মৃত্যু ভাগাড়ে ক্ষীণপ্রায় জীবনামৃত আজীবন বিপ্লবী চারু মজুমদার

Posted: সেপ্টেম্বর 28, 2011 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , ,

লিখেছেন: মনজুরুল হক

কমরেড চারু মজুমদার

নকশাল আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হিসেবে চারু মজুমদার ছিলেন ভারতের জীবন্ত কিংবদন্তী। ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই কলকাতার পুলিশ গ্রেপ্তার করে তাঁকে, ২৮ জুলাই পুলিশ হেফাজতেই তিনি মারা যান। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর ওজন ছিল মাত্র ৯৬ পাউন্ড। মত্যুর ৩৯ বছর পরও তাঁর দেখানো মাওবাদী সশস্ত্র সংগ্রামে কাঁপছে ভারত। আজ ২৮ জুলাই চারু মজুমদারের মৃত্যুর ৩৮ বছর পার হলো। তাঁর মৃত্যু নিয়ে সামনের সময় আরো কথা উঠবে, চলবে আরো আলোচনা।

মারা যাবার আগে তিনি ভুগছিলেন মায়োকার্ডিয়াল ইসকিমিয়া উইথ অ্যানজাইনাতে। ব্যাপারটা হচ্ছে হার্টে ব্লাড সাপ্লাই কমে যাওয়া। দুবার হার্ট অ্যাটাকও হয়ে গেছে। প্রথম ব্যথা হয় দার্জিলিংয়ে পার্টির মিটিংয়ে গিয়ে। হেঁটে ওপরে ওঠার সময় বুকে অসম্ভব ব্যথা হয়। মিটিং সেরে শিলিগুড়িতে ফিরে আসেন। কালু ডাক্তার ইনজেকশন দেন, সারা রাত ছটফট করেছিলেন। ইনভেস্টিগেশনের জন্য তাকে কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে ছিল চারু মজুমদারের ছোট ছেলে অভিজিৎ। শত্রুজিৎ দাশগুপ্ত তাকে দেখেন, সেই সময় ভীষণ ব্যথা হয় বুকে। সঙ্গে সঙ্গে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়, হার্ট অ্যাটাক। এক মাস ভর্তি ছিলেন ফ্রি বেডে। ডাক্তাররা বলে রেস্ট্রিক্টেড লাইফ লিড করতে হবে এবং সিগারেট ছাড়তে হবে। ন্যাশনাল মেডিক্যালে চেক আপও করানো হয়। তারপর থেকে অ্যানজাইনার পেইনটা উঠত। তখন কন্ট্রোল করা যেত না।

তাঁকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর মেয়ে অনিতা মজুমদারের ভাষ্যমতে : ‘আমি তখন ন্যাশনাল মেডিক্যালের ছাত্রী। দোতলায় দিদিদের সঙ্গে ক্লাস করছিলাম, এমন সময় একজন কেউ এসে আমাকে বললেন, আমার ভিজিটর এসেছে। শুনে ভীষণ আশ্চর্য হলাম, কারণ দীর্ঘ ছয় মাসের মধ্যে আমার কোনো ভিজিটর আসেনি এবং আমার ক্লাসের বা হোস্টেলের কেউ জানতও না, যে আমার বাবাই চারু মজুমদার। যে দুএকজনকে বলেছিলাম তারাও বিষয়টি অত্যন্ত গোপন রেখেছিলেন। যাই হোক, আমি করিডর দিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় একজন আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, তোমার বাবা মারা গেছেন, তাঁকে চিনতে পারলাম না। নিচে নেমে এসে দেখলাম পুলিশ আমার জন্য অপেক্ষা করছে, তাঁরা আমাকে জানাল, আপনার বাবা মারা গেছেন, আপনি তাকে দেখতে যাবেন কি? দিদিরা কেউ কেউ বলল, না ওদের সঙ্গে যেতে হবে না, ওরা চলে গেলে আমরাই তোকে পৌঁছে দেব। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওরা আমাকে বলল, দেখ, ওরা তোকে না নিয়ে যাবে না, তারা নিচে এখনো অপেক্ষা করছে; ফলত আমি পুলিশের সঙ্গেই রওনা হয়ে গেলাম। ওরা আমাকে লালবাজারে নিয়ে গেল; সেখানে আমাকে জানানো হলো, চারুবাবুকে অসুস্থতার কারণে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই তিনি মারা গেছেন। তারপর ওরাই আমাকে সেখানে নিয়ে গেল। দেখি ওঁর মৃতদেহ, বুকের উপর একটি কাগজে মৃত্যুর কারণ লেখা একটি স্লিপ লাগানো রয়েছে। কোথাও কোনো রকম অত্যাচারের চিহ্ন লক্ষ করিনি। সে সময় পোস্টমর্টেম হয়নি। সে সময় আমার পরিবারের আমি একাই ছিলাম সেখানে। আমার কাছে বাবার মত্যু রহস্যজনক যে যে কারণে, সেগুলো :

