অনুবাদ: শাহেরীন আরাফাত

প্রাককথন

কমরেড কিষানজী

সন্দেহাতীতভাবে ভারত সরকারের মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তিদের তালিকায় তার অবস্থান দুই নম্বরে (এই তালিকার ১ নম্বর নাম কমরেড গণপতি), তিনি সিপিআই (মাওবাদী)’এর পলিট ব্যুরোর সদস্য ও সামরিক শাখার প্রধান কমরেড মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও, ওরফে ‘প্রহলাদ, ওরফে বিমল, ওরফে রামজী, ওরফে ‘কিষানজী’ ()। তাঁর বেড়ে উঠা অন্ধ্রপ্রদেশে গান্ধী ও রবি ঠাকুরের বই পড়ে। কিন্তু বিশ্বের মুক্তির ইতিহাস অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার পর এক পর্যায়ে তিনি বিপ্লবাকাঙ্খায় অরণ্যে আত্মগোপন করেন। তাঁর জন্ম ১৯৫ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের করিমনগর জেলার পেদপল্লী গ্রামে (উঃ তেলেঙ্গনা)। ১৯৮০ সালে কান্দাপালি সিথামাইয়াহ নামের এক স্কুল শিক্ষকের নেতৃত্বে “পিপলস্ ওয়ার গ্রুপ” (পিডব্লিউজি) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অন্যতম সহযোগী ছিলেন কিষানজী। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ‘পিডব্লিউজি’ এবং ‘মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার অব ইন্ডিয়া’ একীভুত হয়ে গঠিত হয় ‘সিপিআই (মাওবাদী)’। ১৯৮২ সালে সার্চ অপারেশন চলার সময়ে পুলিশ তাঁর পেদপল্লী গ্রামের বাড়ীটি ভেঙ্গে দেয়। তিনি আত্মগোপনে চলে যান, এরপরে আর মায়ের সাথে দেখা করতে আসেননি; তবে তেলেগু পত্রিকার মাধ্যমে তিনি তাঁর মা’কে লিখতেন। কিষানজী’র স্ত্রী সুজাতাও মাওবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত। তিনি দান্তেওয়াড়া এলাকার মাওবাদী কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান করেন। মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়’এর নক্সাল এলাকায় ২০ বছর জড়িত থাকার পর তাকে পুনরায় পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব দেওয়া হয়। লালগড় পুলিশ ক্যাম্প থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে কিষানজী’র একটি গুপ্ত আশ্রয়স্থল থাকা সত্ত্বেও তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী (র’, সিআরপিএফ, বিএসএফ, পুলিশ, সেনাবাহিনী) তাঁকে খুঁজে না পাওয়ার মূলে ছিল জনগণের সাথে তাঁর একাত্মতা। তিনি প্রতিদিন ১৫টি সংবাদপত্র পড়তেন, সেই সাথে তার পার্টির প্রকাশনাগুলোর সাথে যুক্ত থাকতেন। তিনি ছিলের সিপিআই (মাওবাদী) পার্টির সামরিক শাখার প্রধান। মুখের ছবি তুলতে না দিলেও তিনি সাংবাদিকদের সাথে মন খুলেই কথা বলতেন। ৩৭ বছর যাবৎ একই মতাদর্শে অটুট থেকে নিপীড়িতদের মুক্তির সংগ্রামে আমৃত্যু লড়ে যান এই বিপ্লবী।

২৪ নভেম্বর ২০১১ ছিল এক শোকের দিন, সেদিন ‘ভুয়া সংঘর্ষ’ (ফেক এনকাউন্টার) দেখিয়ে পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক সিআরপিএফ দ্বারা হত্যা করা হয় কমরেড কিষানজী’কে। বেশ কিছুদিন ধরেই সরকারের শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়া চলছিল মাওবাদীদের সাথে। ২৩ তারিখে কিষানজী এমনই এক গোপন সভায় হাজির হলে তাকে ধোঁকা দিয়ে আটক করা হয় এবং অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করার পর ২৪ নভেম্বর ২০১১ তারিখ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বুড়িশোল জঙ্গলে এক ভুয়া এনকাউন্টারের নাটক সাজানো হয়।

ধিক্কার জানাই ভারত রাষ্ট্রকে বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের জন্য

শহীদ কমরেড কিষানজী’র প্রতি রইলো আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। কিষানজী শুধু কোন একক ব্যক্তি নন; তিনি এমনই এক সত্তা, যা বিদ্যমান সকল মুক্তিকামী মানুষের মাঝে। তাই কিষানজী’দের মৃত্যু নাই, তারা চিরঞ্জীব। তিনি বেঁচে থাকবেন, গণমানুষের মুক্তির নেশায়, লড়াইসংগ্রামে।

লাল সালাম, কমরেড…..

