রূপগঞ্জ বিদ্রোহ :: রাষ্ট্র-মিলিটারি কর্পোরেশন আর প্রতিরোধী মানুষের গল্প

Posted: অক্টোবর 14, 2011 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , ,

লিখেছেন: বাধন অধিকারী

সূচনাটীকা: সেই বিএনপিজামায়াত জোট সরকারের সময়কার কানসাটের বিদ্যুত আন্দোলনের হাত ধরে সেনাকর্পোরেট কর্তৃত্বের অন্তবর্তীকালীন সরকারের যুগ পার করে বর্তমান আওয়ামী লীগ নের্তৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সময় পর্যন্ত দেশে ভূমি মানে অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে সংগ্রামের বেশ ক’টি স্বতস্ফূর্ত বিদ্রোহআন্দোলন লক্ষ্য করেছি আমরা। কানসাটের পর একে একে ফুলবাড়িতে, শনির আখড়ায় নিজভূমি রক্ষায় অস্তিত্বের সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল মানুষ। পাহাড়সমতলের ছোট ছোট জাতিগুলোর ক্ষেত্রে এই সংগ্রাম প্রায় প্রতিদিনের। সেনাকর্পোরেটজরুরি সরকারের যুগে মধুপুরে নিজেদের ভূমি, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সংগ্রাম করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় এলিট সন্ত্রাসীবাহিনী Rab-এর হত্যাযজ্ঞের (ক্রসফায়ারের) শিকার হন চলেশ রিছিল। বর্তমান আওয়ামী লীগ নের্তৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসবার পর রূপগঞ্জ আর আড়িয়াল বিলে অস্তিত্বের প্রয়োজনে একইভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম রচনা করেছে মানুষ। বলা বাহুল্য কোন রাজনৈতিক দলের অধীনে নয়, কোন মতাদর্শিক অবস্থান থেকে নয়, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে একেবারে ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থেকে করা স্বতস্ফূর্ত এইসব আন্দোলন আমাদের আশাবাদী করে। বুদ্ধিজীবীরা যাদের ‌‌‌আমজনতা সম্বোধন করে, সেইসব মানুষ যে নিজেরা সংগঠিত হতে পারে এবং সংগ্রাম রচনা করতে পারে এবং সংগ্রামের ইতিবাচক ফলাফল আনতে পারে, এই সত্যটি প্রকটভাবে আমাদের সামনে হাজির হয় এবং জনআন্দোলনে কর্তৃত্বতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্ভূক্তির অপরিহার্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পাহাড়েও রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীসেটেলাররাজনীতিআমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিজভূমি রক্ষার লড়াই জোড়ালো হচ্ছে। এইতো, মাত্র ক’দিন আগে খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার হাতিমুড়ায় নিজভূমি রক্ষা করতে গিয়ে ঘরবাড়িআশাআকাঙ্ক্ষাজীবন দিল পাহাড়িরা। কিন্তু পাহাড় জাগছে, পাহাড় আশাবাদী করছে। প্রতিরোধ জোড়ালো হচ্ছে।

সেনাবাহিনী কর্তৃক তাদের বিলাসীতার আবাসনের নামে রূপগঞ্জবাসীদের ভূমি দখলের চিত্র

রূপগঞ্জ বিদ্রোহের উপর করা এই লেখাটির আদি ইতিহাস বলে নেয়াটা ভীষণ দরকারী বলে মনে করছি। রূপগঞ্জবিদ্রোহের দুএকদিন পরই ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে বসি। লিখতে বসে খেয়াল করি দীর্ঘদিনের অনভ্যস্ততা (দীর্ঘ বিরতি দিয়ে কিছু লিখতে বসেছিলাম) বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলো। অথচ তাজা এই বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে কিছু না বলেও থাকা যাচ্ছিলো না। যেহেতু লিখতে পারছি না, বলার কাজটা সহজ হবে ভেবে এক সহযোদ্ধা বন্ধুকে অনুরোধ করি রূপগঞ্জের ঘটনা নিয়ে আমার একটা সাক্ষাৎকার নেবার জন্য । এক সন্ধ্যায় বসে মোবাইল ফোনে আমার সেই বন্ধুটির প্রশ্ন আর তার পরিপ্রেক্ষিতে আমার উত্তর ধারণ করা হয়। সাক্ষাৎকারটা আমরা একটা পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করবএটাই ছিলো তখনকার সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিরাজমান বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার চরম অবমাননা চলছে। আমার সেই সহযোদ্ধা বন্ধুটি তাই নিঃসংশয় হতে চেয়েছিলো যে এটি প্রকাশিত হলে ওর কোনো বিপদ হবে না। কিন্তু বিপদ হবে নাএমন কোনো নিশ্চয়তা আমি তাকে দিতে পারিনি শেষাবধি। এদিকে আমার দিক থেকে বিপদকে আলিঙ্গন করে হলেও এই সত্য উচ্চারণের নৈতিক তাড়না অনুভব করছিলাম। তখন বিকল্প খুঁজছিলাম। সমস্যাটার কথা জানাতেই প্রিয়ভাজনশিক্ষকসহযোদ্ধাবন্ধু সেলিম রেজা নিউটন পরামর্শ দিলেন, সাক্ষাৎকারে করা প্রশ্নগুলোকে সাবহেড করে করে এটাকে একটা প্রবন্ধ বানিয়ে ফেলো। পরামর্শ কাজে দিল ভীষণ। কিন্তু সাক্ষাৎকার জিনিসটাকে প্রবন্ধ বানাতে গিয়ে পুরো জিনিসটাকেই উল্টেপাল্টে নিতে হলো। তারপরও কোথাও কোথাও হয়তো বলা কথার টোন থেকে যাবে। তাই উল্লেখ করলাম রচনার আদি ইতিহাস। নামোল্লেখ না করেই কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখছি সেই বন্ধুটিকে আর অবশ্যই সেলিম রেজা নিউটনকে। একজন প্রশ্ন করেছিলো আর আরেকজন পরামর্শ এবং বিপুল পরিমাণে উৎসাহ দিয়েছিলেন বলেই এই লেখাটা শরীর পেলো। আর আডিও শুনে সরাসরি কম্পিউটারকম্পোজ করে এবং বানান দেখে সহযোগিতা করেছে আমার খুব প্রিয় বন্ধু মুকুটপিতমঅনীক।

২৩ অক্টোবর তারিখের রূপগঞ্জ

দৈনিক পত্রিকা পড়ছিলাম না বেশকিছুদিন। সত্যি বলতে কি, কোনো তাড়না কাজ করছিলো না অনেকদিন ধরেই। রূপগঞ্জের ঘটনাটা যেদিন ঘটল, তার পরেরদিন ইন্টারনেটে দেখছিলাম (বিশেষত ফেসবুকের মধ্যে, তারপরে ফেসবুক থেকে আবার অন্য লিংকে গিয়ে, ব্লগঅলটারনেটিভ সাইটঅনলাইন নিউজপেপার এইসবে) ঘটনার বিবরণ। এরপর পত্রিকা না পড়বার অভ্যস্ততা থেকে বের হয়ে এসে দেখলাম পত্রিকার রিপোর্ট। দৈনিক পত্রিকাব্লগফেসবুকঅনলাইন পত্রিকা মিলে দেখলাম যে, একটা প্রতিযোগিতা আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজে তৈরি হয়েছে। প্রতিযোগিতাটা হলো, কিভাবে কিভাবে দেখা যায়, মানে কত কত বাকা পথে দেখা যায়, কত জটিল করে দেখা যায়। তো রূপগঞ্জের ঘটনা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, সোজাসাপ্টা ঘটনা। জটিল করে, বাকা করে দেখার কিছুই নাই।

ঘটনা হলো সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার (ঘটনার দিন আইএসপিআর এমনই দাবি করেছে যে, এটা সেনাবাহিনীর কোনো প্রকল্প না, এটা কিছু সেনাঅফিসারের নিজস্ব প্রকল্প) রূপগঞ্জে ১৩ হাজার বিঘা জমি কিনে নিজেদের (নিজেদের বলতে কিন্তু শুধুই অফিসারদের, সাধারণ সৈনিকদের নয়) আবাসন নিশ্চিত করবার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়। পত্রিকার বিবরণ থেকে জানতে পারি, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমি তারা কিনেও ফেলেছিল। কিন্তু জমি কিনবার ক্ষেত্রে তারা আইনকানুন কিছুরই ধার ধারেননি।

