয় ১৯২৭ সালে। বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা, ডে মিল চালু, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ব্যাপক সরকারী অনুদানে গড়ে তোলা হয় উচ্চ শিক্ষার প্রকল্প, বিশ্ববিদ্যালয়। প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের সময়ে (১৯৭০-’৭৩) এ ব্যবস্থা সর্বোচ্চ উন্নতি লাভ করে। এর পরবর্তীতে সামরিক অভিযানে আলেন্দে সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতায় আসে আগস্ত পিনোচে। ১৯২৫ এর কল্যাণমূলক সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান করা হয়। ১৯৭৮ সালে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ও চিলির ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে নতুন সামরিক চিলিকে সংস্কার করা হয় নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির পরীক্ষাগার হিসেবে। শুরু হয় শিক্ষাসংস্কার। ১৯৮১’র জানুয়ারিতে সামরিক সরকার ডিক্রী জারি করে উচ্চ শিক্ষায় আমুল সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারী অনুদানউদ্যোগ সম্পূর্ণ কমিয়ে বেসরকারী অনুদানকে স্বাগত জানানো হয়। বাজার অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচ বাড়ানো হয়। ফি এর নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় বাজারের হাতে। শিক্ষার্থীদের উপর চেপে বসা খরচের এই বিপুল বোঝা লোনের মাধ্যমে সমাধার ‘দায়িত্ব’ নিয়ে হাজির হয় আন্তর্জাতিক লগ্নিকারী সংস্থা।

চিলিতে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১৫ টি, বেসরকারী ৪৭ টি, প্রফেশনাল ৪৮ টি আর কারীগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে ১১৭ টি। দেশের প্রায় ৬৫% ছাত্রছাত্রী এ বেসরকারী শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে। শিক্ষা সংক্রান্ত খরচের দিক থেকে সরকারী বা বেসরকারী ক্ষেত্রে খুব একটা পার্থক্য নেই। এই আমূল সংস্কারের ফলে ১৯৮০ পরবর্তী সময়ে উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রবেশের হার বেড়েছে। (.% ছিলো ১৯৮১ তে, ৩৭.% হয়েছে ২০০৫ সালে)। কিন্তু এ উচ্চ শিক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মাত্র ১৫% আসে নিম্নবিত্ত ৪০% জনগণ থেকে। উচ্চ শিক্ষার গড় খরচ সরকারী ক্ষেত্রে বার্ষিক ১৬,০৭০ মার্কিন ডলার আর বেসরকারীতে ২৩, ১৮৬ মার্কিন ডলার। যেখানে চিলির জনগণের গড় বার্ষিক আয় ১৪,৯০০ মার্কিন ডলার। উচ্চ শিক্ষা নিতে হলে লোন নিতে হয় আর এ লোনের বোঝা বইতে হয় পরবর্তী ২০ বছর ধরে। খরচ দিতে না পেরে মাঝপথে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয় নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা। উচ্চ শিক্ষার মত স্কুলগুলোতেও ব্যাপক সংস্কার চালানো হয়। সরকারী অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিয়ে চালু করা হয় LOGE (La Organica Constitucional de Ensenza) সরকারী স্কুলে কেন্দ্রীয় অনুদান তুলে নিয়ে তা ছেড়ে দেওয়া হয় স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল প্রশাসনের হাতে। বন্ধ করা হয় স্কুল প্রশাসনে ছাত্রঅভিভাবকের অংশগ্রহণ। একদিকে চালু করা হয় বিশেষ ধরনের ‘স্কুল ভাউচার’ যার ফলে সরকারীবেসরকারী সমস্ত বিদ্যালয়ে সকল ছাত্রছাত্রী পিছু একই সরকারী ভর্তুকী চালু হয়। অন্যদিকে বেসরকারী স্কুলগুলোর ফি কাঠামোর উপর সরকারী নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়। স্কুল স্তরে বিপুল খরচ বেড়ে যায়। বাড়তে থাকে শিক্ষার মানের বৈষম্য আর বেসরকারী স্কুলে প্রবেশের হার। ১৯৮১ সালে যেখানে ৮৩% ছাত্রছাত্রী সরকারী স্কুলে পড়তো ২০০৫ সালে তা কমে গিয়ে ৫৮% এ এসে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারী স্কুলে প্রবেশগ্রহণ বেড়েছে ২৫%। পিনোচে আমলের শিক্ষাক্ষেত্রে এ সংস্কার তথা নয়া উদারনৈতিক ব্যবস্থায় এ শিক্ষা সংস্কারে উচ্চ শিক্ষা ও স্কুল স্তর দুই ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থী সংখ্যা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তা কেবলমাত্র অর্থবিত্তের সুবিধা জাত।

