অনুবাদ: তানজীর মেহেদী

১৬ নভেম্বর ২০১১। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন নিয়ে ওয়াশিংটন স্কয়ারে দেওয়া অরুন্ধতী রায়ের বক্তৃতা

অরুন্ধতী রায়

A few “pre-revolutionary” thoughts I had : Arundhati Roy

Text of a speech given by Arundhati Roy at the People’s University in Washington Square, NYC on November 16th, 2011.

পুলিশ মঙ্গলবার (১৫ নভেম্বর) সকালে জুকোটি পার্ক খালি করে ফেলেছিল, কিন্তু আজ এখানে আবার সবাই ফিরে এসেছে। পুলিশের জেনে রাখা উচিত, এই আন্দোলন কোনও অঞ্চল দখলের যুদ্ধ নয়। আমরা এখানে সেখানে কোনও পার্ক দখলের যুদ্ধ করছি না। আমরা ন্যায়ের প্রশ্নে যুদ্ধ করছি। আর ন্যায় বিচার শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য নয়, বরং সকলের জন্য।

১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অকুপাই আন্দোলন শুরুর মধ্য দিয়ে যা অর্জিত হয়েছে, তার মধ্যে আছে সাম্রাজ্যের কেন্দ্র থেকে একটি নতুন কল্পনার সঙ্গে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া। সমঅধিকার বঞ্চিত হয়েও পূর্ণতৃপ্তি আর খুশির সঙ্গেই যখন একটি ব্যবস্থা ভোগ্যপণ্য ক্রেতা সাধারণকে সম্মোহিত করার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আপনারা সেই অধিকারকে আবারও সামনে নিয়ে এলেন, যা আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়।

একজন লেখক হিসেবে আমি মনে করি, এটা একটা বড় অর্জন। আপনাদের ধন্যবাদ জানানোর সেই ভাষা আমার জানা নেই।

আমরা ন্যায় বিচার নিয়ে কথা বলছিলাম। আজ, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরাক ও আফগানিস্তান দখলের যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত। পাকিস্তান ও পাকিস্তানের বাইরে মার্কিন ড্রোন হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য নাগরিক। দশ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা ও ডেথ স্কোয়াড সদস্যরা আফ্রিকায় নিজেদের ঘাঁটি গাড়ছে। যদি ইরাক ও আফগানিস্তান দখল যুদ্ধে আপনাদেরই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করার পরও তা যথেষ্ট মনে না হয়, তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আলাপ শুরু হতে যাচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ মন্দা আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও অস্ত্র নির্মাণ ও রপ্তানির মধ্য দিয়েই নিজেদের অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। অতিসম্প্রতি, প্রেসিডেন্ট ওবামার নির্দেশেই সৌদি আরবের সঙ্গে ৬০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সংযুক্ত আরবআমিরাতের কাছে হাজারেরও বেশি বাঙ্কার ধ্বংসকারী অস্ত্র বিক্রিরও আশা করছে তারা। এমনকি, আমার দেশ ভারতের কাছে ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক বিমান বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ গোটা আফ্রিকার সকল দরিদ্র জনগণের চেয়েও বেশি পরিমাণ দরিদ্র ভারতে বাস করে। হিরোশিমানাগাসাকিতে বোমা হামলা থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম, কোরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিটি বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য মানুষ। আর এসবের মূলে ছিল ‘মার্কিনিদের জীবন’ নিরাপদ করে তোলা।

