ল্যাটিন আমেরিকার তাম্বোগ্রান্দে – আরেক ফুলবাড়ি

Posted: অক্টোবর 18, 2011 in আন্তর্জাতিক, প্রকৃতি-পরিবেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: কল্লোল মোস্তফা

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পেরুর রাজধানী লিমা থেকে হাজার মাইল দূরের পিউরা রাজ্যের সান লরেঞ্জো ভ্যালির একটি ছোট্ট শহর তাম্বোগ্রান্দে। বাংলাদেশের রাজধানী থেকে শত মাইল দুরে দিনাজপুর জেলার একটি ছোট্ট শহর যেমন ফুলবাড়ি। ফুলবাড়ির মতোই তাম্বোগ্রান্দে শহর গড়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক জনপদকে ঘিরে। মাত্র অর্ধ শতাব্দি আগেও যে তাম্বোগ্রান্দেও চারপাশটা ছিল মরুময়, আজকে তার চারদিকের ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষকের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে এক সবুজ মরুদ্যান যেখান থেকে পেরুর স্থানিয় চাহিদা মেটানোর পরও প্রতিবছর ইউরোপ আমেরিকায় রপ্তানি করা হয় ৫০ হাজার মেট্রিকটন আম। আম ও লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত এ অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক উৎপাদন থেকে আয় হয় বছরে ৪০ মিলিয়ন ডলারেও বেশি। কিন্তু ফুলবাড়ি ও তার চারপাশের কৃষিজমির নীচের কয়লা যেমন হঠাৎ করে ফুলবাড়িবাসীর অস্তিত্বের জন্য হুমকী হয়ে উঠে, তাম্বোগ্রান্দের ঠিক নীচেই সোনা আবিস্কার হলে লন্ডন ভিত্তিক বহুজাতিক এশিয়া এনার্জির মতোই কানাডা ভিত্তিক বহুজাতিক খনি কোম্পানি ম্যানহাটন মিনারেলস এর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তাম্বোগ্রান্দের উপর। এলাকাবাসীর মতামতের তোয়াক্কা না করেই পেরুর সরকার তাম্বোগ্রান্দেকে উন্মুক্ত খননের জন্য লিজ দিয়ে দেয় ম্যানহাটন মিনারেলস এর কাছে।

আরেক ফুলবাড়ি তাম্বোগ্রান্দে

১৯৯৯ সালের এক সকালে তাম্বোগ্রান্দেবাসী জানতে পারেন তাম্বোগ্রান্দের চারপাশের ১ বর্গকিমি এলাকা জুড়ে উন্মুক্ত খনন করা হবে, ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে চলমান আম ও লেবু চাষের পরিবেশ নষ্ট করা হবে, তাদের শহরের মোট ১৬ হাজার অধিবাসীর অর্ধেককে উচ্ছেদ করা হবে। বিনিময়ে তাদের জন্য বরাদ্দ সোনার খনিতে ৩৫০ টি কর্মসংস্থান, উচ্ছেদকৃতদের জন্য নয়া আবাসস্থল এবং তাম্বোগ্রান্দে এলাকাভিত্তিক কিছু উন্নয়ণ কর্মকান্ড। সান লরেঞ্জোভ্যালির আশপাশের অন্যান্য খনির অভিজ্ঞতা থেকে তাম্বোগ্রান্দেবাসী ভালো করেই জানে পুরো এলাকার মাটিপানিপরিবেশর উপর উন্মুক্ত খননের সম্ভাব্য প্রভাব কি হতে পারে। তাদের সামনে রয়েছে অ্যানকাশ রাজ্যে বহুজাতিক বিএইচপি ও মিশুবিশি’র মালিকানাধিন ”অ্যান্তামানিয়া” কপার মাইন, কাজামার্কা রাজ্যে বিশ্বব্যাংকনিউমন্টমাইনিং কোম্পানির মালিকানাধীন ইয়ানাকোচা, জুনিন এলাকার মেটালরোয়া, কুজাকো এলাকার ’তিনতায়া’ ইত্যাদি খনির ধবংসযজ্ঞের অভিজ্ঞতা। ফলে তারা ফুলবাড়িবাসীর মতোই প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করে, গঠন করে ”তাম্বোগ্রান্দে রক্ষা ফ্রন্ট”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে শুরু হয় ম্যানহাটন মিনারেলস এর মুনাফার ধান্দার বিরুদ্ধে তাম্বোগ্রান্দেবাসীর জীবন ও জমি রক্ষার লড়াই। একদিকে তাম্বোগ্রান্দের আম ও লেবুচাষী অন্যদিকে বহুজাতিক ম্যানহাটন ও তার পেরুভিয়ান দালাল যাদের মধ্যে এমনকি পেরুর তৎকালিন প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরিও ছিলেন।