আসলে রূপগঞ্জের বেশিরভাগ মানুষ তাদের জমি আবাসিক প্রকল্পের কাছে বিক্রি করতে চায়নি। কেন চাইবে? যে জমি তাদের পূর্বনারীপূর্বপুরুষের কিংবা ক্রয়বিক্রয়ের সূত্রে তার হয়ে গেছে এই মালিকানার যুগে, যে জমি তাদের গ্রাম, যে জমি তাদের আবাসঘরসংসারস্কুলখেলার মাঠ, যে জমি তাদের ফসলের জননী, যেখানে তাদের সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত, যেখানে তাদের আজীবন বসবাস সেই জায়গাজমি কে ছাড়তে চাইবে? রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকতারা সেই জমি একরকম দখল করতে চাচ্ছিল। এটা তো দখল করতে চাওয়াই, কারণ যখন কেউ দিতে চাচ্ছে না, তখন যদি তাকে টাকা দিয়ে তার জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয় তাহলে সেটা দখল করতে চাওয়াই। ওইখানে জমির নির্ধারিত মূল্য ছিল কোন পত্রিকার মতে ৬০৮০লাখ, কোনটা ৪০৬০লাখ, আর সেই জমিটা ১৫লাখ টাকায় বেচতে বাধ্য করা হচ্ছিল আর বলা হচ্ছিল যে এটা ন্যায্য মূল্য। চৌদ্দটা মৌজায় রেজিষ্ট্রেশন বন্ধ করে রাখা হইছিল। যে জমি ওই রূপগঞ্জের মানুষগুলোর অস্তিত্ব, সেই জমি, যে কোন কারণে আমি দখল করতে যাই না কেন, সেই দখলদারিত্ব অন্যায্য, সম্পূর্ণ অন্যায্য। এই অন্যায্যতার বিরুদ্ধে অস্তিত্বের প্রয়োজনে মানুষ ওইখানে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলো। এটা হল সোজাসাপ্টা রূপগঞ্জের ঘটনা।

ঘটনাকে ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা

সেনাবহিনী, সরকার এমনকি জাতীয় দৈনিকগুলো রূপগঞ্জের ঘটনাকে ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করেছে। এই ভুল বোঝাবুঝির মানেটা কি? মানেটা হলো, ওখানকার মানুষকে যা বোঝাতে চাওয়া হয়েছিলো, সেটা যখন তাদেরকে কোনোভাবেই বোঝানো গেলো না, তখন বলপ্রয়োগ করে বলা হলো। হ্যাঁ, যেটা জোর করে বুঝতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়, আর কোনোভাবেই যখন বোঝানো যায় না নিজের সুবিধামাফিক, তখনই সেটা ভুল বোঝাবুঝি। সেনাবাহিনীর অফিসাররা চাচ্ছিল হাজার হাজার বিঘা জমি তাঁরা নিয়ে নেবে এবং সেগুলো হল কৃষি জমি, রূপগঞ্জবাসীর অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে যা জড়িত। ছয় হাজার বিঘা জমি জোরপূর্বক কিনে নিয়ে নেয়া হবে, ষাট লাখ টাকার জায়গায় পনের লাখ টাকা দিয়ে কেনার চেষ্টা করা হবে, ফসলের জমি নিয়ে নেয়া হবে, অন্য কারো কাছে বেচতে দেয়া হবে না, ভাইয়ের কাছে ভাইয়ের জমি বেচতে দেবে না, ধর্মীয়মূল্যবোধের জায়গায় দাঁড়িয়ে ওয়াকফ করতে পারবে না, ইসলামের জন্য নিবেদন করতে পারবে না, ওই জমি সেনাবাহিনীর কিছু অফিসারের কাছে সস্তা দামে বিক্রি করে দিতে হবে, সোজা বাংলা কথা তো এই বলতে গিয়েছিল। এখন এই বাংলা কথা বলতে গিয়ে জনগণ এটা বোঝেনি, সুতরাং ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে!

সরকারমিডিয়াসেনাবাহিনীবুদ্ধিজীবী এরা মিলে এই রাষ্ট্র যারা চালায়, এরা সবাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একইরকম বোঝে। একইরকম করে বুঝেছে এটা ভুল বোঝাবুঝি। আসলে রুপগঞ্জের প্রতিরোধী মানুষ সঠিক অর্থেই বুঝে গিয়েছিলো কী ঘটেছিলো রূপগঞ্জে। ক্ষমতাশালীরা তাদের উল্টাপাল্টা বোঝাতে পারেনি। এজন্য এটাকে ভুল বোঝাবুঝি নামে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতাকে দায়ী করবার প্রবণতা

আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী ঘটনার জন্য গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন এবং গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থ হওয়া উচিত। কেননা একজন স্বাধীন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে রাষ্ট্র ঢুকে পড়ে গোয়েন্দা সংস্থা হয়ে। গোয়েন্দা সংস্থা (মানে রাষ্ট্র) আড়ি পেতে কিংবা নজরদারি করে প্রত্যেক মানুষের তথ্য নেবে এটা আমি চাই না। আমাদের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়। আমরা নজরদারির মধ্যে থাকি, স্বাধীন থাকি না।

ফুকো ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ’এ প্যানপটিকনের যে কথা বলেছেন, এটা আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছি এই আধুনিক যুগ বিশ্লেষণের জন্য। ফুকো আধুনিক সমাজকে জেরেমি বেন্থাম নক্সাকৃত ‘প্যানোপটিকন’এর সাথে তুলনা করেছেন। ঐ নক্সানুযায়ী প্যানোপটিকনে, একা একজন রক্ষী অনেক কয়েদিকে দেখতে পায়। কিন্তু সেই রক্ষীকে দেখা যায় না। ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ’এ ফুকো কিন্তু আমাদের সতর্ক করেছেন যে, আধুনিক সমাজের ভেতর দিয়ে একটি ‘কার্সেরাল কন্টিনিউয়াম’ প্রবাহিত। দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা কারাগার থেকে শুরু করে নিরাপদ বাসস্থান, সমাজকর্মী, পুলিশ ও শিক্ষকদের মাধ্যমে আমাদের প্রতিদিনকার কাজের জায়গা আর গার্হস্থ্য জীবনেও এই প্রবাহ বহমান। এ সব কিছুই মুষ্টিমেয় ক’জন মানুষ দিয়ে অন্য মানুষদের পরিচালনা করার মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে আছে। তো আধুনিক যুগে রাষ্ট্র আসলে ঐ প্যানপটিকনের মতো করেই নজরদারি জারি রাখতে চায়। আধুনিক সমাজটা যেন সত্যিই প্যানপটিকন সমাজ আর সব মানুষ যেন কয়েদী। আর গোয়েন্দা সংস্থা যেন সেই রক্ষী! যাকে কেউ দেখতে পাবে না, ছুঁতে পারবে না, কিন্তু কোনো এক ক্ষমতাবলে তারা সবকিছু জেনে যাবে, বুঝে যাবে।

রূপগঞ্জের ক্ষেত্রেও দেখেছি, গোয়েন্দা সংস্থা যদি আগে থেকেই বুঝে যেত যে রূপগঞ্জে জনগণ একত্রিত হয়ে এরকম ঘটনা ঘটাতে পারে, তাহলে হয়তো নিপীড়ন আরও বাড়ত । বা আগে থেকেই সেই প্রতিরোধ মোকাবেলার একটা প্রস্তুতি রাষ্ট্রের দিক থেকেও রাষ্ট্র হয়তো নিতে পারত। এটা যদি নিতে পারত তাহলে দেখা যেত যে জনগণের প্রতিরোধ দমন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র একটু এগিয়ে থাকত। সুতরাং গোয়েন্দা সংস্থা সফল হলে ভাল কিছু হত না, এজন্য ব্যর্থ হয়ে ভালই হয়েছে। এখন যারা বলে যে গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ তারা কোন না কোনভাবে এই রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে মেনে নেয়। রাষ্ট্রের একটা এরকম বাহিনী থাকবে, কারণ রাষ্ট্র অত্যাচার করবেই মানুষের উপর এবং মানুষের প্রতিরোধ সেখানে থাকবে, সেই প্রতিরোধ দমনের জন্য মানে কোথায় কি ধরনের প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে, কোথায় বিরোধিতা হচ্ছে সেটা দমনে গোয়েন্দা সংস্থা দরকার হয়।

ষড়যন্ত্রের নামে বিদ্রোহকে আড়াল করবার প্রচেষ্টা

এখনও পর্যন্ত মানুষ কোথাও বিদ্রোহ করেছে, (রূপগঞ্জের মানুষের এটা পরিষ্কার একটা বিদ্রোহ, অন্যায্য ক্ষমতাকতৃত্বের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ করছে) এখনও পর্যন্ত যত বিদ্রোহ হয়েছে তার মাঝে এমন কোন বিদ্রোহ নাই যে বিদ্রোহের পিছনে ষড়যন্ত্র খোজা হয়নি। গতানুগতিকভাবে এই রূপগঞ্জের ক্ষেত্রেও ষড়যন্ত্র খোজা হয়েছে। এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে মানুষ ওইখানে অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছে। এখন কে তাকে উসকিয়ে দিয়েছে, কে তাকে গেঞ্জিটা পড়িয়ে দিয়েছে, (ক্ষমতাশালীদের দিক থেকে বলা হয়েছে, একই গেঞ্জি সবার হল কিভাবে, একই লাঠি হল কিভাবে) কেউ যদি লাঠি দিয়ে থাকে, তো কি হয়েছে? যদি না দিত তাহলে মানুষ অন্য কোথাও থেকে লাঠি যোগাড় করে নিত। যে ঘটনা ওখানে ঘটছে তাতে কারও উস্কানির প্রয়োজন পড়ে না। এমনিতেই বিদ্রোহ হবার কথা।

