মূল লেখা: বার্নার্ড ডি’মেলো

অনুবাদ: শাহেরীন আরাফাত

কিষানজী লড়েছিলেন একটা উন্নত পৃথিবীর জন্য

একটি সাজানো এনকাউন্টার, যেখানে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) [সিপিআইমাওবাদী]’এর পলিটব্যুরো সদস্য মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও ‘কিষানজী’কে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বুড়িশোল জঙ্গলে, পশ্চিমবঙ্গঝাড়খন্ড সীমান্ত থেকে ১০ কিমি দূরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়; সেই হত্যাকাণ্ডকে “সাচ্চা এনকাউন্টার” দেখানোর জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি. চিদাম্বরম, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী (যিনি পশ্চিমবঙ্গের গৃহমন্ত্রনালয়ের দায়িত্বেও নিয়োজিত), কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব আর.কে. সিংহ এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থরা উঠে পড়ে লেগেছেন। প্রধান প্রধান গণমাধ্যম সমূহ সাংবাদিকতা পেশা শিকেয় উঠিয়ে সরকারী অসত্যতার সঙ্গে ধর্ম বিশ্বাসে তাদের দুষ্কর্মে সহায়তা দিচ্ছে উন্মুক্তভাবে, আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে তাঁর মৃত্যুকালীন পরিস্থিতি এখনো অজানা রয়েছে। ২৫ নভেম্বর ২০১১ তারিখে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র ‘অভয়’ কর্তৃক প্রেরিত এক প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়, “একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আটক করার পর কিষানজীকে হত্যা করা হয়।”

নৃশংসতম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের চিত্র

বিপ্লবী তেলেগু কবি ভারাভারা রাও ‘কিষানজী’কে তাঁর জন্মস্থান অন্ধ্রের করিমনগর জেলার পেদ্দাপল্লী গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘কিষানজী’র ভাইজীর সাথে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন; তিনি বলেন: “গত ৪৩ বছরে আমি তথাকথিত এনকাউন্টারের নামে অনেক নিহতের মরদেহ প্রত্যক্ষ করেছি, কিন্তু এর মতন একটিও ছিল নাশরীরের এমন একটি জায়গা বাদ নেই, যেখানে ক্ষত ছিল না।” পোস্টমর্টেমের পূর্বে কিষানজীর মরদেহ প্রত্যক্ষ করা সিআরডিও (কোঅর্ডিনেশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস অর্গানাইজেশন)’এর কর্মীদের ভাষ্য মতে, “মাথার পিছনদিকের মস্তকের অংশ এবং মস্তিষ্ক ছিল না; ডান চোখ অক্ষিকোটর থেকে বেরিয়ে এসেছিল; নিচের চোয়াল বলতে কিছু অবশিষ্ট ছিল না; মুখমণ্ডলে চারটি ছুরিকাঘাতের ক্ষত ছিল; গলায় ছুরি চালানোর চিহ্ন সুস্পষ্টভাবেই পরিলক্ষিত হয়; হাত ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং কাঁধের নিচে ২টি গুলির ক্ষত দেখা যায়; বাম হাতের তর্জনীর একতৃতীয়াংশ উপড়ে ফেলা হয়; লক্ষ্য করা যায় কতগুলো গুলি ফুসফুস ভেদ করে চলে যায়; ডান হাঁটুতে গভীর ক্ষত করা হয়; বামপায়ের পাতা ছিল সম্পূর্ণরূপে দগ্ধ; শরীরের সামনের দিকে ৩০টিরও বেশী ব্যায়োনটের আঘাতের চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। যখন গুলি, ছুরিকাঘাত, পুড়ে যাওয়ার মতো অসংখ্য ক্ষত কিষানজীর সারা শরীরে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে (!) তার পরিধেয় শার্টপ্যান্টে ক্ষত স্থানের অংশে কোন দাগ লাগেনি।” (পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এখনও ‘কিষানজী’র আত্মীয় স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি)

