মতাদর্শগত প্রশ্নে

সংকলন: শিহাব ইশতিয়াক সৈকত

(পূর্ব প্রকাশের পর…)

এল দিআরিও: চেয়ারম্যান, পিসিপি, মাওবাদ ইত্যাদি আদর্শগত ভিত্তির উপর আমাদের মধ্যে একটু আলোচনা করা যাক। মাওবাদকে মার্কসবাদের তৃতীয় স্তর বলে আপনি চিহ্নিত করেন কেন?

চেয়ারম্যান গনজালো

চেয়ারম্যান গনজালো: এটা একটা অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন এবং প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। আমাদের কাছে মার্কসবাদ হচ্ছে উন্নয়নের একটি ধারা। এই মহান ধারা আমাদের উচ্চতম পর্যায়ের তৃতীয় নতুন এক স্তর উপহার দিয়েছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে মাওবাদ নামে এই উচ্চতম পর্যায়ে তৃতীয় এক নতুন স্তরে আমরা উপনীত হয়েছি এমন মনে করার কারণ কী? চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ মার্কসবাদের তিনটি উপাদানকেই উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এটা পরীক্ষা নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে বলেই একে আমরা মার্কসবাদের তৃতীয় পর্যায় বলে অভিহিত করি। আসুন একটু প্রাঞ্জল ব্যাখ্যায় যাওয়া যাকমার্কসীয় দর্শনে দ্বন্দ্বতত্ত্বের বিকাশে মাওএর মহান অবদানের কথা কেউই অস্বীকার করতে পারেন না; এই দ্বান্দ্বিক নিয়মগুলোর আচার আচরণের ওপর নতুন আলোকপাত করে একেই মৌলিক সূত্র বলে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন। রাজনৈতিকঅর্থনীতির ব্যাপারে দুটো জিনিসকে এই নতুন তত্ত্ব বিশেষ করে পাদপ্রদীপের তলায় নিয়ে এসেছে। তার প্রথমটি আমলাতান্ত্রিক মূলধনরূপে পরিগণিতঅত্যন্ত নির্দিষ্টভাবে যার তাৎক্ষণিক গুরুত্ব আমাদের কাছে অপরিসীম। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক কাঠামোতে এই অর্থনীতির বিকাশ। এসবের একত্র বিন্যাসে একথা নিশ্চিতভাবে বলা চলে সমাজতান্ত্রিক সমাজে এই অর্থনীতির বিকাশ ও উন্নয়নের ব্যাপারে মাও সেতুঙই একমাত্র স্থপতি। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে জনযুদ্ধের উল্লেখ করাই যথেষ্টকারণ মাও সেতুঙএর এই তত্ত্বের দ্বারা সর্বহারার আন্তর্জাতিকতা পূর্ণ বিকশিত এক সমরনীতির সঙ্গে পরিচিত হয়যে সমরনীতি আমরা সর্বহারাদের ক্ষেত্রে শ্রেণীগত প্রশ্নে সব জায়গায় সমভাবে প্রয়োগ করতে পারি। আমরা বিশ্বাস করি, এই তিনটি প্রশ্নে এই তত্ত্ব এক বিশ্বজনীন বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে। আচ্ছা আসুন, দেখাই যাকনা, এই নতুন স্তরে উন্নীত হওয়ার সুবাদে কিভাবে আমরা সমৃদ্ধ হলামআর একে কেন আমরা তৃতীয় পর্যায় বলে অভিহিত করছি। মার্কসবাদ এর আগে মার্কস ও লেনিনের মাধ্যমে দুটো পর্যায় অতিক্রম করে এসেছে বলেই আমরা মার্কসবাদলেনিনবাদের কথা বলি। এটা একটা উচ্চতম পর্যায়কারণ মাও সেতুঙএর চিন্তার আলোকে আলোকিত হয়ে ভাবাদর্শগতভাবে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতা বর্তমানে এক উন্নত পর্যায়ে বিকশিত হয়েছেযা এক সুউচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। আমার পুনরাবৃত্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলছিআপনারা তো জানেন দ্বন্দ্বের সমন্বয়কেই আমরা মার্কসবাদ বলে থাকিযা কিনা উল্লম্ফনের মাধ্যমে উন্নত পর্যায়ে উপনীত হয় আর এক দীর্ঘ উল্লম্ফনের পরই এটা তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। কাজেই আজকের পৃথিবীতে আমরা যা পাচ্ছিতাকে মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ বলা হলেও মূলতঃ মাওবাদই ক্রিয়ারত। আমরা বিশ্বাস করি আজকের দুনিয়ায় একজন মার্কসবাদী হতে গেলে, একজন কমিউনিস্ট হতে হলে তাকে অতি অবশ্যই মার্কসলেনিন ও মাওয়ের চিন্তাভাবনা সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান অর্জন করে মাওবাদের ব্যাপারে বিশেষ করে ওয়াকিবহাল হতে হবে। এসব না করলে তারা নিষ্ঠাবান কমিউনিস্ট বলে পরিগণিত হতে পারবেন না।