প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করবার চক্রান্ত রূপগঞ্জের ঘটনায় খন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ কেউ কেউ এমন মন্তব্য করলেন। ফালতু কথা ওসব। রাজনৈতিক শক্তি কখনও সেনাবিহনী নামের প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করতে চায় না। কেন চাইবে? রাজনৈতিক শক্তির রক্ষাকবচই তো এই সামরিক শক্তি। সেই রাজনৈতিক শক্তিই কেন চাইবে, সেনাবাহিনী ধ্বংস করতে? সেনাবাহিনী ধ্বংস হলে তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে কে। সেনাবহিনীসহ অপরাপর বল প্রয়োগকারী ফোর্স না থাকলে বিদ্যমান কাঠামোর রাষ্ট্রীয় ম্যানেজমেন্ট ঠিক থাকবে না।

আসলে এইসব বক্তব্য শাসকশ্রেণীর নিজেদের মধ্যেকার ছোট ছোট দ্বন্দ্ববিরোধের ফলাফল। কে লুটেপুটে খাবে আগামি ৫ বছর, নির্বাচন করে কে জিতবে, কোন সরকারকে কখন ফেলতে হবে, কী করে বিরোধীদের ধ্বংস করা যাবে, কি করে সরকারীদের উৎখাত করা যাবে এইসব আলাপ।

দেলোয়ার হোসেন আরও বললেন, সেনাবাহিনীকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করবার ষড়যন্ত্র এটা। এই কথাটা শুধুই দেলোয়ার হোসেন বলছেন এমন না, মানে এটা একটা প্রচলিত কথা। সবসময়ই শোনা যায়। সেনাবাহিনীর প্রশ্ন উঠলেই কোথাও, মানে যখনই ওঠে, যেমন বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাতেও দেখছি একইরকম যে সেনাবাহিনীর প্রশ্নটা ওঠে, তখনই সাথে সাথে এই কথাটাও শুনতে পাই, যে সেনাবাহিনী আর দেশের জনগনকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা। তো সেনাবাহিনী আর জনগন অবিচ্ছিন্ন জিনিস কোনদিন ছিলো? এটা নতুন করে বিচ্ছিন্ন করার আর কি আছে? সোজা অর্থে জনগণ আর সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্ন। সোজাসাপ্টা যদি আমরা দেখি, ক্যান্টনমেন্টে তো আমরা দেশের মানুষ ঢুকতে পারি না। এখন তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় না কি হয় সেগুলো পরের প্রশ্ন। আমরা দেশের মানুষ। আমাদের দেশরক্ষার বাহিনী, যাদেরকে আমরা করের টাকা দিয়ে লালনপালন করছি তাদের সাথে আমাদের মানে জনগণের কোনো যোগাযোগ নাই। তারপরে যখনই আমরা রাস্তাঘাটে সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখি, সেনাবাহিনী দেখি, যখন বাজার করতে পর্যন্ত দেখি তখন আমরা এড়িয়ে যাই। কেমন ‘আমরা’ ‘ওরা’ বোধ হয়। সিভিলিয়ানমিলিটারি পরিচয়ের মধ্য দিয়েও তাদের একটা আলাদত্ব নির্মাণ হয়েই আছে এবং তারা নিজেরাও নিজেদেরকে আলাদা ভাবতেই পছন্দ করে আমাদের থেকে। এই আলাদত্ব তাদের জন্য নির্মাণ করা আছে, শুরু থেকেই তার প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়েই হয়তো এর শুরু হয়। তাহলে বিচ্ছিন্ন করার আর নতুন করে চেষ্টা করার কি আছে, সম্পর্কটাতো আগাগোড়াই বিচ্ছিন্নতার। এটা নতুন করে বিচ্ছিন্ন করার আর কিছুই নাই।

এগুলো হল যে স্থূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য বলা কথা। সেনাবাহিনীকে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা।

অস্বীকারের রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় খুন আড়াল করবার প্রচেষ্টা

এখানে তো দেখা গেছে যে অনেকে মারা গেছে, নিহত হয়েছে আহত হয়েছে, কিন্তু সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে গুলি ছোড়া হয়নি, জনগণ বন্দুক কেড়ে নিতে গেলে গুলি বের হয়ে যায়, বের হয়ে গিয়ে জনগণের গায়ে গুলি লাগে। এদিকে আমার দেশ পত্রিকা রিপোর্ট করছে একজন ট্রলার চালক (মানে গুলিবিদ্ধ ট্রলার চালক…) তিনি বলছে যে, গ্রামবাসী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে যখন সংঘর্ষ হচ্ছিল তখন মুষড়ি গ্রামের ঘাটে তিনি ট্রলার ভিড়িয়েছিলেন এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে ট্রলারে লুটায়ে পড়েছিলেন। তারপর তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়। তো সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, তাদের কাছ থেকে যখন লোকজন বন্দুকটন্দুক কেড়ে নিতে গেছে, তাদের অস্ত্রপাতি কেড়ে নিতে গেছে তখন ধস্তাধস্তি হয়ে গুলি বের হয়ে গেছে। ঠিক এমনি করে আমরা আগেও গুলি বের হতে দেখেছি পত্রিকার বিবরণে। ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে যেমন বন্দুকযুদ্ধ দেখি! কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, সেনাবাহিনীর ক্যাম্প নিশ্চয়ই ওই ট্রলারটার মধ্যে ছিল না যে ওইখানে তারা ধস্তাধস্তি করেছে, আর গুলি লেগেছে। ট্রলারটা তো আলাদা জায়গায় ছিল, এই জায়গা থেকে তো বুঝতে হবে যে গুলি চালানো হয়েছে। এতো এতো লোক গুলিবিদ্ধ হলো, সবাই ধস্তাধস্তি করছিল?

সরকারী হিসেবে ঘটনায় নিহত একজন কিন্তু গ্রামবাসী বলেছে যে আরও তিনজনকে ঘটনার দিন Rab গুলি করে তুলে নিয়ে যায়, যাদের হদিস পাওয়া যায়নি। রূপগঞ্জবাসীর হিসেব মতো মৃতের সংখ্যা ৪ জন । এখন যৌক্তিকভাবে, একেবারেই যৌক্তিকতা দিয়ে এটা আপাতত আমি প্রতিষ্ঠা করতে পারব না যে, ওইখানে কতজন মারা গেছে। মানে বলতে পারব না সুনির্দিষ্ট করে, কয়জনকে মারা হয়েছে, মানে কয়জনকে খুন করা হয়েছে। বলতে পারব না কারণ আমি সেখানে যাইনি, আমি সেখানে ছিলাম না, কোন ডিরেক্ট এভিডেন্স এখনও নাই আমার কাছে, যে আসলে কয়জন মারা গেছে। তবে পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে রাষ্ট্র খুন আড়াল করতে চায় ,আড়াল করে, সবসময়ই করে। খুবই মজার এটা যে, একটা সময় ছিলই যে যুগটায় গুপ্তহত্যা প্রচলিত ছিলো। মানে মেরে গুম করে দেয়া হত। আধুনিক যুগকে আমরা কেউ কেউ প্রকাশ্য হত্যার যুগ বলি। সেটা কেমন? সেটা হলো যে আমি তোমাকে বিচার করে খুন করব। মৃত্যুদণ্ড যেটার আধুনিক নাম। সেটা হল প্রকাশ্য খুন। একজন মানুষ ঠিক কি অপরাধ করলে তাকে খুন করা যেতে পারে, তাকে শেষ করে দেয়া যেতে পারে? তো এখন প্রকাশ্য হত্যার সাথে অপ্রকাশ্য হত্যাও চলে। রূপগঞ্জে তাই ঘটেছে হয়তোবা। গ্রামের মধ্যে তিনজন মানুষকে খুজে পাওয়া যচ্ছে না এবং তাদরকে ঠিক ঐ ঘটনার দিন থেকেই খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রামবাসীর দাবি Rab তাদের তুলে নিয়ে গেছে। এইযে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং দিনটা যখন ঐদিন, একই সঙ্গে তিনজন মানুষ নাই একটা গ্রাম থেকে, তখন আমরা কি বুঝব? এটা তো দৈনন্দিন ঘটনা না ঐখানকার, যে প্রতিদিনই ঐখান থেকে তিনজন করে হারিয়ে যায়। এখন, এই যে তিনজন লোক হারিয়ে গেল তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এটার দায় রাষ্ট্র স্বীকার করবে না। তারমানে দেখা যায় যে, একদিকে তো গুপ্ত হত্যার যুগ শেষ হয়নি, অপরদিকে প্রকাশ্যে বিচারের নামে, আইনের নামে, সংবিধানের কিংবা গণতন্ত্রের নামে বৈধতানির্মিত প্রকাশ্য হত্যার যুগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। এখানে যদিও বলে রাখা দরকার, দুনিয়াব্যাপী সমতান্যায়মানবাধিকার আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মীরা মৃতুদণ্ডবিলোপের দাবি জোড়ালো করেছে, আর কল্যাণ রাষ্ট্রগুলো এটা বিলোপও করেছে, সেটা আরেকটা দিক।