উপড়ে ফেলা আঙ্গুল

২৪ নভেম্বর বুড়িশোল জঙ্গলে সংগঠিত সাজানো এনকাউন্টারের স্থান পরিদর্শনপূর্বক সিডিআরও’এর অনুসন্ধানী দলের পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে সিডিআরও কর্তৃক এক প্রেস বিবৃতিতে (“মৃত আলোচনা এবং একটি সাজানো এনকাউন্টার [Killing the Talks and Faking an Encounter]”, কলকাতা, ২ ডিসেম্বর ২০১১) বলা হয়: “কিষানজী’র শরীরে যে পরিমান ক্ষত দেখা যায়, তাঁর মরদেহ জঙ্গলের যেস্থানে ফেলে রাখা হয় সেখানে, বা আশেপাশে তেমন কোন ধ্বংসের চিহ্ন, বা গুলাগুলির চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা সরকারী নথি থেকে ভিন্ন। শুধু তাই নয়, কাছের কোন পাহাড়ে আঘাতের কোন চিহ্ন নাই, ভারী মেশিনগান বা মর্টারের আঘাতে পুড়ে যাওয়ারও কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি।” পরিষ্কারভাবেই, সরকারী গল্প ভীষণভাবে সন্দেহজনক। আর তা আমাদের সন্দেহকে আরো তীব্রতর করেছে। কিষানজীর মৃত্যু ও এর পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুসন্ধানের জন্য এখনি হাই কোর্টের একজন বিচারপতিকে প্রধান করে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিৎ।

এভাবেই খুবলে খায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীরা

আপনি তাঁর চেতনার সান্নিধ্যে নির্বিকার থাকতে পারেন না

ভারতীয় জনগণ কিষানজী’কে চিনে মিডিয়া ও ক্যামেরার মাধ্যমে, যেখানে দেখা যায় কটন কাপড়ের পোষাক পরিহিত গামছা দিয়ে মাথা ও মুখ ঢাকা এক লোক, যার কাঁধে একটা বন্দুক ঝুলানো। যারা তাঁকে ভালবাসতো, তারা প্রায় নিঃস্ব হয়েছে ক্ষমতাধরদের ব্যক্তিগত শোষণে, জলজঙ্গলজমিনের শোষণে, মাল্টিন্যাশনাল, ভারত রাষ্ট্র ও বিদেশীদের দ্বারা খনিজ সম্পদের শোষণের ফলে। যারা তাকে ঘৃণা করে এবং তাকে ও তার দল সিপিআই (মাওবাদী)’কে শাসক শ্রেণীর জন্য বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে; তারা (শাসক শ্রেণী) শান্তির নামে তার পাশে দাঁড়ানো নিপীড়িত জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে – “অপারেশন গ্রীন হান্ট ”।

কমরেড কিষানজী

১৯৫৪ সালে পেদ্দাপল্লী শহরে (উত্তর তেলাঙ্গানার করিমনগর জেলায়) জন্মগ্রহণ করা ‘কিষানজী’ তার পিতা ভেঙ্কটায়্যা (একজন“মুক্তিযোদ্ধা”) এবং তার প্রগতিশীল মাতা মধুরমা’র ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেন। নক্সালবাড়ি এবং শ্রীকাকুলাম আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯৭৪ সালে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি (মার্কসবাদীলেনিনবাদী)’এর অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য শাখার একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে যোগদান করেন এবং তার নিজ জেলা করিমনগরের সিরসিলা ও জাগিত্যাল এলাকার কৃষক আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন, ১৯৭৮ সালের অক্টোবরে ঐ ২টি এলাকা ‘উপদ্রুত এলাকা’ হিসেবে ঘোষিত হয়। জাগিত্যালে সংগ্রামরত অবস্থায় মুপাল্লা লক্ষণ রাও (“গণপতি”), বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, সিপিআই (মাওবাদী), এবং ‘কিষানজী’তাঁদের অনন্যসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য পার্টির অন্ধ্র প্রদেশ শাখার নজরে আসেন। প্রকৃতপক্ষে, উত্তর তেলেঙ্গানার করিমনগর ও আদিলাবাদ জেলাতেই “বিপ্লবী রাস্তা”এর প্রথম বীজ বপন করা হয়; ১৯৬৭ সাল থেকে সিপিআই (এমএল)’এর কার্যপদ্ধতি ও রণকৌশল সমালোচনাও পর্যালোচনাপূর্বক কোন্ডাপাল্লী সীতারামাইয়্যা এবং তাঁর সহযোদ্ধা কমরেডগণ এই কৌশল (“বিপ্লবী রাস্তা”) প্রণয়ন করেন; জরুরী অবস্থা তুলে নেওয়ার পর থেকেই কৃষক আন্দোলনে এই বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে। এরই ফলশ্রুতিতে, কৃষক, শ্রমিক ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে ২২ এপ্রিল ১৯৮০ সালে সিপিআই (এমএল) (পিপলস ওয়ার) গঠিত হয়।

