ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি বিতর্ক

Posted: অক্টোবর 18, 2011 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , ,

লিখেছেন: কল্লোল মোস্তফা

বিতর্ক চলছে ভারতীয় চলচ্চিত্র বাংলাদেশের সিনেমা হলে প্রদর্শনের জন্য আমদানীর অনুমতি নিয়ে। সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে ঈদউলফেতরের পর সেপ্টেম্বর মাসে ‘জোর’, ‘সংগ্রাম’ ও ‘বদলা’ নামের তিনটি ভারতীয় বাংলা ছবি বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হবে। এর আগে গত ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় ছবি আমদানি ও প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের অনুমতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি নীতিমালায় এ বিষয়ক বিধিনিষেধ তুলে নেয়। কিন্তু দেশীয় চলচ্চিত্রের পরিচালকপ্রযোজক ও শিল্পী কলাকুশলীদের আন্দোলনের মুখে সরকার ভারতীয় ছবি আমদানির ওপর পুনরায় বিধিনিষেধ আরোপ করে।সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমদানিকারক ও প্রদর্শকরা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন জানান। আদালতের নির্দেশে উল্লেখিত সময় যেসব ছবি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয় সেসব ছবিকে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড ও তথ্য মন্ত্রণালয় অনাপত্তিপত্র দেয়। এই অনাপত্তিপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ‘জোর’, ‘সংগ্রাম’ ও ‘বদলা’ নামের তিনটি ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি করা হয়। ছবি তিনটি সেন্সর বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেলেই এ তিনটি ছবি বাংলদেশের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনে বাধানিষেধ থাকবে না। এই তালিকায় রয়েছে আরো নয়টি ভারতীয় ছবি। এসবের মধ্যে আছে বলিউডের সুপারহিট ছবি সোলে, দিলওয়ালা দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে, দিল তো পাগল হ্যায়, কুছ কুছ হোতা হ্যায়, কাভি খুশি কাভি গম, ধুম, ডন, ওয়ান্টেড ও থ্রি ইডিয়টস। প্রেক্ষাগৃহে এভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের বিরোধিতা করে আবারও আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি সহ চলচ্চিত্রাঙ্গনের কলাকুশলীদের অন্যান্য সংগঠন।

সূত্র: http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=e360396f035a2fe220cde0ac94c411eb&nttl=52106

অন্যদিকে, ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির পক্ষ নিয়ে একধরণের প্রচারণা গত বছরও হয়েছে, এবারও হচ্ছে। তাদের বক্তব্য হলো বাংলাচলচ্চিত্রকে চল্লিশ বছর ধরে প্রটেকশান দেয়া হচ্ছে এবং তার ফলাফল ভালো হয়নি। তারা মনে করছেন প্রটেকশান দেয়ার কারণেই আজকের এই খারাপ অবস্থা, কারণ:”বাংলাদেশী ছবির প্রযোজকরা জানেন, তারা যা তৈরি করবেন দর্শকদের তাই দেখতে হবে। দর্শকদের হাতে কোনো বিকল্প নেই।” ফলে তাদের কথা অনুসারে সারভাইভাবাল অব দ্য ফিটেস্টের নিয়মেই চলচ্চিত্রকে প্রতিযোগীতা করেই টিকতে হবে এবং প্রতিযোগীতার মাধ্যমেই নাকি ছবি ভালো হবে। তারা আরও মনে করেন মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চলচ্চিত্র আমদানী আইনকরে বন্ধকরে রাখা যায়না, এটা নাকি ভন্ডামি!

এখন প্রশ্ন হলো, আসলেই কি দর্শকের হাতে কি কোন বিকল্প নেই কিংবা আসলেই কি বাংলা ছবিকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রটেকশান দেয়া হয়েছে? এবং এই প্রটেকশানের কারণেই বাংলাছবির এই খারাপ অবস্থা? আসলেই কি উপযুক্ত প্রতিযোগীতার মুখে পড়লে বাংলাছবির মানোন্নয়ন হয়ে যাবে? আসলেই কি বাজার অর্থনীতিতে সবকিছু উন্মুক্ত থাকে, বাজারের অদৃশ্য হাতের জাদুতে চলে?

