সাধারণের মৃত্যু ও অসাধারণের মৃত্যু বা মৃত্যু নিয়ে যখন মশকরা করতে ইচ্ছা করে

Posted: অক্টোবর 18, 2011 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , ,

লিখেছেন: যীশু মহমমদ

(যেই দিন তারেক মাসুদের গাড়িতে ৫ জন মরেছে সেই দিন পাবনায় বাস উল্টে আরো ৫ জন মরেছে। আগের দিন উত্তরায় র‍্যাব মেরেছে আরো ৫ জন। ৫++= আমরা চিনেছি ১জনকে। মৃত্যুর রাজনীতি আছে, শ্রেণী বিভাজন আছে। বিলকুল আছে।)

মৃতদেহ কাঁধে তুললে কতোটা ওজনতুমি এখনো জানো না

দুহাতে ছড়াও খইলঘু শোক,

সাদা ও প্রতীকী

কিঞ্চিত বিষণ্ন হয়ে ভাবো, খুব অংশ নেয়া হলো

মৃতদেহ কাঁধে তুললে কতোটা ওজনতুমি কিছুই জানো না

রনজিৎ দাশ, কবিকে

অসাধারনের মৃতুতে আমরা সাধারণেরা কেঁদে বুক ভাসাই। কিন্তু, সাধারণের মৃত্যুতে অসাধারণে ভূমিকাটা কেমন? মৃত্যুর কি কোন সাধারণ ও অসাধারণের যোগবিয়োগ আছে? বা খ্যাত ও অখ্যাত?

যে কৃষকটি কিংবা যে গামেন্টস শ্রমিকটি কিছু দিন আগে ও কিছু দিন পরে মরেছে ও মরবে সেই মৃতমুখগুলোকে আমরা কোন চিহ্নে চিহ্নিত করবো?

যিনি কবিতা লেখেন, যিনি সিনেমা করেন, যিনি নেতামি করেন তারা সবাই মরবে; —হোক সে অকাল মুত্যু, হোক সে অপঘাতে মৃত্যু, আত্মঘাতী মৃত্যু কিংবা বয়সের ভারের মৃত্যু। কবিতা লেখা, সিনেমা করা, নেতামি করার ‘গুণ’এ গুণান্বিতকে যদি অসাধারণের মৃত্যু বলি তবে কি— যিনি ধান রোপন করেন, যিনি নাও বেয়ে বেড়ান, যিনি কাপড় বুনেন তাদের মৃত্যুকে কি সাধারণের মৃত্যু বলবো? —হোক সে অকাল মৃত্যু, হোক সে অপঘাতে মৃত্যু, আত্মঘাতী মৃত্যু কিংবা বয়সের ভারের মৃত্যু। মৃত্যুর ও মৃতের তো সাধারণ অসাধারণ তকমায় পরিচয় হবার কথা ছিল না, মৃত্যু মানেই মর্মান্তিক। মৃত্যু মানেই বেদনার ভার।(জীবন যেমন সাম্য চায়, মৃত্যুও তার সাম্য চায়। আর যেই দিন মৃত্যুর সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে সেই দিন মৃত্যু পরমহয়ে উঠবে।)

খোদ ধান রোপা, নাও বাওয়া, কাপাড় বুনন কারা কি ‘গুণ’ বা শিল্প বিশেষ? কেন কবিতা লেখাকে আমরা ‘গুণ’ বা ‘শিল্প’ হিসেবে জানবো কিন্তু ধান ফলানোকে নয়? কবিকে গুণীজন সম্মোধন করে মাথায় তুলে নাচবো, কেন চাষীকে নয়? চাষী কি ধান রোপন করতে করতেই গান বাঁধতে জানে না, নাও বাইতে বাইতে মাঝি কি কখনো গান বাঁধে নাই? এখনও কি গান বান্ধে না, গায় না? প্রশ্ন উঠুক, চাষাভূষা, মাঝিমাল্লা, তাঁতি কিংবা গার্মেন্টস কর্মীকে আমরা কোন গুণে ‘গুণান্বিত’ করবো? সাধারণ না অসাধারণ? গুরুত্বপূর্ণ না অগুরুত্বপূর্ণ? তাদের মরা ও আধমরা মুখের আর্জি অনুভব করে উত্তর দিন। আমি ধরে নিচ্ছি যারা উত্তর দিতে সচেষ্ট হবেন তারা অন্তত নিজেরা নিজেদের জন্মদাগ সম্পর্কে সচেতন।