সাধারণ মানুষের প্রতিরোধে তাম্বোগ্রান্দে ছেড়ে পালিয়েছিলো বেনিয়া কোম্পানি

পেরুর খনি আইন অনুসারে সীমান্তবর্তীদেশ ইকুয়েডরের ৫০ কিমি এর মধ্যে কোন খনি কার্যক্রম চালানো নিষিদ্ধ ছিল। তাম্বোগ্রান্দে এই খনননিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে পড়লেও ফুজিমোরি এক বিশেষ প্রেসিডেন্টসিয়াল অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই খনন কার্যক্রমের বৈধতা প্রদান করে এবং সেই সাথে তাম্বোগ্রান্দে উন্মুক্ত খনন প্রকল্প, যেখানে পেরুর অংশীদারিত্ব মাত্র ২৫%, সেটাকে রাষ্ট্রীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করে। এই অধ্যাদেশ জারির একবছরের মাথায় ফুজিমোরিকে বিপুল অর্থ লুটপাট, নির্বাচনে কার্চুপি ও দুর্নীতির অভিযোগে তীব্র গণঅসন্তোষের মুখে পেরু ত্যাগ করতে হয়। পরবর্তীতে পেরুর প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসে আলেহান্দ্রো তলেদো। তলেদো ফুজিমোরির বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাম্বোগ্রান্দেবাসীর উন্মুক্ত খনন বিরোধী আন্দোলনের সাথে একাত্মতা জ্ঞাপন করলেও পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসার পর সেসব বেমালুম ভুলে গিয়ে ফুজিমোরির মতোই ম্যানহাটন মিনারেলস এর হয়ে ”জাতিয় গুরুত্বপূর্ণ” উন্মুক্ত খননের তৎপরতা শুরু করেন। এমনকি তলেদো’র পর ২০০৬ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অ্যালান গার্সিয়াও একই ভাবে বহুজাতিক তোষণে লিপ্ত। যেমন ২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার আমলে এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খননের বিরুদ্ধে ফুলবাড়িবাসীর আন্দোলনের প্রতি তৎকালিন বিরোধী দলীয় নেতৃ শেখ হাসিনা সমর্থন জানালেও, বর্তমানে তিনি ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই নতুন করে বড়পুকুরিয়া সহ ফুলবাড়ি এলাকায় উন্মুক্ত খননের পায়তারা শুরু করেছেন!

২০০১ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে তাম্বোগ্রান্দের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এলাকবাসী মিছিল নিয়ে এসে ম্যানহাটন মিনারেলস এর স্থানীয় অফিস তছনছ করে দেয়, ম্যানহাটন অফিস গুটিয়ে আশ্রয় নেয় রাজ্যের রাজধানী পিউরা’তে এবং সেখান থেকে উন্মুক্ত খননের পায়তারা করতে থাকে। এ ঘটনার ১মাসের মাথায় ম্যানহাটন মিনারেলস এর ভাড়াটে খুনিদের হাতে নিহিত হয় তাম্বোগ্রান্দে রক্ষা ফ্রন্টের অন্যতম নেতা গডফ্রেডো গার্সিয়া। গার্সিয়া তার স্থানিয় পরিবেশ ও কৃষি সম্পর্কিত অগাধ জ্ঞান ও বক্তৃতা দেয়ার দুর্দন্ত ক্ষমতার কারণে তাম্বোগ্রান্দে উন্মুক্ত খনন প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ এবং ম্যনহাটন মিনারেলস এর আক্রমণের প্রধান লক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। এরপর আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে উঠে এবং একপর্যায়ে রাজধানী সহ সারা পেরুতেই তাম্বোগ্রান্দেবাসীর আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে উঠে।