. মর্গ থেকে যখন ওঁর শবদেহ গাড়িতে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছিল ওরা, ঠিক সেই মুহূর্তে চারদিকের আলো নিভে গেল। ৫৬ মিনিট বাদেই আলো জ্বলতেই দেখি ওঁর শবদেহ গাড়িতে তোলা হয়ে গেছে।

. আমাকে যখন ওরা এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন এক পুলিশ অফিসার অন্য একজনকে খুব সাধারণভাবেই বলে ফেলেছিলেন, ‘শেষমুহূর্ত পর্যন্তও চারুবাবু মাথা নোয়ালেন না।’

. আমরা শবদেহ শিলিগুড়ি নিয়ে আসতে চাইলে ওরা আমাদের কথায় রাজি হয়নি।

. মর্গ থেকে কেওড়াতলা শ্মশান পর্যন্ত শবদেহের পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাপড় বাঁধা ছিল এবং শ্মশানে আমার ছোটভাই মুখাগ্নি করল, বাবার শবদেহ ফার্নেসে ঢোকানো হলো পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাপড় বাঁধা অবস্থাতেই। ওরা আমাদের বলেছিল পুরোহিত ডাকবে কি না; আমরা সে সময়ে পুরোহিতের প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। আমি ও আমার মা ওঁর গ্রেপ্তারের পর অসুস্থতার কারণে দেখা করতে যাই ছোট ভাই অভিকে নিয়ে (অভিজিৎ মজুমদার)। শেষবার যেদিন আমরা লালবাজার থেকে চলে আসছি, পেছন পেছন কয়েকজন পুলিশ অফিসার বাইরে পর্যন্ত আমাদের জিজ্ঞেস করতে করতে চলে এসেছিল, ‘ওর যদি কিছু হয়ে যায় তবে আপনাদের কোন ঠিকানায় খবর দেব।’ সেদিনই আমার ও আমার মায়ের মনে সন্দেহ হয়, কিছু একটা অঘটন হতে চলেছে। ওঁকে দাহ করে আমরা যখন চলে আসি, প্রচুর সাংবাদিক আমাদের স্টেশন পর্যন্ত ধাওয়া করে বারবার একই কথা জানতে চাইছিলেন, আমার বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমরা কী মনে করছি। কেউ কেউ ভীষণ ব্রুটাল বিহেভ করে ফেলেছিলেন আমাদের সঙ্গে। কিন্তু সে মুহূর্তে কাউকে কোনো উত্তর দেওয়ার মতো মানসিকতা ছিল না আমাদের। তবে আমরা, মানে আমাদের পরিবারের সবাই সেদিনও একমত ছিল, আজও একমত, আমার বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছে।’

১৭ই জুলাই রাত তিনটেয় যখন ইন্টালি থানার মিডিল রোডের তিনতলা বাড়ির ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

