ছোট গল্প :: সূর্য্যটা তখনও ডোবেনি

Posted: জানুয়ারি 25, 2012 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: আলবিরুনী প্রমিথ

এক

৬ বলে আট রান দরকার প্রতিপক্ষের, হাতে দুই উইকেট, তারা জিতলেই অমলেশের ক্যারিয়ার শেষ। এই সত্যটা সে বিলক্ষ জানে, ৩৩ বছরের পরিণত জীবনে এই কথাটি এখন আর কারো বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনা। গত দুই ট্যুরেই দল জঘন্য খেলেছে, তার নিজের ব্যাটেও রান নেই, আর দীর্ঘদিন ধরেই জমে উঠা বোর্ড পলিটিক্স তাকে শ্বাস ফেলার সামান্য জায়গাটুকুও দিচ্ছেনা। টানা আড়াই বছর ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছে এটা ছয়মাস আগে বোর্ডের সদস্যপদ পাওয়া অনেকেই মেনে নিতে পারেনা এটাও অমলেশকে কোণঠাসা করে রেখেছে। তার নিজের ব্যাটেও রান নেই, তাই সহজেই লোকে বিস্মৃত হয়েছে এই অমলেশ সেন আড়াই বছর ধরে কি দুর্দান্ত প্রতাপে তার দলকে প্রতিটি টুর্নামেন্টেই সফল করে এসেছে। এই জনপদের ধরণটাই এমন, সহজেই সব কিছু অনায়াসে বিস্মৃত হয়, তাই বোধহয় তাদের বোকা বানিয়ে রাখাটা যতটাই সহজ ঠিক ততটাই কঠিন এদের কাছে কাউকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা। নাইলে কি এই অমলেশ মিত্রকে ……. থাক সে কথা, ড্রিংক্স চলছে, তা শেষ হলেই ‘মারো অথবা মরো’ ওভারের শুরু। ভাবতে ভাবতে সে শর্ট মিড উইকেট থেকে এগোতে শুরু করলো, প্রথম বল।

নিজ চোখে বিশ্বাস করতে পারলোনা সে, অফ স্ট্যাম্পের একটু বাইরের বল, লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান মিস করেছে কিন্তু সাথে উইকেট কীপার সেলিমও মিস করেছে। এক রান বাই হয়ে এখন স্ট্রাইকে সেট ব্যাটসম্যান, সন্দেহ জাগলো অমলেশের। তবে কি? সন্দেহটাকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলো সে। সে নিজে কি জানেনা সন্দেহ কতটা ভয়ংকর? তার সমস্ত ছেলেবেলাই তো এর বিষবাষ্পে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলো, মা কিরণময়ীর প্রতি তার পাষন্ড বাপটার সন্দেহই তার মাকে বাঁচতে দেয়নি বলে এখনো মনে করে সে। নিজের জীবন দিয়েই অনুভব করেছে বলেই মৃত্যুর আগে শেষ সময়ে কিরণময়ী ছেলেকে বলে গিয়েছিলেন কখনো যেন কারো উপরে সন্দেহ না করে, কিন্তু সর্বদা মাতৃআজ্ঞা পালন করা অমলেশ এখন তা পারছে কই?

দ্বিতীয় বল, মিডল স্ট্যাম্প বরাবর ইয়র্কার, সেট ব্যাটসম্যান কোনভাবে বলটা ঠেকিয়ে উইকেট বাঁচালো নিজের। ডট বল, চার বলে দরকার সাত রান, অমলেশ বারবার কেবল খেলার দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা। নিজের জীবনের ফ্ল্যাশব্যাক সব বুঝি আজই মনে পড়তে হবে? তার জীবনে মনে রাখার মত আছে কি যন্ত্রনা ছাড়া? সে আর তার ভাই কমলেশ মায়ের উপরে মদ্যপ, ব্যর্থ বাবার অত্যাচার ছাড়া আর কি দেখেছে জীবনে? ভাই কমলেশ নিজের মত করে থেকে পড়াশোনা শেষ করে চাকরী জুটিয়ে সেই যে ঘরছাড়া হল আর ফেরেনি, কালেভদ্রে তার আর বউদির খোঁজ নেয়। তার ছয় বছরের ছেলে পাপাই কাকুকে দেখেছে হাতেগোনা দুবার কি তিনবার, ছেলে আর স্ত্রী নীলা ছাড়া অমলেশের আর স্বস্তির জায়গা কি কোথাও আছে? অমলেশ কখনোই তা মনে করতে পারেনি, মদ্যপ আর অসহিষ্ণু পিতৃদেবের কারণে পাড়ায় কেউই তাদের সাথে সেভাবে মিশতোনা। কেবল কিরণময়ীর কাছে প্রয়োজন হলে সবাই যেত। এখন এসব মনে করার কোনই অর্থ নেই, কিন্তু মনে পড়ে যাচ্ছে সব, তৃতীয় বল।

