১৭ই সেপ্টেম্বর এবং জাতির আত্মবিস্মৃতির দায়ভার

Posted: সেপ্টেম্বর 27, 2011 in মন্তব্য প্রতিবেদন
ট্যাগসমূহ:

লিখেছেন: ফেরারী সুদ্বীপ্ত

বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর উদ্যোগে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে পালিত হয় শিক্ষা দিবস

৯ই সেপ্টেম্বর ১৯১৫ ।পুলিশের গুলিতে মারাত্মক আহত অগ্নিযুগের বিপ্লবী বাঘা যতীন বালেশ্বর সরকারী হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। আর বেশিক্ষণ নেই বোধ হয়, চিরতরে ঘুমিয়ে পড়বেন তিনি। শেষ মুহুর্তে শুরু হল রক্ত বমি, হাতে রক্ত নিয়ে যতীন বললেনএত রক্ত ছিল শরীরে? ভাগ্যক্রমে প্রতি বিন্দু অর্পণ করে গেলাম দেশমাতার চরণে।” এরপর তিনি আর চোখ মেলেন নি।

এই তো নির্ভীক, চির দুর্দম, দুর্বিনীত বাঙ্গালি। হাসতে হাসতে অকাতরে কতবার নিজের রক্ত দিয়ে ধুয়ে দিয়েছে স্বদেশ জননীর চরণ। এই জাতির অন্তরে সঞ্চিত আছে অগ্নিপ্রভ স্বদেশপ্রেম। অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে যে কোন মুহুর্তে বাঙ্গালির ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে উদগিরিত হতে পারে স্বদেশপ্রেমের প্রখর আগ্নেয় তেজ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহী বাঙ্গালির রুদ্র নয়ন থেকে বিচ্ছুরিত হয় প্রতিবাদের বহ্নিশিখা। শিবজ্যান্ত বাঙ্গালির দ্রোহের অমিত তেজে ভস্মীভূত হয় শোষকের দল।

কত বীর শহীদের রক্তে স্নাত এই বাংলামায়ের আচঁল। স্বাধিকার আদায় আন্দোলনে প্রতিটি পর্যায়ে এভাবে বারে বারে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এটা শুধু নয় মাসের কোন রোমাঞ্চকর কাহিনী নয়, এর শুরু সেই ব্রিটিশ পর্ব থেকে। পাকিস্তান পর্বে এসে দমিয়ে রাখা যায় নি বাঙ্গালির অমিয় ইচ্ছাশক্তি, স্বাধীনতা লাভের অয়োময় আকাঙ্খা। ইতিহাসের খেরোখাতায় নিজের রক্তের লাল কালিতে বাঙ্গালি লিখেছে তার অভ্যুদয়ের আখ্যান।

কিন্তু হায়! বাঙ্গালিরাই বোধ হয় একমাত্র জাতি যারা আত্মবিস্মৃতির চোরাবালিতে সমর্পণ করে নিজের সমস্ত সংগ্রামী ঐতিহ্য, রক্তের দাগ মুছে ফেলে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে ভরপুর ইতিহাসের খেরোখাতাটি ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেয়। মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় প্রখর সংগ্রামী চেতনাকে বিস্মৃতির কৃষ্ণমেঘে আড়াল করে রাখতে পারে একমাত্র বাঙ্গালিরাই। বাঙ্গালি জাতি এ এক মহাব্যাধিতে অভিগ্রস্ত, সব কিছু ভুলে যায়, হুজুগে পড়ে যা পায়, তাই নিয়ে মত্ত থাকে, এরপর আবার ভুলে যায়। একটা জাতির সংগ্রামী চেতনার অন্তঃসলিলার দামিনী স্রোত যদি চোরাবালির নিচে হারিয়ে যায় তাহলে দাসত্বের শৃঙ্খল হয় সেই জাতির ভূষণ, বিলয় ঘটে তার প্রতিবাদী শক্তির। আত্মবিস্মৃতির চোরাবালিতে নিমজ্জিত জাতির জাড্যতা দেখে বরেণ্য লেখক হুমায়ুন আজাদ সংক্ষুদ্ধ চিত্তে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, বাঙালি আন্দোলন করে, সাধারণত ব্যর্থ হয়, কখনো কখনো সফল হয়; এবং সফল হওয়ার পর মনে থাকে না কেনো তারা আন্দোলন করেছিলো

