লিখেছেন: আলবিরুনী প্রমিথ

'জাগো ফাউন্ডেশন'এর লুটপাট কর্মসূচীতে জাফর ইকবাল

গত ৪ নভেম্বর প্রথম আলো পত্রিকার ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ওদের নিয়ে কেন স্বপ্ন দেখব না?’ শিরোনামে লেখক জাফর ইকবালের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিলো। সেই লেখাটিতে তিনি নানা বিষয়ের অবতারনা করেছেন যার মধ্যে আমাদের দেশের পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিএর বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই তিনি বোরকা, হিজাব এসবের কথা লিখেছেন। কিন্তু তার সেই লেখা প্রকাশিত হবার পর থেকেই ব্লগে, ফেসবুকে পুরুষতান্ত্রিক লালাসায় পরিপূর্ণ পার্ভার্টরা তার মেয়ে ইয়েশিম ইকবালের কিছু ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করে এবং নানা আদিরসাত্মক আলাপআলোচনাকে উস্কে দেয়। তার সেই লেখায় তিনি যা যা বলেছেন কিংবা লেখাটির উপজীব্য বিষয়কে ছেড়ে দিয়ে সেই পার্ভার্টগুলো ক্রমাগত তাকে সমালোচনার নামে ব্যক্তিগত কুৎসা রটায় এবং নিজেদের অবদমিত পুরুষতান্ত্রিক লালসা, মনের বিকৃতি, উগ্রতা উগড়ে দেয়। ব্যক্তিগতভাবে তেলগ্যাস ইস্যুতে তার নানাবিধ নষ্টামী, ইউনুস সাহেবের নির্লজ্জ এবং উদ্দেশ্যমূলক পক্ষপাতিত্ব এবং নানাবিধ কর্পোরেট বেশ্যাবৃত্তির কারণে আমি তাকে বিক্রী হয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবী বলেই মনে করি। কিন্তু তাই বলে সমালোচনার নামে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যেভাবে টানাটানি করা হয়েছে তা যেকোন অবস্থাতে নিন্দিত এবং কঠোর সমালোচনার যোগ্য। জাফর ইকবালের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনাসমালোচনা হতে পারে, যদি তিনি নিজে যা লিখেছেন তা থেকে তার নিজের বিচ্যুতি ঘটে থাকে, তবে সেটাও সমালোচনা করা যেতে পারেন। তাই বলে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কেন এই নোংরা খেলা এবং কেন আমাদের সেই নোংরামীকে সমর্থন করা? জাফর ইকবাল তার সেই লেখাটিতে যা লিখেছেন তা থেকে তিনি নিজে বিচ্যুত এমনটা কি এখনো প্রমাণিত হয়েছে? এছাড়া আমরা যদি বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির দিকে তাকাই তবে দেখব যে তাদের অনেকেই তাদের জীবনে বিভিন্ন ধরণের অপরাধ করেছেন। উদাহরণ স্বরুপ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের ছোট তালিকা তৈরী করতে বলা হলে সেখানে লিও টলস্টয়ের নাম অবশ্যই আসবে যার সম্পর্কে লেনিন বলেছিলেন, টলস্টয়ের লেখা না পড়লে কোন কমিউনিস্টের শিক্ষা পূর্ণ হয়না সেই লিও টলস্টয় তের বছরের একটি বালিকাকে ধর্ষণ করেছিলেন, যার স্বীকারোক্তি তিনি নিজে দিয়েছিলেন, এখন তাই বলে তার লেখাকে কী অস্বীকার করা সম্ভব? সাহিত্যের জগতে তার যেই অসামান্য অবদান তাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে উপরিউক্ত ঘটনাটির কারণে? এর সাথে তুলনা করলে ব্যক্তিগত জীবনে জাফর ইকবাল এমন কি লঙ্কাকান্ড ঘটিয়েছেন, যার কারণে পোঁদ ফাঁটা আবেগে এই বিকৃতিকে সমর্থন করছেন? দুঃখের ব্যাপার হলো, জাফর ইকবালের অনেক ভক্তকে ব্যক্তিগতভাবে চিনলেও তাদের মধ্যে হাতেগোণা কয়েকজন ছাড়া আর কাউকেই এই নিয়ে তেমন কথা বলতে শুনিনি কিংবা দেখিনি!!