প্রথমত, ধরা যাক, প্রোটেকশান বা প্রতিযোগীতাহীনতাই সকল সমস্যার মূল। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন তূলতে হয়, স্বাধীনতার পরের ৪০ বছর জুড়ে কি চলচ্চিত্র নিরঙ্কৃশ প্রতিযোগীতাহীন ছিল? বিগত দুই দশকে স্যাটেলাইট চ্যানেল এর সাথে কি চলচ্চিত্রকে প্রতিযোগীতা করতে হয়নি? নাকি প্রতিযোগীতা কেবল হলে সিনেমা দেখালেই হয়? সে প্রতিযোগীতার ফলাফল কি? পাঠক, লক্ষ করলে দেখবেন, বাংলাদেশের সিনেমার মান দ্রুত গতিতে একটি বিশেষ দিকে মোড় নেয় ৯০ এর দশক থেকে যখন কারিগরী এবং অর্থকরী উভয় দিক দিয়েই ইতিমধ্যেই ভীষণ দুর্বল বাংলা সিনেমাকে হলিউডবলিউডের সাথে অসম প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হতে হয়েছে।বাংলা সিনেমার ঢাল নাই তলোয়ার নাই। রাষ্ট্র চলচ্চিত্র শিল্পের প্রয়োজনে একটা চলচ্চিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত গড়ে তুলেনি। কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রের কোন কোর্স নাই, গবেষণা নাই। চলচ্চিত্র নির্মানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের কোন সংস্থান নাই। এ অবস্থাকে কি সংরক্ষণ বলে নাকি বড়জোড় বন্দি করে গলা টিপে মেরে ফেলার আয়োজন বলে? ফলে সে সময় বলিউড/হলিউডের “নান্দনিক নগ্নতা” আর “সাইফাই ভায়েলেন্সের” সাথে কি নিয়ে প্রতিযোগীতা করবে ঢালিউড, মোটা দাগের অনুকরণ ছাড়া আর কিই বা অবলম্বন তার কাছে ছিল।

দ্বিতীয়ত, আরেকটা বিষয় বেশ ইন্টারেস্টিং। বাংলাদেশের মূল ধারার বিপরীতে উপমহাদেশীয় বিশেষত ভারতীয় মূলধারার ছবিকে দাড় করানোর ক্ষেত্রে ধরেই নেয়া হচ্ছে বলিউড ঢালিউডের চেয়ে উন্নত রুচির। এবং মুক্ত বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে এই উন্নত রুচির সাংস্কৃতিক পণ্য মধ্যবিত্ত দর্শককে হলমুখী করবে এবং ফলে হল মালিকদেরও একটা গতি হবে এবং চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। গুণগত অর্থে হলিউডবলিউডঢালিউডের মধ্যে পার্থক্য কি? হলিউডবলিউড কি খুব জীবন ঘনিষ্ঠ “সুস্থধারার” বিনোদন হাজির করে আর ঢালিউড শুধু “নোংরামো” দেখায়? নাকি হলিউডবলিউডঢালিউড সব একই ফর্মুলায় চলে? ঢালিউডের সাথে হলিউডের/বলিউডের পার্থক্য হলো যৌনতা ও ভায়োলেন্স এরা বেশ সুদৃশ্য মোড়কে সুন্দর কারুকার্য করে হাজির করে আর ঢালিউডের যেহেতু কারগরী ও অর্থনেতিক সামর্থ্য কম, ঢালিউড সেটা “র” ফর্মে হাজির করে। আর মধ্যবিত্ত ঘরে বসে ছোট পর্দায় হলিউডবলিউডি সুদৃশ্য মোড়কে পোরা যৌনতা ও ভায়োলেন্স দেখতে দেখতে ইতোমধ্যেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, এখন সেটাকে কাজে লাগিয়ে বড় পর্দার বাড়তি উত্তেজনার বাড়তি ব্যাবসা চাই। তাই এখন প্রতিযোগীতার ছল।