——————————————–

(২০০৯ সালের নভেম্বরে “তেহেলকা ডট কম”এ প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে কমরেড মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও ওরফে ‘কিষানজী’ কথা বলেন সশস্ত্র সংগ্রাম, শান্তি আলোচনা, দলের অর্থায়নের উৎস, ভারতের প্রথাগত গণতন্ত্র ও জনগণতন্ত্রের পার্থক্য এবং সিপিআই (মাওবাদী)’এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন তুষা মিত্তাল।)

মধ্যরাত্রিতে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারটির উদ্ধৃতাংশ:

প্রশ্ন: আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। আপনি কিভাবে সিপিআই (মাওবাদী) দলে যোগ দিলেন?

সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন কমরেড কিষানজী

কমরেড কিষানজী: আমি অন্ধ্র প্রদেশের করিমনগরে জন্মগ্রহণ করি। ১৯৭৩ সালে গণিতে স্নাতক ডিগ্রীর পর আমাকে আইনের মাধ্যমে অভিযুক্ত দেখিয়ে হায়দ্রাবাদে সরিয়ে দেওয়া হয়। আমার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ‘তেলেঙ্গানা সংঘর্ষ সমিতি’ (Telangana Sangarsh Samiti)’এর সাথে আমার সংযুক্তি থেকে; এখানে উল্লেখ্য যে, ‘তেলেঙ্গানা সংঘর্ষ সমিতি’ পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্যের দাবী জানাচ্ছিল সেসময়ে। ১৯৭৫ সালের জরুরী অবস্থার মধ্যেই আমি অন্ধ্র প্রদেশে ‘রেডিক্যাল স্টুডেন্টস মুভমেন্ট’ (Radical Students Union (RSU))’এর কাজ শুরু করি। এরপরে আমি বিপ্লবের উদ্দেশ্যে আত্মগোপনে চলে যায়। সেসময়ে বেশ কিছু বিষয়ে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম; এর মাঝে কিছু বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ, যেমন: লেখক ভারাভারা রাও (যিনি বিপ্লবী লেখক সংঘ, Revolutionary Writers Association’এর প্রতিষ্ঠাতা), তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক আবহ এবং একটি প্রগতিশীল পরিবেশ, যে পরিবেশে আমার বেড়ে উঠা।

আমার বাবা ছিলেন একজন গণতন্ত্রী এবং মহান মুক্তিযোদ্ধা [*তিনি ১৯৪০ এর দশকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন]। তিনি রাজ্য কংগ্রেস পার্টির সহসভাপতিও ছিলেন। আমরা বর্ণে ব্রাহ্মণ হলেও আমাদের পরিবার বর্ণ বিশ্বাস করতো না। যখন আমি সিপিআই (মার্কসবাদীলেনিনবাদী) দলে যোগদান করি, আমার বাবা কংগ্রেস পরিত্যাগ করেন। তখন তিনি একথা বলেন যে, ‘এক ছাদের নিচে দুই ধারার রাজনীতি বেঁচে থাকতে পারে না।’ তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রামে নয়। ১৯৭৭ সালে জরুরী অবস্থা শেষ হবার পর আমি সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কৃষকদের একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেই। ৬০ হাজারেরও বেশী কৃষক এই আন্দোলনে যোগ দেন, এই কৃষক আন্দোলন পরবর্তীতে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রশ্ন: গৃহমন্ত্রী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী) সিপিআই (মাওবাদী)’এর সাথে বন অধিকার, জমি অধিগ্রহণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল SEZs(Special Economic Zones)’এর মতো বিষয়গুলোতে কথা বলতে আগ্রহী। আপনারা তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন কেন? তিনি শুধুমাত্র আপনাদের সহিংসতা স্থগিত রাখার কথাই বলেছেন।