কি হয়েছিল ওর যে গ্রেপ্তার হবার মাত্র বারো দিনের মধ্যে তিনি মারা গেলেন? অথচ কয়েকদিন আগে যখন খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রএই সব অভিযোগে ওনাকে গ্রেপ্তার করে লালবাজার লকআপের পাশের ঘরে সাংবাদিকদের সামনে আনা হয় তখন তাঁকে বেশ প্রফুল্লই লাগছিল। এতটুকু বিচলিত দেখায়নি। এক শার্ট আর সাদা পাজামা পরে হাসি হাসি মুখে ফটোগ্রাফারদের কিছুটা সময় দিয়েছেন। হার্ট স্পেশালিস্টও ইজিসি রিপোর্ট দেখে বলেছেন, অসুস্থ, তবে খারাপ আশঙ্কা করার কিছু নেই। তবুও এটা কি করে হলো? তাঁকে ধরিয়ে দেবার জন্য ১০,০০০ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করেছিল সিদ্ধার্থবাবুর সরকার। একই অঙ্ক ঘোষণা করেছিল অন্ধ্র, বিহার উড়িষ্যার সরকারও। যেদিন পুলিশ হানা দিয়ে তাঁকে ধরে তারপর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কমিশনার ফোনে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থবাবুকে জানান। সিদ্ধার্থবাবু হান্টিং কলে দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীকে জানান। আকাশবাণীর প্রতিটি কেন্দ্রে খবর ঘোষণা করা হয়। সেই মানুষটা আজ আর নেই। চারু মজুমদারকে গ্রেপ্তারের সময় আর দুজন যাঁরা ছিলেন তারা শ্লোগান দিয়ে কালো ভ্যানের সামনে অত রাতে জমায়েত লোকের সামনে বলে ওঠেন, ‘কমরেডস, আমাদের সঙ্গে এই বয়স্ক মানুষটাই হলেন চারু মজুমদার। পুলিশ এঁকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।’ সমস্ত জনতাই পলকের জন্য থমকে উঠলো। নকশালবাড়ির সুবাদে এই নামের সঙ্গে পরিচিত সবাই। তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক রোমান্টিক নেতার চরিত্র। একজন বয়স্কা মহিলা বলে উঠলেন, ‘আহা, এমন একজন মানুষ আমাদের পাড়ায় ছিলেন! আগে জানলে একটু চোখের দেখা দেখে নিতাম।’

কিপ এলারর্ট। চারু মজুমদারে ইজ ডেড। উই মাস্ট বি অন দ্য ওফনেসিভ।’ অয়্যারলেসের মাধ্যমে গোটা পশ্চিম বাংলার থানায় ঘন ঘন মেজেস ছড়িয়ে যেতে থাকে।

গত দশ এগার দিন ধরে যে মানুষটির নামের সঙ্গে পরিচয় বেশি দিনের না হলেও অত্যন্ত গভীরে চলে গেছে তাঁর নাম গোটা দেশে। ছোটখাট, পাতলা রোগা, মাঝারি উচ্চতা। বড় বড় সুন্দর চোখ। একদম পদ্মপলাশ লোচন। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা কঠিন। চোট ছোট চুল। নাকটা ধারালো, ঠোট অবধি চলে এসেছে।

২৮ জুলাই তারিখেই সব শেষ হয়ে গেছে। যে মানুষটা দীর্ঘদিন এত অসুস্থ শরীর নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে জীবনের ধকল সয়ে, সারা ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণে চষে বেড়িয়েছেন, আজ তিনি সমস্ত রকম সরকারী চিকিৎসার সুযোগ পেয়েও (?) গ্রেপ্তার হবার মাত্র বারো দিনের মাথায় মারা গেলেন। ওদের এতটুকু সাহস হলো না তাঁকে রেখে বিচারের প্রহসনটুকু করার।

কেন এত ভয়? কড়া পুলিশ প্রহরায় মৃতদেহ দাহ করা হলো বৈদ্যুতিক চুল্লীতে অতি গোপনে। কোন সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যানকে পর্যন্ত যেতে দেওয়া হয়নি তাঁর কাছে। পুলিশের কাছে কাদের যেন কঠোর নির্দেশ, কোন প্রশ্ন করা চলবে না। শুধু সমস্ত মন্ত্রী ও নেতাদের বাড়ীর সামনে গিজ গিজ করছিল পুলিশ আর পুলিশ তাঁর মৃত্যুর পর।