প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে উত্তর তেলেঙ্গানা এবং দণ্ডকারণ্যে গেরিলা অঞ্চল গঠন (পার্টির “গেরিলা অঞ্চল গঠনের পরিপ্রেক্ষিত [Perspective for a Guerrilla Zone]” অনুযায়ী) এবং এই কাজে কিষানজী’র ভূমিকা মোটেও কম ছিল না। সিপিআই (এমএল) (পিডব্লিউ)’এর নেতৃত্বে শ্রমিক, ভূমিহীন কৃষক এবং দরিদ্র শ্রমিক, দলিত, অনগ্রসর জাতি, এবং আদিবাসীদের একটা বড় অংশ নিজেদের আওয়াজ তুলে উঠে দাঁড়ায়, তারা নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলার এবং রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিহত করার সাহস পায়। আন্দোলনকে সুসংহত ও ছড়িয়ে দেওয়া এবং গেরিলা অঞ্চল গঠনের লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে কিষানজী’কে দণ্ডকারণ্যে স্থানান্তরিত করা হয়, এসময় তিনি ছিলেন অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্য কমিটির সদস্য। যতদিন পর্যন্ত গেরিলা বাহিনী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, ততোদিন এই গেরিলা অঞ্চলে পার্টি ও তার সংগঠনসমূহ তাদের রাজনৈতিক চর্চ্চা অবাধে চালিয়ে যেতে পেরেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং “অপারেশনগ্রীনহান্ট”এর মধ্যে পার্টি, পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি (পিএলজিএ), গণসংগঠন ও বিপ্লবী পিপলস কমিটি এখনও আদিবাসী, কৃষকদের মানব এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্টকারী ভারতীয় বিশাল বুর্জোয়া এবং বহুজাতিক কর্পোরেশন থেকে সামান্য পরিমাণ নিরাপত্তাই দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, তেমন নিরাপত্তা বিধান করতে এখনো একটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে এবং পার্টিকে জলজঙ্গলজমিন সরাতে, নব্যউদার বিশ্বায়নের বাজার থেকে শ্রম ও অর্থ অপসারণ ঠেকাতে কাজ করতে হবে। শুধু দৈহিক নিরাপত্তাই নয়, রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মিলিয়ে বসবাসযোগ্যতা, তথা কৃষি নিরাপত্তা বিধান করার প্রশ্ন। আর এসবই বিফলে যাবে, যদি ঘাঁটি অঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব না হয়।

১৯৯০ দশকের মধ্য ভাগ থেকেই কিষানজী অন্যান্য বিপ্লবী বাহিনীর (যারা নক্সালবাড়ির বিপ্লবী চেতনা ধারণ করেন) সাথেঐক্য স্থাপনের কাজ করেন এবং পশ্চিমবঙ্গে নক্সালবাড়ি আন্দোলনের নবপ্রাণসঞ্চার করেন। কিষানজী এবং তাঁর সহযোদ্ধা কমরেডগণ, কমরেড শশধর মাহাতো (এই বছরের মার্চ মাসে নিরাপত্তা বাহিনী এনকাউন্টারের নামে তাঁকে হত্যা করে) তাদেরই একজন, যারা সাংগঠনিক কাজে জড়িত ছিলেন; হো চি মিন সম্ভবত একে বলতেন ধৈর্যের সাথে দীর্ঘ সাংগঠনিক কাজ করে যাওয়া, যা নিয়ে যাবে গুলি চালানোর পথে। সিপিআই (এমএল) (পিডব্লিউ) এবং সিপিআই (এমএল) (পার্টি ঐক্য)’এর মধ্যে১৯৯৮ সালের আগস্টে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিপিআই (এমএল) (পিডব্লিউ) এবং ভারতের মাওবাদী কমিউনিষ্ট সেন্টার (এমসিসিআই) একীভুত হয়ে সিপিআই (মাওবাদী) গঠিত হলে ভারতীয় শাসকশ্রেণীর ঘন্টা বেজে যায়। ২০০৮ সালের নভেম্বরে পশ্চিমবঙ্গে আন্দোলনের নবজাগরণের ফলে পশ্চিমবঙ্গের সংশোধনবাদী সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন সরকার সাহসশূন্য, বলশূন্য হয়ে পড়ে।