মাথাটা চেপে ধরলো সে, মনে হচ্ছে আর বুঝি সহ্যই করতে পারবেনা। আবারো মিডল স্ট্যাম্প বরাবর ইয়র্কার কিন্তু ব্যাটসম্যান আগেই বাইরে বেরিয়ে এসেছিলো। ব্যাট ঠিক সময়ে নামাতে পারায় তার কোনায় লেগে ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারী হয়ে গেলো, সেখানে ফিল্ডারটি সার্কেলের ভেতরে ছিলো। পিতৃদেবের একগুঁয়েমীর কথা মনে করে ভেতরে ভেতরে ক্রোধে মুখে থুথু জমে উঠলো অমলেশের। সেই ছোটবেলা থেকেই তার কত ইচ্ছা ছিলো আর্ট শিখবে, কিন্তু কে শোনে কার কথা? পিতৃদেব তাকে জোর করে শেখালেন ক্রিকেট, নিজের ক্রিকেট জীবনে সফল হতে না পেরে ছেলের উপর তা চাপিয়ে তাকে ক্রিকেটার বানিয়ে প্রতিশোধ নেবার বাসনায় অন্ধ বাবা আর কিছুই তখন দেখেননি। মা কিরণময়ী স্বামীর ভয়ে সবসময়ে তটস্থ থাকতেন, স্বামীর বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস তিনি কখনোই সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি। বাবার চাপিয়ে দেওয়া স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ক্রিকেটার হতে পারলেও অন্য অনেক শখের সব জিনিস ছাড়তে হয়েছে তার। আর্ট শেখা হলনা, পড়াশোনাটাও ঠিকভাবে করতে পারলনা, সবই পিতৃদেবের জন্য।

চতুর্থ বল, স্লোয়ার বল ছিলো, ব্যাটসম্যান যুতসই ব্যাটে বল লাগাতে পারলনা। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ফিল্ডারের কাছে বলে যেতে যেতে এক রান হয়ে গেলো। দুই বলে দুই রান দরকার, অমলেশের মনে হচ্ছে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। স্ত্রী নীলার কথা মনে করতে চাইলো সে, তার একসময়ের অভিশপ্ত জীবনে এই একটা মানুষকেই সে পাশে পেয়েছে। সেই অমলেশকে হতাশার গর্ত থেকে টেনে বের করে নিয়ে তাকে থিতু হতে দিয়েছে, অবশ্য মাঝেমাঝে নীলার উচ্চাশায় সে বেশ বিরক্ত হয়, কিন্তু তারপরেও নীলার সাথে সরাসরি কোন তর্কে যায়না। নীলা তার জন্য কতটা স্যাক্রিফাইস করেছে সেটা একমাত্র অমলেশই জানে, ছেলে পাপাই আর নীলা ছাড়া কোন জীবনের কথা অমলেশ কি কল্পনাও করতে পারে? কোনভাবেই পারেনা।