সেদিনের দৈনিক কাগজ লিখল, ‘হিংসার রুঘুপতিপ্রতিম পুরোহিত চারুবাবু কালীমূর্তিকে ঘোর দংস্ট্রা করাল স্বরূপের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করিয়া থাকিবেন। তবে ইহাও লক্ষণীয় যে তাঁহার মতে দীক্ষিতগণ একদা কেবল মনীষিদের প্রতিমূর্তির অঙ্গহানি ঘটাইয়াছে, কিন্তু সার্বজনীন পুজা মন্ডপে বা মন্দিরে দূরে থাক, পথে ঘাটে ব্যাঙের ছাতার মত গজানো সিন্দুর ও পাথরের নুড়ি বা গাছের গুঁড়ি লক্ষ্য করিয়া তাহাদের কালোপাহাড়ী উৎসাহ আদৌ উত্তেজিত হয় নাই। এসবই আন্তখন্ডন ও ভ্রান্ত নির্দেশের পরিণাম ও ফল, এর সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অজস্র কটু কথা; হাফ পলিটিক্যাল, হাফ অ্যান্টিসোশাল, সিআইয়ের এজেন্ট, ৬৭ বিঘা জমির মালিক, বাড়িতে মা কালির ছবি টাঙানো এসব তো রয়েছেই। টিপ্পনিসমেত অপর কিছু লোক আজ ভোট, কাল বিপ্লব এই ফাঁসির মন্ত্র জপিয়া যারা দলীয় কর্মীদের ঠকাইয়াছে তাদের নেতা প্রমোদ দাশগুপ্তের কাকাবাবুর গ্রেপ্তারের পর বক্তব্য, ‘এসব লোক যতদিন পার্টিতে ছিলেন ততদিন পার্টির নীতির বিরোধীতা করার মত নৈতিক সাহস এদের ছিল না।’ জন্মস্মৃতি অত হ্রস্ব নয়। পত্রিকাটি লিখছে , যুক্তফ্রন্ট আমলে মন্ত্রী হইয়া হরেকৃষ্ণবাবু তবে কাহাকে ভজাইতে নকশালবাড়ি ছুটিয়া যান? দলতো তখনও ভাগ হয়নি?

তো, এই হিংসার রঘুপতিকে আর বাঁচিয়ে রাখা গেল না। তখন কত বয়স ছিল চারু মজুমদারের? পঞ্চাশ সবে হয়ত পেরিয়েছিল। কিন্তু তখনই তিনি বাঁধানো দাঁত ব্যবহার করতেন। রোজ রাত্রে ভীষণ যত্ন করে পরিষ্কার করে দাঁত তুলে রাখতেন। পুলিশের সংবাদদাতা রিপোর্ট লিখল; ‘হানা দেবার পর চারুবাবুকে সাবইন্সপেক্টর বললেন, আপনার খোলা দাঁতের পাটি দুটো পরুন তো। উনি তাই করলেন। পুলিশটি বেরিয়ে এসে ডেপুটি কমিশনারকে ফোন করে জানালেন, ‘স্যার ঠিক লোককেই পেয়েছি। চলে আসুন।’ এর পর পরই যবনিকা টেনে দেয়া হলো একটি দুনিয়া কাঁপানো যুগের। অনেক পরে জানা গেছে লালবাজারে বন্দী চারু মজুমদারের প্রাণ রক্ষাকারী ওষুধের সাপ্লাই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। যে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষে সারা ভারতবর্ষ কেঁপে উঠেছিল, যে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে যেতে বসেছিল। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আতুর ঘরের সংশোধনবাদী দূর্গ, সেই বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ যেন আষাঢ়ের ঘন বর্ষায় ঢাকা পড়ে গেল! নিভে গেল একটি প্রদীপ যা সমস্ত যুগকে আলোকিত করতে চেয়েছিল।

চারু মজুমদার শহীদ হওয়ার ৩৯ বছর পর আজও ভারতের কোণে কোণে অসংখ্য ‘চারু মজুমদার’ জন্ম নিচ্ছে। পশ্চিম বাংলা থেকে বিপ্লবের আগুন অন্ধ্র, বিহার উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট, মধ্যপ্রদেশ হয়ে সারা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে পথ দেখাচ্ছে। চারু মজুমদার শহীদ হওয়ার পর বহুধা বিভক্ত সিপিআই(এমএল) বারে বারে সংগঠিত হয়েছে, আবার ভেঙ্গেছে, আবার সংগঠিত হয়েছে। এখনো এই গড়ার প্রক্রিয়া চলেছে অবিরাম। চারু মজুমদার আজ নেই, কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে সেই ভারত কাঁপানো কৃষক আন্দোলন কিভাবে গোটা ভারতবর্ষের সঙস্কৃতিকে ঝাঁকি দিয়েছিল তার কিছু উদাহরণ আমরা দেখি বিভিন্ন লেখকের স্মৃতিচারণেঃ