১৯৯০ পরবর্তী চিলির শিক্ষা ব্যবস্থা: বেসরকারীকরণের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ ও প্রতিরোধের সূচনা

শিক্ষাক্ষেত্রে পিনোচে আমলের এই সব পরিবর্তন সযত্নে টিকিয়ে রেখেই পথ চলতে থাকে ১৯৯০ সালের পরে চিলিতে ক্ষমতায় আসা বিভিন্ন ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার। ‘স্কুল ভাউচার’ সিস্টিমের যে পরিকল্পনা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে আনা হয়েছিলো তাকে আরো বাজারমুখী করে তোলে ১৯৯১ সালে নতুন নির্বাচিত ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির সরকার। নতুন সরকারের আমলে একদিকে বেড়ে চলে উচ্চ শিক্ষার ফি আর অন্যদিকে বাড়তে থাকে লোনের উপর সুদের হার। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানের পার্থক্যও বেড়ে চলে ক্রমাগত। ২০০৫ সালের সমীক্ষায় দেখা যায় শিক্ষায় বেসরকারীকরণের ক্ষেত্রে চিলি; জাপান ও কোরিয়ার পরেই পৃথিবীতে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে নানা স্তরের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন শুরু হয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলগুলোতে। লোন ব্যবস্থায় কিছু ন্যুনতম পরিবর্তন, নতুন স্কুল না খুলে, নতুন শিক্ষক নিয়োগ না করে বাধ্যতামূলকভাবে স্কুল আওয়ার বাড়িয়ে (JEC POLICY) সামলানোর চেষ্টা চলতে থাকে শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান এ বৈষম্যকে। এর মাঝে ২০০৬ সালে ক্ষমতায় আসে মিচেল বাচেত এর সোসালিস্ট সরকার। এই সরকারের ভোটে ক্ষমতায় আসার অন্যতম স্লোগান ছিল বৈষম্যমূলক LOGE ব্যবস্থার অবসান। কিন্তু বাস্তবতঃ দেখা যায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই ব্যবস্থার অবসান না ঘটিয়ে LGE (Le General de Education) নামক এক আংশিক সংস্কারের প্রস্তাব আনে মিচেল সরকার। হতাশা নেমে আসে ব্যপক ছাত্র সমাজে। এরই সাথে সরকারের দুটি পদক্ষেপ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যপক ক্ষোভের সঞ্চার করে। প্রথমটা হলো কেন্দ্রীয় ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষার (PSA test) ফি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া আর দ্বিতীয়টি স্কুল ছাত্রদের পরিবহন ছাড় (Student Concession in Transport) তুলে দেওয়ার প্রস্তাব। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ব্যপক ছাত্র সমাজ। শুরু হয় ২০০৬ সালে বিখ্যাত ‘পেঙ্গুইন আন্দোলন’। ‘পেঙ্গুইন’ নামটার উৎপত্তি চিলির রাজপথে স্কুল ড্রেস পড়া হাজার হাজার সারিবদ্ধ ছাত্রছাত্রীর মিছিল দেখে। এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো ২০০৬ সালে ২৪ শে এপ্রিল। প্রথমে সান্তিয়াগোতে কিছু স্কুল ধর্মঘট দিয়ে শুরু হলেও অতি দ্রুত এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। এস.এফ.আই মার্ক কোন নিষ্ক্রিয় ধর্মঘট নয়, ছাত্রছাত্রীরা সক্রিয়ভাবে ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে স্কুলের সামনে ব্যাপক সংখ্যায় অবস্থান শুরু করেন। পরে তা পরিণত হয় স্কুলদখল অভিযানে। গোটা চিলির রাজপথ জুড়ে চলতে থাকে পেঙ্গুইনদের’ মিছিলের মহড়া। স্কুল ছাত্রছাত্রীদের এ আন্দোলনের সমর্থনে পথে নেমে আসে ইউনিভার্সিটি ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে অভিভাবক ও শিক্ষকশিক্ষিকারা। শঙ্কিত হয়ে পড়ে চিলির শাসক। টিয়ারগ্যাস, জলকামান, লাঠি, গুলি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ‘RIOT POLICE’। আহত হয় প্রায় ১২০ শিক্ষার্থী, আহত হয় আরো ১০০০। প্রতিবাদে গর্জে উঠেন চিলির গণতন্ত্রপ্রিয় সাধারণ মানুষ। সরকার ও শিক্ষানীতি বিরোধী এ আন্দোলোন সর্বোচ্চরূপ ধারণ করে ৩ মে। সেদিন গোটা দেশ জুড়ে সরকারী শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে পথে নামেন প্রায় ৬ থেকে ৭ লক্ষ মানুষ। সান্তিয়াগো শহর পরিণত হয় এক বিরাট জনসমুদ্রে। জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত ধর্মঘটের জ্বরে আক্রান্ত হয় চিলি। ছাত্রছাত্রীদের দখলে চলে যাওয়া স্কুলের সংখ্যা ৩২০ ছাড়িয়ে যায়। বাড়তে থাকা আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে সরকারপক্ষ দ্রুততায় আলোচনায় বসেন আন্দোলনের নেতৃত্বের সাথে। সম্পূর্ণরূপে মেনে নেওয়া হয় ছাত্রছাত্রীদের আশু দাবিগুলো। সরকার ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব সহকারে এক কমিটি গড়ার প্রস্তাব দেয়; যে কমিটির কাজ হবে স্কুলশিক্ষায় বৈষম্য দূর করা ও এবং ছাত্রছাত্রীদের দীর্ঘকালীন দাবিগুলো বিবেচনা করে দেখার জন্য। বেশ কিছুদিন আলোচনাআন্দোলন চলার পর ৯ জুন ছাত্রছাত্রীরা মেনে নেয় সরকারের প্রস্তাব। আপাত সমাপ্তি ঘটে ২০০৬ এর আন্দোলনের। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার উপর গলায় বেঁধা কাঁটার মতন অমীমাংসিতভাবে থেকে যায় LOGE পলিসি সহ শিক্ষায় বেসরকারীকরণের মূল প্রশ্নগুলো।

