লিখেছেন: রাজীব নন্দী

অপরাজেয় বাংলার সেই সুর: রাজধানী জায়গাটি ছিল আমার কাছে চরম উত্তেজনার এবং সমান কৌতুহলের। চট্টগ্রাম থেকে রাজধানীতে এসেছিলাম। আজ থেকে বছর দশেক আগে। দিনটি কী বার ছিল, ছিল কোন তারিখ তা আজ আর মনে নেই। মিছিল হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা। মিছিলের আগে হবে সমাবেশ। অপারেজয় বাংলা আমার কাছে ছিল গম্ভীর ভাস্কর্য। যার নিচে গিয়ে দাড়ালে ঘাড় কাত করে দেখতে হয়। সেই ভাস্কর্যের তলায় বিশাল মঞ্চ। ছাত্র সমাবেশ কিন্তু হল্লা নেই। সবাই শান্ত অথচ প্রত্যয়ী। গম গম করছে জমায়েত। আমি তখন ম্যাট্রিক দিয়ে কলেজের ছাত্র। মিছিলমিটিং থেকে বাবামায়ের নির্দেশে দূরে থাকার কথা, তবু এসেছি। তখন আমার ‘স্লোগান দিতে গিয়ে চিনতে শিখি নতুন মানুষজন’ দশা!

এরই মাঝে খাকানো গলায় স্লোগান উঠল। ছাত্রদের দাবি নিয়ে স্লোগান। এক উন্মাদিনী আহত সেনার মতো গলায় সুর তুলেছে। সেই সুর রোদের উত্তেজনাকে ছাপিয়ে অপরাজেয় বাংলা কাঁপিয়ে তুলল। হাজারো জমায়েত থেকে একসুরে স্লোগানের প্রতিউত্তর হচ্ছে। যেদিকে তাকাই শুধু মুখ। আর সেই মুখে পাষাণভেদী শব্দ বেরিয়ে আসছে। উপেক্ষা করা যাচ্ছে না শব্দ। আমি লজ্জাবনত মুখে তাকিয়ে দেখি যিনি স্লোগান দিচ্ছে সেই বাজখাঁই গলাটি একজন নারীর!

সেই সমাবেশটিতে হাজিরা দিয়েছিলাম বাম ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে। বলাবাহুল্য, আমি ছিলাম দলটির মুগ্ধ প্রেমিক। প্রেমের উল্টা পিঠ যেমন ঘৃণার; তেমনি প্রেমপর্ব শেষ হয়ে এখন বিচ্ছেদপর্ব চলছে। দলের প্রতি আস্থাসম্পর্ক এতটুকু না থাকলেও এখনও সেই দশ বছর আগের অপরাজেয় বাংলার স্লোগানের সুর কানে বাজে। সেই নারী নেত্রী স্লোগান নিজের কণ্ঠে নকলামী করে আমিও ছিলাম দলটির স্লোগানদাতাদের একজন।

ওয়ালস্ট্রিট দখল করো:ওয়ালস্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে মরিচের গুড়া ছিটানোর ঘটনা ঘটেছে। দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শুক্রবার সংঘটিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পুলিশ মরিচের গুড়া স্প্রে করে। এই চিত্র সম্বলিত ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষ এর তীব্র সমালোচনা করে। বিক্ষোভের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ডেভিস পুলিশ ডেকেছিলেন। রবাহুত সেই পুলিশ বাহিনীই বিক্ষোভকারীদের উপর মরিচের গুড়া স্প্রে করে। বিক্ষোভে হাত উচিয়ে স্লোগান দিচ্ছে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী। ছন্দে দুলছে তার কানের দুল!

(সূত্র: http://www.washingtonpost.com/blogs/blogpost/post/uc-davis-occupy-protesters-set-up-new-encampment/2011/11/22/gIQAzm7IlN_blog.html)

UC Davis students protest at an "Occupy UCD" rally on campus in Davis, Calif., Monday. (MAX WHITTAKER - REUTERS)

একটি ছবি হাজার শব্দের চাইতে শক্তিশালী: সাংবাদিক হিসেবে আমাদের পত্রিকা অফিসে শত শত ছবির স্তুপ পড়ে। কিন্তু ছবি প্রকাশ/ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বহুমুখী বিচারবিশ্লেষণ চলে বার্তাকক্ষে। কোন কোন ছবির তাৎক্ষণিক ব্যবহারের পরিবর্তে ভবিষ্যতে কোনও অনুকূল স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে প্রকাশ ও প্রচার করার বিবেচনা করা হয়। ছবি যেন উত্তেজনা সৃষ্টিতে অথবা/এবং বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত না হতে পারে সেটাও মুখ্য থাকে। ধর্ষিতা নারীর ছবি না ছাপিয়ে মূল্যবোধ রক্ষার চেষ্টা চলে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ছবি সেন্সরশিপের কবলে পড়েকল্যানের হেতু। সাংবাদিকতার বিদ্যায়তনিক আয়োজনে একে আমরা বলি ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিভৎষ লাশ আমরা সংবাদপত্রে ছাপি না। মফস্বল থেকে পাঠানো বহু অরুচিকর ছবিও ‘পেইজ নাম্বার নাইন’এ চলে যায়। নানা বিচারবিশ্লেষণের পর আমরা উত্তেজক আর নানান অরুচিকর ছবি ছাপা থেকে নিজেদের বিরত রাখি। সম্পাদন করি দায়িত্বশীল ও মর্যাদাবান সাংবাদিকতার চর্চা। কিন্তু কদাচ এমন একটি ছবি বার্তাকক্ষে বিষ্ফোরণ ঘটায় যে ছবি প্রাচীন চৈনিক প্রবাদটি কানে শুনিয়ে দিয়ে যায়– ‘একটি ছবি হাজার শব্দের চাইতে শক্তিশালী’।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন সংক্রান্ত আইন বাতিল দাবিতে গত মাস দুয়েক আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ছবি। তুলেছেন Mohsin Kabir Miron

আসুন ভাবি: সাদাকালো ছবিটি দেখেছেন? জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন সংক্রান্ত আইন বাতিল দাবিতে গত মাস দুয়েক আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ছবি এটি। পেছনে ফেলে আসা দশ বছর আগের স্লোগান শুনতে পাই এই দুটি জেপিজি ফর্মেটের ছবিতে। নজরুলের “কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারী,/ প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী” শুনতে পাই ছবিদুটিতে।

এবার আমরা ভাবতে পারি। আসুন ভাবি তার মুখের ঐ হাকরা আকৃতি নিয়ে। ভাবি তার বাকযন্ত্র থেকে কোন সুর ভেসে আসছে তা নিয়ে। ছবির দ্রষ্টা নারীকে নিয়েও ভাবতে পারি অথবা কচি লাউয়ের ডগার মতো ডান বাহু নিয়ে ভাবতে পারি। ভাবি তার ঐ আঙ্গুলের দিকে; কি নির্দেশ করছে সে? আসুন ভাবি পেছনের ছাত্রজনতার ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েও। গভীর ভাবে ভাবি মাথায় জড়ানো স্কার্ফ নিয়ে।

ভাবুন তো একটি ছবি হাজার শব্দের চাইতে কেন শক্তিশালী?

ভাবুন, কেন দুনিয়াজুড়ে আজ একই ভঙ্গীতে নারীরা হাত উঁচিয়ে স্লোগান দিচ্ছে?

ছবি দুটিতে কেন এত মিল?

আসুন ভাবি। ভাবনা আমাদের কোন না কোন উত্তর যোগান দেবেই

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s