টিপাইমুখ বাঁধ :: বাংলাদেশের ভয়ঙ্কর ভবিষ্যত এবং করণীয়

Posted: নভেম্বর 26, 2011 in প্রকৃতি-পরিবেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , ,

লিখেছেন: সত্যজিৎ দত্ত পুরকায়স্থ

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। নদী বিধৌত এই দেশে অসংখ্য নদনদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে ৫৭ টি আন্তর্জাতিক নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে ২৩০ টি নদীতে বিভক্ত হয়ে আবার বিভিন্ন জায়গায় একত্রিত হয়ে সাগরে পড়েছে, যার মধ্যে ৫৪ টি নদীর উৎপত্তিস্থল ভারত। এসব নদনদীর উপর এদেশের অগণিত মানুষের জীবন জীবিকা নির্ভরশীল। নদীর বয়ে আনা পলিমাটি এদেশের জমিকে উর্বর করে তুলে। তবে বিভিন্ন কারণে এসব নদনদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি হচ্ছে। যার প্রায় পুরোটাই মানব সৃষ্টি। এর মধ্যে নদী ভরাটড্রেজিং না করা, নাব্যতা হ্রাস, এমনকি পলিথিনের স্তরও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী বুড়িগঙ্গানদীর তলদেশে ১০ ফুট পলিথিনের স্তরও রয়েছে।

টিপাইমুখ বাঁধ

এছাড়াও রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কর্তৃক বিভিন্ন নদীর উজানে বিভিন্ন উদ্দেশ্য বাঁধ নির্মাণ যার অন্যতম সুরমার উজানে টিপামুখ বাধ। যার মূল উদ্দেশ্য নদীর স্রোতকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদীর যে জায়গায় স্রোত বেশি, নাব্যতা বেশী সেসব জায়গায় আড়া আড়ি বাঁধ দেয়া হয়। এসব বাঁধ থেকে বিশাল এলাকা জলমগ্ন হয়, গ্রীন হাউজ গ্যাস উৎপত্তি হয়, উপকূলে ক্ষয় দেখা দেয় আর কোনো কারণে যদি বাঁধ ভেঙ্গে যায় তাহলে প্রাণহানীর ঘটনা ঘটা খুবই স্বাভাবিক; যেমন১৯৭৫ সালে চীনে এই রকম দুটি বাঁধ ভেঙ্গে মারা যায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব হ্রাসের কৌশল উদ্ভাবন বিষয়ক প্রতিবেদন, ২০০৯ থেকে জানা যায় যে, ২০০৯ সালে বিশ্বে প্রায় ৩০০ টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেছে, এতে বাস্তুহারা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০ কোটি মানুষ, প্রায় ১৮ হাজার কোটি ডলারের সম্পদহানী ঘটেছে। এর প্রভাব বেশী এশিয়ায়। বিশ্বের ১০টি সর্বোচ্চ বিপর্যয় কবলিত দেশের মধ্যে ৯টি দেশ এশিয়ায় অবস্থিত। বিশ্বে বন্যায় যত মানুষ মারা যায় তার ৭৫% চীন, ভারত এবং বাংলাদেশে (তথ্যসুত্র : সারা বিশ্ব, দৈনিক প্রথম আলো, ১৮ মে, ২০০৯)। ইতোমধ্যে ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরগামী প্রায় সকল নদী থেকে জল প্রত্যাহার করছে।