মধ্য পঞ্চাশেও কিষানজী ছিলেন একজন তরুণ গেরিলার মতোই দুরন্ত, যা তাঁর কমবয়সী সহযোদ্ধাদের জন্য ছিল খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক। শক্তি এবং প্রত্যয়ের সঙ্গে তিনি একটি উন্নততর পৃথিবী গড়ার জন্য সংগ্রামে নিবেদিত থেকে খুবই সহজ জীবন যাপন করতেন। তাঁর এই নৈতিকতার উৎস হলো কর্মশক্তি এবং আবেগ, যা দিয়ে তিনি সংগঠিত শ্রেণী সংগ্রামে নিয়োজিত থাকতেন। তিনি যা সমর্থন করতেন, তাই জীবনে ধারণ করতেন তাহলো, সকল কমরেডদের অবশ্যই একে অপরের খেয়াল রাখতে হবে, অপরকে ভালবাসতে হবে, সাহায্য করতে হবে; পিএলজিএ’এর কর্মকর্তাদের মৌলিক মনোভাব হবে সৈনিকগেরিলাদের সঙ্গে সুখদুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়ার, তাঁদের মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান; অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করলে “যুদ্ধ বন্দী”দেরও মানবিক সম্মান দেখাতে হবে। কিষানজী জনগণের সাথে খুবই ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন; জাগিত্যাল থেকে জঙ্গলমহল পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রায় তিনি সর্বদা তাদের জন্য উদ্বিগ্ন থাকতেন এবং তাদের আপদেবিপদে সাহায্য করতেন। তিনি বলতেন, পিএলজিএ’কে অবশ্যই জনগণের একজন হয়ে যেতে হবে, যেন তারা গেরিলাদের নিজেদের একজন মনে করতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে নক্সালবাড়ির সংগ্রামী চেতনার পুনরুজ্জীবন

এরপর আসে লালগড় আন্দোলন, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিপিআই (মাওবাদী)’এর পক্ষে কিষানজী। পশ্চিমবঙ্গ সরকার পশ্চিম মেদেনীপুর জেলার শালবনিতে বনভূমির প্রায় ৪৫০০ একর জায়গা ‘সজ্জন জিন্দাল’ব্যবসা গোষ্ঠির হাতে তুলে দেয়; যদিও সরকারের ভূমি সংস্কার আইনের অধীনেও আদিবাসী কৃষকদের অধিকার বঞ্চিত করা হয়েছিল। সন্ত্রাসের রাজত্বে আদিবাসীদের সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়২ নভেম্বর ২০০৮, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য ‘জিন্দাল প্রজেক্ট’এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনপূর্বক ফেরার সময়ে একটি ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরিত হয়, মুখ্যমন্ত্রী অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পানমাওবাদীদের সমর্থন ও কিষানজীর নেতৃত্বে সেদিন তারা সক্রিয়ভাবেই প্রতিহত করেছিল শত্রুকে; তারা তাদের মর্যাদা বিনষ্ট হতে দেয়নি। মধ্য নভেম্বর, লালগড় ও এর আশেপাশের এলাকার জনগণ গঠন করে পুলিশী অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনসাধারণের কমিটি (People’s Committee Against Police Atrocities, PCAPA)

ডিসেম্বর ২০০৮ থেকে জুন ২০০৯ পর্যন্ত, যতদিন মাওবাদী রাজনীতির দাপট ছিল, ততোদিন ছিল প্রকৃত জনগণতন্ত্রের চর্চ্চা; প্রতিটা গ্রামে ছিল ৫ জন নারী ও ৫ জন পুরুষের সমন্বয়ে একটি গ্রাম কমিটি, প্রতিটা গ্রামের ১ জন নারী ও ১ জন পুরুষ কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী কমিটির অংশ; বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো পুরোপুরি গণতান্ত্রিক উপায়ে; কর্মকর্তারা কমিটির সাথে আলোচনার সময় অন্যদের সঙ্গে মাটির উপর হাতে তৈরী মাদুরে বসতেন এবং এতো বড় আন্দোলন পরিচালনা করা পিসিএপিএ, নিজেদের খুব অল্প সংস্থান থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য প্রতি সপ্তাহে কোলকাতা থেকে ডাক্তার আনার ব্যবস্থা করেন; বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত, পুকুর খনন, টিউবওয়েল স্থাপন, বেশকিছু স্কুলে স্থানীয় ভাষা শেখার ব্যবস্থাসহ এমন অনেক কাজ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে করেন।

