আমাদের সিফিলিসক্লিষ্ট ‘দেশপ্রেম’ এবং আড়ালে থাকা কিছু ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’দের কাহিনী

Posted: ডিসেম্বর 3, 2011 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: আলবিরুনী প্রমিথ

প্রাক কথন

তীব্র শ্রেনী বৈষম্য আবিষ্ট যেকোন সমাজেই নানাবিধ বৈষম্য বিদ্যমান থাকে যার মধ্যে লিঙ্গীয় বৈষম্য অন্যতমবাংলাদেশের মত তীব্র শ্রেনী বৈষম্যে আকন্ঠ নিমজ্জিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই বৈষম্যের নানা ভয়াবহতা পরিলক্ষিত হয় যার মধ্যে ইভ টিজিংনামক যৌন সন্ত্রাস অন্যতমদীর্ঘদিন ধরে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করতে গিয়ে সম্প্রতি বন্ধুপ্রতীম কমরেড প্রীতম অংকুশ এবং তার সহযোগী কমরেড নিনাদকে সেখানকার ছাত্রলীগের কতিপয় বর্বর বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেঘটনাটি শুনেই রাগে, ক্ষোভে এবং ডিসেম্বর মাসের আগমনে আমাদের দেশপ্রেমদেখানোর নানাবিধ আত্মম্ভরিতায় বিরক্ত হয়েই লেখাটি লিখতে বসলাম

কুয়েটে ছাত্রলীগের বর্বরদের অবাধ যৌন সন্ত্রাস, নিশ্চুপ প্রশাসন, কিন্তু প্রতিবাদ থেমে থাকেনি

বন্ধুপ্রতীম কমরেড প্রীতম অংকুশের কাছ থেকেই প্রায় ১ মাস আগেই কুয়েটে ধারাবাহিকভাবে চলমান ইভ টিজিংএর ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছিলামএই ইভ টিজিং এর বিরুদ্ধে সেখানে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সম্প্রতি নৃশংস রক্তাক্ত ঘটনাটি ঘটে তার সূত্রপাত হয় যন্ত্র কৌশল বিভাগের দুই ছাত্রীকে খান জাহান আলি হলের সামনে উত্যক্ত করাকে কেন্দ্র করেএর আগেও এরকম ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে কিন্তু এর পরে যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের ফেসবুক গ্রুপেএই নিয়ে নিন্দা জ্ঞাপন করে পোস্ট দেয়কিন্তু তাদের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি যে তাদের সহপাঠীদের মধ্যেই এমন কয়েকজন আছে যাদের চরিত্র বিভীষনের ন্যায়তাই সেই কথা খান জাহান আলী হলের ইভ টিজিং এর প্রধান হোতাগুলজারের কানে পৌঁছায়, তারপরে ১০ অক্টোবর যন্ত্রকৌশল বিভাগের ছাত্র কমরেড প্রীতম অংকুশ, অভ্র, সোহাগকে খান জাহান আলী হলে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়তারপরে এর প্রতিবাদে ১২ অক্টোবর দুই শতাধিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মানববন্ধন করা হয় এবং ১৪ অক্টোবর যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০০৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এবং রোকেয়া হলের যৌন সন্ত্রাসের শিকার ছাত্রীরা সেই সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও প্রতিকার চেয়ে উপাচার্য বরাবর পৃথক স্মারকলিপি জমা দেনএরপরে ১৭ অক্টোবর রোকেয়া হলের ছাত্রীরা একজোট হয়ে প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করে যার নেতৃত্ব দেন রোকেয়া হলের ছাত্রী বর্নালী বিশ্বাস, সেই সময় শিক্ষার্থীদের কাছে তদন্ত কমিটি গঠন এবং কমিটির রিপোর্ট প্রদানের জন্য ৭ দিন সময় চাওয়া হয়অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা গেছে সেই সময় উপাচার্য যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনকে বিএনপি সমর্থক শিক্ষক ডঃ খন্দকার আফট্যাব হোসেনের ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেনপরবর্তীতে ২৪ অক্টোবরে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট না দেওয়ায় রোকেয়া হলের ছাত্রীরা হলের বাইরে এসে অবস্থান নিলে উপাচার্য আন্দোলনকারী ছাত্রীদের নেতৃত্ব দানকারী বর্নালী বিশ্বাসকে ডেকে নিয়ে নানা অজুহাতে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় চান৩০ তারিখেও রিপোর্ট প্রকাশিত না হলে ৬০ / ৭০ জন ছাত্রী উপাচার্যের বাসার সামনে অবস্থান নিলে উপাচার্য অচিরেই বিচার হবে এমন আশ্বাস দেন এবং তাদের হলে চলে যেতে বলেনবারবার এই কালক্ষেপনের কারণে ও ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার কারণে এই বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে যাবার কারণে ফেসবুকে এবং ব্লগে বেশ কিছু লেখালেখি হয় কুয়েটে এই যৌন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। আর এতেই উত্যক্তকারীদের রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকেএমতাবস্থায় ২৪ নভেম্বর কুয়েটের একটি বাস বরাদ্দ নেয় ছাত্রলীগতাদের বিরোধীদের শায়েস্তা করতেই শহর থেকে এই বাসে করে আনা হয় অস্ত্রশস্ত্র