বাংলাদেশের সাথে ৫৪টি আন্তঃনদীর মধ্যে ৪৭টি নদীতে ভারত বাঁধ দিয়েছে। কেবল উত্তরপুর্ব ভারতেই নির্মিত হচ্ছে ১৬০টি বাঁধ ও ব্যারেজ। ৪৭ পরবর্তী সময় থেকে ভারত ৮০ হাজার কোটি রুপি খরচ করে ৩৬০০ বাঁধ তৈরি করেছে। অধিকাংশ বাঁধ বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য করা হলেও বন্যার প্রকোপ বেড়েছে, খরার প্রকোপ বেড়েছে, বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মানের ফলে উদ্বস্তু হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি মানুষ, যা ২য় বিশ্বযুদ্ধের উদ্বাস্তু সংখ্যার চাইতেও বেশি। World Commission of Dam (WCD) ১২৫টি বৃহৎ বাঁধের উপর সমীক্ষা চালিয়ে এসব বাঁধ প্রকল্পকে মানুষ, পরিবেশপ্রতিবেশ এবং উৎপাদনের অলাভজনক বলেছে। ভারত সরকার টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৯৫৫ সাল থেকে চেষ্টা করলেও খোদ তার নিজের দেশের মানুষ বিশেষত মনিপুর রাজ্যের মানুষের প্রতিবাদের কারণে তা কার্যকর করতে পারে নি। ভারত কর্তৃক সুরমার উজানে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে বরাকসুরমাকুশিয়ারামেঘনা অভিন্ন নদী প্রবাহ শুধু বাধাগ্রস্তই হবে না এর ফলে যে ভূপ্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতো বলার অপেক্ষা রাখে না।

সিলেটের ভৌগলিক অবস্থান এবং টিপাইমুখ বাঁধ: সংক্ষিপ্ত তথ্যবলী

সিলেট বিশ্ব মানচিত্রে ২৩৫৮ থেকে ২৫১৪ উত্তর অক্ষাংশে এবং ৯০৫৭ থেকে ৯২২৮ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় একটি বিভাগ। আয়তন,৪৯০.৪০ বর্গ কিলোমিটার। এখানকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১.৪০ সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন ১২.৯০ সেলসিয়াস। বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ১২০ হয়। প্রধান নদী সুরমা, কুশিয়ারা,মনু, ধলাই, খোয়াই, কালনী।

সিলেট জেলার জকিগঞ্জের অদূরে অমলশিদ সীমান্ত পয়েন্ট থেকে সরাসরি মাত্র ১০০ কিলোমিটার উজানে ভারতের মনিপুর রাজ্যের চোরাচাঁদপুর নামক স্থানে যেখানে বরাক ও টুইভাই নদী মিলিত হয়েছে সেখানে টিপাইমুখ বহুমুখী জল বিদ্যুৎ প্রকল্প নামে ৫০০ ফুট উঁচু ও ১৫০০ ফুট দীর্ঘ, সমুদ্রপৃষ্ট হতে ১৮০ মিঃ উঁচু এক বিশাল পাথরের বাঁধের নকশা প্রণয়ন ইতোমধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সম্পন্ন করেছে। যার ফলে প্রায় ৩০০ বর্গ কিঃ মিঃ এলাকা ১৫ বিলিয়ন ঘন মিটারের এক বিশাল জলাধারে পরিণত হবে।

১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন লার্জ ড্যামের প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৫ মিটার বা তদুর্ধ্ব এবং ৩ বিলিয়ন কিউবেক মিটার বা এর বেশি পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন বাঁধকে লার্জ ড্যাম বলা হয়। ভারতীয় বিদ্যুৎ আইনের ধারা ২৯ মোতাবেক ২০০৮ সালের অক্টোবরে টিপাইমুখ বহুমুখী জল বিদ্যুৎ প্রকল্পএর জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে এবং ২০০৬ সালে ভারতীয় জ্বালানি মন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্দে এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

বাঁধ নির্মাণের কাজ পেয়েছে নর্থ ইস্ট ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন (নিপকো)। ৬৩৫১ কোটি টাকা ব্যায়ে ৫ বছরে এই বাঁধ নির্মাণ হবে। যে বরাক নদীর উপর এই বাঁধ নির্মিত হবে তা শুধু ভারতের নয়, এর উৎসস্থল মাওমংস্যাং এর কাছে মনিপুর পাহাড়ে নানা ঝর্ণা ধারার মিলনে এই নদী বরাকসুরমাকুশিয়ারামেঘনা অভিন্ন নদী প্রবাহ হিসাবে ৯৪৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভোলা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। যার মধ্যে ভারতের মনিপুর, মিজোরাম, আসামে ২৭৭ কিঃ মিঃ, বাকি ৬৬৯ কিঃ মিঃ বাংলাদেশে।

টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ভারতীয় যৌক্তিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এর বৈধতা