রাষ্ট্র নিরাপত্তা নয়, রাষ্ট্র নিজেই নিরাপত্তাবাধা

এই রূপগঞ্জ এলাকার মানুষরা তো এখন এলাকা ছাড়া, বাচ্চারাকিশোররা স্কুলেও আসছিল না, সবাই পালিয়ে ছিলো। তারা নিরাপদ বোধ করছিলো না, সেজন্য গ্রামে ফিরছিল না। ওদিকে প্রধানমন্ত্রীস্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সাংসদ এরা বলছিল যে যারা উসকানিদাতা শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তারা সাধারণ মানুষকে গ্রামে ফিরতে বলেছিল। চার হাজার লোকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। চার হাজার লোককেই কি এই প্রধানমন্ত্রী, আমাদের প্রধানমন্ত্রীস্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীস্থানীয় সাংসদ উসকানিদাতা মনে করেছে? নিশ্চই করেনি। এখন মামলা মানে রায় না সেটা অবশ্য ঠিক। কিন্তু যখন চার হাজার অজ্ঞাতনামা মানুষের নামে মামলা করা হয়েছে, তখন তো মানুষ খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরতে চাইবে না, ফেরার পথটা আগেই বন্ধ। মামলা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় ফোর্সের পক্ষ থেকে। যাইহোক এগুলো তো কণ্ট্রাডিকশন। একদিক থেকে চার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা। আরেকদিক থেকে সেই মামলা অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে। কে আসামি কে আসামি না সেটা তো কেউ জানে না। কেমন করে ফিরবে? তারপরেও লোকজনের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই তারা ফিরেছে। এখন এইযে উসকানির ঘটনাটা, এইটাকে বিভিন্নভাবে ব্যবহারের সুযোগ থাকে। দেখা গেল আওয়ামিলীগ নেতার একজনের উপর রাগ আছে, সে থানার ওসিকে ফোন করে বলে দিল, যে একে উসকানিদাতা বানান, সে উসকানিদাতা হয়ে গেল। ধরা যাক এমন হলো যে, বিএনপির পঞ্চাশজনকে ফাসানোর চেষ্টা করা হল। আবার দেখা গেল যে যারা হয়তো প্রকৃত সংগঠক এই আন্দোলনের, (সংগঠক বলছি, নেতা বলছি না কিন্তু, এই মুভমেন্টের কোন নেতৃত্ব নাই, এটা স্পষ্ট করে এখানকার জনগণ বলছে যে, পত্রিকার কাছে তারা বলেছিলো যে, আমাদের কোন নেতা নাই, আমরা অস্তিত্বের প্রয়োজনে একজায়গায় হয়েছি।) তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করা হলো। আমি সেজন্যেই বারবার ওই অস্তিত্বের প্রয়োজন কথাটা; তাদের কথাটাএকেবারে তাদের বলা কথাটা ব্যাবহার করছি। এই রূপগঞ্জের প্রতিরোধী মানুষ, তারা একেবারে অস্তিত্বের প্রয়োজনে লড়াই করছে এবং তাদের যারা সংগঠক, যারা কোন না কোনভাবে লোকজন একজায়গায় করছে, তারা যাই করুক না কেন, তাদেরকে উস্কানিদাতা বানানোর চেষ্টা করার সুযোগ তৈরী করাই এমন আইনমামলার উদ্দেশ্য। অর্থাৎ যে বা যারা ন্যায্য প্রতিবাদের, একটা ন্যায্য প্রতিবাদ সংগঠিত করার চেষ্টা করছে তারা উসকানিদাতা। এটাই হবে হয়তো, বরাবরই তাই হয়, আমরা আগষ্টের মুভমেন্টের সময় দেখছি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে, একেবারে নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছি, একই ঘটনা। তখন খোঁজা হয়েছে যে সংগঠক কারা। তো ঐ ঘটনাও ছিল উসকানি। ওর মধ্যে উসকানি খোঁজা হয়েছে।

আইনের শাসনের নামে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে ঘটানো ঘটনা

প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনী দেশ ও জাতির অতন্দ্র প্রহরী। সেই অতন্দ্র প্রহরীর কাজ হল দেশ রক্ষা করা, সার্বভৌমত্ব্ রক্ষা করা। সেনাবাহিনী তো শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া তাদের বাপের টাকায় চালায় না। জনগণের করের টাকায় সেনাবাহিনী চলে। তো সেই টাকায় তার মানে আমার টাকায় আপনার টাকায় সবার টাকায় চলে সেনাবাহিনী, মানে আমাদের টাকায় খাবে, আমাদের টাকায় প্রশিক্ষিত হবে, তার হাতে আমরা দেশ রক্ষার জন্য অস্ত্র তুলে দেব, সেই অস্ত্র নিয়ে যেয়ে সে তার ব্যক্তিগত বিলাসবাসনা, তার বাড়ির বাসনা পূরন করবে এটা বেআইনি। এটা হয় না। এটা তো নিশ্চিত বেআইনি, সোজা অর্থে ইলিগাল।

সেনাক্যাম্প হইল ওইখানে, সেখানকার ইউপি চেয়ারম্যান জানত না। চেয়ারম্যান জানত না, তারপরে থানার ওসি জানত না, যে সেনাক্যাম্প হচ্ছে। তো জনপ্রতিনিধির তো জানার কথা, এটা রাষ্ট্রীয় আইন যে সেনাক্যাম্প হইলে সেখানকার জনপ্রতিনিধি জানবে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জানবে। ওইদিক থেকে সেনাসদরদপ্তরের বক্তব্যে ওরা বলেছিল যে, এইটা আসলে সেনাবাহিনীর সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই, এটা হল কিছু সেনাকর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ। আমরাও দেখলাম তাই, যে এটা কিছু সেনাকর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ। এটা সেনাবাহিনীর জিনিস না। তো কারও ব্যক্তিগত উদ্যোগ, ব্যক্তিগত বাসনা মেটাবার জন্য রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে। সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ মেটানোর জন্য টোটাল সেনাবাহিনী নামক প্রতিষ্ঠানকে ব্যাবহার করেছে, ওইখানে যেয়ে ক্যাম্প বানিয়েছে। সেখানে তাদের প্রশিক্ষণট্রশিক্ষণ কিছুই কাজ না, কাজ ছিলো লোকজনকে ভয় দেখিয়ে জমি নেয়া, অথবা বুঝিয়েশুনিয়ে। তো এইটা কি গণতন্ত্র, যাকে আমি কিছুই বলতে পারব না সে আমাকে গুলি করবে। এটা স্পষ্টত বেআইনী।

কিন্তু এটাই হবে, এটাই স্বাভাবিক। আইনবেআইন ব্যাপার না। মিলিটারি কর্পোরেশন যুগের দাবি। এই নিও লিবারাল বাজারের যুগ। এই আইনের শাসনের যুগ। এই যুগে মোশরেফা মিশু, বিনায়ক সেন, জুলিয়ান আসাঞ্জ নামের প্রতিরোধী মানুষদের আইন দিয়ে সাইজ করবার নাম আইনের শাসন। এই যুগে সবাই কেনাবেচা করবে দেধারসে, অন্যদের হাউজিং বিজনেস থাকবে, সেনাবাহিনীর লোকজন কেনাবেচা করবে না, বাড়ি বানাবে না, সেটা তো হয় না! তাহলে ক্রাইসিসটা স্বৈরতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির দাপটের (নিরঙ্কুশ ক্ষমতার) মধ্যে নিহিত। আমি এটা খেয়াল রাখতে চাই। নিছক, আলাদা করে সেনাবাহিনীকে দোষ দেবার কিছু নেই। বাজারের যুগে তাদের হাতে থাকা স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা নিয়ে তারা বাজারে নামবে, এটাকে আমি স্বাভাবিকভাবেই দেখছি!

