দৃঢ় চঞ্চু-বিদ্রোহী নখর-ঘনকৃষ্ণ বায়স

Posted: অক্টোবর 27, 2011 in প্রকৃতি-পরিবেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: রাজীব নন্দী

ছেলেটি ছুটছে। মুখে ঘাম। সুরে চটুল শিস। হাতে সদ্য ভাঙা আম গাছের লাঠি। হাত দশেক উঁচু গাছটি থেকে মাত্র নেমে এলো। খেয়াল করলাম, ছেলেটি যখন গাছ থেকে নামছে তখন প্রাণ ভয়ে উড়াল দিয়েছে খান চারেক কাক।

বাগানের অন্য প্রান্তে, অন্য গাছে তখন আরেক অভিনব তরুণ মরিয়া হয়ে কাকের বাসা থেকে ডিম নিতে ব্যস্ত। পাল্টা আঘাতে কাকও যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছাড়বার নয়। পাকড়াও করতে চাইছে তরুণকে। গাছের মগ ডালে বসা কাক পরাস্ত হল। নিচে তরুনটির বান্ধবীর হাততালি। তবে কি বান্ধবীর মন পেতেই কাকের ডিম বড্ড জরুরি ছিল তরুণের!

না। দিনভর হুল্লোড় সেরে এই তরুনতরুনীর দল যখন হাতে বইকাগজকলম নিয়ে কী জানি নোট করছে আর কাকের বাসার খোঁজে নিরন্তর ঢিল ছুড়ছে তখন বুঝতে বাকি নেই এর নাম ‘কাক গবেষণা’। আজ থেকে বহুকাল আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কাকের বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত জরিপ/গবেষণা কাজ চলছিল। কথা বলছিলাম এমন একজনের সাথে যিনি সেদিন আগ্রহী দর্শক হিসেবে ছিলেন গবেষকদের ঘিরে থাকা কৌতুহলীদের দলে।

চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ী এলাকা থেকে কাকের সন্তানের মুখে আহার তুলে দেয়ার একটি বিরল মুহুর্ত

এতকিছু থাকতে কাক কেন?

দৃঢ় চঞ্চু, বিদ্রোহী নখর, ঘনকৃষ্ণ বর্ণ। স্বজাতির বিপদে এগিয়ে আসা প্রাণীটির নাম কি? বিনীত উত্তরকাক! নাগরিক ভোরে কর্কশ কা কা স্বরে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় কাক। পক্ষী ভূবনের কোন এক বিচিত্র পরীক্ষার মেধা তালিকায় সর্বশীর্ষে থাকা এই কাক সারাদিনমান খাবার সংগ্রহের নেশায় থাকে মত্ত। ছোঁ মেড়ে মানুষের খাবার সাবাড় করে এনে সেই খাবার পরম মমতায় তুলে দেয় ছানার লাল টুকটুকে মুখে। প্রাকৃতিক ময়লাগার (ডাস্টবিন) খ্যাত এই কুৎসিত পাখি নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একদল শিক্ষার্থী করেছেন একাডেমিক গবেষণা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেশীয় পাখির আবাস ও জীবন যাপনের চিত্র উঠে এসেছিল এই গবেষণায়। ১৭ শ’ একরের এই ক্যাম্পাসে বিদেশী গাছের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং দেশীয় গাছের বনায়ন কম হওয়ায় কাকেরা আর আগের মতো বাসা বানাচ্ছে না বলে তারা মত দিয়েছেন। প্রায় পঞ্চাশেরও বেশি দেশীয় গাছের কাকের বাসায় উঠে ডিম পরখ করে নিশ্চিত করা হয়েছিল যে, কোন কোন গাছে দেশীয় গাছে পাখিরা এখনও বাসা বানাচ্ছে।

আজ বহুবছর পর কথা বলছিলাম ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনর্জাভেশন অফ নেচার’ (আইইউসিএন) বাংলাদেশ শাখার প্রকল্প সমন্বয়কারী ড. ইশতিয়াক সোবহানের সাথে। তিনি বললেন, মানুষের সঙ্গে টিকে থাকা পাখির মধ্যে কাকই অন্যতম। এটি নিজে টিকে থেকে মানুষকে পরিবেশের সাথে টিকিয়ে রেখেছে। দেখতে কদাকার হলেও এটি মনুষ্য বান্ধব প্রাণী।

মনুষ্য বান্ধব কিভাবে হলো এই কদাকারা প্রাণীটি? যেভাবে মরা ইদুর, বিড়াল, পঁচাবাসী খাবার নিয়মিত সাবাড় করে কাকসে তো বন্ধুই বটে! বন্ধুত্বের পরশে মানুষকে আরামে রাখলেও নিজের শরীরে ময়লা মাখামাখি থাকায় কাকের গা থেকে বেরোয় দুর্গন্ধ। অথচ অবাক হলেও সত্যি নিয়মিতই স্নান সারে এই কুসিৎ পক্ষী, পানিতেও ধুয়ে নেয় ঠোঁট! মানুষের নির্জনতা ভঙ্গ করার ওস্তাদ কাকের আবার নির্জনতা প্রিয়।

