মধ্যপ্রাচ্যের আন্দালন, বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব

Posted: অক্টোবর 16, 2011 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান

মোহাম্মাদ বৌয়াজিজি উত্তর আফ্রিকার ছোট্ট দেশ তিউনিসিয়ার উচ্চ শিক্ষিত যুবক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রী নেওয়া অন্যদের মত তারও কাজ জোটেনি পড়া লেখা শেষে। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে ফল বিক্রি করতো সে, সেখানেও এসে বখরা দাবি করত রাষ্ট্রীয় পাহারাদাররা। দুঃশাসনের প্রবল অন্ধকারে ডুবে ছিল বৌয়াজিজির স্বদেশ দীর্ঘ ২৩টি বছর। কোনো প্রমিথিউস আগুন এনে দেয়নি যখন, মোহাম্মদ বৌয়াজিজি নিজেই একদিন আগুন হয়ে জ্বলে উঠলো শেষে।

গণজাগরণ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে

রাজধানী তিউনিস থেকে বেশ দূরের সিরি বৌজিদ শহরে দুঃশাসনের পাহারাদারদের নিপীড়নের অপমানে ২৫ বছরের এই তরুন যখন নিজের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিল ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বরে তখন তিউনিসিয়া, মিশর, সিরিয়া, সুদান, ইয়েমেন, জর্দানের স্বৈরশাসকরা কেউ ভুলেও কল্পনা করেনি, এই আগুনের তীব্র আঁচ এসে লাগবে তাদের সকলের তখতে তাউসে,পুড়ে ভস্ম হবে কারো কারো দীর্ঘ দুঃশাসন। মোহাম্মদ বৌয়াজিজির জ্বলন্ত শরীর থেকে জন্ম নেয়া দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ প্রথমে ছড়াল তাঁর নিজের দেশ তিউনিসিয়ায়। চার সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা প্রবল গনআন্দোলনের মুখে ২৩ বছরের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটলো। স্বৈরশাসক বেন আলী সপরিবারের পালাতে বাধ্য হল। তিউনিসিয়ার তরুনরা গনবিদ্রোহের যে উপমা তৈরী করল, আর উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের একনায়ক কবলিত রাষ্ট্রসমুহের তরুনরা সেই উপমা যে দৃঢ়তায় ধারন করল, তা নিঃসন্দেহে স্থান করে নিয়েছে মানুষের জেগে উঠার অমলিন ইতিহাসে। কিন্তু এরপর? অর্থ্যাৎ কারা সেখানে ক্ষমতায় এলো? তারা কি পারবে বৌয়াজিজির মত বেকার তরুনদের হাতে কাজ তুলে দিতে? সেই প্রশ্নের গভীরে তলিয়ে দেখতে হবে আরব বিশ্বের আন্দোলন এবং বাংলাদেশের করণীয়।

আন্দালনরত দেশগুলোর জনসংখ্যার দিকে চোখ দিলে লক্ষ্য করা যাবে যে, গত দুদশকে ১৫২৯ বছর বয়সী তরুনদের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তোড়ে এইসকল রাষ্ট্র টিকে থাকার জন্য এক প্রকার বাধ্য হয়ে কল্যানমূলক তত্ত্ব গ্রহণ করে ষাটের দশকে। ফলে কর্মসংস্থান পরিকল্পনার বড় অংশ ছিল সরকারি চাকরি। আর এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী থেকে শুরু করে হাইস্কুল ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সরকারি চাকরি ছিল অবারিত। জাতীয় আয়ের সাথে জাতীয় ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতার সামঞ্জ্যসতা না থাকায় এইসব দেশগুলোতে আমলতন্ত্র বাড়তি একটি বোঝা আকারে দাড়ায়। সোভিয়েত সমাজের অকালের সময় এইসব রাষ্ট্রগুলোই আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানে লোকবল কমাতে থাকে যা নব্বই দশকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। নব্বইতে এসে মুক্তবাজার অর্থনীতির ভীষণ ধাক্কায় সেবাখাত থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সকল অর্থনৈতিক খাতই বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। যার ফলে বাড়তে থাকে ধনী গরিবের বৈষম্য, বেকারত্ব, হতাশা।

একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি, অন্যদিকে চাকরির বাজারে অব্যাহত মন্দা। এ কারণে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তৈরী হয় হতাশা আর ক্ষোভ। আর এই ক্ষোভ সঞ্চারিত হতে থাকে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সব থেকে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভেতরে। এ কারণে বিগত সময়ের আন্দোলন সংগ্রাম থেকে এই আন্দোলন সংগ্রামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এই আন্দোলনের অধিকাংশই হলেন বেকার উচ্চ শিক্ষিত।

আন্দোলনে তিউনিশিয়ার প্রভাব

এটা নিঃসন্দেহ কেউ অস্বীকার করবেন না যে, সাম্প্রতিক আন্দোলন সংগ্রামে তিউনিশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তবে আন্দোলনের বাস্তব পরিস্থিতি দেশগুলোতে বিরাজ করছিলো। তিউনিশিয়া শুধু আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। তিউনিশিয়ার সফল গণঅভ্যুত্থানের পর মধ্যপ্রাচ্যের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক যুবক। রাস্তা ভরে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন পশ্চিমা ঘেষা সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের গণঅসন্তোষের জোয়ারে।

আলজেরিয়া

তিউনিসিয়ার নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র আলজেরিয়ায় আন্দোলন সংগ্রাম দানা বেঁধে উঠে। যদিও আলজেরিয়ায় রয়েছে সুদীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। দেশটিতে তিউনেশিয়ার প্রভাবের কারণে পুরো জানুয়ারি মাস জুড়ে উত্তাল থাকে।

অন্যান্য জায়গার মত আলজেরিয়াতে খাদ্যদ্রব্যের মুল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে উঠে রাজধানী আলজিয়ার্স সহ গুরুত্বপূর্ণ সকল শহরে। অন্তত ৮ জন বিক্ষোভকারী নিজের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দেয় মোহাম্মদ বৌয়াজিজির অনুকরণে। এসময় দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সাথে দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ায় নিহত হন বেশ কিছু মানুষ। শেষপর্যন্ত সরকার বাধ্য হয় খাদ্যশস্যের মুল্য হ্রাস এবং আমদানী বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে।

