লিখেছেন: আলবিরুনী প্রমিথ

গত ১৬ ডিসেম্বর বিকালে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ শিক্ষার্থী সুরমার শাখানদী চেঙ্গেরখালে নৌকাভ্রমনে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় ফেরার পথে ডাকাতের কবলে পড়লে সেখানে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড পলিমার সায়েন্স (সিইপি) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রদ্বয় দীপঙ্কর ঘোষ অনিক ও খায়রুল কবীর নিহত হন, যাদের লাশ পরবর্তী দিনে অর্থাৎ শনিবার সকালে চেঙ্গেরখাল থেকে উদ্ধার করা হয়। লাশ গ্রহণ করার সময়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিমাদ্রি শেখর রায়ের অবিস্মরনীয় বানী ‘ডুবুরীর কোন দরকার নেই, মরা বাহাত্তর ঘন্টার পর এমনিতেই ভেসে উঠবে!!!’ এবং সহকারী প্রক্টর ফারুক উদ্দীনের লাশের সামনে সিগারেট ধরানো এবং পরবর্তীতে সাধারণ ছাত্রদের ‘রাজনীতি বিমুখতা’কে কাজে লাগিয়ে শাসকসশ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ছাত্র সংগঠনটির বিষয়টিকে ঘিরে আন্দোলনকে ‘অরাজনৈতিক’ মোড়কে দেখিয়ে স্তিমিত করার দূরভিসন্ধীর বিষয়টি নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা জরুরী ঠেকেছে,বিধায় তা নিয়ে লিখতে বসলাম।

অনিক ও খায়রুল'এর নিথর দেহ

এ কথা অনস্বীকার্য যে যেকোন ইস্যুতেই গনআন্দোলন কখনোই ‘অরাজনৈতিক’ হতে পারেনা, তা সম্ভবও নয়, কেননা আন্দোলনের প্রতিটা ইস্যুই স্পষ্টত বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর আওতায় এবং যেই ক্ষমতা বিদ্যমান শাসকশ্রেণীর কুক্ষীগত। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবলীলায় হত্যার বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করলে তা অবশ্যই ‘অরাজনৈতিক’ হওয়া আরো সম্ভব নয়। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হত্যার বিষয়টিকে ‘অরাজনৈতিক’ হিসাবে দেখতে শিখলে কিংবা সেভাবে ধরে নিলে প্রকৃতপক্ষে অবলীলায় শিক্ষার্থীদের হত্যার বিষয়টিকেই অনুমোদন করা হয়। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের যেই তিন দফা দাবী ছিলো সেগুলা হলো:

১। দায়িত্বে অবহেলার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রক্টরকে পদত্যাগ করতে হবে।

২। লাশের প্রতি অবমাননার দরুন ফারুক স্যারকে ছাত্রছাত্রীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

৩। অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও ফাঁসি কার্যকর করতে হবে।

আমরা যদি খেয়াল করে দেখি তাহলে দেখবো যে উপরে উল্লিখিত যেই তিনটি দাবী করা হয়েছে তার দুটি স্পষ্টতভাবেই রাজনৈতিক। কিন্তু পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের নিশ্চিতভাবেই বেশ কিছু জিনিস সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পাওয়া গেছে যে সরকারী দলের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’ এই নায্য আন্দোলনটিকে ক্ষতিগ্রস্থ করার অভিপ্রায়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘রাজনীতি বিমুখতাকে’ কাজে লাগিয়ে ঘোষণা করছে ‘এখানে কোন রাজনীতি চলবেনা’। এই টোপ দিয়ে তারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটিকে লক্ষ্যহীন করে তোলার যেই কূট–কৌশলকে কাজে লাগাতে চেয়েছে, তা সফল হয়েছে। কেননা এর ফলে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো এই বিষয়ে তাদের সচেতনতার কারণেই এগিয়ে আসতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। এই আন্দোলনকে বলা হচ্ছে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন’ হিসাবে যেখানে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই কিংবা যার সাথে কোন রাজনৈতিক দল জড়িত নেই। কিন্তু রাজনীতি বিমুখ যেসব ছাত্র তা দাবী করছেন, তারা কি লক্ষ্য করেছেন যে ইতোমধ্যেই বিষয়টিকে ‘অরাজনৈতিকতার’ মোড়কে ‘রাজনৈতিক’ কূট –কৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে? এই কাজটি করেছে সরকারের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’, যার ফলে আন্দোলনটি হয়ে গেছে লক্ষ্যহীন। এক্ষেত্রে যেই বিষয়গুলো মনে রাখার দরকার তা হল উপরিউক্ত দাবীগুলোর বাস্তবায়ন অরাজনৈতিকভাবে কোনভাবেই করা সম্ভব নয়, আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি একটু পর্যবেক্ষ করতেন তাহলে দেখতে পেতেন যে, লাশ গ্রহণ করার সময়ে প্রক্টরের উদাসীনতা এবং সহকারী প্রক্টরের সিগারেট খাওয়ার যেই দু’টি ঘটনা সেগুলার মাঝে কিন্তু ক্ষমতার দাম্ভিকতা স্পষ্টতভাবেই প্রতীয়মান হয়। এই ক্ষমতার যেই দাম্ভিকতা সেটার চরিত্র সম্পূর্ণই রাজনৈতিক, যাকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যায়না। যদি এই দু’টি ঘটনা আপনাদের কাছে ঘৃণ্য মনে হয়, যদি মনে হয় যে এই ঘটনাদ্বয়ের কারণে তাদের পদত্যাগ করা উচিত তবে অবশ্যই আপনাদের ‘এই আন্দোলনটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, যার সাথে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই কিংবা রাজনৈতিক দল জড়িত নেই’ এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যান্য সব আন্দোলনের মত এই আন্দোলনটিও আদ্যপ্যান্ত রাজনৈতিক এবং এই আন্দোলনের সাথে কোন রাজনৈতিক দলটি আপনাদের সহায়ক/বন্ধু আর কোন রাজনৈতিক দলটি আপনাদের শত্রু/আন্দোলনটিকে বানচাল কিংবা লক্ষ্যহীন দিকে ধাবিত করে নিয়ে যেতে পারে, তা বিচার করতে গেলে আপনাদের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষ করতে হবে। আপনাদের যেই বিশ্লেষটি করতে হবে, সেই বিশ্লেষটিও রাজনৈতিক, কেননা এখানে শত্রু/মিত্র নির্ণয়ের বিষয়টি চলে আসছে।