সত্যিই তখন বসন্ত হাওয়া বইছিল।এই সাত মাসে যতদিন কিষানজীর নেতৃত্বে পিসিএপিএ এবং সিপিআই (মাওবাদী) সেখানে ক্ষমতায় ছিল, তারা রাজনৈতিক সংহতি, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং সামাজিক কল্যাণ/উন্নয়ন কার্যকলাপের মধ্যে বিচক্ষণ ভারসাম্য স্থাপন করেন। কিন্তু যখন তারা ১৪ জুন ২০০৯ তারিখে প্রাচীন শাসনব্যবস্থার প্রতীক “হোয়াইট হাউস” ধ্বংস করলেন, যা ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি (মার্কসবাদী) [সিপিআই (এম)]’এর ধর্মপুরের স্থানীয় সচিব অনুজ পাণ্ডের প্রাসাদ তুল্যবাড়ী, এটিই ছিল রাষ্ট্রের ধৈর্য্যের শেষ সীমা। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের যৌথ বাহিনী (জয়েন্ট ফোর্সেস, জেএফ) একটি দখলদার বাহিনীর ন্যায় হামলে পড়ে, সাথে ছিল সিপিআই (এম)’এর হার্মাদ বাহিনী ও কিছু স্থানীয় বিশ্বাস ঘাতক।

রাজনৈতিক সংহতি এবং সশস্ত্র সংগ্রামকে সঠিকভাবে ভারসাম্য রক্ষার মাওবাদী রণকৌশলে এটি ছিল একটি বড় ধাক্কা। তাছাড়া, কিষানজী তৎকালীন শাসক সিপিআই (এম) এবং মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধীদল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)’কে পাল্লায় মাপতে ভুল করেন। (**মূলত এই দু’টি দলের মাঝে পার্থক্যের পরিমাণ খুব সামান্যই অনুবাদক)। আর তার আক্রমনাত্মক উপদলীয় ও দু:সাহসিক রণনীতির মাশুল গুণতে হয় পার্টিকে এবং ভীষণভাবে গণআন্দোলনকে; এই রণনীতির ফলে রাষ্ট্রীয়দমনপীড়ন যেমন হওয়ার কথা ছিল, তার থেকেও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। স্থানীয় পর্যায়ে মাওবাদী বিপ্লবীদের এবং সামাজিকগণতান্ত্রিক সিপিআই (এম)’এর মধ্যে অপ্রয়োজনে বৈরিতা বাড়তে থাকে এবং এর ফলে সংগঠিত হয়েছে বেশ কিছু (অনাহুত) হত্যাকাণ্ড সত্যিইকি মাওবাদীরা ছিল শ্রেণী শত্রুদের প্রধ্বংসী? পরিশেষে, এ থেকে ফায়দা তুলে নেয় তৃণমূল কংগ্রেস, এই বছর এপ্রিলমে মাসের নির্বাচনে পরিস্থিতির সুবিধা থেকে তারা সিপিআই (এম)’এর প্রার্থীদের হারায়।