মরক্কো

মরক্কোতেও তরুনরা রাজপথে নেমে আসে খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমুল্য, বেকারত্ব বৃদ্ধি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে। জানুয়ারির ২১ তারিখে আন্দোলনকারী চারজন নিজেদের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিক্ষোভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের জন্য পশ্চিম সাহার সীমান্ত থেকে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনা হয়। গণআন্দোলনের রাশ টেনে ধরার জন্য ইতিমধ্যেই সুলতান মোহাম্মদের রাজকীয় সরকার আটা ময়দা, ভোজ্য তেল, চিনি ও জ্বালানী তেলের উপর ভর্তুকী প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে।

লেবানন

লেবানেন নতুন প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতির নিয়োগের প্রতিবাদে বৈরুত ও ত্রিপোলীর রাজপথ দখল করে নেয়া সুন্নী তরুনেরা। হিজবুল্লাহ সমর্থিত মাজিব মিকাতির প্রধানমন্ত্রীত্বে লেবানন আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে যেতে পারে।

ইয়েমেন

আরব বিশ্বের সব থেকে দরিদ্র রাষ্ট্র এটি। এখানকার শাসকশ্রেণী অন্যান্য দেশের মতোই চরম বিলাসী জীবন যাপনে গা ভাসিয়ে দিয়ে থাকে। এই দেশটির মোট জনগোষ্টির অর্ধেকই বাস করে দারিদ্র সীমার নিচে। প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ রাষ্ট্রপরিচালনা করছেন টানা ৩২ বছর ধরে। এই দীর্ঘ সময় প্রেসিডেন্টের সমর্থকেরা ও তার পরিবার কোটি কোটি ডলার আত্মসাৎ করেছে। দেশটিতে জনগণ ক্রমেই বেঁচে থাকার মত অবলম্বন হারিয়ে ফেলছিল। ইয়েমেন উত্তাল থাকে জানুয়ারীর ২য় সপ্তাহ থেকে। নগরী এডেনে বিক্ষুব্ধ এক তরুন নিজের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সেনাবাহিনীর বেতনভাতা বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে সরকারি ভর্তুকী বাড়ানোর মতো সরকারি উদ্যোগেও আন্দোলনকারীরা সন্তুষ্ট না হলে প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ ঘোষনা দিতে বাধ্য হনপরবর্তী নির্বাচনে তিনি আর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হবেননা এবং শর্তসাপেক্ষে ৩০ দিনের মধ্যে তিনি পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দেন।

মিশর

এই আন্দোলনের প্রভাব মিশরে এসে লাগে, সেখানকার মার্কিনপন্থী শাসক হোসনি মোবারক বাধ্য হন ক্ষমতা ছাড়তে। তবে মার্কিন অনুগত সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেয়ার পর সেখানে মূলত আন্দোলনকর্মীদের ধড় পাকড় চলছে। প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন হঠাৎ করেই ত্রাতা হয়ে উপস্থিত হওয়া মোহাম্মদ আল বারাদীও। কায়রোতে জন্ম নেয়া এই আইনবিশেষজ্ঞ ও কুটনৈতিক দীর্ঘদিন ছিলেন জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি কমিশনের প্রধান। যে নিউক্লিয়ার অস্ত্রের অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক দখল, সেই ইরাকী নিউক্লিয়ার অস্ত্র খুঁজে বের করার জাতিসংঘ টিমের তিনিই ছিলেন প্রধান। ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেলও পেয়েছেন বারাদী। মিশরের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে জড়িত হয়েছিলেন, এরকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়না তবে নিশ্চিতভাবেই পশ্চিমাদের ভরসার পাত্র তিনি। ১৯৬৭ এর মিশরইসরাইল যুদ্ধের প্রকাশ্য সমালোচনা করেই বলেনইসরাইলের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে মিশরের কোনো অর্জন নেই।

জর্দান

জর্দানে বিক্ষোভ শুরু হয় জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহেই। রাজধানী আম্মান সহ গোটা দেশেই তরুনরা রাজপথে নেমে আসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নত জীবনযাপনের নিশ্চয়তার দাবিতে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মুল্য ও বেকারত্বের অসহনীয় বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ ছিল জর্দানের জনসাধারণ। প্রধানমন্ত্রী সামির রিফাইয়ি বিক্ষুব্ধ তরুনদের বশ করতে নতুন অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষনা করলেও আন্দোলনের বেগ বাড়তেই থাকে। শেষ পর্যন্ত ফেব্র“য়ারীর ১ তারিখে বাদশাহ ২য় আব্দুল্লাহ সামির রিফাইয়ির সরকারকে পদচ্যুত করেন এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মারুফআলবাকিতকে এই পদে নিয়োগ দেন।

রাষ্ট্র

জনসংখ্যা (মিলিয়নে)

গড় বয়স

বেকারত্বের হার (%)

দ্রারিদ্রসীমার নিচের জনসংখ্যা (%)

ইন্টারনেট ব্যবহারকারি

(মিলিয়নে)

আলজেরিয়া

৩৫.

২৭.

.

২৩

.

মিশর

৮৪.

২৪

.

২০

২০

জর্দান

.

২১.

১৩.

১৪.

.

লেবানন

.০৯

২৯.

তথ্য নেই

২৮

মরক্কো

৩২.

২৬.

.

১৫

১৩.

সিরিয়া

২২.

২১.

.

১১.

.

তিউনিশিয়া

১০.

২৯.

১৪

.

.

ইয়েমেন

২৪.

১৭.৮৯

৩৫

৪৫.

.

তথ্যসূত্রঃ– CIA World Factbook/UN

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব

বনাম পরাশক্তি

মধ্যপ্রাচ্যের আলোচনার সাথে বাংলাদেশের সার্বভৌমের বিষয়টি রয়েছে পুঁজির অনুসঙ্গ হিসেবে। অর্থাৎ মুক্ত বাজার অর্থনীতির বাজার ব্যবস্থায় বেকারত্ব, শিল্পায়ন ইত্যাদির মত বিষয়গুলি সমাধান করা যেহেতু সম্ভব নয়, সে কারণে ওই সকল দেশের মত বাংলাদেশেও একটি আন্দোলনের বাস্তবতা রয়েছে। এর সাথে রয়েছে মার্কিন ও ভারতের হম্ভিতম্ভি। সব মিলিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম দানা বেঁধে উঠলে তা দেশের শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে যাবে। যাবে তাদের মনিব মার্কিন ও ভারতের বিরুদ্ধে। কিন্তু আন্দোলন সংগ্রামকে সঠিক দিশা দেখাতে পারে এমন কোন কমিউনিস্ট পার্টি না থাকায় তা আবার বেহাত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ আজকের যুগে জাতীয়তবাদী বুর্জোয়া দলগুলো সাম্রাজ্যবাদের অনুগত দল হিসেবে মুক্ত বাজার অর্থনীতির অন্যতম ধারক বাহক হওয়াতের তাদের পক্ষে আর জনগনের কর্মসূচী এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, সফল করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। এ কারণে নব্বই এর গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। রক্ত, আন্দোলন সব জলে গেছে।

