লিখেছেন: রাজীব নন্দী

পাঠক, ‘যৌবনদীপ্ত’ শব্দটি খেয়াল করেছেন?

ভালো করে খেয়াল করে দেখুনশব্দের ঠিক মাঝে লুকিয়ে আছে একটি চঞ্চল শব্দনদী!

বাংলাদেশের নদী তার যৌবনদীপ্ত স্বভাব হারাচ্ছে। আমি বিগতযৌবনা ‘তিতাস’। আমি মরা নদীর সর্বশেষ নমুনা।

বাংলার সকল কোলাহলজুড়ে লেপ্টে থাকা নামটি কী? বলতে দ্বিধা নাই তার নাম ‘নদী’। নিজের খেয়ালে হুড়মুড় ছুটে চলার মুহূর্তে হঠাৎই থমকে তাকিয়ে থাকি। আমি তিতাস। আমার সপির্ল গতি, ছলো ছলো ফেনিল জল, কুলু কুলু ধ্বনি আজ লগ আউট হওয়ার দশা। শুনতে যদি ভীষণ ইচ্ছা, তবে শোন এই মরা নদীর কাহিনী।

তিতাস একটি খুন হয়ে যাওয়া নদীর নাম! ছবি: নিলয় দাশ

ওহে মানুষ! তোমরা প্রকৃতির মানসপুত্র, তোমাদের শাসকের চোখে আমি কেবলই নদী নই, নই দুরন্ত জল। আমি ভারতকে সড়ক সুবিধা দেয়ার একমাত্র মাধ্যমও। সমুদ্রের মহাসংগীতের মূর্চ্ছনায় আমার অভিযাত্রা থমকে গিয়ে আমি ভারতকে দিলাম আমার সবটুকু।

কি জানি কোন খেয়ালে এক প্রবাসীপাগল কবি দেশে ফেলে আসা নদীকে স্মরে কলম ধরেছিলেন

বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদদলে,

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণামিটে কার জলে”

আজকের কোন বঙ্গীয় কবি প্রবাসে মন মজে এমন স্নেহের তৃষ্ণা স্মরে বিহ্বল হবেন না। অন্তত আমার মতো মরা তিতাসকে নিয়ে তো নয়ই।

কোথাকার কোন রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন

মানুষের কত কীর্তি, কত নদী, গিরি, সিন্ধু, মরু

কতনা অজানা জীব, কতনা অপরিচি তরু’।

কিসের কী? এসব খেয়ালি ছন্দ কেবল সাহিত্যের খোরাক। আমি আজ ভারতীয় ট্রানজিটের খোরাক!

তাহলে কেন আমাকে নিয়ে লেখা হলো

এমন স্নিগ্ধ নদী কাহার? কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়?

কোথায় এমন হরিৎক্ষেত্র আকাশ তলে মেশে

এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায়

বাতাস কাহার দেশে?”

সে আমি জানি না। তবে এটা জানি আমি আজ মজা খাল। না না, খাল নয়আমিতো রাস্তা। কোন ধরনের ট্রানজিট ফি ছাড়াই ভারতকে এই সুবিধা দেওয়া হল। নদীর উপর মাটি ফেলে রাস্তা করা হয়েছে ভারতীয় কার্গো পরিবহনের জন্য। আমার ঘোলাস্রোতে এখন কেউ আর নাগরদোলার ঢেউ খেলা দেখে না। আমি কারো প্রেমিকার শাড়ী উড়াতে পারি না। আামকে নিয়ে আজ কোন কবি গায় না

মজা নদী, ওগো মজা নদী, মনে পড়ে

সেই ঘোলাস্রোত, ঢেউয়ের নাগর দোলা?

বিজলীর হানা, এক রাত্রির ঝড়ে

শাড়ী উড়ে গেছে, কার যেন চুল খোলা।” [মজা নদীআল মাহমুদ]

