লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্র এখন পুঁজির খাঁচায় আবদ্ধ, সবকিছুই মাপা হয় পুঁজির বাটখারায়; প্রেমভালবাসা, লেখাপড়া বা খেলাধুলা, কোনটিই এর বাইরে নয়। আর ক্রিকেট যেহেতু এই অঞ্চলে অধিক জনপ্রিয়, তাই পুঁজির দালালেরা একে টেনে আনবে এটাই স্বাভাবিক। ক্রিকেট নিয়ে এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে যে এটি নিপীড়িতনিষ্পেশিত, অর্ধাহারেঅনাহারে ভোগা জ্বরাগ্রস্তদের দেশ, বাংলাদেশ

আর এই সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি লগ্নির ক্ষেত্রে ওই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রগুলো জনগণের দেশপ্রেমের ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে তাকে গড়ে তোলে উগ্র জাতিয়তাবাদী রূপে; যা তারা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন অবস্থায় নিজেদের তথা ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করে।

যে ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে জনগণের মৌলিক অধিকার সংবিধান সর্বস্ব, যেখানে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে সাজা হয়, যেখানে গণমুক্তির কথা বললে আসে ক্রসফায়ারের ছোবল, যেখানে সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের দালালী হয় রাষ্ট্রীয় কর্তব্য, যেখানে আছে তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র, যেখানে আছে বিশ্ববিদ্যালয় রূপী দালাল তৈরীর কারখানা, যেখানে মিডিয়া তোষামোদে ভরপুর; সেখানে যারা মনে করেন ভারতীয় পণ্য বর্জন করলেই দেশে জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটবে, দেশ তরতর করে উন্নতির জোয়ারে ভেসে যাবে, দেশের মানুষের জীবন যাত্রার মান বেড়ে গিয়ে তালগাছের আগায় ওঠবে; তারা মূলতঃ অন্ধকারে পথ হাতরাচ্ছেন, যে পথের ঠিকানা তাদের অজানা

গ্লোবালাইজেশন নামক শোষণের ফলে এখনকার কোন পুঁজিই একক পুঁজি নয়, সকল পুঁজিই এখন সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি, তা ভূমিদস্যু শাহ আলমের বসুন্ধরাই হোক, ঋণ খেলাপী সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো বা লতিফুরের এসেম্বলিং কারখানা। এই পুঁজিকে কেউ কেউ জাতীয় পুঁজির অগ্রপথিক রূপে স্বীকৃত করতে চাইলেও তা যে কেবলই রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজী, তা কারো অজানা নয়। তারা জাতীয় পুঁজির চরিত্রের সাথে এই ফরিয়া আর সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির মিল কোথায় পেলেন? কোন পুঁজি, নির্দিষ্ট কোন দেশে নিজের জানান দিলেই কি তাকে সে দেশের জাতীয় পুঁজি বলতে হবে? আর যদি তারা এটাই বলতে চাইছেন, তাহলে তারা কেবলই জনগণকে ধোঁকা দিচ্ছেন, পরোক্ষভাবে দালালী করছেন সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদের

৪০ বছরের সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের গাঁটছড়া আগ্রাসনে এখন দেশের অর্থনীতির যে বেহাল, দৈন্য দশা, তা হয়েছে মূলতঃ ক্রমান্বয়ে জাতীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংসের মাধ্যমে, এই আগ্রাসনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পুঁজির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে এক পর্যায়ে তা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিতে বিলীন হতে বাধ্য হচ্ছে। আর সেই সাথে পাট শিল্প, চিনি শিল্পের মতো একের পর এক বড় খাতগুলো বন্ধ করে পরনির্ভরশীল এক জাতীয় অর্থনীতির বিকাশে রাষ্ট্রের ধারক বাহক সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা সুখের পায়রা উড়াচ্ছে

মানুষ অনাহারেঅর্ধাহারে মরলে মরুক; জিডিপি বাড়ছে, মার্কিনভারত রাষ্ট্র দিচ্ছে উন্নতির সার্টিফিকেট। কৃষকের পেটে আগুন জ্বললে জ্বলুক, বিশাল কেকে পার্টি হবে ম্যাডামনেত্রীদের; সঙ্গী আছে সুদখোর ইউনুসআবেদ গং, যারা এদেশে মার্কিন এম্বেসীর এজেন্ট। সুশীল রূপী পাচাটা প্রাণীদের দালালী, প্রথমালু, চ্যানেল আই, কালের কণ্ঠ গং দালাল মিডিয়া, সর্বোত রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণীর সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের দালালীতে পিষ্ট জনগণের সব মুখ বুজে মানিয়ে চলার বিশাল গুণকেও (এটি অবশ্য গুণ নাও হতে পারে) প্রতিনিয়ত পরাস্ত করছে, ক্রমেই বিধ্বংসী হয়ে উঠছে জনগণ। এই বিদ্রোহের কিছু কিছু নজির আমরা দেখতে পাব নিকট অতীতে জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত গণআন্দোলনগুলোর পাণে তাকালেই, যদিও কোন নামধারী প্রগতিশীল দলই সেই আন্দোলনকে কাংখিত লক্ষ্যে পৌছে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি; আবার কেউ কেউ মুখে এই আন্দোলনের পক্ষাবলম্বন করেও পরোক্ষভাবে এর বিরোধিতা করেছে কখনো কালক্ষেপণ, কখনো ভ্রান্ত দিকনির্দেশনা, আবার কখনো ভণ্ড সুশীলতার ছলে। কিন্তু জনগণকে এই সুশীলতার দোহায় দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়, কানসাট, রূপগঞ্জ, ফুলবাড়ি, আড়িয়ল বিল বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান ছাত্র আন্দোলন আমাদের সে কথারই জানান দেয়। যদিও এই আন্দোলনগুলো হওয়া উচিৎ ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের আন্দোলনের এক একটা অংশ, তথাপি ক্ষেত্র বিশেষে এরূপ মনে হতেই পারে যে, পরষ্পর বিচ্ছিন্ন পৃথক এক একটা আন্দোলনই জনগণের একমাত্র আশাআকাংখার প্রতিফলন, যেমনটা কখনো কখনো মিডিয়াতে আবার কখনো বাম দলগুলোর কর্মসূচীতে লিপিবদ্ধ হয়েছে! আর দেশে জনগণের মুক্তিকামী কোন পার্টি না থাকায় এই বিচ্ছিন্ন আন্দোলনগুলোকে এক সুতোয় গাঁথা সম্ভব হয়নি, সব বাম দলই আন্দোলনে এসেছে নিজেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচিয়ে, নিরাপদ দূরত্বে থেকে (এখানে উল্লেখ্য যে, এই বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত সদস্যদের কথা আমি বলছি না, কারণ তারা অনেকাংশেই নিবেদিতপ্রাণ, যদিও বামদলগুলো তাদের সঠিক মূল্যায়নে ব্যর্থ হয়েছে বারংবার)