বাংলাদেশে সার্বভৌমত্ব বলতে এখন শুধু সীমানার চিহ্নই বহন করছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বাংলাদেশের মত নয়া উপনিবেশিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ সত্য সমান সত্য। এ কারণে এসকল দেশে উপস্থিত মার্কিন দূতেরা যেসব হম্ভিতম্ভি দেন, তা দেখার পরও আওয়ামী লীগবিএনপির মত কোন শাসক মার্কিন দূতকে বহিস্কার করার ক্ষমতা রাখেন না।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে অথবা এভাবেও বলা যায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের এইসব শর্ত মেনে নিয়েই তারা ক্ষমতায় এসেছে।

ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ বরাবরই খোলামেলা অবস্থান নিয়েছে। আওয়ামী লীগের যুক্তি মুক্ত বাজার অর্থনীতির যুগে জানালা দরজা বন্ধ করে কোনো দেশ এগুতে পারে না। ট্রানজিটের মাধ্যমে বাংলাদেশ কোটি কোটি টাকা আয় করবে। আর জামাত বিএনপি এর তীব্র বিরোধীতা করে আসছে সেই পুরানো ধাঁচের ভারত বিরোধীতা রাজনীতি দিয়ে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিগত জামাত বিএনপি আমলেই ভারত বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। তবে বিএনপি জামাতের ভারত বিরোধীতা সর্ঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক ভেদ বিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলেও অনেকে মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এবং দাসত্বের চুক্তি

মুজিব আমলে ইন্দিরামুজিব গোপন চুক্তি করা হয়েছিলো। যা আজও জাতি জানতে পারেনি। তবে সেসব চুক্তি বিভিন্ন সময় যেভাবে ফাঁস হয়েছে, তা থেকে অনুমান করা যায় দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ইজারা দেয়ার কাজটা মুজিব ইন্দিরার কাছে করে এসেছিলেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন হবার পর দিল্লি সফরে হাসিনা সেইরকম প্রতিশ্র“তি দিয়ে এসেছেন চুক্তির মাধ্যমে।

দিল্লির দীর্ঘদিনের চাওয়া ছিলো ঢাকার কাছে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের জল ও স্থলভাগ ব্যবহারের সুযোগ। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের ১১ জানুয়ারি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ৫০ দফা যৌথ ইশতেহারে উভয় দেশ সাক্ষর করে। বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারতের সব থেকে বড় উদ্বেগ দেশটির উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের জল ও স্থল ভাগ ব্যবহারের অনুমতি। ভারতের সেই কাঙ্খিত উদ্বেগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশমিত করেছেন যৌথ ইশতেহারে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের জল ও স্থলভাগের অনুমতি প্রদান করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আশুগঞ্জকে ‘পোর্ট অব কল’ ঘোষণা করা হয়েছে। চট্রগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ভারতকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে বাংলাদেশ দিল্লির টেনশন প্রশমিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পূর্বে বোঝা যাচ্ছিলো দিল্লিঢাকার সম্পর্ক পূর্বের হিসেব নিকেশের মধ্যে থাকবে না। তার ফল দেখা গেলো ৫০ দফা মনমোহনহাসিনা যৌথ ইশতোহার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনমোহন সমঝোতা সাক্ষরের ২৩ নম্বর দফায় আশুগঞ্জকে শুধু ওডিসি সুবিধাই দেয়নি বরং এই নদী বন্দরটিকে ‘পোর্ট অব কল’ ঘোষণা করে সার্বক্ষণিক পণ্য পরিবহনের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। আর এ জন্য দেশের মধ্যেকার সকল বিদ্যমান নদীপথের ট্রানজিটের আইনী বাধা অপসারণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। আইনী বাধা অপসারনের পাশাপাশি আশুগঞ্জ থেকে ত্রিপুরার সড়কপথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। দিল্লি এখন থেকে ওডিসি পরিবহনের সঙ্গে সঙ্গে সব ধরণের পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাবে।

আশুগঞ্জের পরে ভারতকে মংলা ও চট্রগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে যৌথ ইশতেহারে। ইশতেহারের ২৩ নম্বর দফায় এই সুবিধা দেয়া হয়েছে। মংলা ও চট্রগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ভারতের পণ্য পরিবহনের কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রেল ও সড়ক পথের উন্নয়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশের রেল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবন থেকে একটি রেল লাইন অচিরেই বসতে যাচ্ছে, যা ভারতের পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হবে। ভারতের পণ্য পরিবহন গতিশীল রাখার জন্য যৌথ ইশতাহারের ২৪ নম্বর দফায় আখাউড়া ও আগরতলার মধ্যে ট্রেন চালুর বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

বাংলাদেশের এজেন্ডা হিসেবে আরেকটি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যৌথ ইশতেহারের ২৬ নম্বর দফায়। সেখানে বলা হয়েছে, নেপালে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের জন্য রোহনপুরসিঙ্গাবাদ ব্রডগেজ রেলওয়ে লাইন ব্যবহার করা হবে। এ বিষয়ে ভারতও সম্মত, কিন্তু বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই। যৌথ ইশতেহারের ৩৮ নম্বর দফায় বাংলাদেশকে রেলওয়ে, নদীপথ ও সড়কপথে অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। এটা একক কোনো দেশকে ভারতের সর্বোচ্চ পরিমাণ ঋণসহায়তা। এ বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে, যাতে কিছু অগ্রগতি আছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বিষয়টি নিজে তদারকী করছেন। এ নিয়ে আলোচনা করতে তিনি ভারত সফরও করছেন।