উপরে জাফর ইকবাল ইস্যুতে যেই পুরুষতান্ত্রিক বিকৃতির কথা আমি লিখলাম, তা সম্প্রতি জাগো ফাউন্ডেশনএর কর্মকান্ডের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা গেছে। জাগো ফাউন্ডেশনএর কার্য্যক্রম বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর পরজীবী চরিত্র, তাদের দেউলিয়াত্ব এবং বাংলাদেশের উপর ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিফলন। অরাজনৈতিক ইমেজের মোড়কে এইসব এনজিও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর যেই প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি বিদ্যমান এবং তার ফলে বাংলাদেশে সর্বত্র, বিশেষত ঢাকা শহরে উত্তোরোত্তর যেই কর্পোরেট ছেনালীর প্রকট উপস্থিতি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে সঠিকভাবে অনুধাবন এবং স্পষ্ট করে তুলে ধরাটা অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু সেখানেও দেখা গেছে জাগো ফাউন্ডেশনএর সমালোচনা (!) আদিরসাত্মক দিকেই ধাবিত হয়েছে এবং এর ফলে যা হয়েছে তাকে সমালোচনা না বলে বর্জ্য বলাটাই শ্রেয়তর, কেননা কোন গঠনমূলক সমালোচনার পরিবর্তে কেন জাগো ফাউন্ডেশনে কাজ করা একটি মেয়ে টিশার্টের সাথে শর্টস পরে ছবি তুলেছেন তা নিয়ে কুৎসানিন্দার ঝড় বয়ে যায়। শত শত পুরুষতান্ত্রিক লালসায় মত্ত পার্ভার্টরা তাতে তাদের উদগ্র কামনার ঝড় বইয়ে দেয়। জাগো ফাউন্ডেশনএর প্রতিক্রিয়াশীল কার্য্যক্রমের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে বিকৃত কামনাবাসনা এবং সেইসব আলোচনা ভরে উঠে লিঙ্গীয় রাজনীতির আশঁটে গন্ধে!! জাগো ফাউন্ডেশনএর সমালোচনার নাম নিয়ে সেইসব নষ্টামী নিশ্চিতভাবেই জাগো ফাউন্ডেশনএর প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকান্ডের হাতকে শক্তিশালী করেছে তা নিয়ে তেমন সন্দেহের অবকাশ নেই। আমরা উভয় ক্ষেত্রেই আবারো দেখতে পেলাম যে মূল বিষয়ে না গিয়ে ইতিউতি ঘুরে আসার ফলাফল কেবলমাত্র প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষগুলোকেই শক্তিশালী করে। কিন্তু সারা বিশ্বে আগুন লাগলেও আমরা কেবল ফাগুন নিয়েই ব্যস্ত, পোঁদ ফাঁটা আবেগে সুড়সুড়ি দিলেই আমরা করিনা এমন কাজ মনে হয় খুব বেশী নেই!! সমালোচনার নামে মূল বিষয়ে না গিয়ে ইতিউতি ঘোরা এবং এর ফলে যেকোন বিষয়ের গভীরে না গিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর হাতগুলোকে আরো শক্তিশালী করাই হয়ে উঠে অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

উপরের জাফর ইকবাল ইস্যু এবং জাগো ফাউন্ডেশনএর সমালোচনার ধরণের ঘটনাদ্বয়কে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে তা বিভ্রান্তিকর হবে কেননা উভয় ক্ষেত্রেই বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক লালসার এবং উদগ্র কামনাবাসনার প্রতিফলন ঘটেছে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর হাত আরো শক্তিশালী হয়েছে এবং আলোচনার মূল বিষয় আরো একবার বর্জ্যের স্তুপে চাপা পড়েছে। এই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রধান কারণ আমাদের পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেই নিহিত। সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব এবং এর ফলে শোষণের প্রয়োজনে যেই নির্যাতন মানব সমাজে শুরু হয়, নারী নির্যাতন তারই একটি বিশেষ রুপ। নারী ও পুরুষের মধ্যকার এই বৈষম্যের এবং এই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি উন্নত পুঁজিবাদী সমাজেও বিদ্যমান, সেখানে বাংলাদেশের মত অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ দেশে নারী ও পুরুষের মধ্যকার এই বৈষম্য আরো প্রকট এবং কদর্য্যভাবেই উপস্থিত আছে এবং এখানে নারীর শরীর, নারীর যৌনতা ইত্যাদিকে সেই কারণেই ভোগের বস্তুরুপে গণ্য করা হয়। উপরে উভয় ক্ষেত্রেই সমালোচনার নামে যেই আদিরসাত্মক কথাবার্তা এবং বিকৃতির কথা উল্লেখ করলাম তা এই অর্থনৈতিক দৈন্যদশারই ফলাফল যার প্রভাব উপরিকাঠামো অর্থাৎ চিন্তাধারা, মনমানসিকতার উপরে দেখা যায়। এমনকী এই দেশে নারীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের প্রতিবাদের ধরনও প্রকৃতপক্ষে এই নির্যাতনকেই টিকিয়ে রাখে। ভিকারুন্নিসার ছাত্রীটি পরিমল কর্তৃক ধর্ষিত হলে তা নিয়ে শহীদ মিনারে সেই স্কুলের ছাত্রীরা সহ শত শত মানুষ হাজির হয়েছিলেন, প্রতিবাদ, শ্লোগানে মুখর হয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়তেই সারা দেশে পত্রিকায় আরো ৩টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছিল (আরো কত আছে যার খবর আমরা জানিই না, জানতে পারিওনা), কিন্তু সেই ৩টি ধর্ষণ নিয়ে কেউ কোন উচ্চবাচ্চ্য করেনি, ভিকারুন্নিসার একটি ছাত্রীও সেই ধর্ষণের ঘটনাগুলো নিয়ে কোন কথা বলেনি। তারা যে ধর্ষণ বিরোধী প্রতিবাদ বলতে কেবল তাদের বান্ধবীর ঘটনাটাই বোঝে, বরগুনার ১৩ বছরের কিশোরী জেনীকে ধর্ষণের পরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করার পরে বীরদর্পে সেই ধর্ষক ঘুরে বেড়ালেও তার বিচার তো দূরে থাক তা নিয়ে কেউ কথা পর্যন্ত বলেনি, সব চাঁপা পড়ে গিয়েছিলো শ্রেণীবিভাজনের ডিস্টেম্পারে !!!