অস্বীকার করার জোঁ নাই— যে কোন জীবন অর্থাত জন্ম মাত্রই গুণবাচক ধারণা। যেই কোন শিশুর জন্ম আমাদের জীবনের আকুতি বাড়ায়। এবং মৃত্যুসেও আমাদের দীর্ঘায়ু কামনা করে।

জন্মে কারো হাত নেই, তাই তার শ্রেণীকরণও নেই। কিন্তু জন্ম পরবর্তী ‘যাপন’ থেকে শুরু করে মরনের খাটিয়ায় চড়া পর্যন্ত আমরা শ্রেণীকরণ দেখি। যাপনের শ্রেণী আছে, আছে মৃত্যুরও শ্রেণীকরণ। উপস্থিত বৈষম্যের সামজটাই তার সাক্ষ্যি।

কাজেই, বাংলাদেশ নামক মৃত্যু উপত্যকায় মানুষ মেরে ফেলা যেমন সহজ, তেমনি মৃত্যু নিয়ে নাঁকি কান্নাও সহজ। কে কখন কাঁদেন এবং কে কার জন্য কাঁদেন তাও খেয়াল করা উচিত।

যখন কোন ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ নিয়ে বিলাপের শ্রেণীকরণ হয় তখন যেই কোন ‘অপঘাতে মৃত্যু’ নিয়েও প্রতিবাদের শ্রেনীকরন হয়। নিজের শ্রেণীর কেউ ক্ষতিগ্রস্থনা হওয়ায় প্রতিপক্ষ শ্রেণী বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টার লক্ষণ শ্রেণী সমাজে উপস্থিত আছে। এর ভয়ংকর পরিনতিও আছে।

চাষাভূষার মৃত্যু হলে সেটা সাধারণ মৃত্যু, আর কোন ‘শিল্পী’র মৃত্যু হলে সেটা অসাধারণ মৃত্যু। অপূরণীয় ক্ষতি। শিল্পী কি শ্রেণীর উর্ধ্বে, তার গায়ে কি শ্রেণীর গন্ধ নেই? অথচ আমরা জানি, চাষাবাদ বড়ই উত্তম শিল্প। শ্রমিক মাত্রই শিল্পী, মনীষী, সৃজনশীল। কিন্তু, বহু কাল আগেই শ্রমিকের শ্রম সম্পর্কিত সমস্ত ‘রস’সত্ত্বা(শিল্প বা নন্দনসত্ত্বা) লুটে নিয়ে, পান করে যারা উপরি রসিক(শিল্পী বা নন্দনতাত্ত্বিক) হইতে ইচ্ছা প্রকাশ করছে, তারা কারা? এই প্রশ্নের কূল পাই আর না পাই তাতে এই মূহুর্তে বিশেষ ক্ষতি নেই। কিন্তু মৃত্যু ভুলে গেলে জন্মের ক্ষতি আছে। মৃত্যুকে তাই জয় করবার সাধনার দরকার আছে।

এজন্যই, বারংবার প্রশ্ন উত্থাপিত হোক, মৃত্যুতে মৃত্যুতে ফারাক কিসের? কোন কোন মৃত্যু আমাদের কাছে সাধারণ আর কেনইবা কোন কোন মৃত্যু আমাদের কাছে অসাধারণ ক্ষতি বলিয়া গণ্য হয়? যে মৃত্যু অসাধারণ ক্ষতি বয়ে আনে সেই মৃতের সাথে আমাদের সম্পর্ক কি? আমি চাই এইসব প্রশ্নে নাঁকি কাঁদুনেরা আহত হোক। এবং মৃত্যুর লাভক্ষতির খতিয়ান ঘেঁটে আমরা আরো জানতে চাই, ‘অসাধারণত্ব’ বলেতেই বা কে কি বুঝে লয়ে জগতে খায়দায়ঘুমায়পায়খানা করে।