তাম্বোগ্রান্দেবাসী তাদের অস্থিত্ব রক্ষার সংগ্রামের অংশ হিসেবে উন্মুক্ত খননের বিরুদ্ধে দুনিয়ার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। ২০০২ সালের ২রা জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে উন্মুক্ত খননের বিরুদ্ধে ভোট পড়ে ৯৮ শতাংশ। উন্মুক্ত খননের বিরুদ্ধে তাম্বোগ্রান্দেবাসীর এই ঐতিহাসিক রায়ের পর তাম্বোগ্রান্দের আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় ল্যাটিন আমেরিকারই আরেক দেশ আর্জেন্টিনার এসকুয়েল অঞ্চলের অধিবাসীরা কানাডার আরকে কোম্পানি মেরিডিয়ান গোল্ড এর একটি উন্মুক্ত সোনার খনির বিরুদ্ধে ২০০৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রায় প্রদান করে। অথচ পেরুর শাসক শ্রেণীর টনক নড়ে না। ম্যানহাটন মিনারেলস ও তার স্থানীয় দালালদের তৎপরতা থামেনা। বাংলাদেশে ২০০৬ সালের ২৬ আগষ্ট ফুলবাড়ি গণআন্দোলনের পর ফুলবাড়িবাসী ও সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে ৩০ আগষ্ট উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধকরে ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও যেমন ভাবে শাষক শ্রেণী পরবর্তি সময়ে এই চুক্তির আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, একই ভাবে পেরুর শাসক শ্রেণীও ম্যানহাটন মিনারেলস এর পক্ষ নিয়ে উন্মুক্ত খননের বিরুদ্ধে তাম্বোগ্রান্দেবাসীর দেয়া ঐতিহাসিক নির্বাচানী রায়ের আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে কুতর্ক তোলে এবং সরকারীভাবে উন্মুক্ত খননের ব্যাপরে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য এক শুনানির আয়োজন করে। উন্মুক্তখনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক নির্বাচনী রায়ের পরও এই শুনানি আয়োজনকে তাম্বোগ্রান্দেবাসী প্রহসন বলে আখ্যায়িত করে এই শুনানি প্রতিহত করতে টানা তিনদিনের হরতাল আহবান করে। হরতালে সমস্ত রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়া হয়, হাজার হাজার তাম্বোগ্রান্দেবাসী রাজধানীতে আম আর লেবু হাতে মিছিল করে শ্লোগান তুলে কৃষিকে ’হ্যা’ বলো, খনি কে ’না’!

জনগণের এই তীব্র প্রতিরোধের মুখে শুনানি বাতিল হয়ে যায় এবং এর এক মাসের মাথায় পেরুর সরকার কারিগরি ও অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়ে ম্যনহাটন মিনারেলসকে তাম্বোগ্রান্দে প্রজেক্টের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে। ফুলবাড়ি আন্দোলনের পর লন্ডনের শেয়ার বাজারে এশিয়া এনার্জির শেয়ারের যেমন দরপতন ঘটে, একই ভাবে কানাডার শেয়ার বাজারেও ম্যানহাট মিনারেলস এর শেয়ারের ধক্ষস নামে। অবশ্য ম্যনহাটন মিনারেলস এখনও সোনার আশা ত্যাগ করেনি, বাংলাদেশে এশিয়া এনার্জির তৎপরতার মতোই তারা পেরুতে তাদের লবিং গ্রুপিং জারি রেখেছে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তাম্বোগ্রান্দের সোনা উত্তোলনের জন্য। ফুলবাড়িবাসীর মতোই তাম্বোগ্রান্দেবাসী এসব তৎপরতা রুখে দাড়ানো ব্যাপারে দৃঢ প্রতিজ্ঞ।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s