জলাঙ্গির এভাবে মজে যাওয়া এই বাংলার আর্থসামাজিকসাংস্কৃতিক কোন পরিবর্তনই আনবে না। এই জলাঙ্গির দুপাশে যাদের বাস নদী চলে গেলে তারাও বিপন্ন হবেননা। পাঁচ পুরুষের মাছ ধরার পেশা হারিয়ে গেলে আমার কি? জাল ছেড়ে রিকশার পেডেল মারো বা মজুরের কোদাল, কাস্তে ধরোআমার কী? ভুলে যাও এই তিতাসকে ধরে জীবন নদীর নৌকার মাঝি ছিলে একদা। আর বেশিদিন বাওয়া যাবে না তোমাদের জীবন নদীর নৌকা। আমি নিঃশব্দে মৃত্যুর পথে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছি। আমি বিগতযৌবনা নিঃসঙ্গ জলাঙ্গি। আমাকে নিয়েই তো কবি লিখেছেন

যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে

সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে

যে জাতি জীবনহারা অচল অসার

পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার”

আজ অদ্বৈত বাবু বেঁচে থাকলে আমাকে নিয়ে নুতন উপন্যাস রচিতেন

তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া সেতু, বুকভরা বালু, প্রাণভরা মরা লাশের গন্ধ।

হতাশায় তার লাশ দাফন হয়।

ভোরের হাওয়ায় তার তার তন্দ্রা ভাঙ্গে না, দিনের সূর্য তাকে তাতায় না; রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে না।

মেঘনা পদ্মার বিরাট বিভিষিকা তার মধ্যে নাই। আবার রমু মোড়লের মরাই, যদু পণ্ডিতের পাঠশালার পাশ দিয়া বহিয়া যাওয়া শীর্ণা পল্লীতটিনীর চোরা কাঙ্গালপনাও তার নাই। তিতাস আজ মরা নদী। দুষ্ট ভারতীয় ট্রাক তাকে টপকিয়ে পার হতে পারে। আবার ছোট ট্রাকে ছোট পন্য নিয়া আমাদের দেশীয় মাঝি ওপারে যাইতে ভয় পায়।”

তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের শেষ হয়েছে প্রাণবন্ত মালো গ্রামের মর্মস্পর্শী নিস্তব্ধতায়। আজ এই দুই হাজার এগারো সালের নদীখেকো সময়ে উপন্যাসের শেষটা হবে এইভাবে

সেতু বানানো শেষ হইয়া গিয়াছে। নদীতে আজ এক ফোঁটা পানি নাই। সেখানে এখন গোবি মরুভূমির বালু। চাহিলে কারো মনেই হইবে না যে এখানে একটা নদী ছিল। বালু টগবগে ফুটিতেছে। যতদূর চোখ যায় বালু আর বালু। দক্ষিণের সেই সুদূর হইতে বালুর বাতাস উঠিয়া সে ঢেউ এখন মালোপাড়ার মাটিতে আসিয়া লুটাইয়া পড়ে। কিন্তু এখন সেই মালোপাড়ার কেবল মাটিই আছে। সে মালোপাড়া আর নাই। শূন্য ভিটাগুলিতে গাছগাছড়া হইয়াছে। তাতে বাতাস লাগিয়া শোঁ শোঁ শব্দ হয়। ভারতীয় ট্রাকের তলায় চাপা পড়িয়া এখানে পড়িয়া যারা মরিয়াছে, সেই শব্দে তারাই বুঝি বা নিঃশ্বাস ফেলে।”

আমি মরা তিতাস। আমি আমার জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ চাই। মনে রাখবেন আমার স্মৃতিটুকুই কেবল সুখের। বিস্মৃতি আক্ষরিক অর্থেই বিষময়। সময়কে নির্দেশ করে নদীর স্রোতোধারাকে প্রতীক ধরে টেনিসনের দৃপ্ত কণ্ঠের উচ্চারণ ছিল Men may come and go, But I go on for ever”। তিতাস নিয়ে এমন কাটাকুটি খেলায় আমি আজ মরা তিতাস। আমার স্মৃতিটুকুই কেবল সুখের। বিস্মৃতি আক্ষরিক অর্থেই বিষময়। সাতখুন মাফ আছে; কিন্তু নিজের দেশ, নদী, প্রাণ, প্রকৃতি নিয়ে এই উদাসীনতার কি মাফ আছে?

কিশোর কবি সুকান্ত কবে সেই উচ্চারণ করেছিলেন

সে কোলাহলের রূদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ

জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ আসে”

মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। নদীর উপর বিশ্বাস হারানো মহাপাপ। আমি আমার জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ ফেরৎ চাই। প্রিয় পাঠক, ‘যৌবনদীপ্ত’ শব্দটি খেয়াল করুন!

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s