খড়, সরু ডাল, কাগজ টুকরা, পরিত্যক্ত দ্রব্য দিয়ে বুনে তারা বাসা। একদফায় দেয় ৪ বা ৫ টা সাদাটে ফিকে নীল রঙের ডিম। আর পরের সন্তান মানুষ করার মতো কাকের বাসায় চুপিসারে ডিম দিয়ে আসে কোকিল। ডিম আর বাচ্চার ক্ষতি সহ্য করতে পারে না এরা। একের বিপদে দশে মিলে জোট বেঁেধ কাঁপিয়ে তুলে পাড়া। কাকের বিপদে এগিয়ে আসে কাক, যখন মানুষের বিপদে মানুষই দাঁড়িয়ে দেখে তামাশা!

উত্তর আমেরিকার কাকের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এক গবেষণা হয়েছিল। প্রাণবিদ আর পশুআচরণবিদদের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে যে, অন্য যেকোনো পাখির চেয়ে বেশি সঞ্চয়ী এই পাখি। কাকেরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য প্রয়োগ করে হরেক রকম কৌশল। আবার অন্য পাখির মুখের গ্রাস কেড়ে নিতেও অতিশয় পটু এরা। অন্য পাখির বাসা থেকে ডিম চুরি; সেতো নস্যি। আর এসব কাজ দলবদ্ধভাবে করে বলে কাকেরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য অধিকতর কৌশলী হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন প্রাণিবিদরা। আর এসব কাজে তারা দড়ি, লোহার শিক, কাঠি আর পাথরের ব্যবহার করে থাকে। খাদ্য সঞ্চয়ের জন্য এদের রয়েছে অভিনব পদ্ধতি। যে কোনো খাবার পেটুকদের মতো একবারেই না খেয়ে খানিকটা লুকিয়ে রাখে! আর লুকানোর স্থান নির্বাচনে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের কাকরা নাকি তেমন সতর্ক নয়। কিন্তু উত্তর আমেরিকার কাক এ বিষয়ে অনেক সতর্ক। এমন জায়গা তাদের পছন্দ, যেখানে তার জ্ঞাতি ভাইয়েরাও হানা দিতে না পারে।

ভাবতে অবাকই লাগে, মানুষই শুধু নয়, প্রাণিজগতের এই অভিনব সঞ্চয়কারী প্রাণি কতই না ভবিষ্যতের চিন্তায় মগ্ন। আচ্ছা, এসব প্রাণীর কাছেই কি মানুষ সঞ্চয় শিখেছিল? আগামী ৩১ অক্টোবর বিশ্ব সঞ্চয় দিবস। কাকেরা তো আর মানুষ নয়, যে দিবসটিকে বিশ্বসম্মেলনের মাধ্যমে পালন করবে! করলে সম্মেলনে গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম। সেদিন হয়তো উত্তরও মিলেতো!

কথা শেষ করবো কাক নিয়ে একটি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ দিয়ে। জীবনে তখন সবে কৈশোর। চট্টগ্রাম কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের সিড়ি ডিঙ্গোছিলাম তখন। বন্ধুদের মধ্যে নানা রকম মেজাজের ভিড়। কারো মন ভালো, কারো মন খারাপ, কারো পড়ার চাপ, কেউ আবার বান্ধবীকে ছাড়া ‘বাঁচা সম্ভব নয়’ বলে ভাবতে শুরু করেছে। কেউ বাবার শিখিয়ে দেয় এইম ইন লাইফ রচনা মুখস্ত করে পরীক্ষা পাশ করছে।কেউ পেটুক। কেউ বাম রাজনীতির লিফলেট গুজে দিয়ে যাচ্ছে পকেটে। কেউ উদাস। হইহট্টগোলময় বন্ধুকোলাহলে একজন উদাস বন্ধু আমার নজর কেড়ে নিলো। চেহারা দেখে বুঝি বন্ধু আমার প্রিয়া বিরহে কাতর। কিন্তু একি? বন্ধুতো পরজন্মে কাক হয়ে প্রতিশোধ নিতে চায়। চাপা কৌতুহল, কিছুটা রম্য আর হালকা উত্তেজনা নিয়ে প্যারেড কর্নারে একদিন সে আমাকে শুনিয়েছিল

এবার আমি কাক হবো, কাকই হবো,

তোমার প্রিয় সবুজ শাড়ি

আবার যখন রোদ পোহাবে

তাতে আমি ইচ্ছে মতো,

সাদা কালো রঙ ছেটাবো!”

ছবিবন্দী করেছেন: মাসুম হাবিব। হাবিব একটি জাতীয় দৈনিকের আলোকচিত্রী সাংবাদিক।

(প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ছবি ও লেখাটি একটি জাতীয় দৈনিক থেকে প্রত্যাখ্যাত।)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s