কমরেড কিষানজী:সরকার তার বাহিনী প্রত্যাহার করলে আমরা আলাপের জন্য প্রস্তুত। সহিংসতা আমাদের কর্মসূচীর অংশ নয়। আমাদের এই সহিংসতা কেবলই আত্মরক্ষার জন্য। সরকারী বাহিনী আমাদের লোকদের প্রতিদিন আক্রমণ করছে। বাস্তারে গত মাসে কোবরা বাহিনী ১৮জন নিরপরাধ আদিবাসী এবং ১২জন মাওবাদীকে হত্যা করেছে। ছত্তিশগড়ে উন্নয়ন খাতে যারা আমাদের সহায়তা করতো, তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এগুলো বন্ধ করুন; সহিংসতাও বন্ধ হয়ে যাবে। সম্প্রতি, ছত্তিশগড়ে পুলিশের ডিজিপি একটা সন্ত্রাসী সংগঠন ‘সালওয়া জুডুম’এর ৬,০০০ বিশেষ পুলিশ সদস্যদের নিজেদের গৌরব বলে তকমা লাগিয়েছেন। অথচ, তারা বছর বছর ধরে আদিবাসীদের ধর্ষণ, হত্যা, লুটের সাথে জড়িত। ‘সালওয়া জুডুম’এর অত্যাচারে গ্রামের পর গ্রাম বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। সরকার নিজের মনগড়া কথা বলে যেতে পারে, তবে আমরা তা বিশ্বাস করিনা। তারা কিভাবে এই কর্মপন্থার পরিবর্তন ঘটাবে, যখন তাদের অধিকারে কিছুই নাই? সবই তো যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বব্যাংকের এখতিয়ারে!

প্রশ্ন: কোন পরিস্থিতিতে আপনারা সহিংসতা কমাবেন?

কমরেড কিষানজী: প্রধানমন্ত্রীকে আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং সেই সাথে এই সব অঞ্চলে মোতায়েন করা সৈন্যদের প্রত্যাহার করতে হবে। এই সেনাবাহিনী নতুন কিছু না, আমরা গত ২০বছর যাবৎ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছি। সকল বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। সেনা প্রত্যাহারের জন্য যা সময় লাগে নিন, কিন্তু এসেময়ে যেন আমাদের উপর পুলিশী হামলা না হয়, তা নিশ্চিত করুন। যদি সরকার তাতে রাজী থাকে, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে কোন সহিংসতা হবে না। আমরা পূর্বের ন্যায় গ্রামাঞ্চলে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।

প্রশ্ন: এতে সম্মত হওয়ার পূর্বে আপনারা কি রাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করতে পারেন যে, এক মাসের জন্য আপনারা আক্রমণ করবেন না?

কমরেড কিষানজী: আমরা এবিষয়টা নিয়ে চিন্তা করবো। এবিষয়ে আমাকে দলের সাধারণ সম্পাদকের সাথে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু এমন কী নিশ্চয়তা আছে যে, তাদের তরফ থেকে এই এক মাসে কোন সহিংসতা হবে না? তাই সরকারের তরফেই এই ঘোষণা আসতে হবে এবং প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এটা জনগণের জন্য শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনী হবে না। অন্ধ্র প্রদেশের দিকে তাকান। তারা আলোচনা শুরু করলো, আবার সেই আলোচনা ভেঙ্গেও দিল। আমাদের একজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অন্ধ্রের রাজ্য সচিবের সাথে দেখা করতে গেলেন; পরবর্তীতে, সরকারের সাথে আলাপ করার দুঃসাহসের অভিযোগে (!) পুলিশ উনাকে গুলি করে হত্যা করে।

প্রশ্ন: যদি সত্যিই আপনারা গণমানুষের কর্মসূচী নিয়ে কাজ করেন, তাহলে সাথে অস্ত্র রাখার প্রয়োজনীয়তা কী? আপনার লক্ষ্য কি ‘আদিবাসী কল্যাণ’, নাকি ‘রাজনৈতিক শক্তি’?

কমরেড কিষানজী: রাজনৈতিক শক্তি। আদিবাসী কল্যাণকে আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া আমরা কিছুই অর্জন করতে পারব না। একটি সেনাবাহিনী এবং অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া কেউ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবে না। আদিবাসীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকার ফলেই তারা শোষিত এবং এই শোষণ তাদেরকে সবচেয়ে অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়াদের চরমে পৌঁছে দিয়েছে। নিজের সম্পদের উপরেও তাদের কোন অধিকার নেই। তাসত্ত্বেও, আমাদের মতাদর্শ অস্ত্রের উপর স্থিত না। আমরা অস্ত্রকে দ্বিতীয় অবস্থানে স্থান দেই। অন্ধ্রে আমরা একারণেই এক বড় ক্ষতির সম্মুখীন হই।