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে “সবার জন্য বিদ্যুৎ” নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ভারতের দাবি টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে এবং পূর্ণশক্তিতে পরিচালিত হলে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, কিন্তু বাস্তবে বাঁধে কখনোই পূর্ণশক্তি ব্যবহার হয় না, ফলে সাধারণভাবে এই প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। কিন্তু নষ্ট হবে বরাকসুরমাকুশিয়ারামেঘনা অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের জীবন। পৃথিবী জুড়ে বিগত ২০০ বছরে বড় বাঁধ নির্মাণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাঁধ নির্মাণে সবচেয়ে অগ্রসর কিন্তু তারা নিজেরাই পাঁচ শতাধিক বাঁধ ভেঙ্গে দিয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে গণচীন ও ভারতে বাঁধ নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। বিশ্বের মোট বাঁধের ৫৭% এই দুই দেশে। চীন ব্রহ্মপুত্রের নদীর উৎসের বাঁধ দিয়ে ৫০% পানি তাদের গোবি মরুভূমিতে নিতে চায়। ভারতও অরুনাচল প্রদেশে ব্রহ্মপুত্রে জলাধার নির্মাণ করতে চায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমরা কারণ বাংলাদেশের মোট পানি প্রবাহের ৪৯% আসে ব্রহ্মপুত্র থেকে। টিপাইমুখ বাঁধ ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত হলেও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে যেসব নদী একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তাদের পানি উজানের দেশ এক তরফাভাবে প্রত্যাহার করতে পারে না। কিন্তু ভারতীয় সরকার এই বাঁধ নির্মাণের পূর্বে বাংলাদেশ সরকারের সাথে কোনোরূপ আলোচনা বা কোনো তথ্য প্রদান করেনি, যা ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত পানি কনভেনশনের বরখেলাপ। পানি কনভেনশন মতে, কোন অভিন্ন নদীর উপর একক দেশ একতরফা এমন কোনো কাজ করতে পারবে না যা অপর দেশে ঐ নদীর উপর বিশেষ প্রভাব ফেলবে। এ কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৭() এ বলা হয়েছে “প্রতিটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জল প্রবাহের পানি ব্যবহার করবার সময় পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর যাতে কোনো বড় ধরনের ক্ষতি না হয় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।এছাড়াও World Commission of Dam (WCD) (১৯৯৪) এর বাঁধ বিষয়ক সুপারিশ হচ্ছে:

১। কোনো জনগোষ্ঠীর সুস্পষ্ট গ্রহণ (Demonstrable acceptance) ছাড়া কোনো বাঁধ নির্মাণ করা যাবে না; বিশেষত আদিবাসী।

২। নির্মাণ প্রক্রিয়া হবে সর্বাত্মক ও অংশগ্রহণমূলক।

৩। কোনো নতুন প্রকল্প নির্মাণের পূর্বে জল ও শান্তির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে পরিবেশসহ তাদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার সংক্রান্ত হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদীগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন কে বিবেচনায় নেবে। তা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি না করেই হতে হবে”।

১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার ২ নম্বর নীতিতে বলা হয়েছে “পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে”

রিও সামিট, ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশই স্বাক্ষরকারী। ধারা ৩.২১ এর সারমর্ম হলোপানির ঘাটতি আছে বিধায় সবাই যৌক্তিকতার সাথে একে অন্যের ক্ষতি না করে পানি ব্যবহার করবে। এছাড়াও এই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগে ১৯৯৬ সালে ভারতবাংলাদেশ এই দুই দেশের মধ্যকার সাক্ষরিত গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিরও লঙ্ঘন। এই চুক্তির ৯ অনুচ্ছেদ মতে উভয় দেশ ন্যায্যতা, ন্যায়পরায়ণতা ও কোনো ক্ষতি না করার ভিত্তিতে যৌথ নদীর পানি ভাগাভাগি করবে।

টিপাইমুখ বাঁধ এবং বাংলাদেশে এর নেতিবাচক প্রভাবসমূহ

World Commission of Dam (WCD)-এর উপাত্ত অনুযায়ী বড় বাঁধ বড় বিপদ ডেকে আনে। টিপাইমুখ বাঁধ খোদ ভারতে যে সব বিপদ ডেকে আনবে তা হলো

