দেয়াল লিখন :: দেয়ালেই লিখি দেয়াল ভাঙ্গার কবিতা যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়

Posted: নভেম্বর 30, 2011 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: ফেরারী সুদ্বীপ্ত

দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১১” বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। খবরটা শুনে অনেকেই উৎফুল্লিত হয়েছেন বিশেষ করে দেয়ালের মালিকরা, কারণ বাড়ির সীমানা প্রাচীরের গায়ে লাল বা কালো হরফে কোন নেতা নেত্রীর অন্ধ স্তবগান আর লিখিত হবে না। অমুক গ্রুপের তমুক গুণ্ডামাস্তানদের মুক্তি চেয়ে আর কেউ সৌন্দর্য বর্ধনকারী সফেদ দেয়াল কলুষিত করবে না। দেয়ালের রক্ষণাবেক্ষণকারী আনন্দে বগল বাজাবেন, কারণ শাস্তির ভয়ে আর কেউ রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি দেয়াল লিখবে না, কেউ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দেয়ালে নেতানেত্রীর স্তব শ্লোক রচনা করবে না। পরিচ্ছন্ন শহরের বিশাল অট্টালিকার সৌন্দর্যের দ্যুতি ম্লান করে দেওয়ার দুঃসাহস আর কারো রইল না। আর কষ্ট করে মালিককে আবার লিখতে হবে না “দেয়ালে পোস্টার আর চিকা মারা নিষেধ”। দারোয়ানরা দিব্যি আরামে ঘুমাতে পারবেন আর কতিপয় নিশাচর দেয়াল লিখনকারীর হাত থেকে দেয়ালটা এবার রাষ্ট্রের আইনই রক্ষা করবে। সর্বোপরি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়রা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন । কারণ দেয়াল লিখন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ছাত্রনেতাদের কাছে শো কজ নোটিশ পাঠাতে পাঠাতে তারা ক্লান্ত।

বলা হয় মানুষ দেয়াল বানায় তার আত্মরক্ষার জন্য। এটি তার আত্মগৌরবের নিদর্শন, মানুষের চিরায়ত ইপ্সিত ব্যাক্তিগত সম্পত্তির সীমারেখা নির্দেশকারী, পারস্পারিক অবিশ্বাস আর শত্রুতার প্রতীক, ভেদাভেদের নির্ণায়ক, হয়তো বা তার নিজের বলয়ে নিজে বন্দী হওয়ার এক উদ্ভট বাসনা। ব্যক্তি বাড়ির সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে আর রাষ্ট্র তৈরি করে সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে কাঁটাতারের বেড়া। এটি সফেদ দেয়াল নয়, এখানে লেখা যায় না, তবে কেউ অযাচিত ভাবে প্রবেশ করতে চাইলে রক্ত দিয়ে লিখতে হয় অক্ষরহীন ভাষাহীন অদৃশ্য নির্মম মৃত্যুগাথা।

তবুও একা মানুষ দেয়াল গড়ে আবার সম্মিলিত মানুষের প্রাণের জোয়ারে, মুক্তি আর মিলনের আকাঙ্খায় দেয়াল ভেঙ্গে যায়।

বাংলাদেশে রাজনীতি চর্চার বিশাল ক্যানভাস হয়ে দাঁড়িয়েছে এই দেয়াল গুলো। প্রগতিশীলপ্রতিক্রিয়াশীল নির্বিশেষে সবাই তাদের রাজনীতির ভাষা চিত্র আঁকতে চায় এই দেয়ালে। দেয়াল মালিক যতটা না অতিষ্ঠ, তার চেয়েও আমজনতা বিরক্ত হয় ভুল বানানে লেখা গুন্ডা মাস্তানদের বন্দনা, নেতা নেত্রীর ঈদ শুভেচ্ছা আর বদমায়েশদের নিঃশর্ত মুক্তির মদোন্মত্ত আস্ফালনের নগ্নরূপ দেখে। কিন্তু এটাই কি সব?

তাহলে দেয়াল লিখন কি এই অপরাজনীতির চর্চ্চাটাকে বেগবান করেছে, নাকি এটাই ধারণ করে আছে একটা রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পেছনে জাতির সংগ্রামী আলেখ্য? এবার একটু উলটো পিঠে চোখটা ফেরাই।যদি বলি এই দেয়াল লিখনের প্রত্যেকটা শব্দ ধারণ করে আছে শোষণের দেয়াল ভাঙ্গার শাণিত উচ্চারণ। দেয়াল ভাঙ্গব বলেই আমরা দেয়াল লিখি। দেয়াল লিখনের এই নির্বাক ভাষাগুলো ধারণ করতে পারে, অথবা ধারণ করে আছে গণজাগরণের কোলাহল। একেকটি শব্দ কাঁপন ধরাতে পারে শাসকের বুকে তাহলে কি খুব বাড়িয়ে বলা হবে?