এতোদিন জনগণ জেনে এসেছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের গাড়িগুলো চলাচলের জন্য ভারত নিজেই রাস্তাঘাট নির্মাণ করবে। কিন্তু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লির সঙ্গে চুক্তি করার পর জানা যাচ্ছে যে, ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যেসব রাস্তা ব্যবহার করবে তার কোনোটির নির্মাণের খরচ বহন করবে না। ভারতের এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশকে এখাতের উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি ডলার ঋণ প্রদান করবে। এ জন্য উক্ত ভারতীয় ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি ঋণ চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের উচ্চ সুদে দেয়া ১০০ কোটি ডলার বাংলাদেশের ব্যয় হবে ভারতের পণ্য পরিবহনের উপযোগী করে বাংলাদেশের সড়ক ও নৌপথ নির্মাণের জন্য। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে চড়া সুদে আনা অর্থ আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে আদৌ কোনো শুভ ফল বয়ে আনবে কিনা।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন ভারতীয় ঋণের শর্ত এবং সুদের হার নিয়ে। বিশ্বব্যাংক সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছরের জন্য ঋণ দিয়ে থাকে। ঋণ পরিশোধের সর্বশেষ সময় থেকে আরও ১০ বছরের মত বাড়তি সময় দেয় হয় । সেক্ষেত্রে বাড়তি ১০ বছরের জন্য কোনো সুদ নেয়া হয় না, শুধু সার্ভিস চার্জ বাবদ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সংশ্লিষ্ট দেশটিকে প্রদান করতে হয়। সূত্রমতে, ভারত ঋণ দিয়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। এই ঋণের কোনও অর্থ অব্যয়িত থাকলে তার জন্য বাংলাদেশকে বার্ষিক ০.৫০ পারসেন্ট হারে কমিটমেন্ট চার্জ দিতে হবে। পাঁচ বছরের গ্রেস পেরিয়ডসহ এই ঋণ পরিশোধের মেয়াদ হচ্ছে ২০ বছর। ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর উপস্থিতিতে গত ৭ আগস্ট ভারতের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিসিএ রঙ্গনাথন এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া এই ঋণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

ঋণ নিলেই কোনো দেশের লাভ হবে এমনটি মনে করেন না অর্থনীতিবিদরা। সেই ঋণকে কাজে না লাগিয়ে যদি অলসভাবে বসিয়ে রাখা হয় তবে উল্টো ক্ষতির পরিমাণই বেশি। যেমন বাংলাদেশকে দেয়া বিশ্বব্যাংকের ১৭৯ কোটি ডলার কোনো কাজে না লাগায় অব্যবহৃত পড়ে আছে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে দেয়া ১৭৫ কোটি ডলার ঋণ বাতিল করেছে। বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি অন্যান্য দাতা সংস্থা কতৃক বাংলাদেশকে দেয়া ৪শ’ কোটি ডলারের ওপর ঋণ অব্যবহৃত পড়ে আছে। ভারতের ব্যাংক থেকে নেয়া ১০০ কোটি ডলারের মধ্যে বাংলাদেশের রেলওয়েখাত উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের রেলওয়ে সংস্কারের জন্য প্রায় ৪৬ কোটি ডলার পড়ে আছে, কিন্তু কোনো কাজে আসছে না।

ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে গেলে বাংলাদেশের রাস্তাঘাট ভারতের ট্রাক লরি বহনের ক্ষমতা অনুযায়ী তৈরী করতে হবে। তৈরী করতে হবে নৌপথ ও রেল যোগাযোগ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক হিসেব মতে বাংলাদেশের সড়ক, নৌ, রেল ও বন্দর অবকাঠামো ঢেলে সাজাতে ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।

ভারতবাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যা

বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের দুই হাজার ১১২ কিলোমিটার, আসামের ২৩৪ কিলোমিটার, মেঘালয়ের ৪৩৬ কিলোমিটার, ত্রিপুরার ৮৭৪ কিলোমিটার, মিজোরামের ৩২০ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। অন্যদিকে, ছয় দশমিক পাঁচ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমান্ত। এ ছাড়া ৩৫ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার সীমান্তে কোনো সীমানা পিলারনেই। এসব স্থানে প্রায়ই বিএসএফ দখলদারিত্ব কায়েম করতে গিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্ম দেয়।

সীমান্ত সমস্যা সমাধানে ভারতের কোনো আগ্রহ নেই বলে মনে হয়। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে সই হওয়া চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে ছিটমহলগুলো বিনিময় করার কথা ছিল। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালেই এ চুক্তি অনুমোদন করে এবং ভারতের কাছে বেরুবাড়ি ছিটমহল হস্তান্তর করে। কিন্তু ভারত আজও ওই চুক্তি অনুমোদন করেনি এবং বাংলাদেশের ছিটমহলগুলোকে নিজেদের দখলে রেখে দিচ্ছে। অনেক টানাহেঁচড়ার পর ১৯৯৩ সালে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা দহগ্রামআঙ্গরপোতা ছিটমহলে আংশিক যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ পায় বাংলাদেশ।

সীমান্ত সমস্যার সমাধান না করেই ১৯৮৬ সালে ভারত একতরফা ভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে। এই কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করতে গিয়ে অনেক অংশেই আন্তর্জাতিক নিয়ম নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে ভারত আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ভারত তার নির্ধারিত তিন হাজার ৪৩৬ কিলোমিটারের মধ্যে দুই হাজার ৬৭৭ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে এবং বাকি অংশেও বেড়া নির্মানের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে ৬৫৩০ একর বিরোধপূর্ণ ভূমি রয়েছে। উভয় দেশের সীমান্তে ৪৬টি পয়েন্টে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ভূমি রয়েছে।

এ ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দেশ দুটি ২০০০ সালে জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্র“প (জেবিডব্লিউজি) গঠন করে, কিন্তু ১০ বছরে এই গ্র“প মাত্র ৪ বার বৈঠকে বসতে সক্ষম হয়েছে। বলা বাহুল্য, এসব বৈঠক তেমন কোনো ফলপ্রসু সমাধান দিতে পারেনি। গত বছরের ১০ ও ১১ নভেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে জেবিডব্লিউজির শেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল যে বিরোধপূর্ণ জমির বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব এলাকায় শান্তি বজায় রাখা হবে। কিন্তু যথারীতি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শান্তি বজায় রাখা হলেও বিএসএফ এসব এলাকায় গুলিবর্ষণ ও উস্কানিমূলক আচরণ চালিয়েই যাচ্ছে।

শুধুমাত্র বিগত ২০১০ সালে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে মোট ৭৫ জন, গুরুতর আহত ৮৩ জন।

দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ

২০০৭ সালের ৩ আগস্ট, ‘ভারতযুক্তরাষ্ট্র পরমাণু সমঝোতা’ নামে সমঝোতাপত্র প্রকাশিত হয়। তখন থেকে ভারতীয় মিডিয়া এটিকে বেসামরিক পরমাণু প্রযুক্তি ‘বাণিজ্য’, ‘সরবরাহ’ হিসাবে দেখিয়ে এর পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করে। ভারত মার্কিন পরমাণু চুক্তির ব্যাপারে মার্কিন কংগ্রেসে বিল আকারে পাশ করার ব্যাপারে শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনেছেন দুই দেশের নেতারা।

বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তির পেছনে ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মত অজুহাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। যেখানে বর্তমানে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন মোট উৎপাদনের ৩%, সেখানে চুক্তির পরে ২০২৫ সাল নাগাদ এই উৎপাদন দাঁড়াবে ৭%। এই সামান্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যে বিশাল বিনিয়োগসেখান থেকে কী ভারতের সাধারণ জনগণ কোন উপকার পাবে? আসলেপরমাণু বিদ্যুতের অজুহাত কেবলই বুলিমূলত এর মাধ্যমে ভারতের পরমাণু অস্ত্রের জ্বালানী পাওয়াটাই সহজসাধ্য হলো। কেননা ইউরেনিয়াম থেকে যেমন পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়তেমনি তৈরি করা যায় পরমাণু বোমা। বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করার পর জ্বলে যাওয়া ইউরেনিয়ামের যে ছাই পাওয়া যায় তাকে রিপ্রসেসিং করলেই পাওয়া যায় প্লুটোনিয়ামআর এটিই পরমাণু বোমার মূল উপাদান। ১৯৭৪ সালে ও ১৯৯৮ সালে ভারত পরীক্ষামূলক পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রমাণ করেছেতার কাছে এই রিপ্রসেসিং প্রযুক্তি আছে। সুতরাংকোন সন্দেহ নেই, এই চুক্তির মাধ্যমে পরমাণু শক্তি হিসাবে ভারতের হাতকে শক্তিশালীই করা হলো।

বঙ্গোপসাগরে ভারতের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সম্মেলন

পরমাণু চুক্তির সঙ্গে সামরিক মহড়া বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে মার্কিন সহায়তায়। এর সঙ্গে সঙ্গে যা যুক্ত হয়েছে তা হলো ভারতীয় মহাসাগরে ভারতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা। ভারত মহাসাগরে নিয়ন্ত্রন পেতে দেশটি শুধু এশিয়া মহাদেশ নয় অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশ ও ওশিনিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময় নানা ফোরাম আয়োজনের আড়ালে ভারত তার শক্তির মহড়া দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ সূত্র। মূলত ঐসব মহড়া থেকে নিজেদের অবস্থানকে জানান দেয়াই ছিলো ভারতের লক্ষ্য।

বঙ্গোপসাগর ও এশিয়া প্যাসেফিক অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে জোর সামরিক প্রচেষ্টা চালানোর অংশ হিসেবে ভারত গত ২০০৯ সালের ফেব্র“য়ারির ৪ থেকে ৮ তারিখে হয়ে গেলো ‘মিলান ২০১০’ সম্মেলন। অনেকটা নিরবেই ভারতীয় দীপপূঞ্জ আন্দামান নিকোবরে ৫ দিন ব্যপী ব্যয়বহুল এই সম্মেলনের আয়োজক দেশ ছিলো ভারত। সম্মেলনে চীন ব্যতিত প্রায় উল্লেখ্য সব দেশই উপস্থিত ছিলো। সম্মেলনের প্রধান এজেন্ডা ছিলো বঙ্গোপসাগর ও এশিয়া প্যাসেফিক অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলির একটি অভিন্ন সার্থে ঐক্যমতে পৌছানো। সম্মেলনে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ‘কপোতাক্ষ’ জাহাজ নিয়ে অংশগ্রহণ করে। সম্মেলন শুরু হয় আন্দামান নিকোবারদীপপূঞ্জের পোর্ট ব্লেয়ারে। সম্মেলন উদ্ধোধন করে ভারতের নৌবাহিনীর প্রধান নির্মল ভার্মা। এবার সম্মেলনের প্রধান বিষয় ছিলো পূর্বমূখী নীতি কার্যকর করা।

আন্দামান ও নিকোবারসহ প্রায় ৫৭২টি দীপ অঞ্চল রয়েছে বঙ্গোপসাগরে ভারতের নিয়ন্ত্রণে। উক্ত দীপ সমূহে ভারত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে। মিলান ২০১০ সম্মেলনে ভারতের নৌবাহিনীর প্রধান নির্মল ভার্মা উপস্থিত দেশের প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, ভারত আন্দামান ও নিকোবারদীপপূঞ্জে আরও বিমান ঘাঁটি করতে যাচ্ছে। আন্দামান ও নিকোবারের উত্তরে এই বিমান ঘাঁটিগুলো তৈরী করা হবে।

ভারতের গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট বিমান ঘাঁটিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ নিয়ে কাজ শুরু করেছে ভারত। আন্দামান ও নিকোবরের শীবপুর হেলিপ্যাডের দৈঘ্য মাত্র ১ হাজার ফুট। এই হেলিপ্যাডটিকে শক্তিশালী ও কার্যকর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য তৈরী করা হচ্ছে। পোর্ট ব্লেয়ার, ক্যাম্বেল বে ও কার নিকোবারএ আন্দামান ও নিকোবরে ভারতের তিনটি বিমান ঘাঁটি রয়েছে।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে ভারতের আধিপাত্য বিস্তারের পথে প্রধান বাধা চীন। আর এই কারণে চীন ব্যতিত এই অঞ্চলের সমূদ্র তীরবর্তী প্রায় সকল দেশ সমূহকে ‘মিলান ২০১০’ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ব্রনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ভারত। বঙ্গোপসাগরে সামরিক আধিপাত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এশিয়া প্যাসেফিক অঞ্চলে গত দশকের শেষ দশক থেকেই সম্মেলন করে আসছে ভারত। এর আগে ১৯৯৫, ১৯৯৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৬, ২০০৮ ও সর্বশেষ ২০১০ এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো।