ক্যালেণ্ডারের পাতার দিকে চোখটা না রাখলেও আমরা জানি এটা সেপ্টেম্বর মাস। বিসিএসের ক্যান্ডিডেট থেকে শুরু করে ,সরকারে আয়কর বিভাগ, আয়কর দাতা,আয়কর উকিল সবাই জানে গত ১৫ই সেপ্টেম্বর ছিল আয়কর দিবস। এর বাইরে আর কোন দিবস থাকবে, থাকতে পারে, এটা নিয়ে কারো কোন মাথাব্যাথা নেই। কিন্তু যারা জাতির মাথা তথা বিবেক ছাত্রসমাজের ব্যাথাটা থাকা উচিত ছিল। হা হতোস্মি! এই বাঙ্গালার একজন শিক্ষার্থীও কি জানে না শিক্ষার আন্দোলনে অপরাজেয় ছাত্রসমাজের বীরোচিত, স্পর্ধিত ভুমিকার কথা? তাদের মহামহিময় আত্মত্যাগ? এটাই বাস্তব যে প্রযুক্তি আর গতির রথের সারথি নব প্রজন্ম এ সম্পর্কে অবগত নয়। তারা জানে না, তাদের জানতে দেওয়া হয় নি। শাসক শ্রেণী মুছে দিয়েছে সেই গৌরবজ্জল ইতিহাস। কোথাও রাখেনি, না বইয়ের পাতায়, না নবপ্রজন্মের চেতনায়।

১৭ ই সেপ্টেম্বর একটি তারিখ যা বামপন্থীরা ছাড়া আর কেউ তেমন হিসাব রাখে না, আর কারো রাখার প্রয়োজনও পড়ে না। সময়টা ১৯৬২ সাল। পাকিস্তানি প্রায় ঔপেনিবেশিক শাসনশোষণের বিরুদ্ধে সুপ্ত জাতির কর্ণকূহরে রণদুন্দুভি বাজাচ্ছে বাংলার সংশপ্তক ছাত্রসমাজ। অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠীর ভ্রুকূটি উপেক্ষা করে ছাত্রসমাজের পদাতিক পদক্ষেপ ও মিছিলের শ্লোগান মন্দ্রিত হচ্ছে, স্পন্দন জাগাচ্ছে, মুক্তির প্রতীক্ষায় প্রহর গুণতে থাকা সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির অন্তরে। মুক্তির আকাঙ্খা বন্যা বেগের মত ছুটে চলেছে বিপুল ভবিষ্যতের পানে। জঙ্গিলাট আইয়ুব শাহী মনের অজান্তে বারুদে আগুন দিলেন। এস এম শরীফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে প্রণয়ন করলেন চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি। টাকা যার শিক্ষা তার; এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে শিক্ষাকে পণ্য পরিণত করাএবং শিক্ষাকে একটি বিশেষ শ্রেণীর হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবসহ একটি সাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতি এদেশের জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাইলেন। এই চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত ছাত্রসমাজ সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখ হরতাল আহবান করে এবং এর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষিক সহ সর্বস্তরের মানুষ। বাঙ্গালির আড়মোড়া ইতোমধ্যে ভাঙ্গতে আরম্ভ করেছে তাই তারা আঁচ করতে সময় নেয়নি এটা শুধু ছাত্রদের শিক্ষা সম্পর্কিত আন্দোলন নয়, এটা স্বাধিকার আদায় আন্দোলনের একটা মাহেন্দ্রক্ষণও বটে। ১৭ই সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে নয়টায় বের হয় ছাত্রজনতার বিরাট জঙ্গি মিছিল। মিছিল যখন হাইকোর্ট পার হয়ে আবদুল গণি রোডে প্রবেশ করে তখন পুলিশ গুলিবর্ষণ আরম্ভ করল। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল বাবুল, মোস্তাফা ও ওয়াজিউল্লাহ। পিচঢালা রাজপথ রক্তে সিক্ত হল। জঙ্গিলাট আইয়ুব শাহী পারলেন না তার শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে। বাবুলমোস্তাফাদের রক্ত সেই দিনে রাজপথে শুকিয়ে যায়নি, সঞ্চারিত হয়েছিল জাতির ধমনীর শোণিত প্রবাহে, মস্তিষ্কের শিরা উপশিরায়। ঐ রক্তের স্রোত ধাবিত হয়েছিল আরো এক রক্তগঙ্গার পানে, অবশেষে গিয়ে মেশে স্বাধীনতার মোহনায়।