না। ইতিহাস নিজেই তার খেরোখাতা উলটে দেখাবে বায়ান্ন সাল, বাষট্টি সাল, ঊনসত্তর সাল, একাত্তর সাল এবং সর্বশেষ নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান। তবে কেন এই নিয়ন্ত্রণ আইন? খুব সোজা না হলেও এর উদ্দেশ্য বুঝতে খুব একটা কষ্ট হওয়ার কথাও নয়। ধরা যাক ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো বুক পেতে অসংখ্য শ্লোগানকে বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে লেখা থাকে “সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার লুটেরা গোষ্ঠির হাত থেকে জনগণকে রক্ষা কর”, “আমার দেশের তেল গ্যাস আমার দেশে রাখব”, “রক্ত দেব জীবন দেব তেল গ্যাস দেব না”, “শিক্ষা কোন সুযোগ নয়, শিক্ষা আমার অধিকার, এই অধিকার সবার চাই” , “অগ্নি চেতনায় শাণ দাও”, “তোমার স্বদেশ লুট হয়ে যায় প্রতিদিন, বিরুদ্ধতার চাবুক ওঠাও হাতে”, “পুজিবাঁদের উপহার বেকারত্ব অনাহার”

মুক্তির ধ্বনি শোনা যায় যে লেখনিতে

এই শ্লোগান দেখলে অনেক রাজনীতি বিমুখ যুবসমাজ মনে করে এই বামাচারীদের দেয়াল নষ্ট করা ছাড়া কোন কাজ নেই! কিন্তু এরা বোঝে না, ওই নিশাচরদের দল নষ্ট সমাজের ঘুণে ধরা দেয়াল ভাঙ্গার জন্য লাল কিংবা কালো হরফে লিখছে গভীর রাজনৈতিক চেতনাবোধ উৎসারিত প্রাণের আহবান। এসো, বিদ্রোহের পদতলে পিষ্ট করি ক্ষমতা ও কতৃত্বের এই শ্রেণীবিন্যাস। শিক্ষা বাঁচাও, দেশ বাঁচাও , দেশের সম্পদ বাঁচাও। তবে শোষণের দেয়ালে পিষ্ট মানুষটা বোঝে

এখনো তাহলে হারায়নি প্রতিবাদ/ এখনো তাহলে বেঁচে আছে প্রতিরোধ……

অনেকেই হয়তো বোঝে না, কারণ সবাই সৌন্দর্যের পূজারী, কিন্তু আমরা তা নই। আরোপিত সৌন্দর্যের অন্তরালে পচে যাওয়া সমাজের কদর্য রূপ দেখাতে চাই বলে ঢা.বি, জা.বি কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল আর নগরের বিত্তবানদের অট্টালিকার প্রাচীর শুভ্র থাকতে দিই না। আমাদের ছিড়ে ফেলতে হয় এই মিথ্যা সৌন্দর্যের আবরণ, ছুড়ে ফেলতে হয় নন্দনতত্বের এই প্রচলিত ধারণা।

তবে এটা খুবই পরিষ্কার, শাসকশ্রেণী বিরাজনীতিকরণের পথে খুব একনিষ্ঠতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। দ্বিদলীয় বৃত্তে মানুষকে অতিষ্ঠ করে ছাত্ররাজনীতির নামে গুন্ডা বদ্মায়েশদের দিয়ে যূবসমাজের সামনে উপস্থাপন করছে রাজনীতির এক ভয়াল কালো রূপ। করে ফেলছে রাজনীতি বিমুখ, গড়ে তুলছে রাজনীতি ঘৃণার এক অন্ধকার জগৎ। নিজেদের সীমাহীন লুটপাটকে নির্বিঘ্ন করতে অপরাজেয় ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক সচেতনতার মান ধ্বসিয়ে দিচ্ছে, বানাচ্ছে স্বার্থপর, ক্যারিয়ারিস্ট। আবার মাঝে মাঝে সুশীলদের দিয়ে হাউ কাউ করায়ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দিতে হবে, এটা পচে গেছে। বড়ই চমৎকার! মাথা ব্যাথা হয়েছে তো মাথা কেটে ফেলে দাও!!

আওয়ামী সরকারের মন্ত্রীসভার সম্মানিত সভ্যগণ হঠাৎ এত সৌন্দর্যপিয়াসী হলেন কেন? রাস্তায় প্রকাণ্ড বাণিজ্যিক বিলবোর্ড স্থাপন করে কর্পোরেটদের পুজা করলেই দেশের সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। কারণ এখানে আছে চাকচিক্য, জৌলুস, মিথ্যা প্রতারণার ধুম্রজাল আর দেয়ালে অসভ্যরা রাতের আঁধারে লিখে যায়– “ভাত নাই, বিদ্যুত নাই, পানি নাই”। এগুলো তাদের ভাবমুর্তির জন্য ক্ষতিকর।দেশটাকে ভিখারী প্রতিপন্ন করার চক্রান্ত তাদের রুখতে হবে। ত্রাস সঞ্চারকারী বক্তব্য দেয়ালে লিখে জনগণকে বিভক্ত করার এখতিয়ার কারো নেই। এখানে কেউ অসুখী নেই, থাকতে পারে না। কারণ এটা যে হীরক রাজার দেশ!!

তবুও আমরা বলি দেয়াল ভাঙ্গব বলেই দেয়াল লিখি। লিখে যাব কখনো কালি দিয়ে, প্রয়োজন হলে রক্ত দিয়ে। আর নিয়ন্ত্রণ আইন?? শিকল তো অনেকবার পরানোর চেষ্টা করা হয়েছে, এবার আমরাও জানিয়ে দিলামএই শিকল পড়েই, শিকল তোদের করবে রে বিকল…..

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s