মনিপুরের প্রায় ৪০০ কিঃ মিঃ এলাকা জলমগ্ন করবে। যার মধ্যে বড় বনাঞ্চল ও লোকালয় রয়েছে। বিশাল জলমগ্ন এলাকা থেকে নির্গত মিথেন গ্যাস (CH4) ওজন স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই বাঁধের বিরোধিতা করছে খোদ ভারতের মনিপুর রাজ্যের জনগণ। ভারতের সরকার তাদের সাথেও কথা বলেনি। অর্থাৎ, ভারত নিজ দেশেও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। বাংলাদেশে টিপাইমুখ বাঁধএর নেতিবাচক প্রভাবসমূহঃ

১। এই বাঁধ সুরমাকুশিয়ারামেঘনার গতিধারা পরিবর্তন করবে।

২। টিপাইমুখ বাঁধের ফলে সুরমাকুশিয়ারামেঘনার স্রোতধারা এবং নদী সংযোগ প্রকল্পের ফলে ব্রহ্মপুত্রের স্রোতোধারা বন্ধ হলে সাগরের লোনাপানি দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত উঠে আসতে পারে। এতে নদীর পানির বৈশিষ্ট্য যেমনসুপেয় পানি নষ্ট করবে।

৩। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামতে থাকবে এবং আর্সেনিকের মাত্রাও বাড়বে।

৪। জলজ প্রাণীর যেমনবিভিন্ন প্রজাতির মাছ অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

৫। নদীভিত্তিক জীবিকা যেমনকৃষি কাজ, মাছ ধরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

৬। পানির প্রবাহ বিপজ্জনক হারে কমবে। কারণ টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হবে কঠিন শিলায়। নির্মাণ কালেই বিপুল পরিমাণ বালি সুরমাকুশিয়ারার স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে।

৭। খরা মৌসুমে ভারত বাঁধ আটকিয়ে পানি সঞ্চয় করবে। কিন্তু সৃষ্টি মৌসুমে বাঁধ রক্ষার জন্য ফ্লাড গেইট খুলে দিবে ফলে সিলেটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে।

৮। ভৌগলিক অবস্থা গত দিক থেকে সিলেট একটি ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। গত ১০০ বছরে এ অঞ্চলে ৬ ও ৭ রিখটার স্কেলের কয়েকটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে, এর মধ্যে ৭ মাত্রার ১৬ টি এবং ২ টি ৮.৫ মাত্রার। যার মধ্যে ১৮৯৭ সালে সংঘটিত গ্রেট আসাম ভূমিকম্প অন্যতম। এর ফলে সিলেটের ভূপ্রকৃতি তে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। টিপাইমুখ বাঁধ এই আশঙ্কাকে আরো বড় করে তুলবে। আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ যে জায়গায় নির্মিত হচ্ছে এটি একটি ভুমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এখানে সুনামির মত জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হওয়াও অসম্ভব নয়। তলিয়ে যেতে পারে সিলেট সহ বাংলাদেশের পূর্ব ভাগের বিভিন্ন অঞ্চল।

৯। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে ১/৬ অংশ জুড়ে হাওড় অঞ্চল অবস্থিত। এই বাঁধ নির্মাণের ফলে পানির উচ্চতার তারতম্যের জন্য বর্ষাকালের পরও সিলেটের ৪ জেলা নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ এর মোট ৪২৩ টি হাওড়, যার পরিমাণ ৭,৮৪,০০০ হেক্টর জলাভূমিতে (হাওড় অঞ্চলে) পানি জমে থাকবে। যা এক ফসলি জমিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, বিঘ্নিত হবে খাদ্য নিরাপত্তা।

টিপাইমুখ বাঁধ নির্মানের ভারতীয় উদ্যগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের করনীয় এবং ঢাকা ঘোষণা

ভারত বরাক নদীর উজানে টিপাইমুখ বাধ নির্মাণের প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ৩০৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় International Tipaimukh Dam Conference (ITDC) অনুষ্টিত হয়। এই সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল Let the Barak River Free, Development in Harmony with Nature। দুই দিন ব্যাপি এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসসি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। এই সম্মেলনে যে ঘোষণা পত্র পাঠ করা হয় তা ঢাকা ঘোষণা নামে খ্যাত।