প্রশ্ন: সরকার বলছে আগে সহিংসতা থামান, আপনারা বলছেন আগে সেনা প্রত্যাহার করুন। এই বুদ্ধিবৃত্তিশূণ্য চক্রে আদিবাসী সমাজ, আপনারা যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন বলে দাবি করেন, তারা সর্বাধিক কষ্টকর অবস্থার সম্মুখিন হচ্ছে।

কমরেড কিষানজী: আচ্ছা, তাহলে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের আনা হোক। অন্ধ্র প্রদেশ হোক, পশ্চিমবঙ্গ বা মহারাষ্ট্র, আমরা কখনোই সহিংসতা শুরু করিনি। প্রথম আক্রমণ সবসময় সরকার পক্ষ থেকেই আসে। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম [ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি (মার্কসবাদী)]’এর সন্ত্রাসীরা তাদের দলের সাথে যুক্ত নয় এমন কাউকেই গ্রামে প্রবেশ করতে দেয় না (*তৎকালীন সময়ে সিপিএম ছিল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল)। পুলিশ ১৯৯৮ সাল থেকে লালগড় এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে আছে। এমতাবস্থায়, আলুর মূল্যবৃদ্ধি অথবা বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য কিভাবে আমরা চাপ দিতে পারি? এজন্য এমন কোন মঞ্চ আমাদের নাই। যখন পশ্চিমবঙ্গে সর্বনিম্ন মজুরি দেওয়ার কথা প্রতিদিন ৮৫ টাকা, অথচ মানুষকে দেওয়া হচ্ছে ২২ টাকা করে; আমরা দাবী জানালাম ২৫ টাকা করার। মহাভারতের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল যখন পাণ্ডবদের দাবী অনুযায়ী কৌরভরা পাঁচটি গ্রাম তাদের দিতে অস্বীকার করে, তখন। রাষ্ট্রও আমাদের ৩ টাকা মজুরী বৃদ্ধিকে অগ্রাহ্য করলো। এখানে আমরা পাণ্ড, আর তারা কৌরভ।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন সহিংসতা আপনাদের কর্মসূচী নয়, কিন্তু আপনারা গত চার বছরে প্রায় ৯০০ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছেন, যাদের বেশিরভাগই এসেছে গরীব আদিবাসী পরিবার থেকে। এমনকি যদি সেটি অপরপক্ষের সহিংসতার কাউন্টারও হয়ে থাকে, এর মধ্য দিয়ে গণমানুষের পক্ষের এই লক্ষ্যে কিভাবে এগুনো সম্ভব?

কমরেড কিষানজী: আমাদের যুদ্ধ পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে নয়, এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। আমরা পুলিশের সাথে হতাহতের সংখ্যা কমাতে চাই। বাংলায়, অনেক পুলিশ পরিবার আসলে আমাদের সাথে সহমর্মী। সেখানে গত ২৮ বছরে ক্ষমতাসীন সিপিএম প্রায় ৫১ হাজার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হ্যাঁ, আমরা গত সাত মাসে ৫২ জন সিপিএম সদস্যকে হত্যা করেছি। আর তা কিন্তু সিপিএম ও পুলিশের পশুর ন্যায় বর্বর আচরণের ফলেই করতে হয়েছে।

প্রশ্ন: সিপিআই (মাওবাদী) কিভাবে গঠিত হলো? আপনাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির কী কী অভিযোগ রয়েছে?

কমরেড কিষানজী: সেখানে কোন চাঁদাবাজী হয়নি। আমরা কর্পোরেট এবং বড় বুর্জোয়াদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করেছি, এটি কর্পোরেট সেক্টর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে তহবিল সংগ্রহে অর্থায়ন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। আমাদের একটি ষাণ্মাসিক নিরীক্ষা হয়। একটা পয়সাও নষ্ট হয় না। গ্রামবাসীরাও স্বেচ্ছায় প্রতি বছর তাদের দুই দিনের আয় পার্টি তহবিলে অনুদান হিসেবে দিয়ে থাকেন। গাদচিরলি’তে দুই দিনের বাঁশ কাটা থেকে আমরা ২৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করি। বাস্তারে টেন্ডু পাতা সংগ্রহ থেকে আমরা প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করি। এছাড়াও, কৃষকেরা ১০০০ কুইন্টাল ধান অনুদান হিসেবে দিয়ে থাকে।

প্রশ্ন: যদি কৃষক এই অনুদান দিতে রাজি না হয়?