পঞ্চম বল, মুহূর্ত্বের মধ্যেই বোলার সাব্বিরের দিকে ছুটে গেলো অমলেশ। তারপরে অন্যরা ছুটে এসে সাব্বিরকে জড়িয়ে ধরলো একের পর এক, আগের বলের মতই স্লোয়ার বল ছিলো, লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান বুঝতে না পেরে আগেই ব্যাট ঘুরিয়ে মিস করে বোল্ড। সাব্বির ছেলেটির উপরে বরাবরই ভরসা ছিলো অমলেশের, ছেলেটা দারুন বুদ্ধি রেখে ডেথ ওভারে বল করতে পারে। আর সাব্বিরকে সবার প্রথমে সেই দেড় বছর আগে ব্রেক দিয়েছিলো বলে ছেলেটা তাকে অন্য সকলের চেয়ে আলাদা করেই দেখে। মফস্বলের গন্ধ ছেলেটার গা থেকে এখনো যায়নি বলেই বোধহয় এখনো যেকোন কিছুতেই সবার আগে অমলেশ মিত্রকেই মনে পড়ে তার। আনন্দ উল্লাস করতে করতে বাস্তবে ফিরে এলো অমলেশ, এক বলে দুই রান …….

শেষ বলটি করতে কতক্ষন সময় লেগেছিলো অমলেশ জানেনা, শেষ ব্যাটসম্যান ব্যাট ঘুরিয়ে মারতেই সে পেছন বরাবর ছুটতে শুরু করলো। ডিপ মিড উইকেট থেকে ফিল্ডার এসে ধরতে পারবেনা সেটা সাথে সাথেই বুঝেছিলো সে তাই ছুটতে দেরি করেনি। ছুটছে অমলেশ, ধরতে পারলে আরো কিছুদিন, ডাইভ দিয়ে দুই হাতের মধ্যে বল দেখে কতক্ষন শুয়ে রইলো সে। মনে পড়ে গেলো তার বাবার ব্যর্থ হবার কারণ, লাভ হেট রিলেশন যদি কেউ বুঝে থাকে তবে অমলেশ তা হাড়ে হাড়ে বোঝে, কি দিয়েছে তার বাবা তাকে? কিছুই দেয়নি বলতে গেলে, তার জন্য একটা অভিশপ্ত শৈশব, সন্তানের সামনেই নিজ স্ত্রীর উপর তীব্র অসন্তোষ, বিতৃষ্ণা, নিজের মদ্যপ ও অসহিষ্ণুতা এসব ছাড়া আরেকটি জিনিস তার বাবা তার জন্য রেখে গিয়েছে বলেই অমলেশ উল্লাস করার সুযোগ সত্ত্বেও শুয়ে রয়েছে। কিরণময়ীর মৃত্যর পূর্বে কি কারণে যেন সে বাবার অনুপস্থিতিতেই ঘরে ঢুকেছিলো। বেরিয়ে যাবার আগে একটি চিঠি দেখতে পেয়ে কৌতূহলী হয়ে দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করেছিলো কিছু সত্য। চিঠিতে সেই চির পরিচিত বাবাকে সে দেখেনি, বরং নিজের ব্যর্থতার কারণ অকপটে স্ত্রীর নিকট তুলে ধরা এক অসহায় স্বামীকেই দেখেছিলো অমলেশ। তার বাবা আজও জানেনা সেই একটি চিঠির কারণেই বাবার প্রতি তীব্র ঘৃণার পাশাপাশি বুকে এক তীব্র কষ্টও সে বয়ে বেড়ায়, সেই চিঠিটির কারণেই তার জীবনে ঘৃণ্য পাত্র হয়েও বাবা নামক মানুষটির প্রভাব অমলেশ কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারেনা। সহ খেলোয়াড়ের ঘুষ খেয়ে ম্যাচ ছেড়ে দেওয়া বরদাস্ত করতে না পারার কারণে ষড়যন্ত্রে দল থেকে ছিটকে পড়া নিখিলেশ মিত্রের বড় ছেলে অমলেশ মিত্র উঠে দাঁড়িয়ে আম্পায়ারকে সিগন্যাল দিয়ে জানালো সে ক্যাচ ধরার আগে বল মাটিতে ড্রপ খেয়েছে। ম্যাচ শেষ, প্রতিপক্ষ দলের বিজয়োল্লাস, নিজ দলের সবার হতভম্ব চেহারা, দর্শকদের চিৎকার কিছুই অনুভব করতে পারছিলোনা অমলেশ তখন। যাকে সবচেয়ে ঘৃণা করতো বলে সে মনে করে সেই পিতৃদেবকে সে আজও অস্বীকার করতে পারলোনা, সে জানেনা পরবর্তীতে নীলার জীবনও কিরণময়ীর মতই হবে কিনা। অমলেশ এও জানেনা পাপাই তার মতই বাবাকে ঘৃণা করতে শিখে যাবে কিনা, কেবল এখন এটুকু বুঝতে পারছে যে তার ঘৃণ্য বাবা তাকে কখনোই ছেড়ে যেতে পারবেনা, আম্পায়ারকে সিগন্যাল দেওয়ার পরপরই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