গত ২৯ নভেম্বর দিবাগত রাত ১.৩০ এর দিকে কমরেড প্রীতম অংকুশ জানতে পারে যে তাকে আক্রমণ করা হতে পারেফলে সে সেই রাতে ফজলুল হক হলে কমরেড নিনাদ হাসানের কক্ষে আশ্রয় নেয়কিন্তু গুলজারের নেতৃত্বে ৪০/৫০ জন সন্ত্রাসীর একটা দল রাত ২.১৫ এর দিকে ফজলুল হক হলে টহল দিয়ে নিনাদের কক্ষ থেকে নিনাদ এবং প্রীতমকে নিচে ডেকে নিয়ে যায় কথা বলার জন্য এবং সেখান থেকে নির্মানাধীন বঙ্গবন্ধু হলের নিচে নিয়ে রড, কাঠ, বাঁশ দিয়ে মারতে আরম্ভ করেনিনাদের মাথায় লোহার রড দিয়ে প্রচন্ডভাবে আঘাত করা হয় এবং পীঠে অসংখ্যবার লোহার রড দিয়ে মারা হয়তারপর নিনাদকে রেখে তারা প্রীতমকে বেধড়কভাবে মারতে আরম্ভ করে, এর মধ্যে খবর পেয়ে যন্ত্র কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা লাঠি হাতে ছুটে আসলে সন্ত্রাসীরা ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যায়তখন প্রীতম অংকুশ ও নিনাদকে সংকটাপন্ন অবস্থায় সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় এবং খুলনা মেডিকেলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়এখানে উল্লেখ্য যে কমরেড প্রীতম অংকুশ প্রগতিশীল বাম ছাত্র সংগঠনের ( সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ) এর সদস্য এবং কমরেড নিনাদ হাসান সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহবায়ক হওয়া সত্ত্বেও এই ঘটনার পরে সরকারী দলের প্যারাসাইট উপাচার্য এই ঘটনাটিকে বিএনপির ষড়যন্ত্রহিসাবে আখ্যায়িত করেন!!