আমি এমন একটা বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে চাইযাকে এতদিন কোন হিসাবের মধ্যেই ধরা হত নাকিন্তু যাকে আজ নিবিড় নিরীক্ষণের প্রয়োজন। লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক তত্ত্বের মাও সেতুঙ যে উন্নততর বিকাশ সাধন করেছেনআমি তার বিষয়েই আলোচনা করছি। বর্তমানে এর গুরুত্ব অপরিসীম আর এই ঐতিহাসিক যুগে এই তত্ত্ব ক্রমশই বিকশিত হচ্ছে। আবার খুব সহজভাবে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করলে নিচের জিনিসগুলো আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেতিনি সাম্রাজ্যবাদের সেই নিয়মটি আবিষ্কার করে বলেন, সাম্রাজ্যবাদ গণ্ডগোল সৃষ্টি করে ও ব্যর্থ হয় এবং যতক্ষণ না সম্পূর্ণ লয় প্রাপ্ত হয় ততক্ষণ বার বার গণ্ডগোল সৃষ্টি করে এবং ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হয়। সাম্রাজ্যবাদের বিকাশের সময়সীমাকে নির্দিষ্ট করে তিনি এও বলেছেন এর আয়ুষ্কাল ‘পঞ্চাশ থেকে একশ বৎসর’। এই সময়সীমার উল্লেখ পৃথিবীর ইতিহাসে এক নিরূপম উক্তিযার ফলে চেতনা সমৃদ্ধ হয়ে আমরা বুঝতে পারি এই সময়সীমার মধ্যে ধরণীর ধুলি থেকে চিরদিনের জন্য আমরা সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেবো। তিনি আরো কিছু জিনিসের কথা বলেছেন যাকে এখন আর কোনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায়না। তিনি বলেছিলেনএটা হচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সংঘর্ষের যুগ’। এছাড়াও আমরা প্রত্যেকেই তাঁর রণনীতিগত বিখ্যাত তত্ত্ব ‘সাম্রাজ্যবাদী আর প্রত্যেক প্রতিক্রিয়াশীলরাই কাগজে বাঘ’ কথাটা জানি। এই তত্ত্বের গুরুত্ব অপরিসীম এবং আমদের মনে রাখা উচিত চেয়ারম্যান মাও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, দুই শক্তির বিরুদ্ধেই এই তত্ত্ব প্রয়োগ করেছিলেন বলেই এই দুই শক্তিকে আমাদের ভয় করার কোন কারণ নেই।