বসে নেই চীন

একের পর নৌ ঘাঁটি তৈরী করছে

বঙ্গোপসাগরে ভারতের প্রভাব বিস্তারে বসে নেই চীন। চীন শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারে বেশ কয়েকটি নৌ বন্দরের মাধ্যমে দেশটির প্রভাব বিস্তার অক্ষুন্ন রেখেছে। চীনের প্রভাব বিস্তারের বিয়টি গুরুত্বপূন যা এই মহাদেশে শক্তির ভারসাম্যে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারত মহাসাগর নিজেদের কব্জায় রাখার জন্য চীন শ্রীলঙ্কান সরকারের সঙ্গে হাত মেলায় যার ফলশ্র“তিতে চার দশকব্যপী স্বাধীনতার জন্য যে তামিল টাইগার লড়ছিলো তার অবসান ঘটে। শ্রীলঙ্কার রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধে তামিলদের বিপক্ষে সিংহলী আধিপাত্যের সরকারকে অস্ত্র, অর্থ ও কৌশলগত সাহায্য করে। শ্রীলঙ্কার সরকারের আনুকল্য পাওয়ার জন্য মার্কিনীদের পিছু হটিয়ে সামনে চলে আসে চীন। ২০০৮ সালে মার্কিন সরকার যেখানে ৭.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশটির সরকারকে সহায়তা দেয় সেখানে চীন দেশটিক সামরিক সহায়তার পাশাপাশি এক মিলিয়নের বেশি ডলার অর্থ প্রদান করে। নব্বই শতক থেকে চীনের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সামরিক সখ্যতা বেড়েছে কিন্তু ২০০৭ সাল থেকে বিষয়টি আরো বেশি মাত্রায় এগিয়েছে যখন শ্রীলঙ্কা চীনকে বন্দর করার অনুমতি দিয়েছে। মূলত চীন শ্রীলঙ্কার উত্তরে আর ভারতের দক্ষিণে হামবানতোতা (Hambantota) বন্দর তৈরীর আনুষ্টানিক যাত্রার মধ্য দিয়েই ভারতের নাকের ডগায় চাইনিজ নৌ শেষ্ট্রত্বকে জারি রাখলো। চীন শুধু শ্রীলঙ্কায় বন্দর তৈরীর মধ্যে ভারতীয় মহাসাগরে নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা দেয়নি দেশটি ভারত নিয়ন্ত্রিত আন্দামান নিকোবারদ্বীপপূঞ্জের নিকটবর্তী মিয়ানমারের সমুদ্র অঞ্চলে কোকো দ্বীপে বন্দর তৈরী করে বঙ্গোপসাগরেও ভারতীয় আধিপাত্যেকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। কোকো দীপের পাশাপাশি মিয়ানমারের কিয়াক ফিয়াওএতে চীন বন্দর তৈরী করছে। চীনের যুক্তি এই বন্দর দিয়ে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের কুওমিং ও ইউনানে জ্বালানি পৌছে যাওয়া সহজ হবে। তবে সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন জ্বালানি পরিবহনের পাশাপাশি চীন ভারতীয় উপস্থিতিকেই বরং চ্যালেঞ্জ করে বসেছে।

ধ্বসে পড়ছে পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতি

শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের এই আন্দোলন শুরু হবারও অনেক আগে পুঁজিবাদী দুনিয়া ধ্বসে পড়েছে। সেই ধ্বংস থামানোর জন্য জনগনের টাকায় হাজার হাজর কোটি ডলার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও ধ্বংস থামেনি। ধ্বংস থামানোর জন্য তাদের সামনে একমাত্র পথ হলো যুদ্ধার্থনীতি। অর্থ্যাৎ যুদ্ধ করতে পারলে কিছুটা নিস্তার পাবে পুঁজিবাদী দুনিয়া।

পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার সারকথা হলো মুক্তবাজার অর্থনীতি। অর্থনীতিতে বাজার হবে অবাধ এবং সরকারের নিয়ন্ত্রনহীন। এবারকার বিশ্ব মন্দায় রাষ্ট্রকে তার মুক্তবাজার চরিত্র ভেঙ্গে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি তার নীতির বাইরে গিয়ে বাজার ব্যবস্থার রাষ্ট্রিয়করণ করছে। কিন্তু তারপরও বিশ্ব মন্দা কাটেনি। চলমান এই বিশ্ব মন্দা এই পর্যায় পৌছেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার গৃহনির্মাণ খাতে ঋণদানকারী সর্ববৃহৎ দুই কোম্পানী Freddie Mac, Fannie Mae-কে ২০ হাজার কোটি ডলারের বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। আর্থিক বিনিয়োগ ব্যাংক ‘লেহম্যান ব্রাদার্স’ নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। মাকির্ন সরকার এই ধ্বস থামানোর জন্য মার্কিন কংগ্রেসে বেইল আউট কর্মসূচির জন্য ৭০০ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন দিয়েছে। এই মন্দার পরিসর আরও গভীরতর হয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু মার্কিন অর্থনীতি নয় ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেও মন্দা চলছে। অস্থিতিশীল বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ইউরো অঞ্চল নামে পরিচিত ইউরোপের ১৫টি দেশ প্যারিসে বৈঠক করেছে। ইইউএর প্রেসিডেন্সি ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই সারকোজি ওই বৈঠকে বলেছেন, আর কোনো ব্যাংকের পতন তাঁরা চান না এবং এ জন্য ২০০৯ সাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে অর্থ ঢালা হবে। তবে যেসব ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপকেরা দায়ী, তাঁদের অবশ্যই চলে যেতে হবে।’

ব্রিটেনে এই সংকট থাবা বসিয়েছে রয়েল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড (আরবিএস), লয়েডস টিএসবি এবং এইচবিওএসএর উপর। এ কারণে সঙ্কটে থাকা ব্যংকগুলোকে দেওয়া হবে তিন হাজার ৭০০ কোটি পাউন্ড।

জার্মান সরকার ৫০ হাজার কোটি ইউরোর একটি প্যাকেজ পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে। ফ্রান্স ব্যয় করবে ৩৫ হাজার কোটি ইউরো আর স্পেন সরকার ১০ হাজার কোটি ইউরোর প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে। ইতালি, অস্ট্রিয়াও তাদের মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