আজ, মার্কিনিদের জীবনধারা’ সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। তারা এমন একটি উচ্চাকাঙ্খী মডেল স্থাপন করেছে, যার দিকে ধাবিত হচ্ছে অবশিষ্ট পৃথিবী। যার ফলাফল হচ্ছে, গোটা মার্কিন মুলুকের অর্ধেক জনগণের মোট সম্পদের সমপরিমাণ সম্পদের মালিক বনে যান মাত্র চারশ জন লোক। মার্কিন সরকার যখন ব্যাংক ও করপোরেশনগুলোকে আর্থিক সহায়তা করা শুরু করে, তখন হাজারো সাধারণ মার্কিন নাগরিক তাদের বাড়িঘর ও চাকরি হারায়। ওই সময় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ (এআইজি) এককভাবে ব্যাংক ও করপোরেশনগুলোকে দেয় ১৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মার্কিন অর্থনৈতিক নীতিমালার পূজারী ভারত সরকার। দুই দশকের মুক্ত বাজার অর্থনীতির ফলে, আজ, ভারতের ১০০ জন ধনীব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ দেশের মোট জিডিপির একচতুর্থাংশ। অথচ, সেই ভারতের ৮০ শতাংশেরও বেশি লোকের দৈনিক আয় ৫০ সেন্টএর নীচে। ঋণের ফাঁদে পড়ে আত্মহত্যা করেছে আড়াই লাখ কৃষক। আর আমরা সেগুলোকেই উন্নতি হিসেবে চিহ্নিত করে নিজেদেরকে ‘সুপারপাওয়ার’ ভাবতে শুরু করেছি। আপনাদের মতো আমাদেরও যোগ্যতা রয়েছে। আমাদেরও পারমাণবিক বোমা ও অশালীন বৈষম্য রয়েছে।

অকুপাই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে বিশ্বের হাজারো আন্দোলনকারী। যার ফলে, সবচেয়ে দরিদ্র যে লোকটি, তিনিও এসে দাঁড়িয়েছেন সেই কাতারে, আর নিজের অবস্থান থেকেই ধনী করপোরেশন বন্ধের আন্দোলন করছেন। আমাদের মতো কয়েক জন হয়তো স্বপ্ন দেখেছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের আমাদের পাশে পাবো, সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ডে দাঁড়িয়েই এমন একটি আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

যারা ‘এক শতাংশ’, তারা বলছেন আমাদের কোনও চাওয়া নেই। সম্ভবত তারা জানে না, আমাদের ক্রোধই তাদের ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এখানে কিছু বিষয় আছে, প্রাকবিপ্লবী কিছু চিন্তা আমার মধ্যে আছে। যা আমরা সবাই মিলে ভেবে দেখতে পারি।

যে ব্যবস্থাগুলো অসমতা তৈরি করে, সে ব্যবস্থায় ঢাকনা দিতে হবে। ব্যক্তি ও করপোরেশনগুলোর অঢেল সম্পদের পাহাড় তৈরি করে ফেলার যে ব্যবস্থা সেখানে আমাদের টুপি পরাতে হবে। আর ‘ক্যাপইসট’‘লিডইট’  হিসেবে আমাদের দাবিগুলো হচ্ছে:

প্রথমত, বহুমুখীমালিকানার বিষয়টি বন্ধ করতে হবে। যেমন, অস্ত্র নির্মাতারা টিভি স্টেশন খুলে বসতে পারবে না; খননকারী প্রতিষ্ঠান সংবাদপত্রের ব্যবসা করতে পারবে না, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থলগ্নি করতে পারবে না, ওষুধ কোম্পানিগুলো জনস্বাস্থে তহবিল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগুলোকে (পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা) বেসরকারি খাতে দেওয়া যাবে না।

তৃতীয়ত, প্রত্যেকের বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, পিতার সম্পদের উত্তরাধিকার সন্তান পাবে না।

এই সংগ্রাম আমাদের কল্পনাকে আবারও জাগ্রত করে তুলবে। ন্যায়ের প্রশ্নে ‘মানবাধিকার’ বলতে যা বোঝায়, পুঁজিবাদ সেই ধারণাটাই গিলে ফেলছে। সমান অধিকারের স্বপ্ন যেন ব্লাসফেমির আইনেরই অপর নাম। আমরা আসলে আনাড়ির মতো যুদ্ধ করছি না। আমরা চাই একটি ব্যবস্থাকে সংশোধন করতে, যা পরিবর্তন হওয়া উচিত।

ক্যাপইসট’‘লিডইট’  হিসেবে, আমি আপনাদের স্যালুট জানাই।

সালাম ও জিন্দাবাদ।।

Source : opednews.com

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s