বর্তমানে পৃথিবীতে এই যুদ্ধের বিকশিত স্বরূপের যে ব্যাখ্যা লেনিন করেছেন তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই যুদ্ধের আপাতত গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে মাও সেতুঙ কী দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করেন, তাও একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখা দরকার। চেয়ারম্যান আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছেন যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোন দেশ, কোন জাতি অথবা স্বল্পসংখ্যক জনতা যদি সাহস করে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে পারে তাহলে যেকোন অমিত বিক্রম শোষক এবং শাসককে তারা পরাভূত করতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি অনুধাবনের শিক্ষায় তিনিই শিক্ষিত করেছেনআণবিক যুদ্ধের হুমকির বিরুদ্ধে তিনিই আমাদের অকুতোভয় করেছেন। আমার মনে হয় লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক তত্ত্বের যে সমৃদ্ধি চেয়ারম্যান মাও করেছেন, তাকে বুঝতে গেলে উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর পর্যালোচনা দরকার। কারণ এ কথাটা আমাদের যেমন বুঝতে অসুবিধা হয়নালেনিনের সমস্ত অবদানই মার্কসবাদের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছেঠিক সেভাবেই চেয়ারম্যান মাও সেতুঙএর উন্নততর প্রক্রিয়াগুলোও মার্কস ও লেনিনের মহান চিন্তা, অর্থাৎ মার্কসবাদলেনিনবাদের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। মার্কসবাদলেনিনবাদ সম্বন্ধে সচ্ছ জ্ঞান না থাকলে কোন ভাবেই মাওবাদ আমাদের বোধগম্য হবেনা এবং বিশেষভাবে আজকে আমাদের আশু কর্তব্য কী? মতাদর্শের পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরা, তাকে পাহারা দেয়া ও প্রয়োগ করা এবং উদ্দীপনার সাথে লড়াই করা যা আমাদের বিশ্ববিপ্লবের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

আমরা বিশ্বাস করি, এই জিনিসগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যবহকেননা তত্ত্বগতভাবে এবং প্রয়োগের ব্যাপারে মাওবাদ যে এক তৃতীয় উচ্চতর পর্যায় তা বোঝার ব্যাপারে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

এল দিআরিও: চেয়ারম্যান গনজালো, আপনি কি বিশ্বাস করেন হোসে কারলোস মারিয়াতেগুই যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে চেয়ারম্যান মাওএর এই তত্ত্ব ও অবদান সম্বন্ধে সহমত পোষণ করতেন?

চেয়ারম্যান গনজালো: শেষ বিচারে একটা কথা তো বলা যাচ্ছেই যে মারিয়াতেগুই ছিলেন একজন মার্কসবাদীলেনিনবাদী। সর্বোপরি মারিয়াতেগুই আমাদের পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান মাওএর বিশ্বজনীন তত্ত্বের সঙ্গে তাঁর (মারিয়াতেগুই) সহধর্মীতা লক্ষ্য করা যায়। এই চিন্তার আলোকে আমার কাছে এটাই প্রতীয়মান হয়, মারিয়াতেগুই ছিলেন একজন মার্কসবাদীলেনিনবাদী ও মাওবাদী। এটা কোন কাল্পনিক অনুমান নয়হোসে কারলোস মারিয়াতেগুইএর যাপিত জীবন ও সাধিত কার্যের অনুধ্যানে এই কথাকেই স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হিসেবে ধরে নিতে হয়।

(চলবে…)

কমরেড গনজালোর সাক্ষাৎকার (পর্বএক)

কমরেড গনজালোর সাক্ষাৎকার (পর্বদুই)

[এই সাক্ষাৎকারটি প্রথম বাংলায় অনূদিত হয়েছিল ঘাস ফুল নদীপ্রকাশনা হতে ২০০০ সালের অমর একুশে বই মেলায়। মঙ্গলধ্বনির পক্ষ হতে পুরো সাক্ষাৎকারের সংকলনটি সংকলিত করেছেন শিহাব ইশতিয়াক সৈকত, যা ধারাবাহিকভাবে মঙ্গলধ্বনিতে প্রকাশিত হবেসম্পাদক (মঙ্গলধ্বনির পক্ষে)]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s