কমরেড কিষানজী: এমনটা কখনোই হবে না।

প্রশ্ন: এর কারণ কি ভয়?

কমরেড কিষানজী: কখনোই না। তারা আমাদের সঙ্গেই আছেন। আমরা যে উন্নয়ন কর্মকান্ডের উদ্যোগ নিয়েছি, তার জন্য একটা পয়সাও গ্রামবাসীদের কাছ থেকে দাবী করিনি।

প্রশ্ন: মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় আপনারা কী কী উন্নয়ন করেছেন? ছত্তিসগড় এবং ঝাড়খন্ডের আদিবাসীদের জীবনধারা কিভাবে উন্নত হয়েছে?

কমরেড কিষানজী: আমরা মানুষকে রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি, তাদেরকে ধনীদের জীবনযাত্রা ও তারা (আদিবাসীরা) কী কী সুবিধা থেকে বঞ্চিত, সে সম্পর্কে অবগত করেছি। এসব এলাকায় ১টাকায় ১০০০ টেন্ডু পাতা বিক্রি হতো। আমরা মহারাষ্ট্রের ৩টি জেলা, অন্ধ্র প্রদেশের ৫টি জেলা এবং সমগ্র বাস্তার এলাকায় এই দাম বাড়িয়ে প্রতি টেন্ডু পাতার দাম ৫০ পয়সা করেছি। প্রতি বান্ডেল বাঁশ ৫০ পয়সায় বিক্রি হতো। এখন যার দাম ৫৫ টাকা। আমদের এই অর্জন এসেছে রাষ্ট্রের নির্মম প্রতিরোধ ও নিষ্ঠুর চেহারাটার সাক্ষাৎ পাওয়ার মধ্য দিয়ে। শুধুমাত্র গাদচিরলি’তেই তারা আমাদের ৬০ জনকে হত্যা করে, আর আমরা মারি ৫ জনকে।

এছাড়াও সিপিআই (মাওবাদী) পার্টি প্রায় প্রতিদিনই ১২০০টি গ্রামে স্বাস্থ্য সহায়তা দিয়ে থাকে। বাস্তারে আমাদের বেশকিছু সৈনিক রয়েছেন, যারা দক্ষ ডাক্তার, তারা এপ্রোন পরেন এবং জঙ্গলে ধাত্রীর কাজ করে থাকেন। শুধুমাত্র বাস্তারেই আমাদের এমন ৫০টি ভ্রাম্যমান স্বাস্থ্য দল এবং ১০০টি ভ্রাম্যমান হাসপাতাল আছে। গ্রামবাসীরা নির্দিষ্ট অসুস্থতার জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের যান; যেমন: জ্বরের জন্য যাবে ইসা’র কাছে, আবার ডাইরিয়ার জন্য যাবে রামু’র কাছে, ইত্যাদি। এই অঞ্চলে মানুষ এতো বেশী অসুস্থ হয় যে কখনো কখনো লাশ উঠানোর মানুষেরও স্বল্পতা দেখা দেয়। আমরা মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ডাক্তারদের কাছে ঔষধ সরবরাহ করে থাকি। সরকার জানে না যে, এই ঔষধ কিন্তু সরকারী হাসপাতাল থেকেই আসে।

প্রশ্ন: রাষ্ট্র যদি নক্সাল অধ্যুষিত এলাকায় সিভিল প্রশাসন পাঠায়, আপনারা কি তার অনুমতি দিবেন?

কমরেড কিষানজী: আমরা স্বাগত জানাব। আমরা চাই শিক্ষক ও ডাক্তারেরা এখানে আসুক। লালগড়ের জনগণ যুগযুগ ধরে সেখানে একটি হাসপাতালের দাবী জানাচ্ছে। কিন্তু সরকার কিছুই করেনি। যখন জনগণ নিজেদের চেষ্টায় একটা হাসপাতাল গড়ে তুললো, সরকার এটিকে সেনাছাউনিতে রূপান্তর করলো।

প্রশ্ন: আপনাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কি? তিনটি সুস্পষ্ট লক্ষ্যের কথা বলুন।