দুই

নিখিলেশ মিত্র তার নিজের ঘরে চুপচাপ বসে আছেন। সেই একবার দল থেকে ক্লিকবাজিতে বাদ পড়ে যেই নির্বাসনকাল শুরু হয়েছিলো তার সংসারজীবনও তাকে সেই নির্বাসন থেকে ফেরাতে পারেনি। স্ত্রী কিরণময়ী, দুই ছেলে অমলেশ আর কমলেশ কেউই পারেনি তাকে নির্বাসন থেকে ফেরাতে। দিনে দিনে অসহিষ্ণু বাবা, মদ্যপ স্বামীর যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে দুই ছেলে, স্ত্রী সবাই তার থেকে দূরে সরে গেছে। আসলে বলা ভালো তিনি নিজেই দূরে সরিয়ে দিয়েছেন, আশেপাশের মানুষও তার থেকে দূরে দূরেই চলে। কাছের কেউ যদি থেকে থাকে তবে তার নাতি পাপাই, ছয় বছর বয়সের এই ছোট রক্তমাংসের শিশুটা এখনো এতকিছু বুঝতে শেখেনি। সে নির্দ্বিধায় যখন তখন দাদুর ঘরে চলে আসে, তার বাবা মায়ের শত নিষেধ সত্ত্বেও দাদুর সাথেই সারাদিন কাটাতে ভালোবাসে সে। নিখিলেশ নিজেও নাতি ছাড়া আর কারো সঙ্গই কামনা করেন না, তার নির্বাসিত এবং নিঃসঙ্গ জীবনে এখন একমাত্র সঙ্গী পাপাই। এমনকি বসার ঘরে যখন সবাই খেলা দেখতে বসেছে, তিনি তার পনেরো বছরের রেডিওতে খেলার কমেন্ট্রি শুনছেন, জানেন বসার ঘরে তিনি খেলা দেখতে বসলে সবাই আড়ষ্ট থাকবে। ছেলের ক্যাচ ছাড়ার সৎ ঘোষনায় তার দলের বাদ হয়ে যাওয়া, ছেলের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়া দেখে বুঝতে পারলেন স্ত্রীর কাছে লেখা একমাত্র চিঠিটি ছেলে সেদিন পড়েছিলো। নিখিলেশ মিত্র উঠে দাঁড়ালেন, ড্রয়ার খুলে দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখা ঘুমের ওষুধগুলোর দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রইলেন। স্মিত হেসে নিজের মনেই বলে উঠলেন ‘পারলে কি শেষ পর্যন্ত আমাকে অস্বীকার করতে? পারলেনা, একজন অন্তত আমাকে অস্বীকার করতে পারলোনা।’ নিখিলেশ হাত বাড়ালেন ড্রয়ারের দিকে, ঘুমের ওষুধগুলোর আর কোন প্রয়োজন নেই।

তিন

দরজা ভেঙ্গে সবাই যখন নিখিলেশ মিত্র’র মৃতদেহ উদ্ধার করলো তখন অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে আছে। ছেলের ক্যারিয়ারের সমাপ্তি আর মদ্যপ, অসামাজিক, গোমড়ামুখো বাবাটি মুখে হাসি ঝুলিয়ে মরে গেছে এটা নিয়ে তারা যখন শোক প্রকাশের ভন্ডামী ছেড়ে গল্প করছিলো তখন সূর্য প্রায় ডুবতে বসেছে, ডুবন্ত সূর্য্যের কাছে কারো ক্যারিয়ার কিংবা মুখে হাসি ঝুলিয়ে কারো আত্মহত্যা কিছুই যায় আসেনা।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s