এবার সত্যিকারের ‘চিকা মারা’ হবে-রাষ্ট্রযন্ত্রের মস্তিস্কপ্রসূত সকল যন্ত্রণাদায়ক চিকা!

Posted: ডিসেম্বর 1, 2011 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

লিখেছেন: অনিত্য অনীক

[বেশ কিছুদিন আগে একটা খবরের দিকে মন আটকে গিয়েছিলো। রাজনীতি করার কারণেই দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রন আইন) ২০১১ প্রবর্তন এবং তার ফলাফলের কথা ভেবে আৎকে উঠেছিলাম তখন। সম্প্রতি পূণরায় এই খবর আলোচনায় এসেছে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে গত ২৮ নভেম্বর। আইনে রাখা হয়েছে কারাদন্ড এবং জরিমানার বিধান।]

http://www.samakal.com.bd/details.php?news=17&action=main&option=single&menu_type=&news_id=213060&pub_no=886&type=

একটু বাংলাদেশের ইতিহাসের গোড়ার দিকে যাওয়া যাক। সময়টা ৭০ সাল। একদল তরুণ ধরা পড়ল পাকিস্তান সেনাথাবার ঘোরটোপে। তরুণদের হাতে একটা করে জিগা গাছের আগা থেতলানো লাঠি। সেনাবাহিনী কর্তৃক এতো রাতে বেরুবার কারণ জিজ্ঞেস করলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদলের সোজাসাপ্টা উত্তরহলে চিকার উৎপাত খুব বেড়ে গেছে, তাই চিকা মারতে এসেছি। এহেন জবানবন্দীর পেছনের সত্য কিন্তু পুরোপুরি ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিকামী তরুণেরা সেদিন চিকা মারতে নামেনি। সেদিন তাদের হাতে শুধু লাঠি ছিলো না। ছিলো আলকাতরাও। তারা নেমেছিলো কমরেড মনি সিংহএর মুক্তির দাবিতে স্লোগান প্রচারের জন্য। স্বাপ্নিক তারুণ্যের সেই প্রতিনিধিদলের চোখে সেদিন ছিলো সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান উঠেছিলো

ভোটের বাক্সে লাথি মারো

সমাজতন্ত্র কায়েম করো।

কিংবা,

পাক-সেনা কর্তৃক পুড়িয়ে দেয়া বাঙালিদের লাশে পেছনে দেশাত্নবোধক দেয়াল লিখন।

পদ্মা, মেঘনা, যমুনা

তোমার আমার ঠিকানা

সেসময় থেকে দেয়াল লিখন পরিচিতি পায় চিকা মারা নামে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের দিকে এবার তাকানো যাক। সেই স্বাপ্নিক তরুণেরা আবার রাজপথে অন্ধকার রাতে। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন স্বপ্নের গোরখোদকের মৃত্যু রচনার জন্য তারা পূণর্বার হাতে তুলে নিয়েছিলো আলকাতরা ও জিগা গাছের আগা থেতলানো গাছের ডাল। রাজধানী সহ দেশের সমস্ত দেয়ালগুলো ভরে উঠেছিলো মুক্তির মুলমন্ত্রে। তখনো একে বলা হয় চিকা মারা

এবার একটু কাছাকাছি ইতিহাসকে দেখা যাক, বাংলাদেশ তখন সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের গাঢ় অন্ধকার সামরিক বেস্টনির মধ্যে প্রমাদ গুনছিলো। জন্মের মাত্র প্রথম দশকেই স্বাধীন বাংলাদেশে এ ছিলো এক দুর্বিষহ অধ্যায়। গাঢ় অন্ধকারেএক কালো অধ্যায়। দিকে দিকে রব উঠেছিলো স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক বাংলাদেশের সব গৃহস্থের প্রান্তিক দেয়ালগুলো আবারো হয়ে উঠেছিলো অধিকার আদায়ের স্লোগানমুখরিত দৃশ্যমান দলিল। মুক্তিকামী তরুণেরা সামরিক লালচোখ ফাঁকি দিয়ে কালো অন্ধকারের মধ্যেই রঙবুরুশজিগা লাঠি নিয়ে নেমে পড়েছিলো রাস্তায় চিকা মারার জন্য। এখন আমাদের সময় চলছে। এখন আমরা তারুণ্যের বালাম খাতায় নাম লিখিয়েছি। আমরা তাই জ্বলজ্যান্ত সাক্ষী।