খাতওয়ারি লোকসানির একটি চিত্র

এবারকার মন্দায় ধ্বসে পড়েছে সেবাখাত। হাজার হাজার মানুষের কাছে বিক্রি করা ফ্লাটের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না গ্রাহকেরা। তাই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এই মন্দার গোড়ার কথা হলো রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ধ্বস। অথচ কেউ একবার বলছে না যেসব গ্রাহক রিয়েল এস্টেটএর কাছ থেকে ফ্লাট বা জমি কিনেছিলেন তারাইতো প্রথমে কিস্তি শোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা কেন হলো? অর্থ্যাৎ মন্দার গোড়ার কথা রিয়েল এস্টেট নয়। সামগ্রিকভাকে মন্দা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ছোবল দিয়েছে। যার ফলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি সামগ্রিক ধ্বস নেমেছে। যা বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সেবাখাতকে। ২০০৮এর অক্টোবর RealtyTrac-এর সূত্রে জানা যাচ্ছে ওই বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ ৮১,৩০০ বাড়ি নিলামে তোলা হয়েছে, আগস্ট ২০০৭ হতে এ পর্যন্ত মোট ৮,৫১০০০ বাড়ি ঋণদাতারা অধিগ্রহণ করার জন্য অগ্রসর হয়েছে। এই তথ্য আরও ভাবনায় ফেলে দেয় যখন জানা যায় মার্কিনীদের ঘর বাড়ি হারানোর আর করুন কাহিনী। Credit Suisse এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর Rod Dubitsky এক শীর্ষস্থানীয় বিজনেস উইককে জানিয়েছেন, ‘২০১২ সাল নাগাদ ৫০ লাখেরও বেশী আমেরিকান পরিবার তাদের বাড়ি হারাবে, আর ২০০৮ সালেই বাড়ি হারানো পরিবারের সংখ্যা এসে দাঁড়াবে প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার।’

এই মন্দার প্রভাব বিশ্বজুড়ে অন্যখাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। তৈরী করেছে পরপস্পরের প্রতি এক অদৃশ্য কিন্তু বাস্তব টিকে থাকার সম্পর্ক। মার্কিন মন্দা তাই চীনের বাজার ব্যবস্থাকেও হানা দিয়েছে। মার্কিনীদের রিয়েলএস্টেটএর ধ্বস চীনের পিভিসি পাইপ ম্যানুফ্যাকচারিং কমিয়ে দিয়েছে ৩০% উৎপাদন। শুধু পিভিসি নয় চীনের চারটি বৃহত্তম ইস্পাত কোম্পানী ২০% উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে দেশটি। ইউরোপেও এই প্রভাব পড়ার কারণে ইউরোপিয়ান গৃহনির্মাণ সামগ্রী প্রস্তুতকারকেরা হয় ফ্যাক্টরী বন্ধ নতুবা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

মটরযান কেনার লোক নেই

GM, Ford, Toyota, BMW, Daimler, Volkswagen, Audi, Porsche এর ইউরোপের কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। এই সংকচনের ফলে শুধু গাড়ি শিল্প নয় এর প্রবাব গিয়ে পড়েছে অন্যান্য শিল্পেও। ইস্পাত, গ্লাস, রাবার, ইলেকট্রনিক পার্টস, রাবার সহ একাধিক শিল্পে। সহ আরো অসংখ্য খাতের উপরেই তার প্রভাব ফেলছে। তাৎক্ষণিক ফল হচ্ছে বিভিন্ন প্ল্যান্ট ও ফ্যাক্টরী বন্ধ অথবা লেঅফ ঘোষণা। General Motors এর মধ্যেই তার ছয়টি ফ্যাক্টরী বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে যার পাঁচটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত (জর্জিয়া, মিশিগান, নিউ ইয়র্ক, ওহিও, উইসকনসিন), সেই সাথে মেক্সিকোর Toluca এবং কানাডার Ontario তেও প্ল্যান্ট বন্ধের ঘোষণা এসেছে। শুধু তাই নয়, জার্মানী, স্পেন, বৃটেন, পোল্যাণ্ড, সুইডেন এবং বেলজিয়ামেও ফ্যাক্টরী সাময়িক বন্ধ করছে।

ইউএস গাড়িপ্রস্তুতকারকেরা দেউলিয়াত্বের কিনারে এসে অটো শ্রমিকদের চাকুরীর উপর খড়গহস্ত হচ্ছে। জেনারেল মোটর (এগ) গত ১৬ অক্টোবর তাদের তিনটি প্ল্যান্টে (একটি দেলাওয়ার ও বাকি দুটিমিশিগানেপনটিয়াক ও ডেট্রোইট) ১৬০০ জন কর্মীর লেঅফ ঘোষণা করেছে। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত তার অর্ধেক লোকবলকে ছাটাই করেছে, শ্রমিকের সংখ্যা ১,৩৩০০০ থেকে এখন ৭২,০০০ এ এসে দাঁড়িয়েছে।

Chrysler এবং GM ফাইনান্সিয়াল সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে মার্জারের জন্য ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেছে। Chrysler অবশ্য Renault-Nissan এর সাথেও মার্জার তথা পার্টনারশিপ অপশন বিবেচনা করছে বা খতিয়ে দেখছে। এটি ২০০৭ এর শুরু থেকে এর মধ্যেই ২২,০০০ শ্রমিক ছাটাই করেছে, আগামী বছরে আরো কমপক্ষে ৪০০০ ছাটাই করবে।

এরকম ছাটাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়অন্যান্য শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহেও শুরু হয়েছে। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানীর দুই বৃহৎ অটোপার্টস প্রস্তুতকারক কোম্পানী ‘উল্লেখযোগ্য’ সংখ্যায় লেঅফের ঘোষণা দিয়েছে। জার্মান অটোজায়ান্ট Daimler এর স্টার্লিং ট্রাক ডিভিশন বন্ধ এবং অন্টারিও, কানাডা ও অরেগন রিজিয়নে প্ল্যান্ট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে, যাতে ৩৫০০ শ্রমিক কাজ হারাবে।

পাল্টে গেছে বিশ্বযুদ্ধের কৌশল ?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো মূলত বিশ্ব মন্দা কাটানোর জন্যই। সে সময় শিল্প কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে বিশ্ব এক ভয়াবহ অর্থ সংকটের মধ্যে পড়েছিলো। ১৯৩০এর সে মন্দাকে ইতিহাসে গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দা বলে অভিহিত করা হয়। সে সময় কোটি কোটি গাড়ি উৎপাদন নষ্ট করতে হয়েছিলো গাড়ি কোম্পানীগুলোকে। আজকের মন্দায় সেই প্রভাব লক্ষনীয়। বাজার দখলকে কেন্দ্র করে তখন অক্ষ শক্তি বনাম মিত্র শক্তির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় যা বিশ্বযুদ্ধ নামে পরিচিত। সে যুগের মন্দায় যে সব বিষয়গুলি স্পষ্ট ছিলো আজকের বিশ্ব মন্দায় সে বিষয়গুলি স্পষ্ঠ। তবে কী বিশ্ব একটি সামগ্রিক বিশ্বযুদ্ধের অপেক্ষায়? যেহেতু অর্থনৈতিক লক্ষণগুলো প্রায় কাছাকাছি।