কমরেড কিষানজী: গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং তারপর সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, আমাদের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করার জন্য সাম্রাজ্যবাদের ঋণের কোন প্রয়োজন নাই। যুগযুগ ধরে আমরা বিদেশী ঋণের টাকা শোধ করে আসছি, আর যেহেতু এখানে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ক্রমবর্দ্ধমান তাই অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এটা কখনোই পরিশোধিত হবে না। আর এটাই চায় বিশ্বব্যাংক। আমাদের এমন এক অর্থনীতি প্রয়োজন, যা দুইটি বিষয়ের উপর কাজ করবেকৃষি এবং শিল্প। প্রথমত, আদিবাসীরা জমি চায়। জমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র তাদের শোষণ করেই যাবে। শ্রমের ভিত্তিতে শতকরা হারে জনগণকে শস্য বরাদ্দ দিতে হবে। আমরা শিল্পের বিরোধী নই; শিল্প ছাড়া উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব? কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিল্পটি ভারতের জন্য সহায়ক, নাকি আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংকের সহায়ক। বড় বাঁধ, বড় শিল্পের বদলে আমরা ছোট শিল্প, বিশেষত যা কৃষির উপর নির্ভরশীল, এমন শিল্পকে উন্নীত করার পক্ষপাতী। তৃতীয় লক্ষ্য হলো, টাটা থেকে আম্বানী পর্যন্ত সকল বড় কোম্পানিকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করা, সকল স্মারক চুক্তি (MOU) বাতিল করা, তাদের সকল সম্পদকে জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা ও এর মালিকদের জেলে প্রেরণ করা। অবশ্যই, নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকবেন।

প্রশ্ন: কিন্তু বিশ্বে কমিউনিস্ট সরকারগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তারা যে ব্যবস্থাকে উৎখাত করেছিল শোষণের অভিযোগে, ক্ষমতায় এসে তারা নিজেরাও সেরকমই হয়ে যায়। মাওবাদী শাসন ব্যবস্থারই এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব যেখানে বল প্রয়োগ হয়েছে এবং মত পার্থক্য সহ্য করা হয়নি। কিভাবে তা মানুষের স্বার্থে হতে পারে?

গণমানুষের নেতা কমরেড কিষানজী

কমরেড কিষানজী: এই সব পুঁজিবাদীদের দ্বারা ছড়ানো গল্প। গ্রামের মানুষেরা বিনা চিকিৎসায় মরছে, অথচ ডাক্তারেরা সব শহরে থাকতে চায়। আমাদের সব প্রকৌশলীরা জাপানের মতো উন্নত দেশে, অথবা আইটি নিয়ে কাজে আগ্রহী। তারা জনগণের সম্পদ ব্যবহার করেই নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছেছেন। তারা আমাদের দেশের জন্য কী করেছেন? রাষ্ট্র আপনাকে ডাক্তার হওয়ার জন্য জোর দিতে পারে না। কিন্তু যদি আপনি তা হয়ে যান, তাহলে আপনাকে জোর দেওয়া উচিৎ (রাষ্ট্র কর্তৃক) নিজের দক্ষতা অনুযায়ী দুই বছর গ্রামে সেবা দেওয়ার জন্য। রাষ্ট্র কতটা শোষক, তা নির্ভর করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় কারা আসীন তার উপর।

আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চাই। যদি সেখানে কোন গণতন্ত্র না থাকে, তাহলে গ্রামবাসীদের বলুন আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য আরেকটি বিপ্লবের সূচনা করতে। একটি প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, ইতিমধ্যে বাস্তারে আমাদের একটি বিকল্প জনগণতান্ত্রিক সরকার আছে। নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচিত করি, যা বিপ্লবী জনগণের কমিটি নামে পরিচিত। জনগণ হাত উঁচিয়ে ভোট দেন। সেখানে একজন চেয়ারম্যান, একজন ভাইস চেয়ারম্যান, এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কল্যাণ, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা, জনসংযোগ ইত্যাদি বিভাগ রয়েছে। এই ব্যবস্থা বর্তমানে ভারতের প্রায় ৪০টি জেলায় বিদ্যমান। ‘মাওবাদীরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না’ বলে যে একটা ধারণা আছে, তা সম্পূর্ণরূপে ভুল।

বর্তমানে ভারতে যা বর্তমান, তা হলো আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র। এটি প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। তা মমতা হোক, সিপিএম হোক, আর কংগ্রেস পার্টি, সবগুলোই স্বৈরতান্ত্রিক। আমরা তাদের আসল চেহারাটা সবার সামনে উন্মোচনের জন্যই পশ্চিমবঙ্গে ১৪ জন আদিবাসী নারীকে মুক্তির জন্য আলোচনা করেছি; বিশ্ববাসী দেখুক, তাদের এই জেলে কাদের আটকে রাখা হয়।