দেশে যেহেতু শিল্পায়ন হয়নি বা শিল্পের বিকাশ ঘটেনি, তাই শিল্পীয় শ্রমিক শ্রেণীও গড়ে ওঠেনি। আর যে শ্রমিকদের আমরা অবলোকন করি, মূলতঃ তারা গার্মেন্টস শ্রমিক; তাদের চরিত্র শ্রমিকের চরিত্র নয়। যেহেতু সেই শ্রমিক একে তার পেশা হিসেবে নিতে পারেনি, আর সে যে তার শ্রমকে বিক্রি করছে, এসম্পর্কেও সে ওয়াকিবহাল নয়। তাদের সর্বদাই একটা সুপ্ত ইচ্ছা থাকে এর বাইরে কিছু করার, এক টুকরো জমি কেনার বা একটা দোকান করার, অর্থাৎ এস্টাবলিশমেন্ট’এর দিকে যাওয়ার প্রতি এই শ্রমিকদের একটা ঝোঁক থাকে। যা একজন শিল্পীয় শ্রমিকের চরিত্র থেকে ভিন্ন। আর শিল্পীয় শমিকশ্রেণী না থাকায় শ্রমিক ইউনিয়নও কোথাও কার্যকর নয়। আর একারণে এই গণমুক্তির আন্দোলনের চালিকাশক্তি হবে ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকেরা আর আন্দোলনের সহযোগী হবে মাঝারি কৃষক, শ্রমিক, নিপীড়িত ক্ষুদে ও মধ্য বুর্জোয়া।

যারা জনগণের প্রকৃত মুক্তির কথা ভাবেন তাদের বলছি, কোন পার্টিজান হিসেবে নয়, একজন মুক্তিকামী মানুষ হিসেবে বলুন, আপনি কি মনে করেন এই মানববন্ধন, সেমিনার, মধুর ক্যান্টিন আর কলা ভবন কেন্দ্রিক রাজনীতি গণমুক্তির জন্য কোন কাজে আসতে পারে? যে কৃষকশ্রমিকসর্বহারার স্লোগানে শাহবাগ আর প্রেসক্লাবের রাজপথ গরম করা হচ্ছে, তাতে কতোজন কৃষকশ্রমিকের সমন্বয় ঘটে? যেখানে দেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে, আর সেই গ্রামের কৃষকদের মুক্তির বার্তাই যদি আপনি শোনাতে বধ্যপরিকর হয়ে থাকেন, তাহলে এই শহুরে মধ্যবিত্তের রাজনীতিতে আপনি ব্যক্তি পরিচয় তৈরী আর নিজের সুশীল প্রচারপ্রচারণা ছাড়া আর কি অর্জন করতে পারছেন?

অন্ধ মোহে নয়, রাজনীতিকে নিজে বুঝে ধারণ করুন; আর তা সম্ভব না হলে পুরোদস্তুর ব্যক্তি জীবনে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকুন। আর যদি গতানুগতিকতার বাইরে ভেবে থাকেন, তাহলে জনগণের জন্য ব্যক্তি জীবনকে উৎসর্গ করুন, মনে রাখবেন, বিপ্লব করতে চাইলে ব্যক্তি জীবনের বাইরে ভাবতে হবে। দো’টানায় ভাবার অবকাশ এখানে নাই। ব্যক্তি জীবনে ব্যপৃত থেকে বিপ্লবী বুলি কপচানো আর সুশীল, শান্তিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থান মূলক বিপ্লবের আকাশকুসুম কাহিনী ফাঁদাটাই বেশীরভাগ নামধারী প্রগতিশীলদের কাজ, এটাই স্বাভাবিক, কারণ এতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সম্ভাবনা নাই, সেই সাথে আছে সুশীল তত্ত্ব। এমন ভাবনাকারীদেরই আমরা বলতে পারি বুলি বিপ্লবী আর প্রতিবিপ্লবী। আর যদি আপনি এদের বাইরে ভাবেন তাহলে মনে রাখবেন এই সংগ্রামে আপনি কখনোই একা থাকবেন না, সহযোদ্ধারা পাশেই আছে, চিনে নিতে হবে আপনাকে। নিপীড়িত জনগণ আজ চেয়ে আছে আপনার পাণে; সিদ্ধান্ত আপনার, মুক্তি জনগণের

(ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক হাসান ইকবাল সজীবের চলে যাওয়া এবং প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত ঘনিষ্ট সহযোদ্ধাদের সাথে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এবং তাদের সাথে কথোপকথন থেকে এই লেখার উৎপত্তি।)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.