২০০৬ সালের আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই ২০০৮ সালে চিলিতে গড়ে ওঠে আবার এক কেন্দ্রীয় ছাত্রছাত্রী আন্দোলন। এর মাঝে দেশ জুড়ে চলতে থাকা শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন আন্দোলনকে একজোট করে শিক্ষায় বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে ২৪ শে এপ্রিল এক বিরাট মিছিল হয় চিলিতে, ২০০৬ এর আন্দোলনের সূচনার দিনকে স্মরণ করে। একমাস চললেও ব্যাপক পুলিশি ধরপাকড়ের মুখে পড়ে খানিক স্তিমিত হয়ে পড়ে শিক্ষায় বেসরকারীকরণ বিরোধী ২০০৮ এর এই ছাত্রছাত্রী আন্দোলন। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী ব্যর্থতা দমানে পারেনি চিলির ঐতিহাসিক স্বাধীন বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের বিপ্লবী মানসিকতা, ভাঙতে পারেনি চিলির ছাত্রছাত্রীর গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ। তাই ঠিক তিন বছর পর আবার ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভে কেঁপে উঠলো চিলির রাজপথ। ২০১১ সালে গোটা বিশ্বের সামনে বিদ্রোহী বামপন্থী ছাত্রছাত্রীরা তৈরি করলো ছাত্র আন্দোলনের নতুন এক উদাহরণ `CHILEAN SPRING’

CHILEAN SPRING

২০১১ সালের আন্দোলন শুরু হয় মে মাসে। মে মাসের শেষ দিকে চিলির শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যারয়গুলোতে সরকারী অনুদান বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিনের শিক্ষার বৈষম্য নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভের বারুদের স্তুপে আগুনের ফুলকি ছড়ায় এ ঘাষণা। এই সময় চিলিতে একই সাথে হিদ্রওঅভেসন (Hidro-Avsen) বাঁধ প্রকল্পের বিরুদ্ধে এবং তাম্রখনির শ্রমিকদের আন্দোলনও চলছিল। আর অন্যদিকে বিশ্বপ্রেক্ষিতে তখন চলছিলো গোটা আরব দুনিয়ার আন্দোলন। ফলে চারপাশের আন্দোলনের এ বাতাবরণে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে চিলির ছাত্রছাত্রীদের এ আন্দোলন। ১৩ জুনের মধ্যে গোটা দেশ জুড়ে দখল হয়ে যায় প্রায় ১০০টি স্কুল, ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় যার মধ্যে ছিল চিলির প্রধান পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র সংখ্যার বিচারে যারা প্রায় দেশের অর্ধেক ছাত্রছাত্রীর প্রতিনিধিত্ব করে। আন্দোলনের নেতৃত্ব উঠে আসে CONFECH (Confederation of Unions of Chilean University Students) ইউনিভার্সিটি ছাত্রছাত্রীদের এক স্বাধীন নিজস্ব ছাত্র সংগঠন। কনফেক’র পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পেশ করা নিম্নলিখিত দাবিসনদ।