দিলীপ বাগচী তার ‘নওদা থেকে নকশালবাড়ী: পিছন ফিরে দেখো’ প্রবন্ধে লিখছেন; যে ঘটনা বর্তমানে ঘটে তারও একটা পূর্বপ্রস্তুতি অবশ্যই থাকে। নকশালবাড়ীর ঘটনারও একটা পূর্বপ্রস্তৃতি ছিল, ছিল একটি প্রক্রিয়া। ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভিভক্ত শিবিরে সুদীর্ঘ কাল ধরে দুটি রণনীতিগত ধারার মধ্যে, মতাদর্শের স্তরে আন্ত:দলীয় সংগ্রাম ছিল। সেটা ছিল জাতীয় গণতান্তিক মোর্চার তত্ত্ব বনাম জনগণতান্ত্রিক মোর্চার তত্ত্বের লড়াই।জনগণতান্তিক মোর্চা গঠনের মাধ্যমে সশস্ত্র লড়াই সংগঠিত করে জাতীয় মুক্তি অর্জন করার রণনীতি ও কৌশল গ্রহণের পথে ভারতীয় কমিউন্সিটদের বিপ্লবী অংশকে উদ্বুদ্ধ করেছিল চীন বিপ্লবের অভিজ্ঞতা। স্তালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভের সোভিয়েত কমিউন্সিট পার্টি নিস্তালিনীকরণের নামে আদর্শগতভাবে সাম্যবাদকে আক্রমণ করলে মাও সে তুঙ এর নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টিগুলিকে সংশোধনবাদের বিপদ সম্পর্কে সচেতন করতে আন্তার্জাতিক মহাবিতর্ক আরম্ভ করে। সে বিতর্কের রেশ ধরে সংশোধনবাদী পার্টিগুলি মাও সে তুঙকে ১৯৫৬ পর্যন্ত সঠিক বলে তার পরে তার অবদানকে অস্বীকার করে নকশালবাড়ীর আন্দোলনকে সমর্থন করার কারণে!

নবারুণ ভট্টাচার্য তার স্মৃতিচারণে বলছেন : ‘যে পিতা সন্তানের লাশ…..’ এক ভদ্রলোকের সঙ্গে প্রায়ই আমার বাসে দেখা হয়। অনেক সময় আমরা একসাথে ফিরি। শ্যী কলোনিতে যে পাঁচটি ছেলেকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল ইনি তাদের মধ্যে একজনের পিতা। পেশায়কম্পাউন্ডার। সত্তরের রাজনীতির সন্ত্রাস যে কী তার প্রমাণ শ্রী কলোনির কার্নিভাল। কার্নিভালই বলব কারণ ছেলেগুলি আহত হবার অনেক অনেকক্ষণ পর ছটফট করতে করতে মারা যায় এবং অন্তিম সেই সময়ে তাদের মুখে এক ফোঁটা জলও দিতে দেয়া হয়নি! লোকে ভিড় করে এই বিভৎস দৃশ্য দেখতে এসেছিল! ওই হতভাগ্য পিতা কাজ করতেন পুলিশ মর্গে। তিনি শহরতলী থেকে আনা পাঁচটি ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহের মধ্যে নিজের ছেলেকে খুঁজে পেয়েছিলেন! এই হত্যাকাণ্ড কিন্তু পুলিশ করেনি। করেছিল ক্ষমতাসীন বৃহত্তম বামপন্থী দল। যার নেতা একসময় দ্বন্দ্বমূলক কৌতুকের বশে প্রশ্ন করেছিলেন; পুলিশের বুলেটে ‘নিরোধ’ পরানো আছে কিনা? কারণ প্রত্যাসিত সংখ্যায় নকশাল মরছে না! ইনিই প্রস্তাব করেছিলেন যে পুলিশরা সের দাঁড়াক, তাঁর দল নকশাল সমস্যা চুকিয়ে দেবে। ….. জীবিত থাকতে রাষ্ট্রের থেকে গোপনে থাকতাম/ মৃত আমাকে রাষ্ট্র গোপনে এনেছে এখানে…….

ভারতবর্ষের কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রথম এতো তীব্র ও তীক্ষ্ণভাবে বুদ্ধিজীবীদের প্রশ্ন করা হয়েছিলো , তুমি কার পক্ষে?