আইন কোনো রাস্তা না, বুঝে গেছে রূপগঞ্জবাসী

রূপগঞ্জবাসীর একজন পত্রিকার কাছে বলেছিলো, যে যেখানে আমার ভাইয়ের লাশ দাফন করার আধিকারই আমদের নেই সেখানে আমরা কার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করব? যেখানে দাফন করতে পারিনা সেখানে কার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করব? ঐ মানুষটি, যে এই কথা বলেছে, সে স্পষ্ট করে, মানে হাড়ে হাড়ে ওর জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ও বোঝে যে, আইন হল যে বড়লোকেরই জিনিস, ক্ষমতাশালীদেরই জিনিস। এটা সে খুব ভাল করে বোঝে। আমি একবারে মোটা দাগে এই কথা বলে দিচ্ছি না, মানে বললে অন্যায় হবে যে আইন মাত্রই খারাপ, কিংবা আইন মাত্রই গণবিরোধী। যেমন অনেক আইন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ জনপ্রতিরোধের ফলাফল। ফেয়ার এন্ড লাভলির বিজ্ঞাপন ভারতে নিষিদ্ধ করা হইছে জনপ্রতিরোধের কারণে, আইন করে। আইন করে সিগারেটের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন করে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের চেষ্টা আছে দুনিয়ার বুকে। তো এরকম আইনও আছে, সেগুলো আলাদা। কিন্তু যেটা খোদ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বানানো আইন সেইটা আদতেই বড়লোকের আইন। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রটাই আসলে বড়লোকের। শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকবন্ধু সেলিম রেজা নিউটন দারুন বলেন। উনি বলেন, রাষ্ট্র যে বলে সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাত থেকে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা তার একটা দায়িত্ব, তো এটা এক অর্থে ঠিকই বলে। কেননা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের হাত থেকে বড়লোক সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা তার দায়িত্ব। অর্থাৎ সংখ্যাগুরু গরীব মানুষের হাত থেকে এই সংখ্যালঘু মুষ্ঠিমেয় কিছু বড়লোক যার মধ্যে সেনাবাহিনীর অফিসাররাও পরে তাদেরকে রক্ষা করা আইনের কাজ।

থানায় মামলা নেয়নি, এইযে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না যাদের তাদের আত্মীয়স্বজনের মামলা নেয়নি, তাদেরকে জিডি করে ছেড়ে দিছে। আর বিপরীত দিক থেকে মানে Rab এবং পুলিশ চার হাজার অজ্ঞাতনামা মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কি ভয়ংকর! আজও কিন্তু সন্ধান মেলেনি নাখুঁজে পাওয়া মানুষদের। খুন করা হয়েছে তাদের।

অপরিপক্ব কর্মকাণ্ডের দায়ভার

রূপগঞ্জে হাউসিং নিয়ে এই প্রকল্পটার রূপরেখা ওয়েবসাইট তো দিয়ে দেয়া হয়েছিলো, সেই ওয়েবসাইটে ওই টোটাল প্রকল্পটার ডেডলাইন দিয়ে দেয়া ছিল। পত্রিকার তথ্যে দেখা গেছে যে প্রাক্তন একজন সেনা কর্মকর্তা বলছিলেন যে হুবহু প্রকল্পটার রূপরেখা দিয়ে দেবার দরকার ছিলো না। এটাকে উনি অপরিপক্বতা বলছেন। বলেছেন যে এটা না দিলেও হতো। তার মানে কি? মানে হলো যে, দখল করছ কর, এতখানি মহা দখলের পরিকল্পনা নিয়েছে নাও; কিন্তু সেটা জনগনকে না বললেই চলতো, এখনি বলার কি দরকার ছিল। আচ্ছা আবার মানে আরও কেউ কেউ এমনকী আমাদের পত্রিকার মাননীয় সম্পাদকরা পর্যন্ত বলল যে আসলে এটা একটা ভুলবোঝাবুঝি, কিংবা এভাবে না করলেও হত, ওভাবে করা যেত এরকম বিভিন্ন কিছু। সোজা কথা হলো, যে বুঝিয়ে শুনিয়ে জমি নিলেই হতো। হ্যাঁ এটা হল আসল কথা। ওরকম করে জোর করতে গেলা কেন।

সেদিক থেকে তো এটা অপরিপক্বতা। খুবই মজার ব্যাপার হল যে, ক্ষমতা জিনিসটার নামই হল অপরিপক্বতা, এটা কখনও পরিপক্ব না, পরিপক্ব হইলে টিকে যেত। এটার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হয়, কারণ এ হল যে সবসময় পরিপক্বতা জারি রাখতে পারে না। এটা সম্ভব না। মানুষ টের পেয়ে যায়, খুব স্বভাবিক ভাবেই মানুষ টের পেয়ে যায়। মানে মানুষ বুঝে যায় এটা কি জিনিস। যতই পরিপক্ব হওয়া হোক তারপরেও অপরিপক্বতা থাকে তার মধ্যে। কারণ মানুষ অতখানি অপরিপক্ব না। পরে এসে যে রাজউক আর গণপূর্ত অধিদপ্তরকে যুক্ত করতে চাওয়া হয়েছে প্রকল্পের সাথে, পরিপক্ব করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সামরিক আমলাতন্ত্রের তো মাথা গরম, মানে এ হল তো শুধু বল প্রয়োগ করতেই শেখে তাই এখন রাজউককে একেবারে যুক্ত করতে চাওয়া হয়েছে। যেন সেও এই দখলদারিত্বতে আমলাতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করতে পারে। গনপূর্ত অধিদপ্তর, সেটাও একই ঘটনা। যে এগুলো যুক্ত হওয়ার পরে মানে ওইখানে ওইযে যে অপরিপক্বতার কথা বলা হইল ওইটাকে একটু সামাল দেয়ার চেষ্টা করার জন্য, আরেকটু পরিপক্ব করার চেষ্টা করার জন্য।

ঘটনার গভীরে নিরঙ্কুশক্ষমতার স্বৈরতান্ত্রিক বাজারব্যবস্থা

রূপগঞ্জের ঘটনাকে একটি সঙ্কট হিসেবেই দেখা হয়েছে। পত্রিকার বিবরণ, বুদ্ধিজীবীদেরবিবৃতিজীবীদের বক্তব্য থেকে এটা পরিস্কার যে, তারা এটাকে সঙ্কট হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু খুঁজে দেখা হয়নি সঙ্কটের গভীরটা। রূপগঞ্জের যে সঙ্কট, তার গভীরে আছে নিরঙ্কুশঅগণতান্ত্রিক ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব। এই যুগে, (এই যুগ হলো, মার্কেটমিডিয়ামিলিটারি যুগ; যেটা আমি আগেও বলছি বিভিন্ন জায়গায় যে এটা থ্রিএম যুগ) সেই ক্ষমতা আর কর্তৃত্বটাকে আমরা স্বৈরতান্ত্রিক বাজারের মধ্যে দিয়ে মূর্ত হতে দেখি। আমাদের দুনিয়া আজকে যারা চালায়, দেশ যারা চালায়, এই দুনিয়া চালানো মানুষরাই বলছে যে এটা মুক্তবাজারের যুগ। মুক্তবাজার হল যে পণ্য কিনবার কিংবা বেচবার অবাধ স্বাধীনতা, আমার পণ্য আমি বিক্রি করব কিনা কিংবা কোনো পণ্য কিনব কিনা, কার কাছে বেচবকার কাছে কিনব সেটার জন্য অবাধ স্বাধীনতাই কাগজেকলমে মুক্তবাজারের দর্শন। সেই স্বাধীনতা রাষ্ট্রের কাটাতার মানবে না, ব্যক্তি মানবে না, শ্রেণী মানবে না, কিচ্ছু মানবে না। বেচার ক্ষেত্রে এবং কেনার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নামই তো কাগজেকলমে মুক্তবাজার। যারা এই যুগ চালাচ্ছে তাদের মতে এটা সেই মুক্তবাজারেরই যুগ। সেই যুগে রূপগঞ্জবাসী তাদের ব্যক্তিগত জমিটা বেচবে কিনা সেই দিকটায় গুরুত্ব না দিয়ে জমি জোর করে কেনার চেষ্টা করা হয়েছে। তারমানে খেয়াল করলেই দেখতে পারি, এই যুগে মুক্তবাজারের নাম করে স্বৈরতান্ত্রিক বাজার জারি আছে। আর এই যুগ মানেই হল যে, এ বলে একটা আর করে আরেকটা। মানে সে যা বলে সে তা করে না। এইযুগে ক্ষমতাশালীরা যা বলে সেটা অন্যদের জন্য ঠিক, তাদের নিজেদের জন্য সেটা প্রযোজ্য না। মানে অন্যদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য, ক্ষমতাশালীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। ‘মুক্তবাজার’ নামের এই স্বৈরতান্ত্রিক বাজার একা একা চলে না। রাষ্ট্র আর বাজার একসাথে চলে বেশিরভাগ সময়, হাতে হাত রেখে চলে। বাজারের সাথে আছে রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীসহ অপরাপর রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগকারী ফোর্স, আছে রাষ্ট্রের বেসামরিক আমলাতন্ত্র, বিভিন্ন মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠান, মানে মিডিয়া থেকে শুর করে স্কুলকলেবিশ্ববিদ্যালয়এনজিও, এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে আছে রাজনৈতিক দলগুলো। সুতরাং বাজার আর রাষ্ট্রের সামরিকবেসামরিক আমলাতন্ত্র, মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত ঐকতান আজকের যুগ।