বিশ্ববিদ্যালয়/উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত দাবিদাওয়া

বিনামূল্যে সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থা যাতে শিক্ষার খরচ পরিবারের উপর না পড়ে।

সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী অনুদানের প্রভূত পরিমাণ বৃদ্ধি।

-PSU (Prueba de seleccion Universitaria) নামক সিলেকসন পরীক্ষার উপর গুরুত্ব কমিয়ে নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংরক্ষণের ভিত্তিতে ভর্তি ব্যবস্থা।

আইন করে উচ্চ শিক্ষায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বন্ধ করা, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারী অনুদান দেওয়া বন্ধ করা।

দেশ জুড়ে উচ্চ শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আরো মনোযোগ সহকারে মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

দেশের আদিবাসী মাপুচে (Mapuche) জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, যা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য চাহিদা পূরণ করবে।

ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনারদায়িত্ব দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন।

স্কুল শিক্ষা সংক্রান্ত দাবিদাওয়া

-LOGE ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে মিউনিসিপালটির কর্তত্ব সরিয়ে সমস্ত স্কুল কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা।

স্কুল ভাউচার ব্যবস্থার সুযোগ শুধুমাত্র সরকারী স্কুলেই চালু করা।

চিলি দেশের জি.ডি.পির মাত্র ৪.% শিক্ষা খাতে ব্যয় করে যেখানে উন্নত দেশগুলোর গড় খরচ ৭%। সুতরাং শিক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ ব্যয় বাড়ানো।

সারা বছর জুড়ে স্কুল ছাত্রদের জন্য পরিবহন পাস চালু করা।

বৃত্তিমূলক স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি।

শিক্ষকদের মাইনে বাড়ানোর ব্যাপারে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা নেওয়া যাতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা এ পেশায় আসতে চায়।

আর এ দাবিগুলোর সমর্থনে সারা দেশ জুড়ে চলতে থাকে ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপক আকারের প্রতিরোধ আন্দোলন। ৩০ জুন দেশজুড়ে প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করে প্রায় দু’লক্ষ মানুষ। কেঁপে ওঠে কোটিপতি ব্যবসায়ী তথা দেশের রাষ্ট্রপতি পিনেরার গদি। চাপে পড়ে ৫ জুন পিনেরা ঘোষণা করেন সরকারী ক্ষেত্রে শিক্ষার সরকারী ব্যয়ভার বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত Project GANE আর একই সাথে খুবই সুক্ষ্মতার সাথে উচ্চশিক্ষায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানকেও আইনি বৈধতা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। উচ্চশিক্ষায় বেসরকারীকরণকে আরো দৃঢ় প্রস্তাবকে ঘৃণাভরে ছুঁড়ে ফেলে আন্দোলনের নেত্রী ক্যামিলা ভালেনজো। দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন ‘আমাদের লড়াই পিছিয়ে যাওয়ার জন্য নয় মি: পিনেরা’। আরো গতি পায় চিলির শিক্ষানীতি বিরোধী এই লড়াই। ১৪ জুন এল তেনিন্তে তাম্রখনির ধর্মঘটী শ্রমিকদের সাথে যৌথভাবে সরকারবিরোধী মিছিল করেন ছাত্রছাত্রীরা। বাড়তে থাকে আন্দোলনের শক্তি, দখল হওয়া স্কুলইউনিভার্সিটির সংখ্যা। আন্দোলনের চাপে পড়ে ১ আগস্ট ছাত্রছাত্রীদের আরো বেশ কিছু দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় সরকার; যেমন

শিক্ষায় বৈষম্য দূর করতে শিক্ষার মানের সাংবিধানিক গ্যারান্টি।

সরকারী স্কুলের উপর স্থানীয় কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ছাত্রছাত্রীদের বাধ্যতামূলক প্রতিনিধিত্বের আইন।

ফি দেওয়ার জন্য বৃত্তির বন্দোবস্ত ইত্যাদি।

কিন্তু শিক্ষায় বেসরকারীকরণ বন্ধের মূল দাবিতে অনড় থেকে আন্দোলন চালাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় ছাত্রছাত্রীরা। ৪ঠা আগস্ট ছাত্রছাত্রীদের মিছিলের উপর নেমে আসে ব্যাপক পুলিশি নিপীড়ন, লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস, জলকামান। আহত হয় প্রায় ৫০০ জন, গ্রেফতার হন প্রায় ১২০০ জন আন্দোলনকারী। ছাত্রছাত্রীদের পাল্টা প্রতিরোধে আহত হয় ৯০ জন ‘ক্যারাবিনেরো’ (মিলিটারি পুলিশ)। তথাকথিত গণতান্ত্রিকতার ছক ভেঙ্গে পড়ে প্রতিরোধের জোয়ারে।