আমাদের এ সময়টা বড়ো ভারাক্রান্ত। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা পদদলিত হচ্ছে প্রতিটি নির্বাচিত সরকারের সংসদ অধিবেশন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে। মুক্তিকামী জনগণকে এককটা ভোটপণ্য বানিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রের যৌথমূলধনী কারবার খুলে বসেছে বাংলাদেশের দুই বুর্জোয়া জোট। স্বৈরাচার এরশাদ আবারো বসে আছে মসনদের হাতলেগদিতে শেখ হাসিনা। বিএনপি কর্তৃক রাজাকারকে ক্ষমতার মধু পান করানোর প্রতিবাদে শেখ হাসিনার এ এক প্রতিবাদ হয়তো বা!! তাই এখন মুক্তিযুদ্ধের টেন্ডার ও শেয়ার বিক্রি হয় স্বৈরাচার ও রাজাকারের হাত দিয়ে। এখন তাই দেয়ালে লেখা হয়েছে স্বৈরাচাররাজাকার দুই নেত্রীর গলার হার একের পর এক চক্রান্ত হচ্ছেশিক্ষা ধ্বংসের চক্রান্ত থেকে জাতীয়প্রাকৃতিক সম্পদ পাচারের ষড়যন্ত্র। শিক্ষার অধিকার রক্ষার জন্য গত ২০১০ সালের জুলাই মাসে রাজপথে নেমে বজ্রমুঠি স্লোগান তুলতে হয়েছিলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্যকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ রঞ্জিত করতে হয়েছিলো দেহের রক্তে। লাল রক্তকে দাবি আদায়ের রঙে পরিণত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে সেদিন তারা লিখেছিলো এক টাকাও বর্ধিত ফি ছাত্রসমাজ দেবে না

চবি'তে বর্ধিত বেতন ফি বিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের রক্তে লেখা হচ্ছে দেয়াল।

তেলগ্যাসকয়লা রক্ষার দাবিতে দেশের প্রান্তিক দেয়ালগুলো হয়ে উঠেছে একেকটি দুঃসাহসী ফেস্টুন। সারাবাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফেস্টুনগুলো নিয়ে আমরণ মিছিলে নেমেছে গোটা বাংলাদেশ।

রক্ত দেবো জীবন দেবো

তেলগ্যাসকয়লা দেবো না বা

আমার দেশের তেলগ্যাস

আমার দেহের রক্ত

ফুলবাড়ীর কয়লা রক্ষার আন্দোলনে নিজেদের দেয়ালে নিজেরাই প্রাণের দাবি লিখে দিয়েছিলো সেদিন

এখনো এই দেয়াল লিখনের নাম চিকা মারা।এমনি করে প্রতিটি সময়ে অধিকার রক্ষায় দুঃসাহসিক প্রতিনিধি করেছে স্লোগানমুখর আমাদের দেয়ালগুলো। বাংলাদেশের তারুণ্য সমসময় তাদের অধিকার রক্ষার দলিল লিখে রেখেছে দেয়ালে দেয়ালে। বাংলাদেশের দেয়ালগুলো তাই ঐতিহাসিকভাবেই সরকারের চুক্তির খাতা নয়, দেয়ালগুলো আমাদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার উন্মুক্ত গণমাধ্যম।

দেয়াল লিখন এইভাবে যুগে যুগে দেশে দেশে আন্দোলনের দাবী আদায়ের শক্তিশালী মাধ্যম হয়েছে।.© Shahidul Alam

এই আমাদের চিকা মারার উপাখ্যান। এই চিকা মারাদেয়ালগুলো আমাদের প্রতিবাদের অঙ্কিত দলিলআমাদের প্রতিরোধের দৃশ্যমান সাক্ষী। এই চিকা মারাআমাদের পরিণত সংস্কৃতি। আমাদের গৌরববোধের সমস্ত অর্জনের সাথে মিশে গেছে এই চিকা মারা। এটি আমাদের আন্দোলনের ভাষাসময়ের প্রতিবিম্ব। আজ সেই ভাষারক্তের সাথে মিশে যাওয়া সংস্কৃতিইতিহাসের সাক্ষীদলিলকে নিয়েও চক্রান্তে মেতেছে শাসকগোষ্ঠী। ভিত কাঁপার ভয়ে তারা আন্দোলনের সকল ভাষাকে মুছে দিতে প্রস্তুত। বাহ্যিক সৌন্দর্য রক্ষার নাম করে তারা নিজেদের কপটতার, নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ইতিহাসকে দীর্ঘায়িত করতে চায়। দেয়ালে যেনো আর কোন চিকা না হয় যা তাদের ভিত নড়িয়ে দেবে

কেউ খাবেকেউ খাবে না তা হবে না, তা হবে না

সেদিন পরাধীন বাংলার শাব্দিক ও স্বাপ্নিক তারুণ্য উপমা দিয়েছিলো চিকা মারা। আজ বাংলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দৌঁড়ঝাঁপ করছে, উৎপাত করছে নির্বাচিতঅনির্বাচিত স্বৈরাচারী সরকারের পোষা দুর্গন্ধময় চিকার দল। গণতন্ত্রের সারা শরীরজুড়ে চিকাগুলোর অসংযত চিৎকার। এরকম আইন তাই গণতন্ত্রের মুখে চিকা ঢুকিয়ে দেয়ার নামান্তর। এরকম আইন সংস্কৃতিকে পদাঘাত করার সামিল। আজ তাই নতুন করে দেয়াল লিখন করে জানিয়ে দিতে হবে চিকা মারার শক্তি।

দেয়াল লিখন আমার দেয়াল ভাঙার ভাষা

দেয়াল লিখন নিষিদ্ধ করে গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ চলবে না, মানি না।

আজ তাই সত্যিকারের চিকা মারাহবে। সব দুর্গন্ধময় ঢাউস কদাকার সব চিকা!

[কৃতজ্ঞতাঃ রাজীব নন্দী (যিনি আমাকে ছবি জোগাড় করে দিয়ে সহযোগিতা করেছেন)]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s