ঢাকা ঘোষণায় বাধ নির্মানের প্রেক্ষিতে যে সব বিষয় বিবেচনা করা হয় তা হলোঃ

) বাধ তৈরীর পুর্বে World Commission of Dam (WCD) এর নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগনকে প্রকল্পের সাথে যুক্ত করতে হবে। যার প্রক্রিয়া হবে গণতান্ত্রিক, অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক। কিন্তু ভারত সরকার তা করেনি। বন্যা নিয়ন্ত্রন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিমিত্তে বাধ নির্মানের ফলে পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বেতা পূণেWorld Commission of Dam (WCD) দ্বারা নির্ধারিত আইন সমুহ বিবেচনা করা হয়নি।

) টিপাইমুখ বাধের ফলে যে সব আদিবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের জন্য World Commission of Dam (WCD) এর নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

) যেসব আদিবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা হলোজিলিয়াংগ্রং, মিজো, হেমার। তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি এবং সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মোট ৭০টি গ্রাম প্লাবিত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৬০ কিঃমিঃ দীর্ঘ জাতীয় মহাসড়ক, মোট ১৩২০ টি আদিবাসী পরিবার সহ ৪০ হাজার পরিবার বাস্তুচুত্য হবে।

) বরাক উপত্যকার নদী সমুহের গতিপথ নষ্ট হবে।

) কর্মপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট জনগন কে যুক্ত না করা আন্তর্জাতিক ভোক্তা আইন, জাতিসংঘের উন্নয়ন অধিকার এবং আদিবাসী অধিকার নীতিমালার লংঘন।

) ভারত বাংলাদেশকে কোনরুপ তথ্য না দিয়ে UN Convention 1997 এবং The Ganges Treaty of 1996 এর লংঘন করেছে।

) এই প্রকল্পের সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।

) এই বাধ গঙ্গাব্রহ্মপুত্রমেঘনা অববাহিকা, যা GBM নামে পরিচিত তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং পানির লবনাক্ততা বৃদ্ধি করবে।

) শুধু উত্তরপুর্ব ভারতের ২০৭৩৭ হেক্টর বনভুমি, ১১৯৫ হেক্টর গ্রাম, ৬১৬০ হেক্টর কৃ্ষি বাগান, ২৫২৫ হেক্টর কৃ্ষি জমি নিশ্চিহ্ন করবে।

ঢাকা ঘোষণার উল্ল্যেখযোগ্য সুপারিশগুলো ছিল

১। অবিলম্বে এই প্রকল্প বন্ধ করতে হবে।

২। একটি সর্বাত্মক, পক্ষপাতহীন পর্যালোচনা করতে হবে।

৩। সার্ক, চীন ও মায়ানমারের সাথে অভিন্ন নদী নিয়ে যে সব সমস্যা রয়েছে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করতে হবে।

বর্তমান অবস্থা এবং আমাদের সুপারিশ

২০০৯ সালের ১৬ জুন মিসরে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে হবে এমন কোনো স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ ভারত নেবে না বলে আশ্বস্ত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রি ড. দীপুমনি জাতীয় সংসদে মার্চ মাসে বলেছেন, বাংলাদেশ মেঘনা নদীর পানি বন্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো মতৈক্য না হওয়া পর্যন্ত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছে। দিল্লীও বাংলাদেশকে এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য দিতে রাজি হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী গত ১৯ মে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে জানান যে, ভারত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ করবে না। কারণ তারা মনে করেন টিপাইমুখ বাঁধ দ্বারা বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। জুলাই মাসের ৩য় সপ্তাহে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নিপকো তাদের ওয়েব সাইটে টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের ভারত অংশের পরিবেশ সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যদিও এতে বাঁধের নকশা, পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনার কোনো তথ্য নেই।

উক্ত পরিবেশ সমীক্ষা প্রতিবেদনটিতে ৩টি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়

১। এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট এসেসমেন্ট।

২। এনভায়রনমেন্টাল মেনেজমেন্ট প্লান।

৩। ড্যাম ব্রেক এনালাইসিস এন্ড ডিজেস্টার মেনেজমেন্ট প্লান।

সমীক্ষা প্রতিবেদনটিতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয় তা নিম্নবরূপ

১। প্রকল্প এলাকা ৯৫ কি: মি: উজানে ফুলেরতল নামক স্থানে ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে।

২। বাধের ফলে প্রকল্প এলাকার সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে। জলমগ্ন এলাকায় নৌ চলাচল সুবিধা বাড়বে।

৩। বরাক নদীতে ইলিশ মাছসহ ১৩৬ প্রজাতির মাছসহ অন্যান্য জীববৈচিত্রের কথা বলা হয়েছে।

৪। প্রকল্প এলাকাকে “ভি” মাত্রার ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা বলা হয়েছে।

২০০৪ সালে ডেইলী স্টারএ প্রকাশিত ভারতবাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের সদস্য তৌহিদ আনোয়ারের মন্তব্য থেকে জানা যায় যে, টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশ তিনবার কুটনৈতিক সুত্রে ভারতকে আপত্তি জানিয়েছে। এমন কি ভারতবাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনেও এই বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে জুন ২০০৯ এ দেয়া সর্বশেষ ভারতীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে

১। ভারত পানি প্রত্যাহার করবে না।

২। বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ভাটির দিকে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি করা হবে এতে বাংলাদেশ লাভবান হবে।

৩। বন্যার প্রকোপ বাড়বে।

ভারতবাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের সর্বশেষ ৩৫ ও ৩৬তম সভায় এই বাঁধের বিরূপ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। ৩৫তম সভায় ভারত প্রকল্প এলাকায় সেচ অবকাঠামো তৈরি না করার কথা বলেছিল। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য জলবিদ্যুৎ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ।

২০০৫ সালের ৩৬তম সভায় ভারতের কাছে নিশ্চয়তা চাওয়া হয় ভারত পানি প্রত্যাহার করবে না। যৌথ নদী কমিশনের সভায়ও ভারত বাংলাদেশের সাথে আলোচনা ছাড়া টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করবে না বলেছিল।

শেষ কথা

আমেরিকার মিটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির জার্নাল অব ক্লাইমেটএ প্রকাশিত গবেষনা থেকে জানা যায় বিশ্বের গুরুত্বপুর্ন নদীসমুহের পানির প্রবাহ গত ৫০ বছরে হ্রাস পেতে শুরু করেছে। চীনের উত্তরাঞ্চলে ইয়োলো রিভার, ভারতের গঙ্গা, যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীর পানির উৎস ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তারা এক্ষেত্রে ৯০০ টি নদীর পানির প্রবাহে ৫০ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষন করেছেন। এতে পানি প্রবাহ হ্রাস পাবার কারণ হিসাবে দেখাৎ গেছে বাধ নির্মান, সেচের জন্য পানি প্রবাহের দিক পরিবর্তন। আমরা অবশ্যই উন্নয়ন বিরোধি না। তবে যে উন্নয়ন মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে তা যুথবদ্ধতার সাথে মোকাবেলা করাটাই কাম্য এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভুমিকাই মুখ্য।

তথ্যসুত্র

) NO TO TIPAIMUKH DAM (Post Conference Publication)

International Tipaimukh Dam Conference (ITDC), ৩০৩১ ডিসেম্বর ২০০৫, ঢাকা।

) “টিপাইমুখ বাধ ইস্যূতে সুরমা নদী তীরে গণপার্লামেন্ট, বাংলাদেশের জনগনের পক্ষে পেশকৃত বিল”। দৈনিক উত্তরপূর্ব, ২৪ এপ্রিল, ২০০৯, পৃষ্টা ২।

) “পানির প্রবাহ কমছে প্রধান নদীগুলোয়”। দৈনিক প্রথম আলো, বিজ্ঞান প্রজন্ম, ৩ মে ২০০৯, পৃষ্টা ৩।

) “টিপাইমুখঃ প্রতিবাদ জরুরী কেন”। দৈনিক প্রথম আলো, ১ লা জুন ২০০৯।

)http://www.dam.org

)www.the-south-asian.com/aug2004/river-linking.html

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s