১৮ আগস্ট সরকার তৃতীয়বারের জন্য প্রস্তাব পাঠায়। শিক্ষায় সরকারী লোনের সুদের হার কমিয়ে ২% করে দিতে রাজি হয়। কিন্তু বেসরকারীকরণ অবসানের মূল দাবি না মেটায় নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেন ছাত্রছাত্রীরা। ২১ আগস্ট শিক্ষক, অভিভাবক সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে প্রায় ১০ লক্ষ লোকের মিছিল করে আরো বড় লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেয় আন্দোলনের নেতৃত্ব। আন্দোলনের সমর্থনে ছাত্রছাত্রীদের পাশে এসে দাঁড়ায় দেশের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। শ্রমিকদের ডাকে ছাত্রছাত্রী আন্দোলনের সমর্থনে দেশজোড়া ধর্মঘট পালন করা হয় ২৪ ও ২৫ তারিখ। সালভেদর আলেন্দের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আবার দেশ জোড়া প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে ১১ই সেপ্টেম্বর। আন্দোলনের গতি রোধ করার জন্য ব্যাপক ধরপাকঢ় চলে মিছিলের উপর। পরের দিন চিলির কম্যুনিস্ট পার্টির সদর দফতরে হানা দেয় ‘ক্যারাবিনেরোর’র দল। চলে ব্যাপক মারধর, ভাঙচুরকিন্তু কিছতেই থামানো যায় না চিলির এই অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের গতিকে। সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবরে এসে ৫ মাস পূর্ণ করে চিলির এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ সংগ্রাম। এর মধ্যে দেশের জনগণের মধ্যে বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘The Gurdian’ সমীক্ষায় বলছে ছাত্রছাত্রীদের এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন আছে দেশের ৮০% জনগণের। তাই এখন আন্দোলন থামাতে মরিয়া হয়ে নেমেছে পিনেরা প্রশাসন। ছাত্রছাত্রীদের প্রতিরোধ রুখতে বিশেষ আইন আনার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। এই আইনে বেআইনী মিছিল করলে ৩ বছর পর্যন্ত শাস্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চেষ্টা করা হচ্ছে আন্দোলনের নেতৃত্ব বিভেদ তৈরী করার। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্বের একতা আর সাধারণ ছাত্রদের মনোবল এখনো অটুট। ১৮ ও ১৯ শে অক্টোবর দু’দিনই দেশ জুড়ে আবার সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয় শ্রমিক ইউনিয়ন ও ছাত্রছাত্রীরা। ২৬ অক্টোবর পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্রদের মিছিল কাঁপিয়ে দিযেছে সান্তিয়াগোর রাজপথ। অক্টোবরের শেষে CONFECH গোটা দেশ জুড়ে ছাত্রছাত্রীদের এক ভোটের ব্যবস্থা করে। তাতে নভেম্বরের সেমিস্টার বয়কটের পক্ষে ভোট দেয় ৫২% ছাত্রছাত্রী। এই লেখা ছাপাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত জানা খবর ৫ তারিখ আবার সাধারণ ধর্মঘট করেছে চিলির ছাত্ররা, ৯ নভেম্বর পরিকল্পনা করা হয়েছে আবার এক বিশাল মিছিলের, ঐদিনই শুরু হচ্ছে ২০১২ তে দেশের শিক্ষার বাজেটের আলোচনাপরিকল্পনা।।

তথ্যসূত্র:

(1) Higher Education in Chile : Aiming for Quality-Santiago, Chile: Division of Higher-Education, Ministry of Education 2005.

(2) Gobierno de Chile(2005) Ley No, 20.027. EstableceNormaspara el Financiamiento de Estudios de Educacion Superior.

(3) Chile’s Higher Education System : a comparative political economy focus-by Jose Joaquin Brunner, Panorama of Education & UNESCO, World Education.

(4) Evaluating a Voucher systen in Chile. Individual, Family and School Characteristics- Dante Contreras, Universidad de Chile and Yale University.

(5) 2006 student protests in Chile – Wikipedia.

(6) 2011 Chilean protests – Wikipedia.

(7) I LOVE CHILE – oct 19 2011, internet edition.

(8) Santiago Times, I LOVE CHILE – 2nd nov, internet edition.

(পূর্ব প্রকাশ: ‘ছাত্র অধিকার আন্দোলন’ পত্রিকায়)

(আন্তরিক কৃতজ্ঞতা: নূসরাত জাহান ও আহমদ জসিমএর প্রতি)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s