দ্বন্দ্বে বৈরিতার স্থান

Posted: সেপ্টেম্বর 27, 2011 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, ,

(সভাপতি মাও সেতুঙ, অনুশীলন সম্পর্কে, দ্বন্দ্ব সম্পর্কে, অনুবাদ:সেরাজুল আনোয়ার)

সভাপতি মাওয়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা

বিপরীতগুলোর সংগ্রামের প্রশ্নের অন্তর্ভূক্ত রয়েছে বৈরিতা কী সেই প্রশ্নটিও। আমদের উত্তর হল এই যে, বৈরিতা হল বিপরীতগুলোর সংগ্রামের অন্যতম এক রূপ, কিন্তু একমাত্র রূপ নয়।

মানবজাতির ইতিহাসে, শ্রেণীসমূহের মধ্যেকার বৈরিতা বিপরীতের সংগ্রামের এক সুনির্দিষ্ট অভিব্যক্তি হিসেবে বিদ্যমান থাকে। শোষিত ও শোষক শ্রেণীর মধ্যেকার দ্বন্দ্বের কথাই বিবেচনা করুন। এরূপ দ্বন্দ্বরত শ্রেণীগুলো দীর্ঘসময় একই সমাজে সহাবস্থান করে, তা সে সমাজ দাসতান্ত্রিক সমাজ, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ বা ধনতান্ত্রিক সমাজ যাই হোকনাকেন, এবং এরা পরস্পরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে; কিন্তু শ্রেণী দু’টির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব একটি নির্দিষ্ট স্তরে বিকাশ লাভ করার পরই কেবল প্রকাশ্য বৈরিতার রূপ পরিগ্রহ করে এবং বিপ্লবে পরিণতি লাভ করে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শান্তি থেকে যুদ্ধে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য।

বিস্ফোরিত হওয়ার পূর্বে বোমা হল এমন একটি সত্ত্বা যেখানে নির্দিষ্ট অবস্থাধীনে বিপরীতগুলো সহাবস্থান করে। বিস্ফোরণ একমাত্র তখনই ঘটে যখন একটি নোতুন শর্তপ্রজ্জ্বলনদেখা দেয়। যেসব প্রাকৃতিক বিষয়ব্যাপার পুরাতন দ্বন্দ্ব সমাধান ও নতুন বস্তু সৃষ্টির জন্যে চূড়ান্তত প্রকাশ্য সংঘাতের রূপ পরিগ্রহ করে সেসবগুলোর ক্ষেত্রেও এরূপ সাদৃশ্যপূর্ণ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।

এই বাস্তব ঘটনাটি অনুধাবন করা অতিশয় গুরুত্বপুর্ণ। এটা আমদের বুঝতে সমর্থ করে তোলে যে, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে বিপ্লব ও বিপ্লবী যুদ্ধ অপরিহার্য এবং সেগুলো ছাড়া সমাজবিকাশের ক্ষেত্রে কোন দ্রুত অতিক্রমণ সম্পন্ন করা ও প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণীগুলোকে উৎখাত করা অসম্ভব আর সেজন্যে জনগণের পক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করাও অসম্ভব। সমাজবিপ্লব হলো অপ্রয়োজনীয় ও অসম্ভব – এরূপ দাবীর মতো প্রতিক্রিয়াশীলদের শঠতাপূর্ণ প্রচারপ্রোপাগান্ডার স্বরূপ কমিউনিস্টদের উদ্‌ঘাটন করে দিতেই হবে। সমাজবিপ্লবের মার্ক্সবাদীলেনিনবাদী তত্ত্বকে তাদের দৃঢ়ভাবে উর্ধ্বে তুলে ধরতে এবং জনগণকে একথা বুঝাতে সমর্থ হতে হবে যে, সমাজবিপ্লব শুধু যে সম্পুর্ণত প্রয়োজনীয় তা নয়, বরং তা সম্পূর্ণত সম্ভবও বটে, আর মানবজাতির সমগ্র ইতিহাস ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়যাত্রা এই বিজ্ঞানসম্মত সত্যের সুনিশ্চয়তা প্রদান করেছে।

কিন্তু, বিপরীতগুলোর প্রতিটি সুনির্দিষ্ট সংগ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই বাস্তব অধ্যয়ন চালাতে হবে এবং সবকিছুর ক্ষেত্রেই আলোচিত(দ্বন্দ্বের) সূত্রকে যথেচ্ছভাবে প্রয়োগ করা চলবেনা। দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম হলো সর্বজনীন ও চূড়ান্ত, কিন্তু দ্বন্দ্বের সমাধানের পদ্ধতি, অর্থাৎ সংগ্রামের রূপসমূহ, দ্বন্দ্বের প্রকৃতির বিভিন্নতা অনুসারে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কোন কোন দ্বন্দ্বের বৈশিষ্ট্য হলো প্রকাশ্য বৈরিতা, অন্যগুলোতে তা নেই। বস্তুর বাস্তব বিকাশ অনুসারে, কোন কোন দ্বন্দ্ব যা আদিতে ছিল অবৈরি পরে তা বৈরি দ্বন্দ্বে বিকাশ লাভ করে, আর অন্য যেগুলো ছিল আদিতে বৈরি পরে সেগুলো অবৈরি দ্বন্দ্বে বিকাশ করে।

ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, যতদিন শ্রেণী বিদ্যমান থাকবে ততদিন কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সঠিক ও বেঠিক চিন্তাধারার দ্বন্দ্ব হলো পার্টির ভেতরে শ্রেণীদ্বন্দ্বের প্রতিফলন। প্রথম অবস্থায় কিছু কিছু প্রশ্নের ব্যাপারে, এরূপ দ্বন্দ্বসমূহ বৈরি রূপে নিজেদের অভিব্যক্ত নাও করতে পারে। কিন্তু শ্রেণীসংগ্রামের বিকাশের সাথে সাথে এগুলো বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বৈরি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস আমাদের দেখিয়ে দেয় যে লেনিন ও স্তালিনের সঠিক চিন্তাধারা এবং ট্রটস্কি, বুখারিন ও অন্যান্যদের ভ্রান্ত চিন্তাধারার মধ্যেকার দ্বন্দ্বসমূহ গোড়ার দিকে বৈরি রূপে নিজেদের অভিব্যক্ত করেনি, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলো বৈরিতায় বিকাশ লাভ করেছিল। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসেও অনুরূপ ঘটনা রয়েছে। প্রথম অবস্থায় আমদের পার্টির অনেক কমরেডদের সঠিক চিন্তাধারা আর ছেন তুসিউ ও চাঙ কুওথাও এবং অন্যান্যদের ভ্রান্ত চিন্তাধারার মধ্যেকার দ্বন্দ্বসমূহ বৈরিরূপে নিজেদের অভিব্যক্ত করেনি, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলো বৈরিতায় বিকাশ লাভ করে। বর্তমানে আমাদের পার্টিতে সঠিক ও বেঠিক চিন্তাধারার মধ্যেকার দ্বন্দ্ব বৈরি রূপে নিজেকে অভিব্যক্ত করছেনা, এবং যেসব কমরেড ভুল করেছেন তাঁরা যদি সেগুলো সংশোধন করতে পারেন, তাহলে তা বৈরিতায় বিকাশ লাভ করবে না। এজন্যে, পার্টিকে একদিকে ভ্রান্ত চিন্তাধারার বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে, অন্যদিকে যেসব কমরেড ভুল করেছেন তাঁদেরকে জাগে উঠার জন্য যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে। এমতাবস্থায়, মাত্রাতিরিক্ত সংগ্রাম স্পষ্টতই অনুপযুক্ত। কিন্তু যেসব লোক ভুল করেছেন তাঁরা যদি সেগুলো আঁকড়ে থাকেন এবং গভীরতর করেন, তাহলে এই সম্ভাবনা থেকে যাবে যে এই দ্বন্দ্ব বৈরিতায় বিকাশ লাভ করবে।

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে, পুঁজিবাদী সমাজ, যেখানে বুর্জোয়া শাসনাধীনে শহরগুলো নির্মমভাবে গ্রামাঞ্চলকে শোষণ করে, আর চীনে কুওমিনতাঙ শাসিত এলাকা, যেখানে বৈদেশিক সাম্রাজ্যবাদ ও চীনা মুৎসুদ্দি বড় বুর্জোয়াশ্রেণীর শাসনাধীনে শহরগুলো চরম বর্বরতার সাথে গ্রামাঞ্চলকে লুণ্ঠন করে – এই উভয় ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব একটা অতিশয় বৈরি দ্বন্দ্ব। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক দেশে এবং আমাদের বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকায়, এই বৈরি দ্বন্দ্ব একটা অবৈরি দ্বন্দ্বে পরিবর্তিত হয়েছে; আর যখন সাম্যবাদী সমাজে পৌঁছানো যাবে তখন এই দ্বন্দ্ব বিলুপ্ত হবে।

লেনিন বলেছেনঃ “বৈরিতা ও দ্বন্দ্ব কোনক্রমেই এক বিষয় নয়। সমাজতন্ত্রের অধীনে, প্রথমটির তিরোধান ঘটবে, কিন্তু দ্বিতীয়টি থাকবে’’(এন, আই, বুখারিন এর গ্রন্থ ‘উত্তরণের যুগের অর্থনীতি’এর উপর মন্তব্য)। অর্থাৎ, বৈরিতা হলো বিপরীতগুলোর সংগ্রামের অন্যতম এক রূপ, কিন্তু একমাত্র রূপ নয়; বৈরিতার সূত্র যথেচ্ছভাবে প্রয়োগ করা যায় না।

সংকলন: শিহাব ইশতিয়াক সৈকত

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s