প্রশ্ন: আপনি যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাহলে ইতিমধ্যে বিদ্যমান গণতন্ত্রকে পরিহার করছেন কেন? নেপালে তো মাওবাদীরা নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে।

কমরেড কিষানজী: নতুন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য পুরোনোটিকে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে। নেপালে মাওবাদীরা সমঝোতা করেছে (*এরই ফল স্বরূপ বর্তমানে নেপালে মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বে আসীন দুই দালাল, প্রচণ্ড আর ভট্টরাই)। ১৮০ জন এমপি (সংসদ সদস্য) গুরুতর অপরাধের আসামী, ৩ শতাধিক এমপি কোটিপতি। এর নামই কি নির্বাচন? আপনি কি জানেন, মার্কিন সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই উত্তর প্রদেশে একটি ঘাঁটিতে অনুশীলন শুরু করেছে? তারা স্বদম্ভে বলছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে তারা তাদের ইচ্ছানুযায়ী যেকোন স্থানে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। এই স্পর্ধা কে অনুমোদন দেয়? আমি তো নয়। আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই। আমিই প্রকৃত দেশপ্রেমিক।

প্রশ্ন: ভারতকে আপনি কেমন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান? একটি আদর্শ ব্যবস্থা বাছাই করুন।

কমরেড কিষানজী: আমাদের প্রথম আদর্শ ব্যবস্থা হলো প্যারিস, যা ভেঙ্গে গেছে। এরপর রাশিয়া ধ্বসে পড়লো, আর তখনই জ্বলে উঠলো গণচীন। কিন্তু মাও পরবর্তী সময়ে সেটিরও পতন হয়। এখন বিশ্বের কোনোখানেই জনগণের হাতে সত্যিকারের ক্ষমতা নাই। সর্বত্রই শ্রমিকেরা এজন্য সংগ্রাম করছে। তাই কোন আদর্শ ব্যবস্থা বিদ্যমান নাই।

প্রশ্ন: যখন কমিউনিজম অন্যত্র ফলপ্রসু হয়নি, তখন ভারতে তা কিভাবে কাজ করবে? চীনে বর্তমানে মাও’এর তত্ত্বকে ভ্রান্তিমূলক আখ্যা দেওয়া হয়। নেপালে ইতিমধ্যে মাওবাদীদের বিদেশী বিনিয়োগ খোঁজছেন।

কমরেড কিষানজী: নেপালে মাওবাদীরা যা করছেন, তা ভুল। এই পথ অনুসরণ করার মানে হলো আরেকটি বুদ্ধদেব বাবু [“মার্কসিস্টপশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী] তৈরী করা। আমরা তাদের নিকট আবেদন জানিয়েছি পুরোনো পন্থায় ফিরে আসার জন্য। যেখানেই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম শিকড় গজিয়ে উঠে, সেখানেই সাম্রাজ্যবাদ তা স্বমূলে উপড়ে ফেলতে চায়। অবশ্যই, লেনিন, মাও, প্রচণ্ড – সবারই কিছু দুর্বলতা আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ের পর লেনিন এবং স্তালিন আমলাতন্ত্রের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করেন। তারা জনগণের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করেন। তাদের ভুল থেকে আমাদের শিখতে হবে। পুঁজিবাদও কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়েছে। আপনি কিভাবে বলবেন যে পুঁজিবাদই সফল হয়েছে? সমাজতন্ত্রই মুক্তির শুধুমাত্র পথ।

প্রশ্ন: কিন্তু ক্ষমতায় গেলে আপনারাও কী নেপালের মাওবাদীদের মতো বা সিপিএম’এর মতো বিভ্রান্ত হতে পারেন না?

কমরেড কিষানজী: যদি আমরা পরিবর্তিত হই, তাহলে জনগণ আমাদের বিরুদ্ধেই আরেক বিপ্লবের (ক্রান্তিকারী আন্দোলন)সূচনা করবে। শাসক যেই হোক না কেন, যদি সে শোষকে পরিণত হয় তাহলে জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য উঠে দাঁড়াবেই। তাদের ‘একজন কিষানজী’, ‘একজন প্রচণ্ড’ বা ‘একজন স্তালিন’এর উপর অন্ধ বিশ্বাস থাকা উচিৎ নয়। যদি কোনো নেতা বা পার্টি তাদের নিজস্ব মতাদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে তাদের উপরে আস্থার সমাপ্তি ঘটিয়ে আবারো বিদ্রোহ করতে হবে। জনগণের এই পরম্পরা জিইয়ে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি কি কখনও কোন ব্যক্তিগত দ্বিধার সম্মুখীন হয়েছেন? সহিংসতাই কি একমাত্র পথ রাষ্ট্রের উপর চাপ বৃদ্ধি করার?