রূপগঞ্জের ঘটনার ক্ষেত্রেও আমরা দেখলাম বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় এ্যাপারেটাসগুলো মিলে রূপগঞ্জের বাস্তবতা তৈরী করলো। ওইখানে সেনাবাহিনীর চারটা ক্যাম্প স্থাপিত হয়েছিল। চারটা ক্যাম্প স্থাপন করে সেখানে জমি কিনতে শুরু করেছিল তারা, তাদের একটা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য। তাদের বাড়িঘর বানাবে, তাদের একটা আবাসন প্রকল্প হচ্ছে, সেই আবাসন প্রকল্প বানাইতে যেয়ে তারা ওইখানে চারটা ক্যাম্প করে ফেলল, এখানে কিন্তু আইনকানুনের কোন বালাই ছিল না। চারটা ক্যাম্প বানিয়ে ওইখানে জমি কিনতে শুরু করলো, ফোর্স করতে শুরু করলো লোকজনকে, জোর করে কিনতে শুরু করল, জমি বেচতে দিলো না অন্যদের কাছে। ক্ষমতাশালীদের দিক থেকে ঘটনাটা তো এমনই। তো এখানে আসলে রাষ্ট্রের বেশ কয়েকটা ফোর্স কাজ করেছে। পত্রিকার বিবরণ থেকে জানা যায়, ওইখানকার প্রকল্পটা যখন শুরু হয়েছিল আরো আগে ওই ১/১১ গভর্নমেন্টের সময়, তো তখন সেখানকার স্থানীয় বিএনপি নেতারা ছিল এই প্রকল্পের দালালি করবার জন্য। পরে এসে আওয়ামীলীগের নেতারা, বিশেষত ওইখানকার ইউপি চেয়ারম্যান সেই দালালির দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিয়েছেন। আরও ইছল এলাকার বেসামরিক আমলাতন্ত্র অর্থাৎ সেই ভূমি অফিসের ভূমি রেজিষ্টার। ওদিকে সামরিক আমলাতন্ত্র তো হাজির, সেনাবাহিনীর অফিসারদের ব্যাপার, তাই সেনাবাহিনী নিজেই হাজির। আর একটা জায়গা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, এই অন্যায্য দখলদারিত্বের সাথে মিডিয়াও কোন না কোনভাবে ছিলো। দেখেছি ২/১টি পত্রিকাই দাবি করছে যে রূপগঞ্জের ঘটনা একদিনের নয়। তাহলে ঘটনা যদি একদিনের না হয় তাহলে আমরা রূপগঞ্জের উপর কোনো রিপোর্ট পাইলাম না কেন ২৪ অক্টোবরের আগে? তাহলে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে মিডিয়ার সাথেও একটা সমঝোতা ছিল। কোন না কোন বোঝাপড়া ছিল। তারমানে মিডিয়াও এখানে আছে। তাহলে মিডিয়া তারপরে সামরিকবেসামরিক আমলাতন্ত্র, পলিটিকাল ফোর্স এইযে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় এ্যাপারেটাস এরা সবাই মিলে এই অন্যায্যতা নির্মাণ করেছিল।

এই যে নিও লিবারাল যুগ, এটাকে বিভিন্ন জায়গায় আমি মার্কেটমিডিয়ামিলিটারি যুগ বলেছি। এই যুগের প্রধান দাবি মুনাফা। উৎপাদন হয় মানুষের প্রতি দৃষ্টি রেখে নয়, মানুষের ক্রয়মতার উপর দৃষ্টি দিয়ে। তাই ভাবতে গিয়ে বিপদে পড়তে হয়। কী চায় এই যুগের মানুষ। কৃষিজমিতে আবাসন বানাবে একের পর এক, সামরিকবেসামরিক বাজার পোক্ত হবে, বাড়িতে বাড়িতে ছেয়ে যাবে জমিগুলোএরপর কোনো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান সেই ফখরুদ্দিনের মতো করে খাদ্যাভাস পরিবর্তনের ঘোষণা দেবেন। নন্দীগ্রাম দেখেছি আমরা, রূপগঞ্জ দেখলাম, একেবারে আমাদের ঘরের মধ্যেকার ঘটনা এগুলো। জমি অধিগ্রহণ কিংবা দখলের এই রাজনীতির ফলাফল স্বরুপ একদিন যদি বন্ধ হয়ে যায় যাবতীয় কৃষিজ উৎপাদন! তখন হয়তো বাতাস খেয়ে বাচবার রাস্তা বের করবে মানুষ! কিংবা অন্যকছু। কর্পোরেট ল্যাবরেটরি আর কর্পোরেট ক্যাপিটাল ছাড়া যা উৎপাদন করা সম্ভব নয়। পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে সমস্ত প্রাণ আর তার বৈচিত্র, সমস্ত বীজএমনি করে একদিন কেয়ামত

নিও লিবারাল যুগে মিলিটারি কর্পোরেশন

এই যে যুগ, একে যে আমি মিডিয়ামিলিটারিমার্কেট যুগ বলছি, তার খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একটু নজর ফেরানো দরকার। সেটা হলো, আজকের যুগে এসে মুক্তবাজার আর সেনাবাহিনীর সম্পর্কসূত্রে একটা নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। বাজার আর মিলিটারির এই সম্পর্কসূত্রকে যদি আমরা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে চাই, তাহলে দেখব এখানে সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাজারে নিজেদের অঙ্গীভূত করেছে। তাই আজকে এসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধুমাত্র প্রথাগত একটা সেনাবাহিনী নয়, এটা একটা মিলিটারি কর্পোরেশন। বিবিসির সাংবাদিক কামাল আহমেদ, ফৌজি বাণিজ্য নিয়ে দুর্দান্ত ধারাবাহিক প্রতিবেদনের ৯টি কিস্তিতে দারুণ করে তুলে এনেছেন বাণিজ্যিক কর্পোরেশন হিসেবে সেনাবাহিনীর বর্তমান চালচিত্র। সেনাবাহিনীসংশ্লিষ্ট দুই বাণিজ্যিক প্রকল্প সেনা কল্যাণ সংস্থা ও আর্মি ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টএর প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম দেখলেই বোঝা যায়, বৃহৎ কর্পোরেশন হিসেবে দাঁড়ানোর পথে তারা কতোদূর। সেনাকল্যাণ সংস্থার সচল প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, ডায়মন্ড ফুড ইন্ডাষ্ট্রিজ, ফৌজি ফ্লাওয়ার মিলস, চিটাগাং ফ্লাওয়ার মিলস, সেনা কল্যাণ ইলেক্ট্রিক ইন্ডাষ্ট্রিজ, এনসেল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, স্যাভয় আইসক্রিম, চকোলেট এন্ড ক্যান্ডি ফ্যাক্টরী, ইষ্টার্ণ হোসিয়ারী মিলস, এস কে ফেব্রিক্স, স্যাভয় ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরী, সেনা গার্মেন্টস, ফ্যাক্টো ইয়ামাগেন ইলেক্ট্রনিক্স, সৈনিক ল্যাম্পস ডিষ্ট্রিবিউশন সেন্টার, আমিন মহিউদ্দিন ফাউন্ডেশন, এস কে এস কমার্শিয়াল স্পেস, সেনা কল্যাণ কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, অনন্যা শপিং কমপ্লেক্স, সেনা ট্রাভেলস লিমিটেড, এস কে এস ট্রেডিং হাউস, এস কে এস ভবনখুলনা, নিউ হোটেল টাইগার গার্ডেন, রিয়েল এস্টেট ডিভিশনচট্টগ্রাম এবং এস কে টেক্সটাইল।

ওদিকে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের ষোলটি প্রতিষ্ঠান হলো আর্মি শপিং কমপ্লেক্স, রেডিসন ওয়াটার গার্ডেন হোটেল, ট্রাষ্ট ব্যাংক লিমিটিড, সেনা প্যাকেজিং লিমিটেড, সেনা হোটেল ডেভলেপমেন্ট লিমিটেড, ট্রাষ্ট ফিলিং এন্ড সিএনজি ষ্টেশন, সেনা ফিলিং ষ্টেশনচট্টগ্রাম, ভাটিয়ারী গলফ এন্ড কান্ট্রি ক্লাব, কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব, সাভার গলফ ক্লাব, ওয়াটার গার্ডেন হোটেল লিমিটেড চট্টগ্রাম, ট্রাষ্ট অডিটোরিয়াম এবং ক্যাপ্টেনস ওয়ার্ল্ড। আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সংঘস্মারকে আনুষঙ্গিকভাবে যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো : ঢাকায় আবাসিক হোটেল এবং বিপণী কেন্দ্র , বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানী, জঙ্গল বুট ফ্যাক্টরী, চট্টগ্রামে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, কাদিরাবাদে একটি চিনি কল, যশোরে ফাওয়ার মিলস, ফাউন্ড্রি এবং পেট্রল পাম্প, গলফ কাব, বিভিন্নজায়গায় বিপণী কেন্দ্র, কার সার্ভিসিং এবং ওয়াশিং সেন্টার, রেন্ট এ কার সার্ভিস, প্যাকিং এন্ড কুরিয়ার সার্ভিস, নারায়ণগঞ্জে ফ্যাব্রিক ডায়িং এন্ড স্ক্রিনপ্রিন্টিং ইউনিট, নারায়ণগঞ্জে হোশিয়ারী মিলস, সব সেনানিবাসে ব্রাস এন্ড মেটাল ইন্ডাষ্ট্রি, কুমিল্লায় বিদ্যুত প্রকল্প, রংপুরে ওষুধ শিল্প এবং কিংকার প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প, বগুড়ায় সিমেন্ট প্রকল্প, সিলেটে রেস্তোরা এবং পর্যটন ও ট্রাভেল এজেন্সি, ঢাকায় হাসপাতাল, সব সেনানিবাসে মৎস চাষ প্রকল্প এবং পোল্ট্রি খামার।