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না

এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না

এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না

এই রক্তাক্ত কসাইখানা আমার দেশ না

নবারুন ভট্টাচার্য

ফি বছর লঞ্চ ডুবিতে, বাসট্রাক খাদে পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে যারা মরে তাদের প্রাণের দর কত? একটি ছাগল? ১ হাজার টাকা? গার্মেন্টস কারখানায় আগুন ধরিয়ে বীমা কম্পানী থেকে মালিক ‘আসল’ বের করে নেন কিন্তু শ্রমিকের জীবন কি শুধুই সুদের কারবার? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাদের ডাকাতচরমপন্থীছিনতাইকরী নামে খুন করে তাদের মৃত্যুর বদলা কি? গণপিটুনিতে মৃতের দায় কার? ছাত্রলীগ ছাত্রদল নামের আসল ডাকাতমাস্তানখুনিদের হাতে যেই লাশ গুম হয়ে যায় তাদের নামধাম নাইবা জানলেন কিন্তু সেইসব লাশের সাধারণত্ব অসাধারণত্ব সম্পর্কে বলুন। লিমন, কাদেরের ‘সাধারণ’ পায়ে আপাতত বুলেট ঠুঁসে বা চাপাতির ধার পরিক্ষা করা হলো কিন্তু যেই দিন কল্লা কাটা হবে সেদিনও কি আপনারা সাধারণের জীবন গেলো বলে জিহ্বায় সামান্য আপসোসের সুর তুলেই দায় সারা হতে চাইবেন?

চাষাভূষারা তো ‘সাধারণ’তাদের মৃত্যুতে কার কি আসে যায়? তাদের দরদাম হয় একটি ছাগল বা উর্ধ্বে এক হাজার টাকার সাথে। কিন্তু যারা ‘অসাধারণ’, ‘সেলিব্রেটি’, আপন শ্রেণীভুক্ত তাদের অপঘাতে মৃত্যুতে ()সামান্য ‘ইস্’ উচ্চারণ করলে, গাঢ় কালো পতাকা টাঙ্গালে ও গভীর শোক প্রকাশে দায় শেষ হয় কি? যদি তাই হয় তাহলে মৃত্যু আপনার দিকেই তেড়ে আসছে।

রাষ্ট্রের এই খুনে চরিত্রের সামনে কিভাবে কতদিন দাঁড়িয়ে থাকবেন নিজেকে প্রশ্ন করুন। কেননা, খুনে রাষ্ট্রের চক্করে খেটে খাওয়া মানুষেরা শিকার হতে হতে তা আজ আপনাকেও মৃত্যুর ফাঁদে ফাঁসাতে চাইছে। এই ‘আপনি’ মধ্যবিত্ত। মনে রাখবেন, এই রাষ্ট্র জীবন চেনে না, লাশের গন্ধে সে বেঁচে থাকে।

রাষ্ট্র বিমূর্ত কোন বিষয় নয়, সে ধনিক শ্রেণীর আশাআকাঙ্ক্ষার সংগঠিত রূপ; অতএব, সেই শ্রেণীর ‘দাম্ভিক হুঙ্কার’টাই সর্বত্র বিরাজ করে। যে আমাকে অধীনস্থ করে, মানবোচিত সত্ত্বার উপর খবরদারি করে, যে আমাকে তার আইনে বিচার করে, মৃত্যুদণ্ড দেয়, যে আমাকে ছলেবলে কৌশলে বিষ খাইয়ে মুনাফা কামায়, শারীরি ও মানসিক দু’ভাবেই হেনস্থা করেসেই হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শকারকাখানার জাদুর কাঠি নেড়েচেড়েই র‍্যাবপুলিশ নামক দৈত্যদানব থেকে শুরু করে সমস্ত সমাজ কাঠামোটাকে ভয়ংকর গর্তে রূপান্তরিত করে যারা তারা মানববিরোদ্ধ জান্তব প্রাণীগণ। এরাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রই এরা।