কমরেড কিষানজী: আমার বিশ্বাস আমরা সঠিক কাজটিই করার চেষ্টা করছি। আমরা একটা ন্যায়ের যুদ্ধ করে যাচ্ছি। হ্যাঁ, পথ চলতে ভুল হতেই পারে। কিন্তু তা রাষ্ট্রের মতো নয়, আমরা ভুল করলে তা স্বীকার করতেও জানি। ফ্রান্সিস ইন্ডুয়ার’কে হত্যা করাটা ছিল একটি ভুল, আমরা এজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। লালগড়ে আমরা একটা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছি। সেখানে আমরা সম্প্রতি শুধুই উন্নয়নের জন্য সরকারকে (লিখিতভাবে) দাবী জানিয়েছি এবং সরকারকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছি। আমরা ৩০০টি গভীর নলকূপ এবং ৫০টি অস্থায়ী হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছি। এছাড়াও আমরা ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, সিপিআই, এমনকি সিপিএম’এর মতো বাম দলগুলোর সাথেও আলোচনা করেছি। আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রীদের সাথেও যোগাযোগ করেছি। মুখ্যমন্ত্রীর সাথে আমি নিজে কথা বলেছি।

প্রশ্ন: মুখ্যমন্ত্রীর অফিস এগুলো ময়লার ঝুড়িতে ফেলেছে।

কমরেড কিষানজী: আমি মুখ্যমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। আমি তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ করতে বলেছি এবং বলেছি যে, আমরা আমাদের উন্নয়ন চাহিদা চিঠির মাধ্যমে পাঠিয়েছি। তিনি জানালেন যে, তিনি তার দল ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী চিদাম্বরম দ্বারা চাপে আছেন।

প্রশ্ন: পুলিশ কেন আপনাকে ধরতে সক্ষম হচ্ছে না?

কমরেড কিষানজী: আটটি রাজ্যে দিন নেই, রাত নেই, আমাকে ধরার জন্য অভিযান চলতেই থাকে। তাদের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় আমার অবস্থান ২ নম্বরে। পুলিশ যেন আমার কাছে পৌছাতে না পারে, সেজন্য বাংলার ১৬০০ গ্রামের মানুষ রাতে পাহাড়া দেয়। আমি এখন যেখানে আছি, সেখান থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে একটা ক্যাম্পে ৫০০ পুলিশ রয়েছে। বাংলার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। পুলিশ আমাকে ধরার আগে তাদের মারতে হবে।

প্রশ্ন: স্বরাষ্ট্র সচিব সম্প্রতি আপনাদের অস্ত্র দেওয়ার জন্য চীনকে উদ্দিষ্ট করেছেন। এটা কি সত্য?

কমরেড কিষানজী: তিনি আমাদের মতাদর্শ সম্পর্কে একদমই কিছু জানেন না। যুদ্ধে জয়ী হতে হলে শত্রু সম্পর্কে জানতে হয়। আমাদের অবস্থান চীন থেকে সম্পূর্ণভাবে বিপরীত। আমি ভেবেছিলাম চিদাম্বরম এবং পিল্লাই আমার প্রতিযোগী, কিন্তু আমার শত্রু এতো নিন্মমানের হবে তা কখনোই বুঝতে পারিনি। তারা কেবল হাওয়াতেই তরবারী ঘোরাবেন। বিজয় আমাদেরই হবে।

প্রশ্ন: লষ্করতৈয়বা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? আপনি কি তাদের যুদ্ধ সমর্থন করেন?

কমরেড কিষানজী: আমরা তাদের কিছু দাবী সমর্থন করি, কিন্তু তাদের পদ্ধতি ভুল এবং জনবিরুদ্ধ। তাদেরকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাদ দিতে হবে, কারণ তা কোন লক্ষ্যের দিকে সহায়ক নয়। শুধুমাত্র জনগণকে সঙ্গে নিয়েই বিজয় অর্জন করা সম্ভব।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s