পাকিস্তানের ফৌজি ফাউন্ডেশন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে যে প্রতিষ্ঠানটি সেনাকল্যাণ সংস্থা নামে আবির্ভূত হয়, কামাল আহমেদ জানালেন, ১৯৭২ এ যখন বাংলাদেশ এটি প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার মূলধন ছিলো আড়াই কোটি টাকার মতো। তবে, মাত্র চারবছরের মধ্যেই ঐ সংস্থার নীট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় একশো কোটি টাকা। সেনাকল্যাণ সংস্থার প্রকাশিত প্রচারপত্রে দেখা যায় যে, গত আটত্রিশ বছরে ধারাবাহিকভাবে এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। সংস্থাটির অধীনে এখন রিয়েল এষ্টেট এবং শিল্পের সেবামুখী চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও রয়েছে। তবে, সেনাকল্যাণ সংস্থার বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের আকার বা আয়তনের তুলনায় বহুগুণ বেশী বাণিজ্য করছে সেনাবাহিনীর অপর কল্যাণমূলক সংস্থা আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট। সবমিলে সামরিকবাহিনী ইতোমধ্যেই যেসব নানাধরণের বাণিজ্যিক উদ্যোগ এবং প্রকল্পে জড়িত হয়ে পড়েছে তার সম্পদমূল্য অত্যন্ত রক্ষণশীল হিসাবেও তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানাচ্ছেন কামাল আহমেদ।

নিম্নপদস্থদের কল্যাণের নামে সেনা সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য/ কর্পোরেশন

এইযে বিশাল বাণিজ্যিক তৎপরতা, তা শুরু হয়েছিলো কিন্তু সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ চাকরীজীবীদের, বিশেষত সৈনিকদের কল্যাণের নাম করে। কিন্তু আদতেও তা যে হয়নি, সেটা কামাল আহমেদ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। দেখিয়েছেন তিনি, কল্যাণ খাতে ব্যয় সাধারণের অজানা । শিক্ষাবৃত্তি, প্রশিক্ষণের জন্য বৃত্তি, চিকিৎসা এবং দুঃস্থ বিধবাদের আর্থিক সাহায্য দেওয়ার মতো যেসব কল্যাণমূলক কাজ সংস্থাটি করে থাকে সেসব খাতে গত আটত্রিশ বছরে ঠিক কতোটা অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তার কোন হিসাব সাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়নি। অবসরে যাওয়া সেনাসদস্যদের অভিযোগের বরাত দিয়ে তিনি বলেছেন, যে সেনাকল্যাণ সংস্থাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত নয় এবং সেকারণে তাঁরা তেমন কোন উপকার পান না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অস্বচ্ছতা, গ্রামশহরের দূরত্ব (অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকেরা বেশিরভাগ গ্রামে থাকে) এসব মিলে সেনা কল্যাণের সংস্থা, যা মূলত সৈনিকদের কল্যাণের নাম করে চললেও ব্যবসাকেই মূল উপজীব্য করেছে। এইসব ব্যবসার ক্ষেত্রে অন্যসব স্বৈরাচারী বাণিজ্যিক কর্পোরেশনের মতো করেই, কোথাও কোথাও আসলে তার চেয়েও বেশি করে অন্যায্যতা জারি আছে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে তখনকার সেনাপ্রধানের হাউস লোন নিয়ে দূর্নীতির খবর বের হয়ে পড়ে। এই ট্রাষ্ট ব্যাংক শুধু যে বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসাবে কাজ করছে তাই নয় বরং তারা মার্চেন্ট ব্যাংক বা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসাবেও কাজ করার অনুমতি পেয়েছে। এছাড়া, বিশেষ রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার আলামতও এখানে স্পষ্ট। যেমন পাসপোর্টের ফি জমা নিয়ে সেই পাসপোর্ট ইস্যু করার ক্ষমতাও এই ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে যা আইনগতভাবে অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন কোনো বামপন্থী কিংবা সেনাবিদ্বেষী কেউ নয়; এককালের জাদরেল আমলা ড. আকবর আলী খান। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনে নানাভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সামরিকবাহিনীর ভূসম্পদ। কামাল আহমেদএর প্রতিবেদন থেকে জানতে পারলাম, সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্কিত আরেকটি বড় বাণিজ্যিক প্রকল্প হচ্ছে ঢাকা বিমানবন্দরের কাছে বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল ঋাডিসন ওয়াটার গার্ডেন হোটেল। এই হোটেলের মালিকানার সাথে আন্তর্জাতিক পুঁজির সম্পর্ক আছে। এখানে যারা আসেন তারা টাকা দিয়ে গলফ খেলে, সামরিক ভূসম্পত্তিতে। এছাড়া বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী বা বিএমটিএফকে সরকার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে। সবমিলে শিল্পেবাণিজ্যেসার্ভিসে সেনাবাহিনীসংশ্লিষ্টরা বাজার দখল করছে। আর তাতে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে রাষ্ট্র। ব্যবহৃত হচ্ছে সামরিকভূসম্পত্তি, বলাবাহুল্য, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে।

বাংলাদেশের মিলিটারি কর্পোরেশনের নিও লিবারাল যুগে অন্তর্ভূক্তি

বাংলাদেশের বাজারে এই সেনাসংশ্লিষ্ট লোকজনদের আধিপত্যশীল এই বাজার আরও অগ্রাসী হবার সম্ভাবনা বেশী। কেননা বলপ্রয়োগ যে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বের শর্ত, সে যদি বাজারে আসে তো বেচাকেনার ক্ষেত্রেও সে আগ্রাসী হবে এটাই স্বাভাবিক। সামরিকবাহিনীর বাণিজ্যিক এইসব তৎপরতা অবশ্যই রাজনৈতিক মাত্রা পাবে, পাচ্ছেও বটে। রূপগঞ্জই প্রমাণ। এক অর্থে। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সুযোগসুবিধা নিয়ে সেনাবাহিনীর বাজার অসম প্রতিযোগিতা তৈরী করবে যা মিলিটারি কর্পোরেশনকে শক্তিশালী করবে। বাজারটাই তাদের মূল লক্ষ্য। আরেকটা দিক নিয়ে বলবার আছে। এমনিতেই কর্পোরেশনগুলো খুবই অগণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিতার বালাই রাখে না। তারমধ্যে সামরিক কর্পোরেশন আরও বেশি করে নিরঙ্কুশ হবার সম্ভাবনা বেশি, যেটা বাজারের যুগের মানুষের বিপরীতে যাবার সম্ভাবনা।

গণতন্ত্রমানবাধিকার এবং রুপগঞ্জে তার প্রতিভাস

দুনিয়াব্যাপী প্রতিরোধ অন্দোলনের তীব্রতার ফলে প্রায় সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে রাষ্ট্রসমাজ পরিচালনার পদ্ধতি গণতান্ত্রিক না হলে চলে না। সেটা দুর্বলপশ্চাদপদগণবিরোধী শাসন বলে বিবেচিত হয়। তাই সবাই মুখে মুখে গণতন্ত্র ফেরি করে বেড়ায়। আমাদের গোটা দুনিয়ায় যতো গণতান্ত্রিকরাষ্ট্র আছে এদের প্রায় সবাই আছে প্রতনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মধ্যে, মানে ভোটের গণতন্ত্রের মধ্যে। এটা আসলে গণতন্ত্র না। সে আলাপ এখন না। এখন এটুকু বলা দরকার, যে খোদ প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের দর্শনও বেশিরভাগ রাষ্ট্রই মানে না। আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলা যায়, প্রতিনিধ্বিমূলক গণতন্ত্রের ফাঁকই হলো এটা যে, যথেষ্ট গণতান্ত্রিক না হয়েও, যথার্থ অর্থে গণতান্ত্রিক না হয়েও রাষ্ট্র চালানো যায়। আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্র জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণায় স্বাক্ষর করছে, অরও আরও কি কি সনদে স্বাক্ষর করছে। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সবগুলোই তাদের দৈনন্দিন পলিটিকাল কর্মকাণ্ডে যে শব্দটা সবচেয়ে বেশি উচ্চারণ করে সেটা বোধহয় গণতন্ত্র। তারপরও কারও ব্যক্তিমালিকানার জমি সেনাবাহিনীসংশ্লিষ্টদের কাছে দিতে বাধ্য করা হবে কম দামে, ঐটার নাম হল যে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে গুলি করে মারা হবে, এটা হল গণতন্ত্র আর মানবাধিকার। লাশ গুম করে দেয়া হবে, এটা গণতন্ত্র আর মানবাধিকার। আসলে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার আছে হল গিয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবী, আমাদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধিদলীয় নেত্রীসহ রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাষ্ট্র বিজ্ঞানের বইপুস্তক এগুলোর মধ্যে । বাস্তবে ঐ জিনিস নাই কোথাও, মানে আমাদের দেশের কোথাও নাই, কোন গণতন্ত্র নাই। অন্য দেশেও নাই! (আসলে ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো আর কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর কথা বলছি না, এগুলো নিয়ে আমার অন্য কথা বলবার আছে, মানে অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর সাথে এগুলোকে এক করে দেখি না আমি।)। ঐ যে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের কথা বলছি আমরা, সেটাও আছে নামে। বাস্তবে সেটাও এমনকী নাই। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও যদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ২টি জায়গা নির্দিষ্ট করতে চাই তাহলে বলব, রাষ্ট্রের দিক থেকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিরোধী দলের সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই সরকার পত্রিকা বন্ধ করে দিচ্ছে আইনহাইকোর্ট এসব দেখিয়ে, বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে যেন। পত্রপত্রিকার বিবরণে যা দেখছি তাতে পূর্বতন সরকারগুলোর থেকে আলাদা করে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না বরং কোথাও কোথাও মনে হচ্ছে, বিরোধীদের দমনের ক্ষেত্রে এই সরকার পূর্বতন সব সরকারের রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলবে একদিন। এই গভার্নমেন্টকে একা দোষ দিচ্ছি না, মানে দেয়ার কিছুই নাই, আমি একেবারে সবার কথা বলছি সমান তালে। যারা গণতন্ত্রেও ধারক বাহক তাদের কথা বলছি।