নকশালবাড়ি সাম্প্রতিক ভারতবর্ষের ইতিহাসের সর্বশেষ বিভাজনরেখা। এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজসংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপনও নকশালবাড়ির কৃষকঅভ্যুত্থানের আগে যেমনটি ছির পরে আর তেমনটি থাকেনি। নকশালবাড়ির রাজনীতি সফল হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে বিতর্ক থাকতে পারে, দেশব্যাপী সেই নিপীড়িত জনতার বিপুল অভ্যুত্থানে ত্রুটি বিচ্যুতি কতটা ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা আজও নকশালপন্থীরা দখল করতে পারেনি এটাও তর্কাকতীত বাস্তবতা। কিন্তু ১৯৬৭তে তরাইয়ের আকাশে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ যে ভারতবর্ষের আবহমানকালের ইতিহাসের এক অভিনব পালাবদলের সংকেত বহন ক’রে এনেছিলেন এটা আজ শত্রমিত্রনির্বিশেষে সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। সমাজগবেষকরা আজ নানাভাবে সমীক্ষা করে দেখেছেন ভারতবর্ষের জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে নকশালবাড়ির অগ্নিস্ফূলিঙ্গ একেবারে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এমনকি শাসকশ্রেণীগুলির আদবকায়দাও সে বদলে দিয়েছে। তাই প্রায় তেতাল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হলেও আপাত: পরাজিত, বিপর্যস্থ, ছত্রভঙ্গ একটি আন্দোলন আজও প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়, অন্ধ্রপ্রদেশে, বিহারে, ঝাড়খণ্ডে, ছত্তিশগড়ে, জামগড়ে, পুরুলিয়ায়, মেদীনিপুরে বা বাংলাদেশের কোথাও কোথাও আজও বেজে ওঠে কৃষকযুদ্ধের রণদামামা।”

আমাদের শিল্পসংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই নকশালবাড়ির প্রভাব অপরিসীম। একটি ‘মৃত’ আন্দোলন সম্পর্কে এখনো শত্র“পক্ষের আতঙ্ক কাটে না।এখনো শত্রুপক্ষের লেখাপত্রে নকশালবাড়ির বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা অব্যাহত। অন্যপক্ষে নকশালবাড়ির রাজনীতির সপক্ষেও শিল্পসাহিত্যের অঙ্গনে অসংখ্য কণ্ঠস্বর সরব ও সোচ্চার। যে শিল্পসাহিত্যের বাণিজ্যিক চরিত্রকে আমরা ‘বাজারী’ বলে চিহ্নিত করি, সেই বাজারী পত্রপত্রিকায় প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীসাহিত্যিকেরা এখনো নকশালপন্থীদের প্রতি সহানুভূতির বন্যা বইয়ে দেন। এখনো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘পূর্ব পশ্চিম’ লিখতে গিয়ে চারু মজুমদারকে চরিত্র হিসেবে আনেন, ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয় চারু মজুমদারের অসাধারণ স্কেচ, প্রচ্ছদনিবন্ধ বেরোয় অন্ধ্রের নকশাল আন্দোলন নিয়ে!

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই ভোর রাতে শিলিগুড়ির দীপক বিশ্বাসের বিশ্বাসঘতকতায় চারু মজুমদার অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় কলকাতার এন্টালী এলাকা থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। লালবাজারের পুলিশী হাজতে টানা বারো দিন পাশবিক অত্যাচার সহ্য করে ২৮ জুলাই শহীদের মৃত্যু বরণ করলেন আজীবন বিপ্লবী এই মানুষটি। চারু মজুমদার আজ নেই। কিন্তু তিনি ভারতবর্ষের শোষিত জনগণের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন শোষণমুক্তির এক অমোঘ অস্ত্র মার্কসবাদলেনিনবাদমাওসেতুঙ চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত নকশালবাড়ির রাজনীতি। সেই রাজনীতি দিয়ে যেদিন সমগ্র ভারতবর্ষকে মুক্ত করা যাবে সেদিনই কমরেড চারু মজুমদারের আত্মত্যাগকে প্রকত সন্মান জানানো হবে।

ঢাকা, ২৮ জুলাই, ২০১১।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s