নির্বাচনের পূর্বে তার প্রতিশ্রুত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে মমতা ব্যানার্জী অঙ্গীকার করেছিলেন ২০০৯ সালের মধ্য জুন থেকে জবরদখল করে রাখা যৌথ বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্ত করার, বিশেষত শতশত আদিবাসীদের জেল থেকে মুক্ত করার যাদের যৌথ বাহিনীর অভিযান চলার সময় বন্দী করা হয় এবং মাওবাদীদের সাথে শান্তি আলোচনা। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তিনি তার সকল অঙ্গীকার প্রত্যাহার করে নিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ছত্তিশগড়ের সীমান্তে দস্যু বাহিনী সালওয়া জুডুম’এর সহযোগী হিসেবে প্রায় ১০,০০০ বিশেষ পুলিশ হাবিলদার নিয়োগ করেন। আর সেই সাথে সিপিআই (এম)’এর হার্মাদ বাহিনীর মতোই টিএমসি’এর ভৈরব বাহিনী দখলদার যৌথ বাহিনীকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। অনেক হার্মাদ সদস্যও টিএমসি’এর ভৈরব বাহিনীতে যোগ দেয়। আত্মসমর্পণের বিনিময়ে একটি “উন্নয়ন প্যাকেজ”ঝোলানো হয়, সেই সাথে যৌথ বাহিনীকে পুনরায় দখল ও অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার মূলে আছে কমান্ডো বাহিনী “কোবরা”, আর এর উদ্দেশ্য হলো রাজ্য পুলিশকে জঙ্গলে যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্পেশ্যাল ইন্টিলিজেন্স ব্যুরো অব অন্ধ্র প্রদেশ (এপিএসআইবি)’এর সাথে ইন্টিলিজেন্স ব্যুরো’র নক্সাল অংশকে শক্তিশালী করা এবং গ্রেহাউন্ড সহ রাজ্যের কাউন্টার ইনসার্জেন্সি ফোর্স; এসবই দেখা গিয়েছে উৎপাদিত ফলাফলেকিষানজী’কে “শিকার” করার পর তাদের উল্লসিত আমেজ সেদিকেই নির্দেশ করে।

পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে মাওবাদী আন্দোলনের পুনর্জাগরনের কৃতিত্ব যেমন কমরেড কিষানজী এবং শশধর মাহাতো’র মতো তাঁর কাছের কমরেডদের; তেমনি অবস্থার বর্তমান অবনতির দায়টাও তাঁদের উপরেই বর্তায়।

এনকাউন্টার রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড

এনকাউন্টারের” (বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড) মাধ্যমে মাওবাদী নেতাদের হত্যা করাটা নতুন কিছু নয়। বিপ্লবী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে পার্টিকে উপড়ে ফেলাই ভারত রাষ্ট্রের বিদ্রোহ দমনের কৌশলের প্রধান উপাদান।) ভেম্পাতাপু সত্যনারায়ন (“গাপ্পা গুরু” নামে অধিক পরিচিত) এবং আদিভাটলা কৈলাশম ১৯৫৫ সালে এই দুইজন স্কুলশিক্ষক শ্রীকাকুলাম’এর গিরিজন (**একটি আদিবাসী জাতি) কৃষকদের আন্দোলনে সংগঠিত করেন, ১৯৬৭৬৮ সালে তারা সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দান করেন এবং ১৯৬৯ সালে সিপিআই (এমএল)’এ যোগদান করেন – ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে “এনকাউন্টারের” নামে পুলিশ তাদের হত্যা করে; যামুকূলকথা (নাটুকে লোক গান)’এর জন্য পরিচিত সুব্বারাও পাণিগ্রাহী উড়িষ্যাপ্রদেশে শ্রীকাকুলাম আন্দোলনের সম্প্রসারণে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল; ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে পুলিশ তাঁকে আটকের পর হত্যা করে।

প্রকৃতপক্ষে, অন্ধ্র প্রদেশে এনকাউন্টারে শহীদ হওয়াদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। আর জরুরী অবস্থার কালো দিনগুলোতে এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সামান্য কয়েকটিরই মাত্র কমিটি গঠন করে অনুসন্ধান করা হয়েছিল (কমিটি গঠন করেন “নাগরিকের জন্য গণতন্ত্র [Citizens for Democracy]”এর সভাপতি জয়প্রকাশ নারায়ন), এই কষ্ট সহিষ্ণু কাজের প্রধান ছিলেন ভি.এম. তারকুন্ডে, সদস্যসচিব কে.জি. কান্নাবীরন এবং সেই সাথে বেশ কয়েকজন বেসামরিক লোকজন এই কমিটিতে যুক্ত ছিলেন।

সম্প্রতি অন্ধ্র প্রদেশে আবারো এমনি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, বিদ্রোহ দমনের মূল লক্ষ্য পার্টির নেতাদের হত্যা করে পার্টিকে প্রত্যক্ষভাবে ধ্বংস করা। এই ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে শহীদ হওয়া অন্ধ্র প্রদেশ ইউনিট ও সিপিআই (মাওবাদী)’এর কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজনের তালিকা এখানে উল্লেখ করছি, বছরের পর বছর ধরে যে কমরেডদের গড়ে তোলা হয়েছে।