মার্কেটমিডিয়ামিলিটারি যুগে রূপগঞ্জের ঘটনার মতাদর্শিক নির্মাণ

একটা কথা আমি আগেই বলেছি যে, মিডিয়া এখন এসে রিপোর্ট করলো যে, রূপগঞ্জের ঘটনা একদিনের না। তাহলে, বোঝা যাচ্ছে এই রূপগঞ্জ নিয়ে সংবাদযোগ্য ঘটনা আরও আগেও ছিলো। সেই সংবাদযোগ্য ঘটনাকে সে এরকম একটা মানে একেবারে মহা ঘটনা না ঘটে যাওয়া পর্যন্ত, মানে তার মহাবিস্ফোরণ না ঘটে যাওয়া পর্যন্ত পত্রিকাগুলো কোনো কথা বলল না। কোনো রিপোর্ট করল না। প্রকারন্তরে পত্রিকা নিজেই এটা স্বীকার করে নিল যে, এই রূপগঞ্জের সংবাদযোগ্য ঘটনা এতোদিন আড়াল করেছে মিডিয়া। পত্রিকা কমনলি মোটামুটি ওইযে ওই দোষারপের মধ্যে আছে দেখা যাচ্ছে যে একটু বিএনপিপন্থী পত্রিকা যেটা সেটা হল যে মানে হাইলাইট করেছে আওয়ামিলীগের দোষগুলা, যারা আওয়ামিপন্থী পত্রিকা তারা বিএনপির দোষ মানে ঐদিক দিয়ে ষড়যন্ত্র খোঁজার চেষ্টা করেছে, সেগুলো আলাদা ব্যাপার কিন্তু মূল জায়গাটা এক। কোন পক্ষই বলতে চাইল না যে একটা অন্যায় করা হচ্ছিল এইখানে। কেউ বলল না সেনাবাহিনীআমলাতন্ত্ররাজনৈতিক শক্তি মিলে ওখানে গণবিরোধী কাজ করছিলো, ক্ষমতাকাঠামোতে বিরাজিত মানুষগুলো ক্ষমতাহীনদের উপর আধিপত্য করছিলো।

আর সেনাবাহিনী নিয়ে আমাদের প্রচলিত যে ডিসকোর্স; সেনাবাহিনী দেশ ও জাতির অতন্দ্র প্রহরী, সেনাবাহিনী ডিসিপ্লিনড একটা বাহিনী, সেনাবাহিনী আমাদের সার্বভৌমত্বের মূর্ত প্রতিক, সেনাবাহিনী দেশপ্রেমিক, সেনাবাহিনীকে দলীয় কাজে ব্যবহার করা যাবে না, সেনাবাহিনীকে সকল বিতর্কের উর্ধ্বে রাখতে হবে এইসব কথাবার্তাই ঘুরে ফিরে এসেছে পত্রিকার পাতায়। সার্বিক ডিসকোর্সের পার্ট হিসেবে।

আমরা উপরে আলাপ করেছি মিলিটারি কর্পোরেশন নিয়ে। সেনাসংশ্লিষ্ট এইসব ব্যবসাপাতির বিজ্ঞাপন হয় পত্রিকায়। এগুলোর বাইরে একটা সমঝোতামূলক সম্পর্ক থাকে। যে ঘাটতে যাব না। বুদ্ধিজীবিদেরও তাই। কেউ সেনাবাহিনী নিয়ে কথা বলেননি। নুরুল কবিররা তাদের জায়গা থেকে কথা বলার চেষ্টা করছেন। নুরুল কবির লিখছেন বুধবারে । এম এম আকাশ একটা লিথছেন। আমার চোখে স্বীকৃত বুদ্ধিজীবীদের আর কোনো লেখা চোখে পড়েনি। যারা পড়ছেন এই লেখা, তারা আর কিছু পেয়ে থাকলে জানাবেন।

আইনের শাসেনর নিও লিবারাল যুগে রূপগঞ্জে বিদ্রোহী জনগণের স্বাধীনতার লড়াই

সত্যিকারের গণতন্ত্র থাকলে জনগনের জমি সেনাবহিনীসংশ্লিষ্ঠরা সেনাবাহিনী ব্যবহার করে দখল করতে যেতে পারে না। এটা খুবই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। জনগণ বলছে যে লাশ দাফন করতে পারি না কার বিরুদ্ধে মামলা করব। তারমানে আইন জিনিসটাও গণতান্ত্রিক না, জনগণের আওতায় নাই। পুরা জায়গাটাই হল অগণতান্ত্রিক বলপ্রয়োগজনিত ব্যাবস্থাপনা। হয় বল প্রয়োগ করে না হলে সম্মতি আদায় করে, অথবা দুইটার সম্মিলিত প্রয়োগে আধুনিক দুনিয়া চলে। সবসময় বলপ্রয়োগ করে না, সবসময় বলপ্রয়োগ করলে তো কাহিনী খারাপ হয়ে যাবে। বারবার বারবার কানসাট আর মানে এইযে আগস্ট আর বিডিআর বিদ্রোহ আর হল যে এই ঘটনা ঘটে যাবে। তো এটা তো এক্সপেক্টেড না, সেজন্য সম্মতিও আদায় করে তারা। চমস্কিহারম্যান বলছেন ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট, সম্মতি আদায় করা, কন্সট্রাক্ট করা। কিন্তু সবসময় এতে কাজ হয় না। ক্ষমতা যখন নিজে অনেক বেশি নিরঙ্কুশ হয়, তার পাল্টা দিকে প্রতিরোধও সেরকম করে জোরালো হয়। এটা মানবইতিহাসে একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে ২০০৭২০১০ এর মধ্যে খুবই চিহ্নিত করার মত কয়েকটা বিদ্রোহ ঘটে গেছে। আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভে, তারপরে বিডিআর বিদ্রোহে, এবং এইযে রূপগঞ্জ বিদ্রোহে। বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করছে, বাংলাদেশের মানুষ এইযে আরেকটা মানে অকথিত মিলিটারি শাসন দেখছে ১/১১ এর পর। তো মানে এদিক থেকে এই বিদ্রোহ জনতার বিদ্রোহ, সেনাতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনতার বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহগুলো আমাদেরকে শেখায়, সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষভাবে দেশের মানুষের প্রতিপক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে অস্তিত্বের প্রয়োজনে মানুষ লড়াই করে, এটা মনুষ্যধর্ম। তখন মানে নিজের মত করে সংগঠিত হয়, প্রতিরোধ জারি করে। এই সবগুলো বিদ্রোহের মধ্যে ষড়যন্ত্র খোঁজা হয়েছে, মানে বিডিআর বিদ্রোহ, ছাত্র বিক্ষোভ এবং এই বিদ্রোহের মধ্যে কমন কিছু জিনিস দেখা যাচ্ছে। তিনটা ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, ষড়যন্ত্র আছে, পারস্পরিক দোষারোপ আছে, গোয়েন্দা সংস্থার ব্যার্থতার দায় আছে, রাষ্ট্রের দিক থেকে বিদ্রোহটাকে আড়াল করার চেষ্টা আছে, মিডিয়ার সাথে ঐক্য আছে, সবমিলে নিও লিরারাল পুঁজির আধিপত্য রক্ষার রাজনৈতিক বাস্তবতা জারি আছে। এখান থেকে শিখি মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ বাসনা তার সহজাত বাসনা। অস্তিত্বের জন্য সজ্ঞানেই সে প্রতিরোধ জারি করে, বিদ্রোহ করে এবং বিদ্রোহ করে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জানান দেয়।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.