স্বার্থ, সুবিধা অনুযায়ী শাসক শ্রেণী যেমন বেপোরোয়া তেমনি তার স্বার্থের সমাজটাও সে বেপোরোয়াই রাখে। খাদাখন্দে ভরে রাখে। তাতে তার লাভ অনেক। আপনি প্রতিবাদ না করে খাদ এড়িয়ে চলতে চাইবেন তো একে একে আপনাকে সেই বেপোয়ারা খাদেই পা দিতে হবে।

ও জীবন, জীবনরে

ছাড়িয়া যাইস না মোরে

তুই জীবন ছাড়িয়া গেলে

আদর করবে কে

জীবনরে

প্রতীমা বড়ুয়া পাণ্ডে’র কণ্ঠে গান

রাজআয়েশ ছেড়ে ছুঁড়ে সিদ্ধার্থ বনেজঙ্গলে ঢুকে অনেক গুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বোধিবৃক্ষের তলে ধ্যাণে বসেছিলেন। যেমন: মৃত্যু কি? এবং তাকে জয় করবার উপায় কি? আমরা এখানো সেই রকম ভাবে উত্তর ও উপায় খুঁজতে ষ্পষ্ট দার্শনিকতায় প্রবেশ করিনি, কেননা, আমরা এখনো তেমন কোন বোধিবৃক্ষের দেখা পাইনি, কিংবা আমাদের মগজে আমরা এমন কোন বোধের চারাগাছ পুঁতি নাই।

আমরা উত্তর ও উপায় অন্বেষণ নাকরেই মরতে জানি। আসলে আমারা জীবন’ই ধারণ করিনি। আমারা জীবিতের মতোন মাত্র। আমারা মানুষের মতোন মাত্র। বা আমরা এখনো ‘মানুষ’ হই নি। তাই পথেঘাটে, প্রান্তিকে পড়ে থাকা লাশ দেখেও নিজেকে সনাক্ত করতে পারি না। আমরা আয়নায় ইগো’কে দেখি, মানুষের মুখচ্ছবি যা প্রকৃত আয়না তাতে নিজেকে দেখি না; তাই আমরা আত্মতত্ত্বও জানি না।

অথচ, দীর্ঘ মৃত্যুর অভিজ্ঞাতা সাথে নিয়ে মানুষ মৃত্যুকে ডিঙ্গাতে চাইছে। যেই দিন জগতে জীবনের অপমৃত্যু ঘটবে না, যেই দিন মৃত্যুর দায় মৃতদের উপরেই চাপিয়ে কেউ পালায়ন করবে না, যেই দিন মৃতের পরিচয় সাধারণ আর অসাধারণত্বের বিচারে হবে না, অখ্যাত আর বিখ্যাতের ব্যাবধান তৈরী করবে না –সেই দিন মানুষের দিন। এবং ‘মানুষ প্রতিদিন জীবন গড়ে, মানুষ প্রতিদিন নতুন জীবন গড়ে’।

কিন্তু, মৃত্যু ও অপমৃতুকে নিয়তি ভেবে আমরা যখন দুঃস্বপ্নকেই আলিঙ্গন করি, মেনে নেই, তখন দেহের বদলে দেহের ছায়াকেই বাস্তবজ্ঞান করি। নিজের হাতের বন্দুক নিজের দিকেই তাক করে ধরার মতো কাণ্ড। তাতে এই পরিষ্কার হয়, যে অপঘাতে মরেছে সে মরেছে অপঘাতের বিরোদ্ধ আমাদের প্রতিরোধহীন থাকার কারণেই। আর আমরা যত বেশী প্রতিরোধহীন ততবেশী মৃত্যুমুখি।

অবশেষে এই আকুতি জানাই, আমিও চাষার পুত মরিলে কাঁদিস ভাই।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s