সেট্টিরাজু পাপাইয়্যা (ওরফে সোমান্যা), উত্তর তেলেঙ্গানার বিশেষ আঞ্চলিক কমিটির এই সদস্যকে এপিএসআইবি বেঙ্গালুরু (কর্ণাটক প্রদেশের রাজধানী) থেকে ২৯ জুন ২০০৬ তারিখে অপহরণের পর নিষ্ঠুর নির্যাতনের পর ১ জুলাই হত্যা করে; হত্যার পর তাঁকে অন্ধ্র প্রদেশের ওয়ারাঙ্গাল জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়।

২৩ জুলাই ২০০৬, গ্রেহাউন্ড সহ পুলিশের বিশেষ বাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন নাল্লামালা জঙ্গলে পার্টির অন্ধ্রের হেড কোয়ার্টারে হামলা চালিয়ে পার্টির রাজ্য সচিব বুররা চিন্নায়্যা ওরফে “মাধব” এবং তাঁর৭ জন কমরেডকে হত্যা করে। হামলাকারীদের নিকট সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল; এমনকি মাধব যে তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন, তাও তাদের জানা ছিল।

পার্টির অন্ধ্র প্রদেশের রাজ্য কমিটির সদস্য রাঘাউলু, তিনি ছিলেন এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান, বেড়ে উঠার বয়সে তিনি ছিলেন একজন রাখাল। ২০০৬ সালের ৮ নভেম্বর, চুদ্দাপাহ জেলার জঙ্গলে তাঁকে ৮ জন কমরেড সহ হত্যা করা হয়।

চন্দ্রমৌলি, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সদস্য এবং তার স্ত্রী করুণা, একজন খালি পায়ে চিকিৎসা করা ডাক্তার; ২৯ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখে পার্টি কংগ্রেসে যাওয়ার পথে অন্ধ্রউড়িষ্যা সীমান্তে পূর্বঘাটে পরিকল্পিতভাবে তাঁদের হত্যা করা হয়।

প্যাটেল সুধাকর রেড্ডি (ওরফে সুরিয়ম, বিকাশ), একজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং তাঁর সহচর ভেঙ্কাটাইয়্যাকে ২৩ মে ২০০৭ তারিখে নাসিক থেকে অপহরণ করে ওয়ারাঙ্গলে তুলে এনে নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হয় এবং পরদিন হত্যা করার পর তাঁদের মৃতদেহ লাভভালা জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়।

তাইকিষানজী’এর হত্যাকাণ্ড প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের অপরাধ চর্চ্চারই অপরিহার্য অংশ একথা হলফ করে বলা সম্ভব।

এই বেআইনী, ঘৃণ্য অপকর্ম কি অবিসন্বাদিতই থেকে যাবে? এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসীদের অবশ্যই দায় মুক্তি থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই বছরের প্রথমদিকে, সুপ্রিম কোর্টের দুই জন বিচারপতি আফতাব আলম ও আরএম লোধা জনস্বার্থ সম্পর্কিত দুইটি ভুয়া ‘এনকাউন্টার’ সম্পর্কে কথা বলেন; ; ২০১০ সালের ১২ জুলাই, সিপিআই (মাওবাদী)’এর পলিটব্যুরো সদস্য ও পার্টির মুখপাত্র চেরুকুরী রাজকুমার (“আজাদ”) ও সাংবাদিক হেমচন্দ্র পাণ্ডে’কে অন্ধ্র প্রদেশ পুলিশ নাগপুরের কাছ থেকে তুলে এনে গুলি করে হত্যা করে; এ সম্পর্কে বিচারকগণ বলেন: “প্রজাতন্ত্র তার সন্তান হত্যা করবে, আমরা তা অনুমোদন করতে পারিনা।” ‘আজাদ ভুয়া এনকাউন্টার মামলা’র মতোই কিষানজী হত্যাকাণ্ডের পরেও একই রীতিতে মামলা হতে দায় মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে দমনমূলক ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে শাসকেরা বদ্ধপরিকরএই অপরাধীরাই ভারত রাষ্ট্রের দমননীতির মূল যন্ত্র। কিষানজী’র হত্যাকাণ্ডও এমনি খুনিদের কাজ; সর্বোপরি, যুদ্ধরূপী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসই যার শেষ কথা।

লাল পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে গাও ‘আন্তর্জাতিক’