সন্ত্রাসী হামলার পর পরই তোলা প্রীতম অংকুশের ছবি

আমাদের সিফিলিসক্লিষ্টদেশপ্রেমে মুক্তিঅপাংতেয়,বিজয়কেবল ইউটোপিয়া

একদিকে যখন কমরেড প্রীতম অংকুশ, কমরেড নিনাদ এবং কুয়েটের অনুসরনযোগ্য শত শত সাহসী, প্রতিবাদী ছাত্রীরা যৌন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনে মুখর, একদিকে যখন নিজ কন্যার লৈঙ্গিক নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বরিশালে মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষক জিন্নাত আলীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তখন আরেকদিকে আমরা কি করি? পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফরে আসা, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে কে কে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ায়, কে পাকিস্তানের পতাকা গালে আঁকে (এসব নিয়ে কথাবার্তা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত এবং প্রয়োজনীয় কিন্তু উপরোক্ত বিষয়গুলোকে এড়িয়ে গিয়ে অবশ্যই নয়) তা নিয়ে গালাগাল করে, তাদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করার মধ্যেই আমাদের দেশপ্রেম উত্থিত হয়ে স্থলনে নিস্তেজ হয়ে যায়তার সাথে এবার নতুন যেই ছেনালী যুক্ত হয়েছে তা হল ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশী সবার ফেসবুক প্রোফাইলে বাংলাদেশের পতাকা প্রোফাইল ছবি করা, লালসবুজে এই একটা মাস ছেয়ে দেওয়া তাতে নাকি সারা বিশ্বের নিকট বাংলাদেশকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা যাবে!! এই ডিসেম্বর মাস এলেই আমাদের কম বেশী সবার মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে মনের মাঝে লালিত আবেগ, ভালোবাসা দেখা যায়কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হলো, এই আবেগ, ভালোবাসার বাস্তব ভিত্তিটি দুর্বল বিধাতেই এই মানবিক অনুভূতিগুলো নিয়ে নানাবিধ কর্পোরেট ছেনালী দেখা যায়, এসবকে পুঁজি করে কর্পোরেট কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফার পাহাড় আরো উঁচুতে নিয়ে যায়মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে আমাদের লালিত ভালোবাসাকে আমরা অন্ধভাবে মুনাফার অন্বেষনে সদা তৎপর কিছু ব্যবসায়ীদের হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দেই বিধাতেই আমাদের সকল আবেগ অনুভূতি পণ্য হিসাবেই বাজারে বিকোয়আমাদের এই সিফিলিসক্লিষ্ট দেশপ্রেমে, ক্যান্সারাক্রান্ত আবেগ অনুভূতিএর কারণেই যখন একদিকে আমরা মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আমাদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা প্রকাশ করি, তখন মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষককে দিনেদুপুরে ধারালো অস্ত্রের দ্বারা হত্যা করা হয়, আমাদের সবার অগোচরে ধারাবাহিকভাবে ইভটিজিং এর বিরুদ্ধে লড়তে থাকা সাহসী কমরেড অংকুশ, কমরেড নিনাদদের সংকটাপন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়, সেখানকার প্রতিবাদী শত শত ছাত্রীদের কথা স্মরন করারও সময় আমাদের হয়নাতাদের প্রত্যেকেরই আমাদের মত আবাল, ছেনাল, ছ্যাবলা আহাম্মকদের চেয়েও অনেক বেশী অধিকার রয়েছে সদ্য প্রয়াত ভারতের সিপিআই (মাওবাদী) দলের নেতা শহীদ কমরেড ‘কিষানজীএর মত করে বলার আমিই প্রকৃত দেশপ্রেমিক, তারা যদি এই কথা বলতেন তাহলে তা মোটেও অত্যুক্তি হতোনা, যেমনটা হয়নি উপরে উল্লিখিত মাওবাদী নেতার ক্ষেত্রেকুয়েটে ইভ টিজিং এর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সেখানকার শত শত ছাত্রী, কমরেড প্রীতম, কমরেড নিনাদের হয়ে এই অধমই স্পষ্ট লিখে দিচ্ছে তারাই প্রকৃত দেশপ্রেমিকআমার ধারণা যারা যারাই এই লেখাটি পড়বেন তারা কেউই আমার এই ঘোষণার সাথে দ্বিমত পোষকরবেন নাসবশেষে কমরেড প্রীতম অংকুশ, কমরেড নিনাদ এবং কুয়েটের আন্দোলনরত শত শত ছাত্রীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা মিশ্রিত একরাশ ভালোবাসা রইলো

(ইভ টিজিং এর বিরুদ্ধে লড়তে থাকা কমরেড প্রীতম অংকুশের উপরে এই বর্বরোচিত আক্রমণের ব্যাপারে জেনেও যারা কিছু বলেনা, যারা বাস্তবতার এই নির্মম, নির্মোহ দিকটি এড়িয়ে কর্পোরেট দেশপ্রেমেইমত্ত থাকে তাদের দেশপ্রেম ছ্যাবলা আহাম্মকি ছাড়া আর কিছু নয় কারণ তারা একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকএর বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিবাদে নিশ্চুপ থাকেএই সিফিলিসক্লিষ্ট দেশপ্রেম আমাদের মধ্যবিত্তীয় ভন্ডামির মুখোশই কেবল উন্মোচন করে, স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয় আমরা কতটা দেউলিয়া)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s