তৃতীয়ত, মুক্তবাজার অর্থনীতি জিনসিটাই একটা ভন্ডামি কিনা, মুক্তবাজার অর্থনীতিই সবার কাম্য কিনা, মুক্তবাজার অর্থনীতি সবমুশকিলের সমাধান করতে পারে কিনা সে বিতর্কে বিস্তারিত না গিয়েও বলা যায় মুক্তবাজার তত্ত্বগত ভাবে যতটা মুক্ত বাস্তবে কিন্তু ততটা মুক্ত নয়। ভারতীয় সকল স্যাটেলাই চ্যানেল অবাধে বাংলাদেশে প্রদর্শিত হলেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দেখিয়ে বাংলাদেশের কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেলকে ভারতে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। এর সাথে বাংলাদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রতিযোগীতা থেকে ভারতীয় পণ্যকে রক্ষা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্নটি যুক্ত। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে তো সাধারণ অর্থে কোন আমদানী রপ্তানীর ক্ষেত্রে বাধা থাকার কথা না। কিন্ত বাস্তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির ধ্বজ্জাধারী সকল দেশই তাদের দেশীয় শিল্পের এবং কৃষির স্বার্থে নানান শুল্ক ও অশুল্ক বাধা জারি রাখে। একই ভাবে চলচ্চিত্র শিল্পের যদি উন্নতি করতে হয় তাহলে তাকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই পেরে আর্থিক কারগরী, নন্দন তাত্ত্বিক সব দিকে থেকেই দুর্বল রাখার সব ম্যাকানিজম চালু রাখলে চলচ্চিত্রকে আর প্রতিযোগীতামূলক হতে হবে না! হলিউডের যৌনতাভায়োলেন্সের নষ্টামির সাথে প্রতিযোগীতা করতে গিয়ে ভারতীয় হিন্দি ছবিও কম নষ্ট হয়নি। আর অন্য দিকে ইরানি ছবির দিকে তাকানসেন্সরশিপ সহ নানান কারণেই সেটা আমাদের মডেল না হলেও, একদিকে হলিউডি প্রতিযোগীতা থেকে মুক্ত থাকা এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে কড়া সেন্সরশিপ স্বত্ত্বেও যে কোন বিচারে ইরানি ছবি বিশ্বের অন্যতম সেরা ছবি হয়ে উঠেছে।

চতুর্থত, আমরা বিদেশী ছবি আমদানীর বিপক্ষে নই। বরং সারা দুনিয়ার মানসম্পন্ন ছবি যেন দেশের মানুষ দেখতে পারে সেটাই আমার কাম্য। কিন্ত সেটা এখন যেভাবে বাজারি প্রতিযোগীতার মাধ্যমে করার কথা বলা হচ্ছে তার পক্ষে নই। কারণ বাজার দেখে মুনাফা, মুনাফার প্রয়োজনে বাজার বাজারি ছবিই আমদানী করবে আর তার সাথে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়ে এদেশের চলচ্চিত্রের পুরো বিলুপ্তি ঘটবে নতুবা আরও অধগতি হবে আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হিন্দীভাষা আর আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি আরো জাকিয়ে বসবে(দেশের সিনেমা হলগুলোতে ইংরেজি ছবি আমদানী তো নিষিদ্ধ না, কয়টা ভালো ইংরেজী ছবি আমদানী হয়?)

শেষ কথা হলো, স্রেফ ভারতীয় ছবি আমদানী বন্ধ করলেই যেমন চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নতি হবে না, তেমনি ভারতীয় ছবি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রদশর্ন করলেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের সাথে প্রতিযোগীতার ভয়ে দেশীয় চলচ্চিত্র উন্নত হয়ে উঠবে না। চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্য চাই রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, আর্থিক দায়িত্ব নেয়া, চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাবস্থা এবং দেশের বড় বড় সিনেমা হলে বাধ্যতামূলক ভাবে মাসের অন্তত একটি সপ্তাহে ভারতীয় বাজারি ছবি নয় বরং ভারত সহ সারা দুনিয়ার সেরা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যাবস্থা করা।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s