এই হল আমাদের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস যা হিরন্ময় দ্যুতিতে ভাস্বর ও প্রোজ্বল হয়ে ঊঠতে পারেনি। এর পেছনে যতটা না আমাদের আত্মবিস্মৃতির ঘোড়ারোগ দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী আমাদের দন্ডমুন্ডের কর্তাদের ইতিহাস মুছে ফেলার হীন অপপ্রয়াস। বাংলাদেশ নামক ভুখন্ডের অভ্যুদয়ের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আছে এ শিক্ষা আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন, শিক্ষার সার্বজনীন অধিকার সংরক্ষণের আন্দোলন, শিক্ষার পণ্যায়ন ও সাম্প্রদায়িকীকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সর্বোপরি এর সাথে যুক্ত হয়েছিল প্রায় ঔপনেবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিস্পৃহা। যেহেতু স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলসমুহের ক্ষমতার পালাবদল করেছে, কিন্তু শিক্ষানীতির প্রশ্নে কেউই ঘাড় থেকে আইয়ুবী ভুত নামাতে পারেনি, আর তাই তারা চায় না এই সংগ্রামী ইতিহাস যুগ যুগ ধরে জীবন্ত থাকুক, প্রেরণা দান করতে থাকুক।কারণ শিক্ষার নীতিগত প্রশ্নে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসক, পাকিস্তানী প্রায় ঔপনেবেশিক শাসক এবং স্বাধীন দেশের বুর্জোয়া শাসকের মধ্যে সময়, পরিস্থিতি এবং মাত্রাগত কিছু তারতম্য ছাড়া মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির তেমন কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না। একটা সুরের ঐক্য তাদের সকলের মধ্যে রয়েছে তা হল; যে শোষণ ও বৈষম্যের সমাজ তারা টিকিয়ে রেখেছেএর প্রয়োজনের বাইরে তারা শিক্ষাকে গণমানুষের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে দেবে না। ফলে জনগণের অধিকার প্রশ্নেসমাজ প্রগতির অর্থে শিক্ষার প্রয়োজন তাদের কাছে বাহুল্য এবং দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ একটা রাষ্ট্রের চরিত্রবৈশিষ্ট্য এবং শাসক শ্রেণীর শ্রেণী চরিত্রের ওপর নির্ভর করে শিক্ষানীতি কি ধরনের হবে। শিক্ষানীতির ভুমিকা ও প্রস্তাবনায় চমৎকার ও চটকাদারী বক্তব্য যতই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা শিক্ষা সঙ্কোচনের নীল নকশায় পরিণত হয়।

বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর জাতীয় শিক্ষানীতি২০১১ সেই নতুন বোতলে পুরানো মদই হাজির করেছে। চটকদার ও প্রাঞ্জল ভাষার আড়ালে শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অতীতের সমস্ত গণ আন্দোলন থেকে উঠে আসা সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, সেক্যুলার, বৈষম্যহীন, একই ধারার শিক্ষানীতির দাবিকে পাশ কাটিয়ে শিক্ষার বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ এবং টাকা যার শিক্ষা তার এই নীতিকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে পিপিপি , বেসরকারী বিনিয়োগ এই সব গাল ভরা বুলির আড়ালে ব্যবসায়ীদের শিক্ষাব্যবসার নিত্য নতুন পথ বাতলে দিয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি২০১১।

যদিও এই শিক্ষানীতি প্রণয়নে আওয়ামী লীগ সামাজিকভাবে জনপ্রিয় ও তর্কাতীত ব্যাক্তিবর্গদের নিয়ে এই কমিটি করেছে তথাপি এটা পুনরায় স্মর্তব্য ব্যাক্তি মানুষের সদিচ্ছা এখানে সম্পুর্ণ গৌণ। একটা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সরকার কি ধরনের শিক্ষানীতি নিয়ে চলবে তা নির্ভর করে কি ধরনের আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার উপর তা দাঁড়িয়ে আছে এবং কোন শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে ও স্বার্থে কাজ করছে তার ওপর।

আজ শিক্ষার উপর দেশীবিদেশী লুটেরাদের শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে। সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থের মোড়ল বিশ্বব্যাংকের নির্দেশে নতজানু শাসকশ্রেণী উচচ শিক্ষার মেয়াদী কৌশলপত্রের নামে শিক্ষাকে একটা শ্রেণীর হাতে তুলে দিচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বছর বছর বেতনফি বাড়ছে। নাইট কোর্স , ইভিনিং শিফট ,HEQEP , PPP এর নামে বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ধ্বংসের ষোলকলা পুর্ণ করতে যাচ্ছে শাসক শ্রেণী।

বিস্মৃতি , সংকোচের বিহবলতা ,হতাশার অমানিশা আমাদের কাটিয়ে উঠতেই হবে। বিস্মৃত ইতিহাস কথা বলছে, আমাদের কান পেতে শুনতে হবে সেই স্বনন । তার অনুরণনে আমাদের চেতনার রুদ্ধদ্বার উদঘাটিত হোক, প্রখর প্রতিবাদী তেজে উদভাসিত হোক আমাদের মানসালোক। অতীতের সংগ্রামী ঐতিহ্যের অনুপ্রেরণা নিয়ে আমাদের ঝাপিয়ে পড়তে হবে সর্বাত্মক ছাত্র আন্দোলনে। আজ দিকে দিকে ছাত্রআন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে, এখন প্রয়োজন সময়ের আহবানে সাড়া দেওয়া। এটাই আমাদের দায়ভার।

পরিশেষে, এটাই সমূহ আকাংক্ষা, বিস্মৃতির চোরাবালি থেকে আমরা খুজে বের করব ইতিহাসের মণিহার, কণ্ঠে ধারণ করে এগিয়ে যেতে থাকব, সতত আমাদের শিয়রে জ্বলবে দ্বাদশ রবির বহ্নি, চৈতন্য আর প্রতিবাদের শাণিত তলোয়ারের আঘাতে ধ্বংস হবে অত্যাচারী, শোষক, লুটেরা গোষ্ঠী; যুগে যুগে, বার বার, অনিবার, শতবার………..

(ফটো অনিত্য অনীকের সৌজন্যে)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s