অশান্ত আরববিশ্ব ও পশ্চিমা লুন্ঠনজীবী সভ্যতা

Posted: অক্টোবর 16, 2011 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, ,

লিখেছেন: হাসান তারিক চৌধুরী

মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রকামী সাধারণ

পশ্চিমের পন্ডিতেরা বহুকাল ধরে আমাদের গণতন্ত্র শিখিয়ে আসছে। বিশেষ করে যতদিন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন বলবৎ ছিল, ততদিন এই সবক দেয়ার মাত্রা অসহনীয় হলেও সংখ্যার দিক থেকে কমতি ছিলনা। আমেরিকার সরেস ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বৃত্তি পাওয়া এদেশী কালো চামড়ার চিন্তাবিদরাও তখন ‘সাহেবী গণতন্ত্রের (!)’ গুণগান গাইতে কোন কার্পণ্য করেননি। তাদের দেয়া তত্ত্ব অনুযায়ী সমাজতন্ত্রহীন তথাকথিত এককেন্দ্রীক বিশ্বের ‘চিত্রকল্প’ তখন বহু তাগড়া বামপন্থীকেই বিভ্রান্ত করেছিল। তারা এও বলেছিলেন, স্নায়ুযুদ্ধ মুক্ত এককেন্দ্রীক বিশ্বে যুদ্ধবলে কোন শব্দই থাকবে না। ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটির অস্তিত্ব শুধু অভিধানেই থাকবে। গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা আর মানবাধিকারের সুবাতাস বইবে এ পৃথিবীতে। জাতিগত সংঘাতের ফলে যেটুকু সহিংসতার আশঙ্কা করা হয়েছিলো, তা সমাধানে তাদের আবিষ্কার ছিল, ‘দূর্বলকে পিষে খাবার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি।’

যে সত্যটি এসব পশ্চিমা দাদনখোর পন্ডিতেরা সজ্ঞানে চেপে গিয়েছিলেন কিংবা আমলে নেননি। তাহলো, বিশ্বপুঁজিবাদের অমোঘ ও অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। তারা তাদের লেখনিতে একথা বলেন নি যে, পুঁজিবাদ তার আপন নিয়মেই যুদ্ধের জন্ম দেবে, হয়ে ওঠবে লুন্ঠনজীবী, অনেকটা জঙ্গলের হিংগ্র মাংসাশী পশুর মতো। ফলে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের বিপর্যয়ের পর পরই তথাকথিত এককেন্দ্রীক বিশ্বে বিশ্বপুঁজিবাদ তার লুন্ঠনজীবী রুপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। তার এই আবির্ভাব কতোটা রক্ত লোলুপ ও হিংগ্র ছিলো, ইরাক ও আফগানিস্তানের লাখো মানুষের রক্তের নদী এই বর্বরতারই বাস্তব প্রমাণ।

ইরাক ও আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়া সাম্রজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধ বিশ্বপুঁজিবাদের নতুন কোন বাইপ্রডাক্ট (উপজাত) ছিলনা। এটি মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে পুঁজিবাদের সহিংস রূপের ধারাবাহিকতা মাত্র। এ সহিংসতার শেকল থেকে মুক্তির কথাই মার্কসবাদলেলিনবাদে উচ্চারারিত হয়েছে। বলা হয়েছে, বিশ্ব পুঁজিবাদের চিরস্থায়ী কবর রচনার কথা।

আজ লিবিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী ন্যাটোবাহীনি তথাকথিত গণতন্ত্র (!) প্রতিষ্ঠার নামে অত্যাধুনিক মারনাস্ত্র নিয়ে হামলে পড়েছে। প্রতিদিন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে, বাড়ী ছাড়া করছে; এটিও সেই পুঁজিবাদী সভ্যতার (!) অন্তর্নিহিত সহিংসরূপের ধারাবাহিকতা মাত্র। পুঁজিবাদ তার লুন্ঠনজীবী চরিত্রের কারণে শুধু লিবিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, প্রয়োজনে পুরো বিশ্বজুড়ে সহিংসতা চালাতে কসুর করবেনা। সমাজতন্ত্রের নিন্দা করার সময় পুঁজিবাদী পন্ডিতরা এ চরম সত্যটিই স্বীকার করতে ভুলে যান।

উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সর্বশেষ লিবিয়ায় হামলা পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধই সাম্রাজ্যবাদীরা হয় গণতন্ত্র নয়তো মানবাধিকার, প্রভৃতির অজুহাতে সংঘটিত করেছে। গত ১১ এপ্রিল ২০১১, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন এশটন বলেছেন, ‘লিবিয়ায় স্থল সেনা পাঠাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তুত রয়েছে।এশটন আরো বলেছেন, ‘লিবিয়ার মানবাধিকার বঞ্চিত মানুষদের বাঁচাতে এ হামলা খুবই জরুরী।অন্যদিকে, জার্মান চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল বলেছেন, ‘জার্মান সেনারা এ হামলায় নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে আগ্রহী।কি অদ্ভুত সাদৃশ্য উভয়ের কথায়! পশ্চিমা লুন্ঠনজীবী সভ্যতা আবারো তাদের সন্তানকে জায়েজ করার জন্য মানবাধিকারের ছুতাকে ব্যবহার করছে। বিদেশী সেনাদের আগ্রাসন কতটা মানবাধিকার দেয়, ইরাক ও আফগানিস্তান তার জলন্ত প্রমাণ। কিন্তু আসল বিষয়টি যে মানবাধিকার নয়, সেটা আর কারোই অজানা নয়। বিবিসি, রয়টার্সসহ বহু আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, গাদ্দাফী বিরোধী বিদ্রোহী সেনাদের সংগঠন ট্রান্স ন্যাশনাল কাউন্সিল এর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে প্রতিদিন লিবিয়ার অশোধিত তেল লুটপাট করছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো। এখন পর্যন্ত মোট লুটের আর্থিক মূল্য ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইয়েমেন, বাহরাইন, সৌদি আরব, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও সেখানকার স্বৈরাচারী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে চলমান গণবিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের সাম্রাজ্যবাদী মিশন অব্যাহত রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, সেই স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র যতদিন জনগণকে লুটে সাম্রাজ্যবাদের তৃষ্ণা মেটাতে পেরেছে, ততদিন সেখানে কোন পশ্চিমা পণ্ডিত গণতন্ত্রের কথা বলেনি; কিন্তু যখনই তারা দেখেছে জন রোষে স্বৈররাজতন্ত্রের তাজ হুমকীর মুখে, তখনই তারা গণতন্ত্র/মানবাধিকারের ধুয়া তুলে সেখানে তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তাদের পুতুল সরকার বসাতে চাইছে। আর এসবের পেছনে রয়েছে তেলের উপর তাদের নিরঙ্কুষ নিয়ন্ত্রণ।

পশ্চিমা সভ্যতার নোংরা চেহারার সবচেয়ে নগ্ন রূপটি এবার বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ নিয়ে লীগ অব নেশন থেকে যে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিলো; সামাজ্যবাদ সেই জাতিসংঘের নিরপেক্ষ চরিত্রকে সমূলে বিনষ্ঠ করেছে। এটি এখন একুশ শতকের সবচেয়ে ঘৃন্য নজির। তাই জাতিংসঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৯৭৩ নম্বর প্রস্তাব, যার বলে লিবিয়ায় জাতিসংঘ বাহীনি হামলা চালিয়েছে; তা মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে।

তারপরও সভ্যতার প্রগতিমুখী গতি কখনো থেমে থাকেনা। জাতিসংঘের যে কাজ করার কথা ছিল, লিবিয়া ইস্যুতে সে দায়িত্ব নিয়েছে ‘আফ্রিকান ইউনিয়ন’। আফ্রিকান ইউনিয়নের সভাপতি টিউডোরো ওবিয়াং নগুমা প্রকাশ্যে লিবিয়ায় হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং ন্যাটেবাহিনীর হামলাকে বিদেশী আগ্রাসন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, লিবিয়ার সমস্যা লিবিয়ার জনগনকেই সমাধান করতে দেয়া উচিত। দক্ষিন আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি জ্যাকব জুমার নেতৃত্বে কঙ্গো, মালি, মৌরিতানিয়া ও উগান্ডার নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল সংকট নিরসনে লিবিয়া সফর করেছেন এবং গাদ্দাফী ও বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনার মিলিত হয়েছেন। নূন্যপক্ষে এই কাজটিই জাতিসংঘের করা উচিত ছিল। যে গনতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলে আজ এ যুদ্ধ চালানো হচ্ছে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত প্রমান করে এই পুরো বিষয়টি এক প্রাকন্ড ধাপ্পাবাজি। কারণ, ইরাক হামলার সময় আমেরিকার ৬৪ শতাংশ জনগণ এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল, ২৭ শতাংশ মানুষ মতদানে বিরত ছিল। লিবিয়ার হামলার বিষয়ে মার্কিন ও ইউরোপীয় জনমতের চেহারা এর থেকেও কম হবে। তাহলে কোন গনতান্ত্রিক অধিকার বলে পশ্চিমের তথাকথিত সভ্য শাসকেরা এ অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিল? তাদের এ যুদ্ধাপরাধের বিচার আজ খুবই জরুরী নয় কি??

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s