লক্ষণগুলো কাছাকাছি হলেও আজকের যুগে বিশ্বযুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। কারণ আজকের যুগে বৈশ্বিক মন্দায় এক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই একাই কারণে অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যদি অর্থনৈতিক পুনরোদ্ধার করার কোনো উপায় বেছে নেয়, তাহলে কম আক্রান্ত অন্যদেশগুলো সে বিষয়ে বিশেষ কোনো বাধা দেয় না। এমন কী অর্থনীতি পুনরোদ্ধারের জন্য যুদ্ধের রাস্তা বেছে নিলেও।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখন ২০০০এর নাইন ইলেভেনে কথিত সন্ত্রাসী আক্রমনের স্বীকার হওয়ার আগ থেকেই মন্দার আগুন লাগা শুরু করেছে। ওয়ার্ল্ডকম, এনরনের মত জায়ান্ট কোম্পানীগুলো লোকসানির দায়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো তখনই। মার্কিনীদের মন্দার সাথে নাইন ইলেভান হামলার একটি সম্পর্ক রয়েছে।

ট্ইুন টাওয়ারে হামলার পরে মার্কিনীরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার একটি অজুহাত দাড় করাতে পেরেছিলো। অথচ এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিলো তাদের অর্থনীতি পুনরোদ্ধারের যুদ্ধ। একটি অন্যায় যুদ্ধ শুরু করার পর বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার অনেক কারণ ছিলো। বিশ্বযুদ্ধ বাঁঁধেনি, কারণ না বাঁঁধার মত বাস্তবিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু মার্কিনীরাই নয় চীনের মত মার্কিন বিরোধী দেশেরাও এই মন্দায় আক্রান্ত হয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মন্দা দ্বারা আক্রান্ত হলে তাদের স্বার্থও কাছাকাছি। বর্তমান বিশ্বে যারা শিল্পোন্নত দেশ তাদের স্বার্থ অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন যুদ্ধ ঘোষণা করে অন্যায়ভাবে দেশ আক্রমণ করেছিলো তখন কোনো দেশ এর জোরালো প্রতিবাদ শক্তি সামর্থ্য কম হবার কারণে করেনি তা নয়, বরঞ্চ পরোক্ষভাবে হলেও এই যুদ্ধে তাদের একটি অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির লড়াই

লিবিয়াতে যখন বোমা ফেলা হচ্ছে ঠিক তখন মার্কিন নেতা ওবামা বলছেন এই লড়াই হলো লিবিয়ার বেসামরিক জনগণকে স্বৈরাচার ঘাতকের হাত থেকে বাঁচানোর যুদ্ধ। অর্থাৎ এই বোমা হলো আক্ষরিক অর্থেই শান্তির বোমা। যে বোমা আমরা ইরাক ও আফগানিস্তানে দেখেছি। যদি সাদ্দাম স্বৈরাশাসক হন আর তালেবানরা বর্বর হয়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি? গাদ্দাফির কারণে যারা মারা গেছেন এবং যাচ্ছেন তাদের মুক্তির জন্য লিবিয়াতে যদি আক্রমণ ন্যায় সঙ্গত হয়, তাহলে ন্যাটো জোট এবং তাদের নেতৃত্বদানকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোমা ও গুলির হাত থেকে বাঁচার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করা কেন ন্যায় সঙ্গত হবে না? কেন বারাক ওবামাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা যাবে না ???

মধ্যপ্রাচ্যের আজকের এই যুদ্ধ দেখে অনেকের মনে হতে পারে এই আন্দোলন একজন বৌয়াজিজির আত্মহননের পর থেকে শুরু হয়েছে, তাহলে এটা বিরাট ভুল হবে। কারণ, দ্বিতীয় ইন্দোচীন যুদ্ধের পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাদের যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলে সাব সাহারা অঞ্চলে। যেখানে আজকে আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে। যদি খেয়াল করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, আজকের কথিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ইরান যখন ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তখন তাকে ইসরায়েল ও মার্কিনীরা অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে। সেই অস্ত্রের মধ্যে ট্যাংক, মিসাইল থেকে শুরু করে ইয়ারক্রাফট পর্যন্ত ছিলো। অর্থ্যাৎ, বেয়াড়া সাদ্দামকে বাগে আনতে হলে ইরান তাদের জন্য ভালো বন্ধু।

এ সময়েই রিগ্যান সরকার নিকারাগুয়ের কমিউনিস্ট সান্দিনেস্তা সরকারের বিরুদ্ধে কন্ট্রাদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে নিকারাগুয়েতে আত্মঘাতমূলক তৎপরতায় চালায়।

লিবিয়ার লড়াইয়ের সাথে বাংলাদেশের একটা ঘনিষ্ট মিল রয়েছে। তাহলো ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কার। যখন ভারতীয় বাহিনী কথিত মুক্তির জন্য বাংলাদেশের উপর আগ্রাসন ঘটায় তখন এখানকার জাতীয় মুক্তি বেহাত হয়ে যায়। চলে যায় সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট আওয়ামী বাহিনীর হাতে। মূলত ভারতীয় বাহিনীর এই আক্রমণ ছিলো কমিউনিস্টদের যুদ্ধ থেকে হঠিয়ে দেয়া। ভারত সেবার সে পরীক্ষায় পাশ করেছে। সে সময় বাংলাদেশের যেসব কমিউনিস্ট পার্টি ভারতীয় বাহিনী এবং পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলো আজকের সময় লিবিয়ার জনগণের কাছে সেই কর্তব্য এসে হাজির হয়েছে। অর্থাৎ, এই লড়াই দীর্ঘস্থায়ী এবং দুই ফ্রন্টে হবে। যদি তা না হয়, তাহলে লিবিয়ার পরিস্থিতি আজকের বাংলাদেশের মতই হবে।

আজকের যুগে যে কোন দেশের আন্দোলন সংগ্রামের সাথে অন্য দেশের আন্দোলন সংগ্রামের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, পৃথিবী একটি সার্বজনীন বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে চলেছে। পৃথিবীর দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদের বনিক পুঁজি মাত্রাহীন শোষণের কারণে আন্দোলন সংগ্রাম দানা বাঁধছে। সেই আন্দোলন সংগ্রামে বাংলাদেশ কি ভূমিকা নিবে, কার পক্ষ হয়ে লড়াই করবে তা ঠিক করে দিবে এখানকার জনগণ। জনগণকে সংগঠিত করার কোন শ্রেণী নেতৃত্বের কমিউনিস্ট পার্টির অভাবে আন্দোলন সংগ্রাম বেহাত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s