আমরা যারা আবাল পাবলিক, এস্টাব্লিশমেন্টের দালাল, ব্যুরোক্রেসির চামচা, অফিসিয়াল টাউট, ধর্মীয় ফ্যানাটিক, সামাজিক হিপোক্রেট এবং আরো নানাবিধ প্রভুদের দাসত্ব করে চলেছি তারা কোনকিছুর সমালোচনার নামে ব্যক্তিগত কুৎসা রটাই অথবা কিছু হলেই সেইসব পপুলিস্ট কথাবার্তা ব্যবহার করিতুমি যে এত কথা বলছো, এত সমালোচনা করছো তা তুমি দেশের জন্য করেছো কি, তোমার কি অবদান দেশের প্রতি ব্লা ব্লা কিংবা খালি তো কেবল সমালোচনা কর, কোন সমাধান তো দিতে পারোনা (যেন সমস্যাটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার মত মানুষে দেশটা ছেয়ে গেলো এবং সমাধান বুঝি সহজলভ্য কোন মেডিসিন, যা ফার্মেসিতে গেলেই পাওয়া যায়) তারা কিন্তু ইতিহাসের নিয়ম ভুলে যান। ইতিহাসের নিয়ম হলো, ইতিহাস তার নিজস্ব নিয়মে ভাস্বর হবেই, তা হতেই হবে। তাতে শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যেতে পারে কিন্তু তা অনিবার্য, আপাতদৃষ্টিতে কোন ব্যক্তি প্রচার মাধ্যমের কারণে এবং নানাবিধ প্রচারে যতই জনপ্রিয়তা পাক না কেন, আবার অন্যদিকে কোন মানুষ যতই সেসবের অভাবে মানুষের কাছ থেকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু থেকে বঞ্চিত হলেও ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যাচাই বাছাই হয়েই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে পৃথিবীতে কোন মানুষের কতটুকু অবদান। এই নির্মোহ ও নিরপেক্ষ পরীক্ষণ থেকে আমাদের কারোরই কোন রেহাই নেই, থাকতে পারেওনা।

কৃতজ্ঞতা:মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান (হলুদ হিমুর জাগো কর্মীরা এবং পুরুষতান্ত্রিক আক্রমণ)

মনজুরুল হক (মৃত্যুপ্রান্তরে জীবনের নিস্ফল দাপাদাপি এবং জীবিতদের বেঁচে থাকার উদগ্র বাসনা!)

এই সম্পর্কিত আরো কিছু লেখা:বাংলাদেশে এনজিওগুলোর “জনহিতৈষী খেলা”, শাসক শ্রেণীর দেউলিয়া চরিত্র এবং আমাদের চিন্তাগত দীনতা

জাগো” এবং আমার বন্ধুরা

জাগো ফাউন্ডেশ’ এর ‘হলুদ’ কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য বিবেচনা

মুখোশের আড়ালে অগণিত পরিমল……

মিডিয়া কর্তৃক শ্রেণী বৈষম্যের শিকার একটি পৈষাচিক হত্যাকাণ্ড

Advertisements
মন্তব্য
  1. Ranadipam Basu বলেছেন:

    ধন্যবাদ, বিশ্লেষণধর্মী ভালো লেখা।

    • mongoldhoni বলেছেন:

      ধন্যবাদ কমেন্টের জন্য। এ সম্পর্কিত অন্য লেখাগুলো পড়ে দেখার অনুরোধ রইলো…
      ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং যথাযথ যুক্তি দ্বারা রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিশ্লেষণই মঙ্গলধ্বনি’র উদ্দেশ্য…

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s