উপরিউক্ত ঘটনাটি নিয়ে যেভাবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে আন্দোলনটির সম্ভাবনাকে ইতোমধ্যেই প্রায় নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে, তা দুঃখজনক হলেও এই ঘটনা থেকে সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সেখানে বিদ্যমান প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোরও অনুধাবন করার মত বিষয় আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের যা উপলব্ধী করার আছে তা হলঅদূর ভবিষ্যতে আরো অনেক ইস্যুতেই আপনাদের নিশ্চিতভাবেই মাঠে নামতে হবে, সেই ক্ষেত্রে সরকারের ছাত্র সংগঠন আপনাদের ‘রাজনীতি বিমুখতাকে’ কাজে লাগিয়ে বারবারই আপনাদের নায্য আন্দোলনগুলোকে ধূলিসাৎ করার চেষ্টা করবে কেননা সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের বিরুদ্ধে নানাবিধ অনাচারের, অন্যারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠলে নিশ্চিতভাবেই তা অত্যাচারী শাসকসশ্রেণীর কাম্য হয়না। আর থিয়েটারের মত আন্দোলনও একটি আর্ট যেখানে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন অনস্বীকার্য, সেটা না থাকলে যাদের মিত্র ভাবা যায় তাদের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। তার অন্যথায় কিছু হলে আন্দোলন কোনভাবেই ফলপ্রসূ হয়না বরং তার দুর্বল দিক চিহ্নিত করে শাসকসশ্রেণীর ছাত্র সংগঠন তাকে বানচাল করে দেয়, যা এই আন্দোলনটির ক্ষেত্রেও ইতোমধ্যে হয়েছে। আর সেখানে বিদ্যমান প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে প্রত্যাশা থাকলো তারাও পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে প্রাসঙ্গিকভাবেই এই ধরনের আন্দোলনকে যে ‘রাজনৈতিক’ভাবেই পরিচালিত করতে হয় সেই ধারণাটি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নয় এমন শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবেন, কাজটি অনেক দূরহ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিবোর্ডে হাত চালিয়ে অনায়াসে এই পরামর্শ দেওয়া যায় তাও বুঝতে পারি, তবে পরবর্তী সময়ে উপরিউক্ত কাজটি করতে সক্ষম হলে সেটা নিশ্চিতভাবেই আপনাদের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে বাড়িয়ে তুলবে যার সুদূরপ্রসারী ফলাফল কেবল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়তেই পাওয়া যাবেনা বরং তা ছড়িয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। বিশেষত প্রগতিশীল আন্দোলন/বিক্ষোভের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমবর্ধমান দুর্বল অবস্থার কারণে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা আমাদের মূঢ়তার কারণে ‘প্রান্তিক’ হিসাবেই দেখে আসছি, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে উঠতে পারে প্রগতিশীল রাজনীতির উর্বরক্ষেত্র, তার সুফলটি যে ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী এলাকা নির্বিশেষে সকলেই ভোগ করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s