নিঃসন্দেহে সিপিআই (মাওবাদী)’এর কেন্দ্রীয় কমিটি’র ভাষ্য মতে, “কমরেড কোটেশ্বর রাও’এর শহীদ হওয়া ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য এক বিরাট ক্ষতি”, কিন্তু এটিই আন্দোলনকে যাচাই করবেসকল ভাল ও মন্দ সময়, সকল ভুলত্রুটি সমেত এটি এখনো একটি উন্নত পৃথিবীর আশা ধারণ করে আছে। ২৭ নভেম্বর কিষানজী’র জন্মস্থান পেদ্দাপল্লী শহরে এক অভূতপূর্ব পুলিশ সমাবেশ করা হয়, সেদিন কিষানজী’র অন্তিমযাত্রায় সামিল হয়ে এই মাওবাদী বিপ্লবীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষের জমায়েতে প্রায় একই পরিমাণ পুলিশেরও সমাবেশ ঘটে। তাঁর মাতা মধ্য আশি’র মধুরমা অজ্ঞানপ্রায়; তিন যুগেরও বেশী সময় ধরে তিনি ছেলেকে দেখেননি, আর এখন তাঁর সামনে ছিল ছেলের প্রাণহীন দেহ। যে যন্ত্রণা মধুরমা’কে সইতে হয়েছে তা অবশ্যই অসহনীয়। কিন্তু যে দিন তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়, তা ছিল তাঁর জন্য গ্লানিকর।

আমার ছেলে যা বিশ্বাস করতো, তার জন্যই তাঁকে হত্যা করা হলো। আমি জানতে চাই কিভাবে এবং কারা তাঁর হত্যাকাণ্ডের পিছনে রয়েছে। কেন তারা তাঁকে (কিষানজী) এভাবে মারলো তা জানার জন্য আমি কলকাতা উচ্চ আদালত এবং প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে যাব…. আমি আমার ছেলেকে ৩৭ বছর যাবৎ দেখিনি। এখন আমি তার নিথর শরীর দেখে সহ্য করতে পারি না। আমি আমার মৃত্যুর পূর্বে অন্তত একটি বার তাঁকে দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। তাঁর শরীর নিয়ে আসার পূর্বের মরে গেলে ভাল হতো, আমি আর বাঁচতে পারব না।” -(মধুরমা’র ভাষ্য)

কমরেড কিষানজী, লাল সালাম!!!

এদিকে, যে গান কবি গাদার শোনানেল, তা উপস্থিত মানুষদের চোখ ভিজিয়ে দেয়। মধুরমা একা নন, তাঁর পেটে ধারণ করা সন্তানের স্মরণে জড়ো হওয়া আরো হাজারো মানুষ শোকার্ত। কিষানজীর স্মৃতি, তাঁর জীবন, তাঁর কাজ তাদেরই, যারা গড়তে চায় এক নতুন পৃথিবী। “অমর রহে কিষানজী”, “কমরেড কিষানজী, লালা সালাম”, “জোহার অমরাজীবী কিষানজী”, এমন স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছিল আকাশেবাতাসেতার ঐতিহ্য সর্বোতভাবে দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, বিপ্লবী বুদ্ধিজীবিদের জন্যে। সন্দেহাতীতভাবে কিষানজী মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকবেন মাওবাদী প্রবাদবাক্যকে চর্চ্চায় রূপ দেওয়ার জন্য– “বিপ্লবী যুদ্ধ…..কেবল জনগণের ব্যাপক সমাবেশ (অংশগ্রহণ) ও তাদের বিশ্বাস করার মাধ্যমেই চালানো সম্ভব…”

[“মান্থলি রিভিউ” অনুসারে]

(বার্নার্ড ডি’মেলো, ‘ইকোনোমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলি’এর সহকারী সম্পাদক এবং ‘কমিটি ফর দি প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস, মুম্বাই’এর সদস্য।)

জাগো জাগো জাগো সর্বহারা

অনশন বন্দী ক্রিতদাস

শ্রমিক দিয়াছে আজি সাড়া

উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস।।

সনাতন জীর্ণ কুআচার

চূর্ণ করি জাগো জনগণ

ঘুচাও এ দৈন্য হাহাকার

জীবনমরণ করি পণ।।

শেষ যুদ্ধ শুরু আজ কমরেড

এসো মোরা মিলি একসাথ

গাও ইন্টারন্যাশনাল

মিলাবে মানবজাত।।”

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s